ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
১২ ঘণ্টার জন্য দীপু মনির প্যারোল অনুমতি, প্রশ্ন—‘কেন আগামীকাল, আজ নয় কেন?’
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায় আর নেই
পুলিশ লাইন্সের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড করতে উগ্রবাদীদের হামলা, পুলিশি প্রতিরোধে আহত ২০
প্রবাসে থাকা দলীয় কর্মীর স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার জেরে পদ গেল জামায়াত আমিরের
রাশান দূতাবাস: রাশিয়া থেকে গম আমদানিতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীর দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের নতুন কূটনৈতিক ফাঁদ?
শুক্রবার সন্ধ্যায় শপথ নেবেন নতুন রাষ্ট্রপতি: চিফ হুইপ
দ্য ইস্টার্ন হেরাল্ড || শেখ হাসিনাই বাংলাদেশ গড়েছেন- যে অবদান কোনো আদালত মুছে দিতে পারবে না
২৫ মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা, ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া এবং বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল আদায়—শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্জনের পরিসংখ্যানই ঢাকার কোনো আদালত মুছে দিতে পারে না।
বাংলাদেশ নিজে নিজে বদলে যায়নি। এই পরিবর্তনের পেছনে একজন কারিগর ছিলেন।
২০০৯ সালে বিএনপির বিদায় এবং একটি অন্তর্বর্তী সামরিক শাসনপর্বের পর শেখ হাসিনা যখন আবার ক্ষমতায় ফেরেন, তখন তিনি যে বাংলাদেশ পেয়েছিলেন, তার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল মাত্র প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার। দেশের ১৬ কোটি মানুষের অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল। মাতৃমৃত্যুর হার অবশ্য তিন দশক ধরে কমছিল, কিন্তু এই অগ্রগতি ধরে রাখতে সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে
নিরাপত্তা বাহিনীর চাপের মুখে শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার সময়—যে ঘটনাকে “গণঅভ্যুত্থানের” ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু যা সংগঠিত রাষ্ট্রীয় শক্তি ছাড়া সম্ভব নয় এমন প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল—বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। দেশের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসে। মাতৃমৃত্যুর হার কমে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ১২৩ জনে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাংক কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নেয় না। তাদের পরিসংখ্যান ইতিহাসের নথির অংশ। পরবর্তী সময়ে কেউ সেই পরিসংখ্যানকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করতে চান না কেন, তথ্য-উপাত্তগুলো বরাবর রয়ে যাবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো শেখ হাসিনা গড়ে তুলেছিলেন শুধু অনুকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নয়, কিংবা এশিয়ার জনসংখ্যাগত সুবিধার স্বাভাবিক ফল
হিসেবেও নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প ছিল দেশের প্রধান রপ্তানি খাত। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশেরও বেশি এই খাত থেকে আসত এবং এতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করতেন। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে নীতিগত সুরক্ষা, বন্দর অবকাঠামোয় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে পরিকল্পিত আলোচনার প্রয়োজন ছিল। এসবের মাধ্যমে কম মজুরির সুবিধাকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানে পরিণত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ শুধু ভৌগোলিক অবস্থান বা ভাগ্যের কারণে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হয়নি। বছরের পর বছর এমন পরিবেশ তৈরি ও বজায় রাখা হয়েছিল, যার কারণে পশ্চিমা ফ্যাশন কোম্পানিগুলো তাদের পুরো সরবরাহব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর আস্থা
রাখতে পেরেছিল। এই শ্রমশক্তির গঠনও ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ৮০ শতাংশের বেশি নারী। এসব নারী গ্রাম থেকে শহরে এসে কাজ করেছেন, নিজেদের পরিবারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছেন এবং এমন পরিবারে আয় নিয়ে এসেছেন, যেখানে এর আগে মেয়েদের অনেক সময় অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং বোঝা হিসেবে দেখা হতো। শেখ হাসিনার সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার উপবৃত্তি কর্মসূচিকে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত করেছিল। এটি শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে একটি দাতব্য উদ্যোগ ছিল না। এর মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যার শেষ গন্তব্য ছিল কারখানার কর্মক্ষেত্র। আর সেই কর্মক্ষেত্রই ব্যাপক দারিদ্র্য হ্রাসের বাস্তব প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশ্বব্যাংক পরে এই উপবৃত্তি মডেলকে
৫০টিরও বেশি দেশে প্রয়োগের কথা নথিভুক্ত করেছে। বাংলাদেশ ছিল সেই মডেলের পরীক্ষিত উদাহরণ, যেখান থেকে এই পদ্ধতি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির সাফল্যের সংখ্যা নয়; এগুলো মানুষের বেঁচে থাকার হিসাব। ১৯৯০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ৫৭৪ জন থেকে কমে ১৫৩ জনে নেমে আসে—অর্থাৎ ৭৩ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। এই সময়ের বড় অংশে শেখ হাসিনার সরকারগুলো দেশের জনস্বাস্থ্য নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। ১৯৯০ সালে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল ২৭৩। বর্তমানে তা কমে ৩১-এ দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ, এই সময়ের মধ্যে লাখ
লাখ শিশু জীবনের প্রথম কয়েক বছরেই মারা না গিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর সূচক শিশুদের খর্বাকৃতির হার ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশ হয়েছে। গড় আয়ু বেড়ে ৭৫ বছরে পৌঁছেছে। স্বাধীনতার সময় ১৯৭১ সালে এটি ছিল ৪৬ দশমিক ৫ বছর। ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসে। ২০০৯ সালে এই হার ছিল অর্ধেকেরও কম। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমেই জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানের পেছনে যে বিশাল সরকারি বিনিয়োগ ছিল, তার গুরুত্ব এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—কারণ আগের সরকার যেসব রোগের
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল, নতুন সরকারের আমলে সেগুলোর কিছু আবার ফিরে আসছে। সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব আর শুধু দক্ষ নেতৃত্বের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায় তখনই, যখন কোনো বাহ্যিক চাপ ছাড়াই একজন নেতা কঠিন ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে বিতাড়িত করে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা পরে এই অভিযানকে গণহত্যার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে উল্লেখ করেন। এতে পরিকল্পিতভাবে গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, ব্যাপক যৌন সহিংসতা এবং গণহত্যা চালানো হয়। এর ফলে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দ্রুততম বৃহৎ জনগোষ্ঠী স্থানান্তরের অন্যতম ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ছিল অপর্যাপ্ত—জাতিসংঘের একই তদন্তকারীরা এমনটাই বলেছিলেন। চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কার্যকর পদক্ষেপ আটকে দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো নিন্দা জানালেও তার বাস্তব ফল খুব কম ছিল। আসিয়ান জোটও প্রকাশ্যে ঘটনার প্রকৃত চরিত্র স্বীকার করেনি, যদিও সদস্যদেশগুলোর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি স্বীকার করেছিল। শেখ হাসিনা সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। তিনি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ভাগাভাগির চুক্তি ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কোনো পুনর্বাসন কাঠামো ছিল না। জাতিসংঘও এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি যে সীমান্ত পেরিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের খরচ পুরো বিশ্ব বহন করবে। ফলে বিপুল এই দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপরই এসে পড়ে। সেই সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১ হাজার ৫০০ ডলারেরও কম। আন্তর্জাতিক কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি ছাড়াই এত বড় একটি ভিনদেশী জনগোষ্ঠীকে স্বেচ্ছায় আশ্রয় দেওয়া আধুনিক ইতিহাসের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত ছিল। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ৭ লাখের বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে। পরে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে গড়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার আশ্রয় শিবির। মিয়ানমার নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না করায় সেই শিবির এখন প্রায় নয় বছর ধরে কার্যত স্থায়ী অবস্থায় রয়েছে। পরবর্তীতে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা করে। বাংলাদেশ সরকার এই মামলাকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহির আইনি কাঠামোকে এগিয়ে নেয়। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিলে এই মামলার বর্তমান রূপটি সম্ভব হতো না। কারণ বাংলাদেশ আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে সেই মানুষদের বাঁচিয়ে রেখেছিল, যারা পরবর্তীতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া এখানে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশ সীমান্ত না খুললে পরবর্তী সময়ে আদালতগুলো যে প্রক্রিয়া শুরু করতে পেরেছিল, তার ভিত্তিই তৈরি হতো না। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের “উদারতা ও সংহতি”-র প্রশংসা করেছিলেন। বাস্তবে এটি ছিল এমন একটি সিদ্ধান্তের কূটনৈতিক ভাষায় প্রশংসা, যার আর্থিক, পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যয় বহন করতে হয়েছিল বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশকে। অথচ কোনো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে সেই ব্যয়ের পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ দেয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের তৃতীয় দিকটি দেশের ভেতরে হয়তো সবচেয়ে কম দৃশ্যমান, কিন্তু বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু বিজ্ঞান এখন নিশ্চিত করেছে যে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা প্রতিবছর বন্যায় প্লাবিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় নিচু অঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে। অথচ এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বাংলাদেশের নিজের অবদান অত্যন্ত সামান্য—বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের এক শতাংশেরও ক্ষুদ্র অংশ। অর্থাৎ জলবায়ু সংকটের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তাদেরই সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাথে, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া শুধু সাহায্যের আবেদন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলেছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে এই জোট ৫৮টি দেশের অবস্থানকে একত্রিত করে, যেসব দেশে মোট ১৫০ কোটি মানুষ বসবাস করে। কোপেনহেগেন, প্যারিস, গ্লাসগো এবং শেষ পর্যন্ত শার্ম আল-শেখ—এসব জলবায়ু সম্মেলনে এই জোটের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ২০২২ সালের কপ-২৭ সম্মেলনে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতির জন্য তহবিল গঠনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যখন ধনী ও বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নথিতে প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষতি পূরণের একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব স্বীকার করে। বাংলাদেশের ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রস্পেরিটি প্ল্যান’ দেশের জলবায়ু অভিযোজনের একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বদ্বীপ হিসেবে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশ যে প্রকৌশল ও প্রশাসনিক পদ্ধতি তৈরি করেছিল, এতে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশও এসব পদ্ধতিকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১০০ গুণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়া দেশটি পরবর্তীতে জলবায়ু সহনশীলতার একটি আন্তর্জাতিক মডেলে পরিণত হয়। ২০১৫ সালে শেখ হাসিনা যে ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটি শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মাননা ছিল না। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক প্রধান প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য আন্তর্জাতিক সাফল্যের জন্য তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ঢাকায় এখন যা ঘটছে, তা এই ঐতিহাসিক রেকর্ডের আলোকে বিচার করা উচিত। ঘটনাগুলোকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা উচিত নয়। যে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, সেটি গঠিত হয়েছিল তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর গঠিত সরকারের অধীনে। তাঁর বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি মামলা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত দুর্নীতির মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। আওয়ামী লীগকে সংসদীয় নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই মামলার বিচার শেষ হয়। পরবর্তীতে বিএনপি বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। তার আগে অন্তর্বর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং পরে সরে দাঁড়ান। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও পদত্যাগ করেন। এই বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি—তদন্ত, অভিযোগ গঠন ও রায়কে রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের নির্বাচনী সময়সূচির সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে মিলিয়ে নেওয়া—নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সময়ে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে গবেষণা করা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা ধারাবাহিকভাবে বলেছেন যে পরিস্থিতি নিরপেক্ষ ফৌজদারি বিচারের আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি নয়। ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়—জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুতি, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের উত্তরসূরিদের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী সময়সূচির সঙ্গে মিল রেখে রায় দেওয়া। এ ধরনের কাঠামোগত চাপের মধ্যে পরিচালিত আদালতের নথি বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান, ইউএনএইচসিআরের মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন কিংবা জাতিসংঘের গণহত্যা পর্যবেক্ষকদের তদন্ত প্রতিবেদনের মতো একই ধরনের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এক ধরনের প্রমাণ এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে তৈরি হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কাঠামোগত চাপ থাকে। অন্য ধরনের প্রমাণ তৈরি হয় এমন প্রতিষ্ঠান থেকে, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। ২০২৬ সালে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন যে মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছেন। এই আত্মবিশ্বাস বাস্তবে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু তিনি কী গড়ে তুলেছিলেন—সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকার কথা নয়। ইতিহাসে খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক উত্তরসূরি যেসব নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করেছেন, শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সেই বিচারকদের পক্ষ নিয়েছে। ইতিহাসের হিসাব শুধু তাদের হাতে থাকে না, যারা সাময়িক রাজনৈতিক ক্ষমতার সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। বরং ইতিহাস তাদের কথাও মনে রাখে, যারা এমন কিছু তৈরি করে যান যা তাদের পরেও টিকে থাকে। সেই ইতিহাসে থাকবে দারিদ্র্যের সীমা পেরিয়ে উঠে আসা ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। থাকবে সেই ৪০ লাখ নারী, যারা আনুষ্ঠানিক কর্মশক্তিতে প্রবেশ করে আর পিছিয়ে যাননি। থাকবে সেই ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা, যাদের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা ছাড়াই একটি দেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। থাকবে সেই ৫৮টি দেশ, যারা কয়েক দশকের প্রচেষ্টার পর জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের আইনি দায়িত্ব স্বীকার করাতে সক্ষম হয়েছিল। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ গড়েছেন। পরিসংখ্যান তা-ই বলে। ঢাকার কোনো ট্রাইব্যুনাল সেই হিসাব বদলে দিতে পারে না। The Eastern Herald
নিরাপত্তা বাহিনীর চাপের মুখে শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার সময়—যে ঘটনাকে “গণঅভ্যুত্থানের” ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু যা সংগঠিত রাষ্ট্রীয় শক্তি ছাড়া সম্ভব নয় এমন প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল—বাংলাদেশের অর্থনীতি ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। দেশের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসে। মাতৃমৃত্যুর হার কমে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ১২৩ জনে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাংক কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নেয় না। তাদের পরিসংখ্যান ইতিহাসের নথির অংশ। পরবর্তী সময়ে কেউ সেই পরিসংখ্যানকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করতে চান না কেন, তথ্য-উপাত্তগুলো বরাবর রয়ে যাবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো শেখ হাসিনা গড়ে তুলেছিলেন শুধু অনুকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নয়, কিংবা এশিয়ার জনসংখ্যাগত সুবিধার স্বাভাবিক ফল
হিসেবেও নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প ছিল দেশের প্রধান রপ্তানি খাত। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশেরও বেশি এই খাত থেকে আসত এবং এতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করতেন। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে নীতিগত সুরক্ষা, বন্দর অবকাঠামোয় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে পরিকল্পিত আলোচনার প্রয়োজন ছিল। এসবের মাধ্যমে কম মজুরির সুবিধাকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানে পরিণত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ শুধু ভৌগোলিক অবস্থান বা ভাগ্যের কারণে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হয়নি। বছরের পর বছর এমন পরিবেশ তৈরি ও বজায় রাখা হয়েছিল, যার কারণে পশ্চিমা ফ্যাশন কোম্পানিগুলো তাদের পুরো সরবরাহব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর আস্থা
রাখতে পেরেছিল। এই শ্রমশক্তির গঠনও ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ৮০ শতাংশের বেশি নারী। এসব নারী গ্রাম থেকে শহরে এসে কাজ করেছেন, নিজেদের পরিবারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছেন এবং এমন পরিবারে আয় নিয়ে এসেছেন, যেখানে এর আগে মেয়েদের অনেক সময় অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং বোঝা হিসেবে দেখা হতো। শেখ হাসিনার সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার উপবৃত্তি কর্মসূচিকে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত করেছিল। এটি শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে একটি দাতব্য উদ্যোগ ছিল না। এর মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যার শেষ গন্তব্য ছিল কারখানার কর্মক্ষেত্র। আর সেই কর্মক্ষেত্রই ব্যাপক দারিদ্র্য হ্রাসের বাস্তব প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশ্বব্যাংক পরে এই উপবৃত্তি মডেলকে
৫০টিরও বেশি দেশে প্রয়োগের কথা নথিভুক্ত করেছে। বাংলাদেশ ছিল সেই মডেলের পরীক্ষিত উদাহরণ, যেখান থেকে এই পদ্ধতি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির সাফল্যের সংখ্যা নয়; এগুলো মানুষের বেঁচে থাকার হিসাব। ১৯৯০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ৫৭৪ জন থেকে কমে ১৫৩ জনে নেমে আসে—অর্থাৎ ৭৩ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। এই সময়ের বড় অংশে শেখ হাসিনার সরকারগুলো দেশের জনস্বাস্থ্য নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। ১৯৯০ সালে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল ২৭৩। বর্তমানে তা কমে ৩১-এ দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ, এই সময়ের মধ্যে লাখ
লাখ শিশু জীবনের প্রথম কয়েক বছরেই মারা না গিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর সূচক শিশুদের খর্বাকৃতির হার ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশ হয়েছে। গড় আয়ু বেড়ে ৭৫ বছরে পৌঁছেছে। স্বাধীনতার সময় ১৯৭১ সালে এটি ছিল ৪৬ দশমিক ৫ বছর। ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসে। ২০০৯ সালে এই হার ছিল অর্ধেকেরও কম। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমেই জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানের পেছনে যে বিশাল সরকারি বিনিয়োগ ছিল, তার গুরুত্ব এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—কারণ আগের সরকার যেসব রোগের
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল, নতুন সরকারের আমলে সেগুলোর কিছু আবার ফিরে আসছে। সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব আর শুধু দক্ষ নেতৃত্বের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায় তখনই, যখন কোনো বাহ্যিক চাপ ছাড়াই একজন নেতা কঠিন ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে বিতাড়িত করে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা পরে এই অভিযানকে গণহত্যার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে উল্লেখ করেন। এতে পরিকল্পিতভাবে গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, ব্যাপক যৌন সহিংসতা এবং গণহত্যা চালানো হয়। এর ফলে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দ্রুততম বৃহৎ জনগোষ্ঠী স্থানান্তরের অন্যতম ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ছিল অপর্যাপ্ত—জাতিসংঘের একই তদন্তকারীরা এমনটাই বলেছিলেন। চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কার্যকর পদক্ষেপ আটকে দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো নিন্দা জানালেও তার বাস্তব ফল খুব কম ছিল। আসিয়ান জোটও প্রকাশ্যে ঘটনার প্রকৃত চরিত্র স্বীকার করেনি, যদিও সদস্যদেশগুলোর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি স্বীকার করেছিল। শেখ হাসিনা সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। তিনি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ভাগাভাগির চুক্তি ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কোনো পুনর্বাসন কাঠামো ছিল না। জাতিসংঘও এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি যে সীমান্ত পেরিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের খরচ পুরো বিশ্ব বহন করবে। ফলে বিপুল এই দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপরই এসে পড়ে। সেই সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১ হাজার ৫০০ ডলারেরও কম। আন্তর্জাতিক কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি ছাড়াই এত বড় একটি ভিনদেশী জনগোষ্ঠীকে স্বেচ্ছায় আশ্রয় দেওয়া আধুনিক ইতিহাসের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত ছিল। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ৭ লাখের বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে। পরে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে গড়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার আশ্রয় শিবির। মিয়ানমার নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না করায় সেই শিবির এখন প্রায় নয় বছর ধরে কার্যত স্থায়ী অবস্থায় রয়েছে। পরবর্তীতে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা করে। বাংলাদেশ সরকার এই মামলাকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহির আইনি কাঠামোকে এগিয়ে নেয়। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিলে এই মামলার বর্তমান রূপটি সম্ভব হতো না। কারণ বাংলাদেশ আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে সেই মানুষদের বাঁচিয়ে রেখেছিল, যারা পরবর্তীতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া এখানে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশ সীমান্ত না খুললে পরবর্তী সময়ে আদালতগুলো যে প্রক্রিয়া শুরু করতে পেরেছিল, তার ভিত্তিই তৈরি হতো না। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের “উদারতা ও সংহতি”-র প্রশংসা করেছিলেন। বাস্তবে এটি ছিল এমন একটি সিদ্ধান্তের কূটনৈতিক ভাষায় প্রশংসা, যার আর্থিক, পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যয় বহন করতে হয়েছিল বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশকে। অথচ কোনো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে সেই ব্যয়ের পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ দেয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের তৃতীয় দিকটি দেশের ভেতরে হয়তো সবচেয়ে কম দৃশ্যমান, কিন্তু বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু বিজ্ঞান এখন নিশ্চিত করেছে যে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা প্রতিবছর বন্যায় প্লাবিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় নিচু অঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে। অথচ এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বাংলাদেশের নিজের অবদান অত্যন্ত সামান্য—বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের এক শতাংশেরও ক্ষুদ্র অংশ। অর্থাৎ জলবায়ু সংকটের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তাদেরই সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাথে, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া শুধু সাহায্যের আবেদন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলেছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে এই জোট ৫৮টি দেশের অবস্থানকে একত্রিত করে, যেসব দেশে মোট ১৫০ কোটি মানুষ বসবাস করে। কোপেনহেগেন, প্যারিস, গ্লাসগো এবং শেষ পর্যন্ত শার্ম আল-শেখ—এসব জলবায়ু সম্মেলনে এই জোটের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ২০২২ সালের কপ-২৭ সম্মেলনে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতির জন্য তহবিল গঠনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি ছিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যখন ধনী ও বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নথিতে প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষতি পূরণের একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব স্বীকার করে। বাংলাদেশের ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রস্পেরিটি প্ল্যান’ দেশের জলবায়ু অভিযোজনের একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বদ্বীপ হিসেবে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশ যে প্রকৌশল ও প্রশাসনিক পদ্ধতি তৈরি করেছিল, এতে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশও এসব পদ্ধতিকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১০০ গুণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়া দেশটি পরবর্তীতে জলবায়ু সহনশীলতার একটি আন্তর্জাতিক মডেলে পরিণত হয়। ২০১৫ সালে শেখ হাসিনা যে ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটি শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মাননা ছিল না। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক প্রধান প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য আন্তর্জাতিক সাফল্যের জন্য তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ঢাকায় এখন যা ঘটছে, তা এই ঐতিহাসিক রেকর্ডের আলোকে বিচার করা উচিত। ঘটনাগুলোকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা উচিত নয়। যে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, সেটি গঠিত হয়েছিল তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর গঠিত সরকারের অধীনে। তাঁর বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি মামলা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত দুর্নীতির মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। আওয়ামী লীগকে সংসদীয় নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই মামলার বিচার শেষ হয়। পরবর্তীতে বিএনপি বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। তার আগে অন্তর্বর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং পরে সরে দাঁড়ান। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও পদত্যাগ করেন। এই বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি—তদন্ত, অভিযোগ গঠন ও রায়কে রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের নির্বাচনী সময়সূচির সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে মিলিয়ে নেওয়া—নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সময়ে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে গবেষণা করা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা ধারাবাহিকভাবে বলেছেন যে পরিস্থিতি নিরপেক্ষ ফৌজদারি বিচারের আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি নয়। ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়—জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুতি, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের উত্তরসূরিদের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী সময়সূচির সঙ্গে মিল রেখে রায় দেওয়া। এ ধরনের কাঠামোগত চাপের মধ্যে পরিচালিত আদালতের নথি বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান, ইউএনএইচসিআরের মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন কিংবা জাতিসংঘের গণহত্যা পর্যবেক্ষকদের তদন্ত প্রতিবেদনের মতো একই ধরনের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এক ধরনের প্রমাণ এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে তৈরি হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কাঠামোগত চাপ থাকে। অন্য ধরনের প্রমাণ তৈরি হয় এমন প্রতিষ্ঠান থেকে, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। ২০২৬ সালে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন যে মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছেন। এই আত্মবিশ্বাস বাস্তবে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু তিনি কী গড়ে তুলেছিলেন—সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকার কথা নয়। ইতিহাসে খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক উত্তরসূরি যেসব নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করেছেন, শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সেই বিচারকদের পক্ষ নিয়েছে। ইতিহাসের হিসাব শুধু তাদের হাতে থাকে না, যারা সাময়িক রাজনৈতিক ক্ষমতার সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। বরং ইতিহাস তাদের কথাও মনে রাখে, যারা এমন কিছু তৈরি করে যান যা তাদের পরেও টিকে থাকে। সেই ইতিহাসে থাকবে দারিদ্র্যের সীমা পেরিয়ে উঠে আসা ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। থাকবে সেই ৪০ লাখ নারী, যারা আনুষ্ঠানিক কর্মশক্তিতে প্রবেশ করে আর পিছিয়ে যাননি। থাকবে সেই ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা, যাদের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা ছাড়াই একটি দেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। থাকবে সেই ৫৮টি দেশ, যারা কয়েক দশকের প্রচেষ্টার পর জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের আইনি দায়িত্ব স্বীকার করাতে সক্ষম হয়েছিল। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ গড়েছেন। পরিসংখ্যান তা-ই বলে। ঢাকার কোনো ট্রাইব্যুনাল সেই হিসাব বদলে দিতে পারে না। The Eastern Herald



