এজাজ মামুন বিজ্ঞানী ও কলামিস্ট
আরও খবর
আঁধার পেরিয়ে প্রত্যাবর্তনের প্রত্যয়: একটি নতুন বাংলাদেশের অপেক্ষায় ১৫ আগস্ট
সক্ষমতা, সাহস, সম্মান এবং শৈলী
জিও-পলিটিক্যাল জটিল সমীকরণ এর কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ
মাত্র তিনমাসে নতুন করে ১ কোটি মানুষ দরিদ্র্য হয়েছে
গুম কমিশনের নাবিলা ইদ্রিসের গুপ্তচর জীবনের আখ্যান: আর্টিকেল-১৯ এর প্রতিবেদন
র্যাবের হেলিকপ্টার কি ছয়তলার উচ্চতায় নেমে এসেছিল?
দল নির্বাচনে সম্পৃক্ত হই না
একবার নক্ষত্রের দিকে চাই
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মনের মানুষ। তাঁকে আমরা অন্তরে লালন করি। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের গড়ে ওঠার সহস্র বছরের যে ইতিহাস, তার পূর্ণাঙ্গ রূপকার তিনি। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি। বাংলাদেশের অপর নাম শেখ মুজিব। বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডটি এই মহামানব আমাদের জন্য জয় করে এনেছেন তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে, প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতা দিয়ে।
আমরা আমাদের বাঙালি মনে করি। কারণ আমরা বাংলায় কথা বলি। আমরা ধরে নেই যেদিন থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে, সেদিন থেকেই বাংলা সংস্কৃতির সূচনা, বাঙালিত্বের পথচলা। কিন্তু ক্ষণজন্মা মুজিবের হাতেই এই বাঙালি পেয়েছে সত্যিকার রূপ, আর ঝলমলে পরিচয়টা।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান যত খারাপই
হোক না কেন, বাংলার ধনসম্পদ ও প্রাচুর্যের কারণে এই অঞ্চল বিদেশিদের জন্য আকর্ষণীয় ছিল। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ আর বাংলা দখল করার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালিদের জীবনে নেমে এল ত্যাগ ও তিতিক্ষার দিন। শুরু হলো সাধারণ বাঙালিদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন। ব্রিটিশদের শোষণ-নির্যাতন যত প্রখর হতে লাগল বাঙালি ও তেমনি কঠিন ও কঠোর হয়ে উঠল তাদের সত্তাকে জাগিয়ে তুলবার জন্য। বাঙালির নতুন মূল্যবোধের উন্মেষ হলো। ইংরেজরা বুঝে নিল সিপাহি বিপ্লবের সময় যে ভুল তারা করেছিল তা করা যাবে না। ইংরেজরা ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি গ্রহণ করল। হিন্দু মুসলমানদের একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করল। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হলো ১৯০৫ সালে। তারপর দীর্ঘ ৪০ বছর চলল
ষড়যন্ত্রের ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। হিন্দু-মুসলমানের রক্তে লাল হয়ে উঠল বাংলার মাটি। বঙ্গবন্ধু তখন তরুণ নেতা। অনাদিকালের ভ্রাতৃত্ব ও একতার মাধুর্যে গড়া বাংলার হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা রোধে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করলেন। জওহরলাল নেহরু, গান্ধীজিসহ অনেকেই বাংলার বিভক্তি সমর্থন করলেন। বাংলার অনেক মুসলমান নেতা ও সংস্কৃতিসেবীদের বাধার মুখে শুধুমাত্র মুসলিম লীগের চাপে ১৯৪৭ সালে বাংলা ভিন্ন জাতি সত্তার অংশ হয়ে গেল। এ বিভক্তি ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলার সংযোজন হাজারো বছরের গড়ে ওঠা বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার একটি নীলনকশা তা বঙ্গবন্ধু বুঝে গেলেন। তাঁর বুঝতে বাকি রইল না দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোতে বাঙালি নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হবে। দেশ বিভক্তির প্রাক্কালেই
তিনি কলকাতার সিরাজদৌলা হোটেলে তাঁর কর্মীদের সঙ্গে সংকল্পবদ্ধ হলেন বাংলাকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যয় নিয়ে। সাতচল্লিশের কোনো এক সময়ে এক স্কুলের সমাবর্তনে তিনি ঘোষণা করলেন ‘বাংলাদেশের’ সংকল্প। ভারত ভাগের পর প্রথমেই পাকিস্তানি সরকার বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতিকে রোধ করার চেষ্টা করল। বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। বাঙালি চেতনা প্রবল হয়ে উঠল। আর এই জ্যোতিটা প্রজ্বালিত করলেন ইতিহাসের বরপুত্র তেজি ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর বীরোচিত প্রতিবাদে। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বেই তাঁরই অদম্য নেতৃত্বে ভাষা দিবস পালিত হলো ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। তাঁর বাল্যকাল ও কৈশোর থেকে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তা থেমে থাকেনি এরপর বরং তা বিস্তৃত হয়েছে কালক্রমে। এই মানুষটির
মাঝে বিধাতা এক জাতিকে শিরদাঁড়া সোজা হয়ে দাঁড়াবার শক্তি জুগিয়েছিলেন পরবর্তীতে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু মুজিব তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষণ ব্যয় করেছেন বাংলার মানুষের অধিকার আদায় আর বাঙালিকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। কোথায় ছিল না তাঁর নেতৃত্ব? তাঁর জীবনের অজস্র ঘটনা প্রবাহ যেমন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রলীগ গঠন, ১৯৪৯ সালে মুসলিম আওয়ামী লীগ গঠন ও খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিলের আয়োজন, ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের গঠনতন্ত্রের মূলনীতির বিরোধিতা, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে কারাগারে অনশন, ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা বিষয়, ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ, পূর্ব বাংলার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান
নামকরণের বিরোধিতা, ১৯৫৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও সংখ্যাসাম্যের বিরোধিতা, ১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে কারাবাস, ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতি বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন, ১৯৬৩ সালে আইয়ুবী সংবিধানের বিরোধিতা, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা প্রস্তাব, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় ছিনিয়ে আনা এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন বঙ্গবন্ধুকে যেমন মহিমান্বিত করেছে তেমনিভাবে এক জাতিকে তার অভিশপ্ত, অত্যাচারিত জীবন থেকে মুক্তি এনে দিয়েছে। তাঁর জীবনের অগণিত সংগ্রামী ঘটনাপুঞ্জ তাঁকে শুধু উপমহাদেশের বরেণ্য নেতা নয়, বিশ্বনেতা হিসেবে পরিচিত করে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে বেরিয়ে একই
বছরের ৫ ডিসেম্বর ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের নাম পূর্ব পাকিস্তানের বদলে শুধু বাংলাদেশ হবে।’ সেদিন থেকেই শুরু হলো বাঙালির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ চলা। বিশ্বের সব নেতা আর নেতৃত্বের ইতিহাসকে হারিয়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তিনি সর্বকালের সবচেয়ে শক্তিশালী আর প্রত্যয়ী ভাষণ দিলেন। তিনি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধের আদেশ দিলেন, স্বাধীনতা আর মুক্তিসংগ্রামের ডাক দিলেন, দিক নির্দেশনা দিলেন কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। বাঙালি জাতি নেতার কথায় যেন প্রাণ ফিরে পেল, তারা দৃঢ় প্রত্যয়ী হলো দেশকে স্বাধীন করবার শপথে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি জান্তারা ধরে নিয়ে গেল ৷ বাঙালি জানল না বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন ৷ কিন্তু নেতার আদেশে উজ্জীবিত হয়ে জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে বীর বাঙালি পাকিস্তান আর তার দোসরদের সব বাধাকে উপেক্ষা করে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণ আর অবর্ণনীয় ত্যাগের বিনিময়ে বিজয়ী হলো। জন্ম হলো সবুজ, শ্যামলে ভরা আমাদের সোনার বাংলাদেশের। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবদুর রাজ্জাক তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনুপস্থিত যে সময় দুই অসম শক্তি ভয়াবহ নিষ্ঠুর সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। বঙ্গবন্ধু এবং শুধু বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন সেই প্রতীক, যার চারদিকে নিঃসহায় এক উদ্দেশ্যের সমর্থকেরা এক সঙ্গে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। ওই অন্ধকার দিনগুলোতে, এই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে, যে কোটি কোটি জনতা, যারা ভবিষ্যৎ জাতিকে সৃষ্টি করবে তাদের মধ্যে লুকানো ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বিধা ছিল না।’ এক কথাই বললে বলা যায় বাঙালি জাতির একতার প্রশ্নাতীত প্রতীক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে পরম করুণাময়ের অসীম কৃপায় বাঙালির নয়নের মণিকে তাঁর প্রিয় বাংলার মানুষ ফিরে পেল৷ বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আবারও বাঙালিকে উজ্জীবিত করলেন বিধ্বস্ত এক দেশ গঠনে৷ শত সহস্র বাধার মাঝেও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে শুরু করল৷ বঙ্গবন্ধু যুগান্তকারী রাজনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থা বাকশাল ঘোষণা করলেন৷ পাকিস্তান আর মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী মার্কিন গং কিছুতেই মেনে নিল না বাংলাদেশ আর তার পথচলা৷ কী নিষ্ঠুর আমাদের ইতিহাস! দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে তিন বছর পর পাকিস্তান-মার্কিনের চর, তাদের দেশীয় প্রেতাত্মারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু মুজিব আর তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করল৷ এই হায়েনাদের হাতে বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র রাসেলও রক্ষা পেল না৷ বিদেশে থাকার কারণে শুধু বেঁচে থাকলেন বঙ্গবন্ধুর জ্যৈষ্ঠ কন্যা আজকের দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা আর কনিষ্ঠ কন্যা বাঙালির প্রিয় শেখ রেহানা৷ বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গেল৷ বাংলার প্রতিটি প্রাণী, ধূলিকণা, প্রকৃতি নীরব হয়ে গেল শোকে আর দুঃখে৷ বাঙালির জীবনের সর্বকালের সবচে শোকের দিন, সবচেয়ে অভিশপ্ত দিন ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন সহজ মানুষ, তাঁর রাজনীতি আর রাষ্ট্রচিন্তা শুধুমাত্র মানুষকে নিয়েই ছিল। ‘দুঃখী মানুষ’ হিন্দু না মুসলমান, ব্রাহ্মণ না অস্পৃশ্য, আশরাফ কী আতরাফ, খ্রিষ্টান না বৌদ্ধ তা তাঁর কাছে বিবেচনার বিষয় ছিল না। পৃথিবীর যে কোনো মহা নেতাকে হার মানিয়েছেন তিনি। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রপিতা মহাত্মা গান্ধী ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাত বিভক্ত ভারতের দরিদ্র মানুষকে প্রান্তসীমা থেকে তুলে এনেছিলেন ঠিকই কিন্তু পুরোনো বর্ণাশ্রম প্রথাকে নির্মূল করতে চাননি। বঙ্গবন্ধু মুজিব গান্ধীজিকেও অতিক্রম করেছেন তাঁর সাদা সরল মানবতাবাদী রাষ্ট্র চিন্তা দিয়ে। একজন মানুষের দেশপ্রেম যেটুকু সীমা পেরোতে পারে বঙ্গবন্ধু তা থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসতেন এই বাংলাদেশকে। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় দলের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে বলেছিলেন, ‘আমি যদি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারি, আমি যদি দেখি বাংলার মানুষ দুঃখী, আর যদি দেখি বাংলার মানুষ পেট ভরে খায় নাই, তাহলে আমি শান্তিতে মরতে পারব না, পারব না, পারব না।’ বাংলার মানুষের জন্য কী নিবিড় ছিল তাঁর ভালোবাসা! সব অর্থেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের স্বদেশের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস তাঁকে সৃষ্টি করেনি, তিনিই সৃষ্টি করেছেন বাঙালির ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস। বাঙালির সহস্র বছরের শৃঙ্খল তিনি ভেঙে দিয়ে হয়েছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি। বাঙালি জাতি উঠে দাঁড়িয়েছিল বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া অনুপ্রেরণায় সিক্ত হয়ে, তাঁর স্বপ্নকে পুঁজি করে৷ কিন্তু লোভী, ষড়যন্ত্রকারী, আর বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় ও রাষ্ট্রকে অস্বীকারকারী চক্র আজ বাংলাদেশকে স্তবির করে রেখেছে, তাদের হিংস্রতা মানুষের অধিকার হরণ করেছে, জনজীবনকে এক অপরিসীম দুর্দশার মাঝে উপনীত করেছে। এই মহাসংকটে বঙ্গবন্ধু মুজিব একটি নক্ষত্র, যার দিকে তাকিয়ে আমরা পথের নিশানা পাই। আমাদের হারিয়ে ফেলা পথের দিশা পাই। আমাদের অধিকার আদায়ের সাহসে ঋদ্ধ হই।
হোক না কেন, বাংলার ধনসম্পদ ও প্রাচুর্যের কারণে এই অঞ্চল বিদেশিদের জন্য আকর্ষণীয় ছিল। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ আর বাংলা দখল করার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালিদের জীবনে নেমে এল ত্যাগ ও তিতিক্ষার দিন। শুরু হলো সাধারণ বাঙালিদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন। ব্রিটিশদের শোষণ-নির্যাতন যত প্রখর হতে লাগল বাঙালি ও তেমনি কঠিন ও কঠোর হয়ে উঠল তাদের সত্তাকে জাগিয়ে তুলবার জন্য। বাঙালির নতুন মূল্যবোধের উন্মেষ হলো। ইংরেজরা বুঝে নিল সিপাহি বিপ্লবের সময় যে ভুল তারা করেছিল তা করা যাবে না। ইংরেজরা ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি গ্রহণ করল। হিন্দু মুসলমানদের একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করল। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হলো ১৯০৫ সালে। তারপর দীর্ঘ ৪০ বছর চলল
ষড়যন্ত্রের ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। হিন্দু-মুসলমানের রক্তে লাল হয়ে উঠল বাংলার মাটি। বঙ্গবন্ধু তখন তরুণ নেতা। অনাদিকালের ভ্রাতৃত্ব ও একতার মাধুর্যে গড়া বাংলার হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা রোধে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করলেন। জওহরলাল নেহরু, গান্ধীজিসহ অনেকেই বাংলার বিভক্তি সমর্থন করলেন। বাংলার অনেক মুসলমান নেতা ও সংস্কৃতিসেবীদের বাধার মুখে শুধুমাত্র মুসলিম লীগের চাপে ১৯৪৭ সালে বাংলা ভিন্ন জাতি সত্তার অংশ হয়ে গেল। এ বিভক্তি ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলার সংযোজন হাজারো বছরের গড়ে ওঠা বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার একটি নীলনকশা তা বঙ্গবন্ধু বুঝে গেলেন। তাঁর বুঝতে বাকি রইল না দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোতে বাঙালি নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হবে। দেশ বিভক্তির প্রাক্কালেই
তিনি কলকাতার সিরাজদৌলা হোটেলে তাঁর কর্মীদের সঙ্গে সংকল্পবদ্ধ হলেন বাংলাকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যয় নিয়ে। সাতচল্লিশের কোনো এক সময়ে এক স্কুলের সমাবর্তনে তিনি ঘোষণা করলেন ‘বাংলাদেশের’ সংকল্প। ভারত ভাগের পর প্রথমেই পাকিস্তানি সরকার বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতিকে রোধ করার চেষ্টা করল। বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। বাঙালি চেতনা প্রবল হয়ে উঠল। আর এই জ্যোতিটা প্রজ্বালিত করলেন ইতিহাসের বরপুত্র তেজি ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর বীরোচিত প্রতিবাদে। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বেই তাঁরই অদম্য নেতৃত্বে ভাষা দিবস পালিত হলো ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। তাঁর বাল্যকাল ও কৈশোর থেকে যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তা থেমে থাকেনি এরপর বরং তা বিস্তৃত হয়েছে কালক্রমে। এই মানুষটির
মাঝে বিধাতা এক জাতিকে শিরদাঁড়া সোজা হয়ে দাঁড়াবার শক্তি জুগিয়েছিলেন পরবর্তীতে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু মুজিব তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষণ ব্যয় করেছেন বাংলার মানুষের অধিকার আদায় আর বাঙালিকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। কোথায় ছিল না তাঁর নেতৃত্ব? তাঁর জীবনের অজস্র ঘটনা প্রবাহ যেমন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রলীগ গঠন, ১৯৪৯ সালে মুসলিম আওয়ামী লীগ গঠন ও খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিলের আয়োজন, ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের গঠনতন্ত্রের মূলনীতির বিরোধিতা, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে কারাগারে অনশন, ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা বিষয়, ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ, পূর্ব বাংলার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান
নামকরণের বিরোধিতা, ১৯৫৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও সংখ্যাসাম্যের বিরোধিতা, ১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে কারাবাস, ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতি বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন, ১৯৬৩ সালে আইয়ুবী সংবিধানের বিরোধিতা, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা প্রস্তাব, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় ছিনিয়ে আনা এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন বঙ্গবন্ধুকে যেমন মহিমান্বিত করেছে তেমনিভাবে এক জাতিকে তার অভিশপ্ত, অত্যাচারিত জীবন থেকে মুক্তি এনে দিয়েছে। তাঁর জীবনের অগণিত সংগ্রামী ঘটনাপুঞ্জ তাঁকে শুধু উপমহাদেশের বরেণ্য নেতা নয়, বিশ্বনেতা হিসেবে পরিচিত করে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর কারাগার থেকে বেরিয়ে একই
বছরের ৫ ডিসেম্বর ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের নাম পূর্ব পাকিস্তানের বদলে শুধু বাংলাদেশ হবে।’ সেদিন থেকেই শুরু হলো বাঙালির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ চলা। বিশ্বের সব নেতা আর নেতৃত্বের ইতিহাসকে হারিয়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তিনি সর্বকালের সবচেয়ে শক্তিশালী আর প্রত্যয়ী ভাষণ দিলেন। তিনি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধের আদেশ দিলেন, স্বাধীনতা আর মুক্তিসংগ্রামের ডাক দিলেন, দিক নির্দেশনা দিলেন কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। বাঙালি জাতি নেতার কথায় যেন প্রাণ ফিরে পেল, তারা দৃঢ় প্রত্যয়ী হলো দেশকে স্বাধীন করবার শপথে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি জান্তারা ধরে নিয়ে গেল ৷ বাঙালি জানল না বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন ৷ কিন্তু নেতার আদেশে উজ্জীবিত হয়ে জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে বীর বাঙালি পাকিস্তান আর তার দোসরদের সব বাধাকে উপেক্ষা করে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণ আর অবর্ণনীয় ত্যাগের বিনিময়ে বিজয়ী হলো। জন্ম হলো সবুজ, শ্যামলে ভরা আমাদের সোনার বাংলাদেশের। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবদুর রাজ্জাক তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনুপস্থিত যে সময় দুই অসম শক্তি ভয়াবহ নিষ্ঠুর সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। বঙ্গবন্ধু এবং শুধু বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন সেই প্রতীক, যার চারদিকে নিঃসহায় এক উদ্দেশ্যের সমর্থকেরা এক সঙ্গে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। ওই অন্ধকার দিনগুলোতে, এই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে, যে কোটি কোটি জনতা, যারা ভবিষ্যৎ জাতিকে সৃষ্টি করবে তাদের মধ্যে লুকানো ভুল বোঝাবুঝি বা দ্বিধা ছিল না।’ এক কথাই বললে বলা যায় বাঙালি জাতির একতার প্রশ্নাতীত প্রতীক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে পরম করুণাময়ের অসীম কৃপায় বাঙালির নয়নের মণিকে তাঁর প্রিয় বাংলার মানুষ ফিরে পেল৷ বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আবারও বাঙালিকে উজ্জীবিত করলেন বিধ্বস্ত এক দেশ গঠনে৷ শত সহস্র বাধার মাঝেও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে শুরু করল৷ বঙ্গবন্ধু যুগান্তকারী রাজনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থা বাকশাল ঘোষণা করলেন৷ পাকিস্তান আর মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী মার্কিন গং কিছুতেই মেনে নিল না বাংলাদেশ আর তার পথচলা৷ কী নিষ্ঠুর আমাদের ইতিহাস! দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে তিন বছর পর পাকিস্তান-মার্কিনের চর, তাদের দেশীয় প্রেতাত্মারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু মুজিব আর তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করল৷ এই হায়েনাদের হাতে বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র রাসেলও রক্ষা পেল না৷ বিদেশে থাকার কারণে শুধু বেঁচে থাকলেন বঙ্গবন্ধুর জ্যৈষ্ঠ কন্যা আজকের দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা আর কনিষ্ঠ কন্যা বাঙালির প্রিয় শেখ রেহানা৷ বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গেল৷ বাংলার প্রতিটি প্রাণী, ধূলিকণা, প্রকৃতি নীরব হয়ে গেল শোকে আর দুঃখে৷ বাঙালির জীবনের সর্বকালের সবচে শোকের দিন, সবচেয়ে অভিশপ্ত দিন ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন সহজ মানুষ, তাঁর রাজনীতি আর রাষ্ট্রচিন্তা শুধুমাত্র মানুষকে নিয়েই ছিল। ‘দুঃখী মানুষ’ হিন্দু না মুসলমান, ব্রাহ্মণ না অস্পৃশ্য, আশরাফ কী আতরাফ, খ্রিষ্টান না বৌদ্ধ তা তাঁর কাছে বিবেচনার বিষয় ছিল না। পৃথিবীর যে কোনো মহা নেতাকে হার মানিয়েছেন তিনি। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রপিতা মহাত্মা গান্ধী ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাত বিভক্ত ভারতের দরিদ্র মানুষকে প্রান্তসীমা থেকে তুলে এনেছিলেন ঠিকই কিন্তু পুরোনো বর্ণাশ্রম প্রথাকে নির্মূল করতে চাননি। বঙ্গবন্ধু মুজিব গান্ধীজিকেও অতিক্রম করেছেন তাঁর সাদা সরল মানবতাবাদী রাষ্ট্র চিন্তা দিয়ে। একজন মানুষের দেশপ্রেম যেটুকু সীমা পেরোতে পারে বঙ্গবন্ধু তা থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসতেন এই বাংলাদেশকে। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় দলের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে বলেছিলেন, ‘আমি যদি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারি, আমি যদি দেখি বাংলার মানুষ দুঃখী, আর যদি দেখি বাংলার মানুষ পেট ভরে খায় নাই, তাহলে আমি শান্তিতে মরতে পারব না, পারব না, পারব না।’ বাংলার মানুষের জন্য কী নিবিড় ছিল তাঁর ভালোবাসা! সব অর্থেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের স্বদেশের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস তাঁকে সৃষ্টি করেনি, তিনিই সৃষ্টি করেছেন বাঙালির ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস। বাঙালির সহস্র বছরের শৃঙ্খল তিনি ভেঙে দিয়ে হয়েছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি। বাঙালি জাতি উঠে দাঁড়িয়েছিল বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া অনুপ্রেরণায় সিক্ত হয়ে, তাঁর স্বপ্নকে পুঁজি করে৷ কিন্তু লোভী, ষড়যন্ত্রকারী, আর বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় ও রাষ্ট্রকে অস্বীকারকারী চক্র আজ বাংলাদেশকে স্তবির করে রেখেছে, তাদের হিংস্রতা মানুষের অধিকার হরণ করেছে, জনজীবনকে এক অপরিসীম দুর্দশার মাঝে উপনীত করেছে। এই মহাসংকটে বঙ্গবন্ধু মুজিব একটি নক্ষত্র, যার দিকে তাকিয়ে আমরা পথের নিশানা পাই। আমাদের হারিয়ে ফেলা পথের দিশা পাই। আমাদের অধিকার আদায়ের সাহসে ঋদ্ধ হই।



