হাসান মোরশেদ
আরও খবর
জহির রায়হানের অন্তর্ধান রহস্য
শেখ হাসিনার কলাম || গণতন্ত্র নাকি উগ্রবাদ? বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ
‘ভারতের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি’ বয়ান সৃষ্টি করা মানুষগুলো কেন ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে নীরব?
ফুলবাড়ি কোল বেসিনে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হবে সরকারের আরেকটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ ও তদন্তের নামে হেনস্তা: বিশ্বজুড়ে শিক্ষক-গবেষকদের উদ্বেগ
৫০ বছর পর সাক্ষাৎকারে খুনি ডালিম: একাত্তরেই মুজিবহত্যার ছক- সম্পৃক্ত জিয়া, কোরান ছুঁয়ে নেন শপথও
একবার নক্ষত্রের দিকে চাই
শেখ মুজিব ঠিক যতোটা “ফ্যাসিস্ট”: ভেদ না জেনে গোল বাধানো
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটা শব্দ ইদানীং খুব সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। ফ্যাসিবাদ। শেখ মুজিবুর রহমানকে ফ্যাসিস্ট বলা হচ্ছে, বাকশালকে বলা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। শব্দটা এত সহজে ব্যবহার হচ্ছে যে এর ঐতিহাসিক ওজনটাই হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ ফ্যাসিবাদ কোনো ঢালাও গালি নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংশ্লেষণ। যে কোনো কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাকেই ফ্যাসিবাদ বলে দেওয়া মানে ইতিহাসকে অবহেলা করা।
ফ্যাসিবাদের তত্ত্ব ও প্রমাণিত উদাহরণ
ফ্যাসিবাদ বোঝার জন্য মুসোলিনি ও হিটলারের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার দিকেই ফিরে তাকাতে হয়। এই দুই দৃষ্টান্তই ফ্যাসিবাদের মূল রেফারেন্স পয়েন্ট। সমস্ত তাত্ত্বিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত এই দুটি ঐতিহাসিক ঘটনায় ফিরে যায়।
তাদের জাতীয়তাবাদ শুধু দেশপ্রেম ছিল না। সাধারণ দেশপ্রেমে
নিজের দেশকে ভালোবাসা থাকে, অন্যকে ঘৃণা করার বাধ্যবাধকতা থাকে না। মুসোলিনি ও হিটলারের জাতীয়তাবাদে জাতি ছিল একটি জৈবিক সত্তা। এই সত্তাকে বাঁচাতে হলে ভেতরের শত্রু চিহ্নিত করতে হতো, বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হতো। তাদের স্বৈরশাসন ছিল না শুধু কর্তৃত্ববাদ। সাধারণ কর্তৃত্ববাদে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়, মানুষ ভয়ে চুপ থাকে। ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদ শুধু মানুষকে চুপ করিয়ে রাখতে চায়নি, মানুষের ভেতরের বিশ্বাসকে বদলে দিতে চেয়েছিল। রাষ্ট্র শুধু নিয়ন্ত্রণ করত না, নতুন মানুষ তৈরি করতে চাইত। তাদের একদলীয় রাষ্ট্রও ছিল ভিন্ন ধরনের। বিশ্বের অনেক দেশে একদলীয় ব্যবস্থা এসেছে ভিন্ন ভিন্ন কারণে। সোভিয়েত ইউনিয়নের একদলীয় ব্যবস্থা এসেছিল শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব থেকে। ফ্যাসিবাদী একদলীয় রাষ্ট্র এসেছিল জাতিকে এক
অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে। দল, রাষ্ট্র আর জাতি তিনটি মিলে এক হয়ে যেত। তাদের জাতীয় সম্প্রদায় ছিল বর্জনমূলক। কে এর ভেতরে থাকবে আর কে বাইরে যাবে, এই সীমারেখা রাষ্ট্র নিজেই টেনে দিত। নাৎসি জার্মানিতে এই বর্জন ছিল সরাসরি বর্ণবাদী। ইহুদি, রোমা, প্রতিবন্ধী মানুষ, সমকামী, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী, সবাইকে জাতীয় পরিচয় থেকে আলাদা এক বিদেশি উপাদান হিসেবে দেখা হতো। ইতালীয় ফ্যাসিবাদে বর্ণবাদ শুরুতে এতটা কেন্দ্রীয় ছিল না, তবে ১৯৩৮ সালের পর মুসোলিনিও ইহুদি বিরোধী আইন চালু করেন। তাদের গণরাজনীতি ছিল সামরিকায়িত। দল পরিচালিত হতো বাহিনীর মতো। কালো শার্ট পরা স্কোয়াড্রিস্তি রাস্তায় নামত, বাদামি শার্ট পরা এসএ সদস্যরা প্যারেড করত। উর্দি, স্যালুট, মিছিল,
সবকিছু মিলে রাজনীতিকে যুদ্ধের ভাষায় রূপান্তরিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেখা হতো শত্রু সৈন্যের মতো, প্রতিযোগী হিসেবে নয়। আর এই সহিংসতা ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্তর্গত অংশ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। মুসোলিনির স্কোয়াড্রিস্তি কৃষক সংগঠন আর সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়নের অফিসে আগুন লাগাত। হিটলারের এসএ রাস্তায় রাস্তায় কমিউনিস্ট আর সমাজতান্ত্রিকদের সাথে সংঘর্ষ করত। সহিংসতা শুধু নির্বাচনের আগে ভয় দেখানোর হাতিয়ার ছিল না, এটাই ছিল রাজনীতি করার পদ্ধতি। আর তাদের জাতীয় পুনর্জাগরণের ধারণা ছিল একটি radical ideological myth-এর অংশ। জাতি যেন এক ক্ষয়প্রাপ্ত অসুস্থ সত্তা, একে সহিংস শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে নতুন করে জন্ম দিতে হবে, এমন এক পুরাণ তৈরি হয়েছিল। ইতিহাসবিদ রজার গ্রিফিন একে বলেছেন palingenetic ultranationalism, জাতির
পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে জড়িয়ে থাকা চরম জাতীয়তাবাদ। রবার্ট প্যাক্সটন তাঁর Anatomy of Fascism বইয়ে দেখিয়েছেন, ফ্যাসিবাদ কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত মতাদর্শ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক আচরণের ধারা। জাতীয় অবক্ষয়ের বোধ, শত্রুকে ধ্বংস করার আকাঙ্ক্ষা, একজন করিশম্যাটিক নেতার নেতৃত্বে গণসংগঠন, এই উপাদানগুলো একসাথে মিলে কাজ করে। এই সবগুলো উপাদান একসাথে মিলেই ফ্যাসিবাদ হয়। আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি উপাদান পৃথিবীর আরও অনেক শাসনব্যবস্থায় পাওয়া যায়। জাতীয়তাবাদ বহু দেশে আছে। কর্তৃত্ববাদ বহু শাসনব্যবস্থায় আছে। একদলীয় ব্যবস্থা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রেও ছিল। কিন্তু বর্জনমূলক জাতীয় সম্প্রদায়, সামরিকায়িত গণরাজনীতি এবং পুনর্জন্মের পুরাণ, এই তিনের একত্র উপস্থিতিই ফ্যাসিবাদকে আলাদা করে তোলে। এই নির্দিষ্টতা মাথায় না রাখলে দুটি বিপদ হয়। প্রথম বিপদ, উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বের
নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাসকে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের ছাঁচে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া। একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়করণ, একদলীয় পরীক্ষা এবং কর্তৃত্ববাদী মোড়, সবকিছুকে সরাসরি ফ্যাসিবাদের ক্যাটাগরিতে ফেলে দিলে সেই রাষ্ট্রের নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের ধ্বংসাবশেষ, ভাঙা অর্থনীতি, রাষ্ট্রগঠনের সংকট, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব, এই বাস্তবতাগুলো তখন আর বিশ্লেষণের অংশ থাকে না। দ্বিতীয় বিপদ, ফ্যাসিবাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক নির্দিষ্টতা ক্ষয় হয়ে যাওয়া। শব্দটি সব ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য ব্যবহার হতে থাকলে এর বিশ্লেষণী মূল্যই থাকে না। পশ্চিমা রাজনৈতিক বিতর্কেও এই প্রবণতা বহুবার দেখা গেছে, যেখানে প্রায় যেকোনো কট্টর ডানপন্থী নেতাকেই ফ্যাসিস্ট বলে ডাকা হয়েছে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে জার্মান
ও জাপানের সহযোগীতা নিয়ে ভারতকে বৃটিশ উপনিবেশমুক্ত করতে চেয়েছিলো সুভাষ চন্দ্র বসু, এই জন্য বহুবছর তাঁকেও ফ্যাসিবাদী গালি শুনতে হয়েছে। ইতিহাসবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন, এই ধরনের ব্যবহার শব্দটিকে গালি বানিয়ে ফেলে, বিশ্লেষণী হাতিয়ার হিসেবে অকেজো করে দেয়। শেখ মুজিবের রাজনীতির ধারা এবার প্রশ্ন হলো, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের ধারায় ফ্যাসিবাদের এই উপাদানগুলো খুঁজে পাওয়া যায় কি না। মুজিবের রাজনৈতিক পরিপক্কতা শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই সংগ্রামের চরিত্র জাতিগত বিশুদ্ধতার সন্ধান ছিল না। এটি ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ। ছয় দফা আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, প্রাদেশিক বৈষম্য দূর করার দাবি। এখানে কোনো বর্জনমূলক জাতীয় পুরাণ নেই। বরং আছে একটি বহুত্ববাদী, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে অধিকার আদায়ের রাজনীতি। আওয়ামী লীগের রাজনীতি সবসময় নির্বাচনমুখী ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এই ধারারই ধারাবাহিকতা। ক্ষমতা দখলের পথ এখানে ছিল ব্যালট বাক্স, রাস্তার সহিংস স্কোয়াড নয়। মুজিবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগঠনে যুব সংগঠন ছিল, ছাত্র সংগঠন ছিল, কিন্তু এগুলো কখনো নাৎসি এসএ বা ইতালীয় স্কোয়াড্রিস্তির মতো প্রতিপক্ষের শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটেছে, কিন্তু সেই সহিংসতা মুজিবের রাজনীতির সাংগঠনিক নীতি ছিল না, যেভাবে ইতালি ও জার্মানিতে ছিল। এখানে অনেক সময় শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দল আক্রান্তও হয়েছে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে হত্যা করা হয়েছে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য আহমদ রফিককে, ১৯৭২ থেকে ৭৫ সময়ে কমপক্ষে ৭জন সংসদ সদস্য নিহত হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান টার্গেট ছিলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। মুজিবের জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ভাষা ও ভূখণ্ড ভিত্তিক , রক্ত বা জাতিগত বিশুদ্ধতা নয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নির্বিশেষে একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ঐক্যের ধারণার ওপর দাঁড়িয়েছিল। এই ধারণায় কোনো জৈবিক শুদ্ধতার তত্ত্ব ছিল না, ভেতরের শত্রু চিহ্নিত করে নির্মূল করার কোনো আদর্শিক কাঠামোও ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ, মুজিবের রাজনীতির এই চার স্তম্ভ ফ্যাসিবাদের আদর্শিক কাঠামোর বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁর শাসনামল ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুজিবের শাসনামলে একদলীয় ব্যবস্থা আসে। সংবাদপত্রের সংখ্যা সীমিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। এই পদক্ষেপগুলোকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা যায়, করা উচিতও। বাকশালকে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দৃষ্টান্ত বলা যায়। এমনকি এর মধ্যে কিছু fascistic উপাদান নিয়ে তুলনামূলক গবেষণাও করা যায়, যেমন একদলীয় কাঠামো, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। কিন্তু এই তালিকা তৈরি করাই ফ্যাসিবাদ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। “ফ্যাসিস্ট” শব্দটি ব্যবহার করতে হলে দেখাতে হবে বাকশালের পেছনে ছিল কোনো বর্জনমূলক জাতিগত পুরাণ, সামরিকায়িত গণরাজনীতি, এবং জাতীয় পুনর্জন্মের মতো কোনো radical ideological myth। বাকশালের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ, প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার পুনর্গঠন। এর পেছনে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার একটি কাঠামো ছিল, জাতিগত শুদ্ধিকরণের কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না। বাকশালে কোনো কালো শার্ট বা বাদামি শার্ট পরিহিত আধা-সামরিক বাহিনী রাস্তায় নামেনি প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র নতুন মানুষ তৈরির কোনো আদর্শিক প্রকল্প ঘোষণা করেনি, যেভাবে নাৎসি জার্মানি বা ফ্যাসিস্ট ইতালি করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন কিংবা তৎকালীন পূর্ব ইউরোপের একদলীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাকশাল সেই ধারারই একটি সংস্করণ, ফ্যাসিবাদের ধারার নয়। একদলীয়তা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রেও ছিল, কিন্তু কেউ সোভিয়েত ইউনিয়নকে ফ্যাসিবাদী বলেন না। তুলনাটা শুধু কমিউনিস্ট বিশ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীন হওয়া অনেক রাষ্ট্রেই একই ধরনের কাঠামো দেখা গেছে। জামাল আবদেল নাসেরের মিশরে একদলীয় শাসন এসেছিল, সংবাদপত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল, সুয়েজ খাল জাতীয়করণ হয়েছিল। জুলিয়াস নায়েরেরের তানজানিয়ায় একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, উজামা নীতির আওতায় কৃষিতে যৌথ খামার পদ্ধতি চালু হয়েছিল। বাথ পার্টির নেতৃত্বে সিরিয়া ও ইরাকেও একদলীয় রাষ্ট্র, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের জাতীয়করণ একসাথে ঘটেছিল। এই প্রত্যেকটি রাষ্ট্রে নেতারা নিজ নিজ জাতির কাছে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নাসের, নায়েরে কিংবা বাথ পার্টির নেতৃবৃন্দকে ফ্যাসিস্ট বলার চল ইতিহাসের বিশ্লেষণে নেই। শেখ মুজিবকে ফ্যাসিস্ট বলতে হলে এদের সবাইকেও একই কাতারে ফেলতে হবে। মানদণ্ড যদি একই না হয়, তাহলে বুঝতে হবে শব্দ প্রয়োগের পেছনে বিশ্লেষণ নেই, আছে শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ। বাকশাল প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটও আলাদাভাবে দেখা দরকার। মুজিব ক্ষমতায় আসার একেবারে শুরুতে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। এই ব্যবস্থায় শুধু সরকারের দায়িত্বশীল থাকার কথা নয়, বিরোধী দলেরও দায়িত্বশীল থাকার কথা। যুদ্ধবিধ্বস্ত, খালি রিজার্ভের একটি নতুন রাষ্ট্রে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা কী ছিল, সেই প্রশ্নও ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া যায় না। দেশের স্বাধীনতা অস্বীকার করে একাধিক গোষ্ঠী সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়েছে। পত্রিকাগুলোতে অপপ্রচার চলেছে। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ শুরুতেই সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত ছিল না। বরং শুরুতে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জাতিগঠন এবং মৌলিক বিষয়ে নাগরিকদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পর সংসদীয় গণতন্ত্রে যাওয়া উচিত ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এই ন্যূনতম বোঝাপড়াটুকু আগে দরকার হয়। বাকশাল টিকেছিল সাত মাস। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন বিস্তৃত ছিল প্রায় তিন দশক জুড়ে। পাকিস্তান আমলের চব্বিশ বছরের মধ্যে দশ বছরের বেশি সময় তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে সাত মাসের বাকশাল দিয়ে ফ্যাসিবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া ইতিহাসের একটি খণ্ডাংশকে সমগ্র ইতিহাস বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো। প্রথমত, বাকশাল ফ্যাসিবাদ নয়, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা। দ্বিতীয়ত, কেন শেখ মুজিবকে বাকশাল পদ্ধতিতে যেতে হলো, সেই প্রশ্নের বিবেচনাও জরুরি। এই দায় শুধু একজনের নয়। বিরোধী রাজনীতির ভূমিকাও তখন দায়িত্বশীল ছিল না। সঠিক শব্দ প্রয়োগ না করার রাজনীতি রাজনৈতিক বিরোধিতা বা অপছন্দ থেকে কোনো ব্যক্তিত্বকে তিনি যা নন, সেই ট্যাগে চিহ্নিত করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দটি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে দ্রুত ঘৃণার তালিকায় ফেলে দেওয়ার একটি সহজ পথ। যারা তুলনামূলক ইতিহাস কম জানেন, তাদের সাথে এটি একরকম প্রতারণাও বটে। শব্দটি শুনে তারা ধরে নেন এর পেছনে ঐতিহাসিক প্রমাণের পূর্ণ ভার আছে। অথচ বাস্তবে থাকে শুধু একটি আবেগপ্রবণ তুলনা, যার ভিত্তি কয়েকটি উপরিতলের মিল। ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দটি ব্যবহার করাই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি নয়। সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো, একই শব্দ একই মানদণ্ডে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় কি না। কেউ যদি বাকশালকে ফ্যাসিবাদ বলেন, তাহলে তাকে একই মানদণ্ডে বিশ্বের অন্যান্য একদলীয় সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষাকেও ফ্যাসিবাদ বলতে হবে। যদি সেই সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে বিশ্লেষণের জন্য নয়, আক্রমণের জন্য। শেখ মুজিবের ১৯৭৫-এর শাসনামলকে সমালোচনা করার জন্য ফ্যাসিবাদের মতো একটি ভারী শব্দের প্রয়োজন নেই। কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বলাই যথেষ্ট, কারণ সেটাই সত্য এবং সেটাই প্রমাণযোগ্য। ফ্যাসিবাদ বললে বরং প্রকৃত সমালোচনার জায়গাটা দুর্বল হয়ে যায়, কারণ তখন প্রমাণের দায় এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় যেখানে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। যে শব্দ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত, সেই শব্দ ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। নইলে শব্দটি নিজেই তার অর্থ হারায়, আর যে সত্যিকারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে ভবিষ্যতে, তখন এই শব্দের আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।
নিজের দেশকে ভালোবাসা থাকে, অন্যকে ঘৃণা করার বাধ্যবাধকতা থাকে না। মুসোলিনি ও হিটলারের জাতীয়তাবাদে জাতি ছিল একটি জৈবিক সত্তা। এই সত্তাকে বাঁচাতে হলে ভেতরের শত্রু চিহ্নিত করতে হতো, বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হতো। তাদের স্বৈরশাসন ছিল না শুধু কর্তৃত্ববাদ। সাধারণ কর্তৃত্ববাদে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়, মানুষ ভয়ে চুপ থাকে। ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদ শুধু মানুষকে চুপ করিয়ে রাখতে চায়নি, মানুষের ভেতরের বিশ্বাসকে বদলে দিতে চেয়েছিল। রাষ্ট্র শুধু নিয়ন্ত্রণ করত না, নতুন মানুষ তৈরি করতে চাইত। তাদের একদলীয় রাষ্ট্রও ছিল ভিন্ন ধরনের। বিশ্বের অনেক দেশে একদলীয় ব্যবস্থা এসেছে ভিন্ন ভিন্ন কারণে। সোভিয়েত ইউনিয়নের একদলীয় ব্যবস্থা এসেছিল শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব থেকে। ফ্যাসিবাদী একদলীয় রাষ্ট্র এসেছিল জাতিকে এক
অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে। দল, রাষ্ট্র আর জাতি তিনটি মিলে এক হয়ে যেত। তাদের জাতীয় সম্প্রদায় ছিল বর্জনমূলক। কে এর ভেতরে থাকবে আর কে বাইরে যাবে, এই সীমারেখা রাষ্ট্র নিজেই টেনে দিত। নাৎসি জার্মানিতে এই বর্জন ছিল সরাসরি বর্ণবাদী। ইহুদি, রোমা, প্রতিবন্ধী মানুষ, সমকামী, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী, সবাইকে জাতীয় পরিচয় থেকে আলাদা এক বিদেশি উপাদান হিসেবে দেখা হতো। ইতালীয় ফ্যাসিবাদে বর্ণবাদ শুরুতে এতটা কেন্দ্রীয় ছিল না, তবে ১৯৩৮ সালের পর মুসোলিনিও ইহুদি বিরোধী আইন চালু করেন। তাদের গণরাজনীতি ছিল সামরিকায়িত। দল পরিচালিত হতো বাহিনীর মতো। কালো শার্ট পরা স্কোয়াড্রিস্তি রাস্তায় নামত, বাদামি শার্ট পরা এসএ সদস্যরা প্যারেড করত। উর্দি, স্যালুট, মিছিল,
সবকিছু মিলে রাজনীতিকে যুদ্ধের ভাষায় রূপান্তরিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেখা হতো শত্রু সৈন্যের মতো, প্রতিযোগী হিসেবে নয়। আর এই সহিংসতা ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্তর্গত অংশ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। মুসোলিনির স্কোয়াড্রিস্তি কৃষক সংগঠন আর সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়নের অফিসে আগুন লাগাত। হিটলারের এসএ রাস্তায় রাস্তায় কমিউনিস্ট আর সমাজতান্ত্রিকদের সাথে সংঘর্ষ করত। সহিংসতা শুধু নির্বাচনের আগে ভয় দেখানোর হাতিয়ার ছিল না, এটাই ছিল রাজনীতি করার পদ্ধতি। আর তাদের জাতীয় পুনর্জাগরণের ধারণা ছিল একটি radical ideological myth-এর অংশ। জাতি যেন এক ক্ষয়প্রাপ্ত অসুস্থ সত্তা, একে সহিংস শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে নতুন করে জন্ম দিতে হবে, এমন এক পুরাণ তৈরি হয়েছিল। ইতিহাসবিদ রজার গ্রিফিন একে বলেছেন palingenetic ultranationalism, জাতির
পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে জড়িয়ে থাকা চরম জাতীয়তাবাদ। রবার্ট প্যাক্সটন তাঁর Anatomy of Fascism বইয়ে দেখিয়েছেন, ফ্যাসিবাদ কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত মতাদর্শ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক আচরণের ধারা। জাতীয় অবক্ষয়ের বোধ, শত্রুকে ধ্বংস করার আকাঙ্ক্ষা, একজন করিশম্যাটিক নেতার নেতৃত্বে গণসংগঠন, এই উপাদানগুলো একসাথে মিলে কাজ করে। এই সবগুলো উপাদান একসাথে মিলেই ফ্যাসিবাদ হয়। আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি উপাদান পৃথিবীর আরও অনেক শাসনব্যবস্থায় পাওয়া যায়। জাতীয়তাবাদ বহু দেশে আছে। কর্তৃত্ববাদ বহু শাসনব্যবস্থায় আছে। একদলীয় ব্যবস্থা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রেও ছিল। কিন্তু বর্জনমূলক জাতীয় সম্প্রদায়, সামরিকায়িত গণরাজনীতি এবং পুনর্জন্মের পুরাণ, এই তিনের একত্র উপস্থিতিই ফ্যাসিবাদকে আলাদা করে তোলে। এই নির্দিষ্টতা মাথায় না রাখলে দুটি বিপদ হয়। প্রথম বিপদ, উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বের
নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাসকে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের ছাঁচে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া। একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়করণ, একদলীয় পরীক্ষা এবং কর্তৃত্ববাদী মোড়, সবকিছুকে সরাসরি ফ্যাসিবাদের ক্যাটাগরিতে ফেলে দিলে সেই রাষ্ট্রের নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের ধ্বংসাবশেষ, ভাঙা অর্থনীতি, রাষ্ট্রগঠনের সংকট, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব, এই বাস্তবতাগুলো তখন আর বিশ্লেষণের অংশ থাকে না। দ্বিতীয় বিপদ, ফ্যাসিবাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক নির্দিষ্টতা ক্ষয় হয়ে যাওয়া। শব্দটি সব ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্য ব্যবহার হতে থাকলে এর বিশ্লেষণী মূল্যই থাকে না। পশ্চিমা রাজনৈতিক বিতর্কেও এই প্রবণতা বহুবার দেখা গেছে, যেখানে প্রায় যেকোনো কট্টর ডানপন্থী নেতাকেই ফ্যাসিস্ট বলে ডাকা হয়েছে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে জার্মান
ও জাপানের সহযোগীতা নিয়ে ভারতকে বৃটিশ উপনিবেশমুক্ত করতে চেয়েছিলো সুভাষ চন্দ্র বসু, এই জন্য বহুবছর তাঁকেও ফ্যাসিবাদী গালি শুনতে হয়েছে। ইতিহাসবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন, এই ধরনের ব্যবহার শব্দটিকে গালি বানিয়ে ফেলে, বিশ্লেষণী হাতিয়ার হিসেবে অকেজো করে দেয়। শেখ মুজিবের রাজনীতির ধারা এবার প্রশ্ন হলো, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের ধারায় ফ্যাসিবাদের এই উপাদানগুলো খুঁজে পাওয়া যায় কি না। মুজিবের রাজনৈতিক পরিপক্কতা শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই সংগ্রামের চরিত্র জাতিগত বিশুদ্ধতার সন্ধান ছিল না। এটি ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ। ছয় দফা আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, প্রাদেশিক বৈষম্য দূর করার দাবি। এখানে কোনো বর্জনমূলক জাতীয় পুরাণ নেই। বরং আছে একটি বহুত্ববাদী, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে অধিকার আদায়ের রাজনীতি। আওয়ামী লীগের রাজনীতি সবসময় নির্বাচনমুখী ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এই ধারারই ধারাবাহিকতা। ক্ষমতা দখলের পথ এখানে ছিল ব্যালট বাক্স, রাস্তার সহিংস স্কোয়াড নয়। মুজিবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগঠনে যুব সংগঠন ছিল, ছাত্র সংগঠন ছিল, কিন্তু এগুলো কখনো নাৎসি এসএ বা ইতালীয় স্কোয়াড্রিস্তির মতো প্রতিপক্ষের শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটেছে, কিন্তু সেই সহিংসতা মুজিবের রাজনীতির সাংগঠনিক নীতি ছিল না, যেভাবে ইতালি ও জার্মানিতে ছিল। এখানে অনেক সময় শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দল আক্রান্তও হয়েছে। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে হত্যা করা হয়েছে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য আহমদ রফিককে, ১৯৭২ থেকে ৭৫ সময়ে কমপক্ষে ৭জন সংসদ সদস্য নিহত হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান টার্গেট ছিলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। মুজিবের জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ভাষা ও ভূখণ্ড ভিত্তিক , রক্ত বা জাতিগত বিশুদ্ধতা নয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নির্বিশেষে একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ঐক্যের ধারণার ওপর দাঁড়িয়েছিল। এই ধারণায় কোনো জৈবিক শুদ্ধতার তত্ত্ব ছিল না, ভেতরের শত্রু চিহ্নিত করে নির্মূল করার কোনো আদর্শিক কাঠামোও ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ, মুজিবের রাজনীতির এই চার স্তম্ভ ফ্যাসিবাদের আদর্শিক কাঠামোর বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁর শাসনামল ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুজিবের শাসনামলে একদলীয় ব্যবস্থা আসে। সংবাদপত্রের সংখ্যা সীমিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। এই পদক্ষেপগুলোকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা যায়, করা উচিতও। বাকশালকে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দৃষ্টান্ত বলা যায়। এমনকি এর মধ্যে কিছু fascistic উপাদান নিয়ে তুলনামূলক গবেষণাও করা যায়, যেমন একদলীয় কাঠামো, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। কিন্তু এই তালিকা তৈরি করাই ফ্যাসিবাদ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। “ফ্যাসিস্ট” শব্দটি ব্যবহার করতে হলে দেখাতে হবে বাকশালের পেছনে ছিল কোনো বর্জনমূলক জাতিগত পুরাণ, সামরিকায়িত গণরাজনীতি, এবং জাতীয় পুনর্জন্মের মতো কোনো radical ideological myth। বাকশালের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ, প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার পুনর্গঠন। এর পেছনে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার একটি কাঠামো ছিল, জাতিগত শুদ্ধিকরণের কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না। বাকশালে কোনো কালো শার্ট বা বাদামি শার্ট পরিহিত আধা-সামরিক বাহিনী রাস্তায় নামেনি প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র নতুন মানুষ তৈরির কোনো আদর্শিক প্রকল্প ঘোষণা করেনি, যেভাবে নাৎসি জার্মানি বা ফ্যাসিস্ট ইতালি করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন কিংবা তৎকালীন পূর্ব ইউরোপের একদলীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাকশাল সেই ধারারই একটি সংস্করণ, ফ্যাসিবাদের ধারার নয়। একদলীয়তা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রেও ছিল, কিন্তু কেউ সোভিয়েত ইউনিয়নকে ফ্যাসিবাদী বলেন না। তুলনাটা শুধু কমিউনিস্ট বিশ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীন হওয়া অনেক রাষ্ট্রেই একই ধরনের কাঠামো দেখা গেছে। জামাল আবদেল নাসেরের মিশরে একদলীয় শাসন এসেছিল, সংবাদপত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল, সুয়েজ খাল জাতীয়করণ হয়েছিল। জুলিয়াস নায়েরেরের তানজানিয়ায় একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, উজামা নীতির আওতায় কৃষিতে যৌথ খামার পদ্ধতি চালু হয়েছিল। বাথ পার্টির নেতৃত্বে সিরিয়া ও ইরাকেও একদলীয় রাষ্ট্র, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের জাতীয়করণ একসাথে ঘটেছিল। এই প্রত্যেকটি রাষ্ট্রে নেতারা নিজ নিজ জাতির কাছে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নাসের, নায়েরে কিংবা বাথ পার্টির নেতৃবৃন্দকে ফ্যাসিস্ট বলার চল ইতিহাসের বিশ্লেষণে নেই। শেখ মুজিবকে ফ্যাসিস্ট বলতে হলে এদের সবাইকেও একই কাতারে ফেলতে হবে। মানদণ্ড যদি একই না হয়, তাহলে বুঝতে হবে শব্দ প্রয়োগের পেছনে বিশ্লেষণ নেই, আছে শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ। বাকশাল প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটও আলাদাভাবে দেখা দরকার। মুজিব ক্ষমতায় আসার একেবারে শুরুতে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। এই ব্যবস্থায় শুধু সরকারের দায়িত্বশীল থাকার কথা নয়, বিরোধী দলেরও দায়িত্বশীল থাকার কথা। যুদ্ধবিধ্বস্ত, খালি রিজার্ভের একটি নতুন রাষ্ট্রে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা কী ছিল, সেই প্রশ্নও ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া যায় না। দেশের স্বাধীনতা অস্বীকার করে একাধিক গোষ্ঠী সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়েছে। পত্রিকাগুলোতে অপপ্রচার চলেছে। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ শুরুতেই সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত ছিল না। বরং শুরুতে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জাতিগঠন এবং মৌলিক বিষয়ে নাগরিকদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পর সংসদীয় গণতন্ত্রে যাওয়া উচিত ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এই ন্যূনতম বোঝাপড়াটুকু আগে দরকার হয়। বাকশাল টিকেছিল সাত মাস। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন বিস্তৃত ছিল প্রায় তিন দশক জুড়ে। পাকিস্তান আমলের চব্বিশ বছরের মধ্যে দশ বছরের বেশি সময় তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে সাত মাসের বাকশাল দিয়ে ফ্যাসিবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া ইতিহাসের একটি খণ্ডাংশকে সমগ্র ইতিহাস বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো। প্রথমত, বাকশাল ফ্যাসিবাদ নয়, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা। দ্বিতীয়ত, কেন শেখ মুজিবকে বাকশাল পদ্ধতিতে যেতে হলো, সেই প্রশ্নের বিবেচনাও জরুরি। এই দায় শুধু একজনের নয়। বিরোধী রাজনীতির ভূমিকাও তখন দায়িত্বশীল ছিল না। সঠিক শব্দ প্রয়োগ না করার রাজনীতি রাজনৈতিক বিরোধিতা বা অপছন্দ থেকে কোনো ব্যক্তিত্বকে তিনি যা নন, সেই ট্যাগে চিহ্নিত করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দটি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে দ্রুত ঘৃণার তালিকায় ফেলে দেওয়ার একটি সহজ পথ। যারা তুলনামূলক ইতিহাস কম জানেন, তাদের সাথে এটি একরকম প্রতারণাও বটে। শব্দটি শুনে তারা ধরে নেন এর পেছনে ঐতিহাসিক প্রমাণের পূর্ণ ভার আছে। অথচ বাস্তবে থাকে শুধু একটি আবেগপ্রবণ তুলনা, যার ভিত্তি কয়েকটি উপরিতলের মিল। ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দটি ব্যবহার করাই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি নয়। সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো, একই শব্দ একই মানদণ্ডে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় কি না। কেউ যদি বাকশালকে ফ্যাসিবাদ বলেন, তাহলে তাকে একই মানদণ্ডে বিশ্বের অন্যান্য একদলীয় সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষাকেও ফ্যাসিবাদ বলতে হবে। যদি সেই সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে বিশ্লেষণের জন্য নয়, আক্রমণের জন্য। শেখ মুজিবের ১৯৭৫-এর শাসনামলকে সমালোচনা করার জন্য ফ্যাসিবাদের মতো একটি ভারী শব্দের প্রয়োজন নেই। কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বলাই যথেষ্ট, কারণ সেটাই সত্য এবং সেটাই প্রমাণযোগ্য। ফ্যাসিবাদ বললে বরং প্রকৃত সমালোচনার জায়গাটা দুর্বল হয়ে যায়, কারণ তখন প্রমাণের দায় এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় যেখানে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। যে শব্দ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত, সেই শব্দ ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। নইলে শব্দটি নিজেই তার অর্থ হারায়, আর যে সত্যিকারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে ভবিষ্যতে, তখন এই শব্দের আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।



