ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ফাঁদে দেশের কৃষি-খামার: জেনেটিক্যালি মডিফায়েড পশুখাদ্যের প্রচারণায় রাষ্ট্রদূত
কিশোরগঞ্জে পুলিশের ‘ভুল’ অভিযানে ভাইসহ আওয়ামী লীগ নেতা আটক, জনতার তোপের মুখে মুক্তি
রোহিঙ্গাদের দেওয়া জাতিসংঘের ত্রাণে নয়ছয়: ক্যাম্পের চাল মিলে বিক্রি, জড়িত ডব্লিউএফপির কর্মীরাও
নেপালের ভয়াবহ বন্যা: হিমালয় কেন বারবার এমন দুর্যোগের শিকার হচ্ছে?
ইউনূসের করা দাসত্বের চুক্তি নিয়ে মুখ খুলছেন শীর্ষ ব্যবসায়ীরা, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
১ কোটি কর্মসংস্থানের সরকারি মূলা ও বাস্তবতা: বিশ্বব্যাংক বলছে কর্মহীন হবেন ৬ লাখ মানুষ, বাড়বে দারিদ্র
মাদক-চাঁদাবাজির বিরোধিতা করায় প্রবাসীর জমি দখল করলেন গাজীপুর বিএনপির সদস্য সচিব
কৃষি খাতেও মার্কিন আগ্রাসন: চাপের মুখে দেশজ উৎপাদন
বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এবং এর আগে সম্পাদিত কয়েকটি সমঝোতার ফলে মার্কিন গম, ভুট্টা, সয়াবিন ও সয়াপণ্য, তুলা, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস ও পোলট্রিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া এই উদ্যোগের বিপরীতে দেশের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বাজারে কতটা পরিবর্তন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়-প্রতিশ্রুতি দেশের স্থানীয় উৎপাদকদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ
‘Agreement on Reciprocal Trade’ স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে সয়াপণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফলসহ বিভিন্ন পণ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সরকারি সনদ এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (SPS) ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি দাবির সঙ্গে চুক্তির ভাষার পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন ডেইরি পণ্যের জন্য বাংলাদেশে কোনো সার্টিফিকেট লাগবে না, এমন কথা চুক্তিতে নেই। বরং চুক্তির Facility Registration অংশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেইরি পণ্য বাংলাদেশে ঢোকার সময় USDA Agricultural Marketing Service-এর dairy sanitary certificate সঙ্গে থাকতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আলাদা
facility-registration requirement আরোপ করবে না। মাংস ও পোলট্রির ক্ষেত্রে আবার যুক্তরাষ্ট্রের USDA Food Safety and Inspection Service-এর তদারকি এবং সরকারি পরিদর্শন-ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চুক্তির যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ কর্তৃক প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে গম, সয়াবিন ও সয়াপণ্য, তুলা ও ভুট্টার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এই ৩.৫ বিলিয়ন ডলারকে সরাসরি ‘আগামী ১৫ বছরে বাধ্যতামূলক কৃষিপণ্য আমদানি’ বলা ঠিক নয়। চুক্তির নির্দিষ্ট অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম পাঁচ বছর কেনার চেষ্টা করবে। একই ধারায় সয়াবিন ও সয়াপণ্যের জন্য অন্তত ১.২৫ বিলিয়ন ডলার অথবা ২৬
লাখ মেট্রিক টন, যেটি কম, এক বছরের লক্ষ্যের কথাও রয়েছে। অন্যদিকে ১৫ বছরের ১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি কৃষিপণ্যের জন্য নয়, জ্বালানি পণ্যের জন্য। এই দুই অঙ্ককে এক করে দেখলে চুক্তির প্রকৃত কাঠামো বিকৃত করা হয়। পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ টন মার্কিন গম : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পষ্ট কৃষিপণ্য ক্রয়-প্রতিশ্রুতি হলো গম ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও U.S. Wheat Associates-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর ৭ লাখ মেট্রিক টন মার্কিন গম কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ পুরো মেয়াদে পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। এর বাস্তব প্রয়োগও শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার
টন মার্কিন গম কিনেছিল বলে সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তবে এখানে দামের প্রশ্নও উঠেছে। জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশ ২ লাখ ২০ হাজার টন মার্কিন গম ৩২২ ডলার প্রতি টন দরে কেনার অনুমোদন দেয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রে ৫০ হাজার টন গমের দর ছিল ২৯৭.৯২ ডলার প্রতি টন। অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট ক্রয়ে মার্কিন গমের দাম ছিল প্রায় ২৪ ডলার প্রতি টন বেশি। এই হিসাবে ২ লাখ ২০ হাজার টনের ওই চালানে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় আনুমানিক ৫২ লাখ ৮০ হাজার ডলার, যদি তুলনার ভিত্তি হিসেবে ওই উন্মুক্ত দরপত্রের দর ধরা হয়। তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, দুটি চালানের গুণগত বৈশিষ্ট্য, সরবরাহের সময়, চুক্তির শর্ত
ও উৎস এক না হলে শুধু টনপ্রতি দাম দিয়ে মোট অর্থনৈতিক সুবিধা বা ক্ষতি নির্ধারণ করা যায় না। ভুট্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ভুট্টার বাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ দ্রুত বেড়েছে। USDA Foreign Agricultural Service-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর ২০২৫-২৬ মার্কেটিং ইয়ারে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভুট্টা আসে। জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৬০ হাজার টনের প্রথম চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরবর্তীতে আরও দুটি চালান আসে। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ মার্কেটিং ইয়ারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ভুট্টা এসেছে। ওই সময়ে বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। ব্রাজিলের অংশ ছিল ৭৮ শতাংশ এবং ভারতের ১১ শতাংশ এখানে
অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। বাংলাদেশে ভুট্টার ব্যবহার শুধু মানুষের খাদ্য হিসেবে নয়, প্রধানত পোলট্রি ও প্রাণিখাদ্য শিল্পেও ব্যাপক। USDA-এর হিসাবে ২০২৫-২৬ মার্কেটিং ইয়ারে বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানি প্রায় ১৮ লাখ টন হতে পারে। একই সময়ে দেশের ভুট্টা উৎপাদনও বাড়ছে। অর্থাৎ মার্কিন ভুট্টার প্রবেশকে শুধু স্থানীয় কৃষকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দেশীয় উৎপাদন, ফিড শিল্পের চাহিদা, ভারত-ব্রাজিলের সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক দামের পরিবর্তনও বাজারকে প্রভাবিত করছে। কৃষকের সংকট অন্য জায়গায়ও দেশীয় কৃষকের চাপের বিষয়টি অবশ্য বাস্তব। ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রংপুর অঞ্চলের একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে, যেখানে উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় ৯২০ থেকে ৯৫০ টাকা। CPD-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণেও বোরো ধানের ক্ষেত্রে ‘price scissors’-এর চিত্র উঠে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি অংশকে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম দামে ভেজা ধান বিক্রি করতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এদিকে বাজার ব্যবস্থার আরেকটি অসঙ্গতি হলো, কৃষকের কাছ থেকে ধান বা চাল যে দামে বের হয় এবং ভোক্তা যে দামে কেনেন, তার মধ্যে বড় ব্যবধান। জুলাই ২০২৬-এর CPD বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৈজাম চালের কৃষক পর্যায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩০.৬৫ টাকা, আর খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে ৫৯.৬৯ টাকা হয়েছিল। অর্থাৎ কৃষকের সংকটের কারণ শুধু বিদেশি আমদানি নয়। উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা, সংরক্ষণব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগী, বাজার কাঠামো এবং সরকারি সংগ্রহনীতি মিলিয়ে সমস্যাটি অনেক গভীর। পোশাক খাতেও চাপ, তবে কারণ একক নয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষিপণ্য আমদানির সমীকরণের সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সংকটকে সরাসরি একই কারণ-ফল হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। তবে দুই ঘটনাই একই বাণিজ্য আলোচনার অংশ। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি ছিল প্রায় ৭.১ বিলিয়ন ডলার। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, বিপরীতে বাংলাদেশে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ১৯ শতাংশ reciprocal tariff rate রাখার ঘোষণা দেয় এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্কের সুযোগ রাখে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল পণ্যের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণকে শূন্য reciprocal tariff সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে সেই সুবিধার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে টেক্সটাইল ইনপুট, যেমন তুলা ও man-made fiber-এর রপ্তানির সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাক খাত নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যাতেও চাপে রয়েছে। BGMEA-এর হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২.৪৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে গড়ে ৯.৪৩ শতাংশ। সংগঠনটির হিসাবে গত এক বছরে প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার পেছনে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্যের দাম কমে যাওয়া ও অর্ডার কমে যাওয়ার মতো কারণ রয়েছে। জুলাই ২০২৬-এ BGMEA সভাপতি জানান, ছয় মাসে কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন এবং প্রতি মাসে গড়ে তিন থেকে চারটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে আগস্টে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন BGMEA প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটির দাবি, অনেক কারখানা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালালেও গ্যাস সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমদানি বাড়ার ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ও ভোক্তার স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকরা কীভাবে প্রতিযোগিতা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য বড় পরিসরে প্রবেশ করলে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং কোনো কোনো পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়-প্রতিশ্রুতি যদি আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি দামে পণ্য কেনার দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে সরকারি অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং স্থানীয় বাজারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গমের ক্ষেত্রে ৭ লাখ টন বার্ষিক ক্রয়-প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে। ভুট্টার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ২০১৮ সালের পর নতুন করে ফিরে এসেছে। আর ডেইরি ও মাংসের ক্ষেত্রে মার্কিন সরকারি খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ভবিষ্যতে আমদানির প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের কৃষক বা গার্মেন্টস শিল্পকে ‘ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত’ চুক্তিতে নেওয়া হয়েছে। বরং চুক্তিটি একটি বড় বাজার-অদলবদল ও বাণিজ্য ভারসাম্যের সমঝোতা। এর সুফল ও ক্ষতি নির্ভর করবে বাংলাদেশ কী দামে পণ্য কিনছে, কী পরিমাণ আমদানি করছে, স্থানীয় কৃষকের উৎপাদন খরচ কত, আমদানির ওপর কী ধরনের শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক কতটা সুবিধা পাচ্ছে তার ওপর।
‘Agreement on Reciprocal Trade’ স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে সয়াপণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফলসহ বিভিন্ন পণ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সরকারি সনদ এবং স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (SPS) ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি দাবির সঙ্গে চুক্তির ভাষার পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন ডেইরি পণ্যের জন্য বাংলাদেশে কোনো সার্টিফিকেট লাগবে না, এমন কথা চুক্তিতে নেই। বরং চুক্তির Facility Registration অংশে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেইরি পণ্য বাংলাদেশে ঢোকার সময় USDA Agricultural Marketing Service-এর dairy sanitary certificate সঙ্গে থাকতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আলাদা
facility-registration requirement আরোপ করবে না। মাংস ও পোলট্রির ক্ষেত্রে আবার যুক্তরাষ্ট্রের USDA Food Safety and Inspection Service-এর তদারকি এবং সরকারি পরিদর্শন-ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চুক্তির যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ কর্তৃক প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে গম, সয়াবিন ও সয়াপণ্য, তুলা ও ভুট্টার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এই ৩.৫ বিলিয়ন ডলারকে সরাসরি ‘আগামী ১৫ বছরে বাধ্যতামূলক কৃষিপণ্য আমদানি’ বলা ঠিক নয়। চুক্তির নির্দিষ্ট অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম পাঁচ বছর কেনার চেষ্টা করবে। একই ধারায় সয়াবিন ও সয়াপণ্যের জন্য অন্তত ১.২৫ বিলিয়ন ডলার অথবা ২৬
লাখ মেট্রিক টন, যেটি কম, এক বছরের লক্ষ্যের কথাও রয়েছে। অন্যদিকে ১৫ বছরের ১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি কৃষিপণ্যের জন্য নয়, জ্বালানি পণ্যের জন্য। এই দুই অঙ্ককে এক করে দেখলে চুক্তির প্রকৃত কাঠামো বিকৃত করা হয়। পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ টন মার্কিন গম : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে স্পষ্ট কৃষিপণ্য ক্রয়-প্রতিশ্রুতি হলো গম ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও U.S. Wheat Associates-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর ৭ লাখ মেট্রিক টন মার্কিন গম কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ পুরো মেয়াদে পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। এর বাস্তব প্রয়োগও শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার
টন মার্কিন গম কিনেছিল বলে সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তবে এখানে দামের প্রশ্নও উঠেছে। জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশ ২ লাখ ২০ হাজার টন মার্কিন গম ৩২২ ডলার প্রতি টন দরে কেনার অনুমোদন দেয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রে ৫০ হাজার টন গমের দর ছিল ২৯৭.৯২ ডলার প্রতি টন। অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট ক্রয়ে মার্কিন গমের দাম ছিল প্রায় ২৪ ডলার প্রতি টন বেশি। এই হিসাবে ২ লাখ ২০ হাজার টনের ওই চালানে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় আনুমানিক ৫২ লাখ ৮০ হাজার ডলার, যদি তুলনার ভিত্তি হিসেবে ওই উন্মুক্ত দরপত্রের দর ধরা হয়। তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, দুটি চালানের গুণগত বৈশিষ্ট্য, সরবরাহের সময়, চুক্তির শর্ত
ও উৎস এক না হলে শুধু টনপ্রতি দাম দিয়ে মোট অর্থনৈতিক সুবিধা বা ক্ষতি নির্ধারণ করা যায় না। ভুট্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ভুট্টার বাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ দ্রুত বেড়েছে। USDA Foreign Agricultural Service-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর ২০২৫-২৬ মার্কেটিং ইয়ারে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভুট্টা আসে। জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৬০ হাজার টনের প্রথম চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরবর্তীতে আরও দুটি চালান আসে। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ মার্কেটিং ইয়ারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ভুট্টা এসেছে। ওই সময়ে বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। ব্রাজিলের অংশ ছিল ৭৮ শতাংশ এবং ভারতের ১১ শতাংশ এখানে
অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। বাংলাদেশে ভুট্টার ব্যবহার শুধু মানুষের খাদ্য হিসেবে নয়, প্রধানত পোলট্রি ও প্রাণিখাদ্য শিল্পেও ব্যাপক। USDA-এর হিসাবে ২০২৫-২৬ মার্কেটিং ইয়ারে বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানি প্রায় ১৮ লাখ টন হতে পারে। একই সময়ে দেশের ভুট্টা উৎপাদনও বাড়ছে। অর্থাৎ মার্কিন ভুট্টার প্রবেশকে শুধু স্থানীয় কৃষকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দেশীয় উৎপাদন, ফিড শিল্পের চাহিদা, ভারত-ব্রাজিলের সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক দামের পরিবর্তনও বাজারকে প্রভাবিত করছে। কৃষকের সংকট অন্য জায়গায়ও দেশীয় কৃষকের চাপের বিষয়টি অবশ্য বাস্তব। ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রংপুর অঞ্চলের একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে, যেখানে উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় ৯২০ থেকে ৯৫০ টাকা। CPD-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণেও বোরো ধানের ক্ষেত্রে ‘price scissors’-এর চিত্র উঠে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি অংশকে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম দামে ভেজা ধান বিক্রি করতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এদিকে বাজার ব্যবস্থার আরেকটি অসঙ্গতি হলো, কৃষকের কাছ থেকে ধান বা চাল যে দামে বের হয় এবং ভোক্তা যে দামে কেনেন, তার মধ্যে বড় ব্যবধান। জুলাই ২০২৬-এর CPD বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৈজাম চালের কৃষক পর্যায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩০.৬৫ টাকা, আর খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে ৫৯.৬৯ টাকা হয়েছিল। অর্থাৎ কৃষকের সংকটের কারণ শুধু বিদেশি আমদানি নয়। উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা, সংরক্ষণব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগী, বাজার কাঠামো এবং সরকারি সংগ্রহনীতি মিলিয়ে সমস্যাটি অনেক গভীর। পোশাক খাতেও চাপ, তবে কারণ একক নয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষিপণ্য আমদানির সমীকরণের সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সংকটকে সরাসরি একই কারণ-ফল হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। তবে দুই ঘটনাই একই বাণিজ্য আলোচনার অংশ। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি ছিল প্রায় ৭.১ বিলিয়ন ডলার। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, বিপরীতে বাংলাদেশে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ১৯ শতাংশ reciprocal tariff rate রাখার ঘোষণা দেয় এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্কের সুযোগ রাখে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল পণ্যের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণকে শূন্য reciprocal tariff সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে সেই সুবিধার পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে টেক্সটাইল ইনপুট, যেমন তুলা ও man-made fiber-এর রপ্তানির সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাক খাত নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যাতেও চাপে রয়েছে। BGMEA-এর হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২.৪৩ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে গড়ে ৯.৪৩ শতাংশ। সংগঠনটির হিসাবে গত এক বছরে প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার পেছনে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্যের দাম কমে যাওয়া ও অর্ডার কমে যাওয়ার মতো কারণ রয়েছে। জুলাই ২০২৬-এ BGMEA সভাপতি জানান, ছয় মাসে কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন এবং প্রতি মাসে গড়ে তিন থেকে চারটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে আগস্টে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন BGMEA প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটির দাবি, অনেক কারখানা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালালেও গ্যাস সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমদানি বাড়ার ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ও ভোক্তার স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকরা কীভাবে প্রতিযোগিতা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য বড় পরিসরে প্রবেশ করলে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং কোনো কোনো পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়-প্রতিশ্রুতি যদি আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি দামে পণ্য কেনার দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে সরকারি অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং স্থানীয় বাজারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গমের ক্ষেত্রে ৭ লাখ টন বার্ষিক ক্রয়-প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে। ভুট্টার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ২০১৮ সালের পর নতুন করে ফিরে এসেছে। আর ডেইরি ও মাংসের ক্ষেত্রে মার্কিন সরকারি খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ভবিষ্যতে আমদানির প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের কৃষক বা গার্মেন্টস শিল্পকে ‘ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত’ চুক্তিতে নেওয়া হয়েছে। বরং চুক্তিটি একটি বড় বাজার-অদলবদল ও বাণিজ্য ভারসাম্যের সমঝোতা। এর সুফল ও ক্ষতি নির্ভর করবে বাংলাদেশ কী দামে পণ্য কিনছে, কী পরিমাণ আমদানি করছে, স্থানীয় কৃষকের উৎপাদন খরচ কত, আমদানির ওপর কী ধরনের শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক কতটা সুবিধা পাচ্ছে তার ওপর।



