ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: বন্যা, অধিকার বঞ্চিতকরণ, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও শীতল যুদ্ধের খাদ্য-রাজনীতির গভীরতর বিশ্লেষণ
‘ভবিষ্যতে দাম কমানোর প্রলোভন’ মার্কিন কোম্পানির সাথে সরকারের উচ্চমূল্যে এলএনজি চুক্তি
ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি না করায় বিএনপির সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ শেখ হাসিনার
ভারতের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আগের চেয়েও জোরদারে দুটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ভারত সফরে তারেক রহমান: তবুও গোপন রাখার চেষ্টায় প্রেস উইং!
দলীয় কার্যালয়ে বিএনপির দুই পক্ষের হামলা, গ্রিল-আসবাবপত্র লুটপাট
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় উচ্ছ্বসিত জারদারি, পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ
আওয়ামী লীগ আমলের কোনো সক্ষমতাই ধরে রাখতে পারছে না বিএনপি সরকার
ক্ষমতার পালাবদলের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি ও প্রশাসনের দলীয়করণের অভিযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ-সংযোগ, স্বাস্থ্য অবকাঠামো, শিক্ষা সম্প্রসারণসহ কয়েকটি খাতে যে সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান বিএনপি সরকার তার কার্যকর ব্যবহারও করতে পারছে না—এমন অভিযোগ উঠছে।
বরং দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকট, সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, স্বাস্থ্য খাতে জনবল ও ওষুধের ঘাটতি, শিক্ষা খাতে শিক্ষক সংকট এবং প্রশাসনে পদায়ন ও চেইন অব কমান্ড নিয়ে অসন্তোষ সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময়
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৬৪৫ মেগাওয়াটে। এর সঙ্গে বেসরকারি ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরও প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা ছিল। একই সময়ে বিদ্যুৎ-সুবিধার আওতায় আসা জনগোষ্ঠীর হারও ৯৯ শতাংশের ওপরে ওঠে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বিপুল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। চলতি আগস্টে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গ্যাস সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে বিঘ্নকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গ্যাসনির্ভর সার কারখানাগুলোতে। চলতি বছরের মার্চে
গ্যাসসংকটে দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিই বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) হিসাবে, পাঁচটি কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক কোটি টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের অবকাঠামো একেবারে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন নেই; বিদ্যমান সক্ষমতাগুলো কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। সেই জায়গাতেই সরকারের বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসে গ্যাসসংকট আরও তীব্র হওয়ায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র। আওয়ামী লীগ
আমলে সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনবল ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছিল। কিন্তু সেই অবকাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনার সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। চলতি বছরের জুনে সরকার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়। চার শতাধিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হলেও চিকিৎসক ও জনবলের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে; একই সঙ্গে চারটি বিসিএসের মাধ্যমে ৪ হাজার ১১৩ চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে জেলা প্রশাসকদের সাম্প্রতিক প্রস্তাবনায়। উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ, জনবল এবং চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। এমনকি আগে নির্মিত বেশ কিছু স্বাস্থ্য অবকাঠামো যথাযথ পরিকল্পনা ও জনবলের অভাবে
পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শুধু অবকাঠামো নয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ঘাটতি প্রকট। প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক দীর্ঘ সময় প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে ছিল। কয়েক শ উপজেলা হাসপাতালে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ সরবরাহেও বিঘ্নের কথা উঠে এসেছে। শিক্ষা খাতেও অবস্থা খুব একটা ভিন্ন নয়। আওয়ামী লীগ আমলে শিক্ষার অবকাঠামো ও অংশগ্রহণ বাড়লেও শিক্ষার মান, রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারও সেই কাঠামোর ওপর কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট এখনো প্রকট; অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩৭ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উচ্চশিক্ষায়ও শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা, গবেষণা ও শিক্ষকতার মান
নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামো ও অর্থায়নের পাশাপাশি একাডেমিক গভর্ন্যান্স এবং শিক্ষকদের মান নিয়েও সংকটের কথা উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে আমলাতন্ত্র নিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসন ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়েছিল—এমন অভিযোগ ছিল। কিন্তু সেই প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে দক্ষ ও স্থিতিশীল একটি নতুন চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নয়জন সিনিয়র সচিব ও সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। আরও কয়েকজন সচিবকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় স্থায়ী সচিব ছাড়াই চলছিল। এরপর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আমলাদের একটি
অংশের মধ্যে এ নিয়ে হতাশা বাড়ছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক পর্যায়ের কয়েকটি নিয়োগও বিতর্ক তৈরি করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করলেও এর সুফল প্রশাসনের নিচের স্তরে কতটা পৌঁছাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবদের সরাসরি যোগাযোগ থাকাটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, মাঠ প্রশাসন ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে সেই সমন্বয়ের ঘাটতিই বিভিন্ন খাতে বারবার সামনে আসছে। এখানে আওয়ামী লীগ আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে ওই সরকারের বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে প্রশাসন, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় জনগোষ্ঠীর হার ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল—এটিকে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও আওয়ামী লীগ আমলের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের জন্য মূল প্রশ্নটি অন্য। আগের সরকারের রেখে যাওয়া দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি যে কার্যকর সক্ষমতাগুলো ছিল, সেগুলোকে কি আরও শক্তিশালী করা যাচ্ছে? নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও নতুন নীতির ব্যস্ততায় বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও ক্ষয়ে যাচ্ছে? বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, অন্তত বিদ্যুৎ, গ্যাস-সার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আমলাতন্ত্র—এই পাঁচ ক্ষেত্রে সরকারকে এখনো সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। বরং বিদ্যুৎ ঘাটতি, সার কারখানা বন্ধ, চিকিৎসক ও ওষুধ সংকট, শিক্ষক ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অসন্তোষের মতো সমস্যা একসঙ্গে সামনে আসছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আমলের রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের সময় তৈরি হওয়া রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাগুলোকে কাজে লাগানোর যে প্রত্যাশা ছিল, তার প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল শুধু সরকার পরিবর্তন নয়—সেবা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃশ্যমান উন্নতি। ছয় মাসের মাথায় সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে বিএনপি সরকার।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৬৪৫ মেগাওয়াটে। এর সঙ্গে বেসরকারি ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরও প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা ছিল। একই সময়ে বিদ্যুৎ-সুবিধার আওতায় আসা জনগোষ্ঠীর হারও ৯৯ শতাংশের ওপরে ওঠে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বিপুল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। চলতি আগস্টে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গ্যাস সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে বিঘ্নকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গ্যাসনির্ভর সার কারখানাগুলোতে। চলতি বছরের মার্চে
গ্যাসসংকটে দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিই বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) হিসাবে, পাঁচটি কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক কোটি টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের অবকাঠামো একেবারে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন নেই; বিদ্যমান সক্ষমতাগুলো কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। সেই জায়গাতেই সরকারের বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। চলতি মাসে গ্যাসসংকট আরও তীব্র হওয়ায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র। আওয়ামী লীগ
আমলে সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও জনবল ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছিল। কিন্তু সেই অবকাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনার সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। চলতি বছরের জুনে সরকার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়। চার শতাধিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হলেও চিকিৎসক ও জনবলের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে; একই সঙ্গে চারটি বিসিএসের মাধ্যমে ৪ হাজার ১১৩ চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে জেলা প্রশাসকদের সাম্প্রতিক প্রস্তাবনায়। উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ, জনবল এবং চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। এমনকি আগে নির্মিত বেশ কিছু স্বাস্থ্য অবকাঠামো যথাযথ পরিকল্পনা ও জনবলের অভাবে
পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শুধু অবকাঠামো নয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ঘাটতি প্রকট। প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক দীর্ঘ সময় প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে ছিল। কয়েক শ উপজেলা হাসপাতালে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ সরবরাহেও বিঘ্নের কথা উঠে এসেছে। শিক্ষা খাতেও অবস্থা খুব একটা ভিন্ন নয়। আওয়ামী লীগ আমলে শিক্ষার অবকাঠামো ও অংশগ্রহণ বাড়লেও শিক্ষার মান, রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারও সেই কাঠামোর ওপর কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট এখনো প্রকট; অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩৭ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উচ্চশিক্ষায়ও শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা, গবেষণা ও শিক্ষকতার মান
নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামো ও অর্থায়নের পাশাপাশি একাডেমিক গভর্ন্যান্স এবং শিক্ষকদের মান নিয়েও সংকটের কথা উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে আমলাতন্ত্র নিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসন ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়েছিল—এমন অভিযোগ ছিল। কিন্তু সেই প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে দক্ষ ও স্থিতিশীল একটি নতুন চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নয়জন সিনিয়র সচিব ও সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। আরও কয়েকজন সচিবকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় স্থায়ী সচিব ছাড়াই চলছিল। এরপর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আমলাদের একটি
অংশের মধ্যে এ নিয়ে হতাশা বাড়ছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক পর্যায়ের কয়েকটি নিয়োগও বিতর্ক তৈরি করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করলেও এর সুফল প্রশাসনের নিচের স্তরে কতটা পৌঁছাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবদের সরাসরি যোগাযোগ থাকাটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, মাঠ প্রশাসন ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে সেই সমন্বয়ের ঘাটতিই বিভিন্ন খাতে বারবার সামনে আসছে। এখানে আওয়ামী লীগ আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে ওই সরকারের বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে প্রশাসন, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় জনগোষ্ঠীর হার ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল—এটিকে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও আওয়ামী লীগ আমলের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের জন্য মূল প্রশ্নটি অন্য। আগের সরকারের রেখে যাওয়া দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি যে কার্যকর সক্ষমতাগুলো ছিল, সেগুলোকে কি আরও শক্তিশালী করা যাচ্ছে? নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও নতুন নীতির ব্যস্ততায় বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও ক্ষয়ে যাচ্ছে? বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, অন্তত বিদ্যুৎ, গ্যাস-সার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আমলাতন্ত্র—এই পাঁচ ক্ষেত্রে সরকারকে এখনো সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। বরং বিদ্যুৎ ঘাটতি, সার কারখানা বন্ধ, চিকিৎসক ও ওষুধ সংকট, শিক্ষক ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অসন্তোষের মতো সমস্যা একসঙ্গে সামনে আসছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আমলের রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের সময় তৈরি হওয়া রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাগুলোকে কাজে লাগানোর যে প্রত্যাশা ছিল, তার প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল শুধু সরকার পরিবর্তন নয়—সেবা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃশ্যমান উন্নতি। ছয় মাসের মাথায় সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে বিএনপি সরকার।



