ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
গার্বেজ গিলে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত প্রত্যেকের নিজের, এতে ইতিহাসের সত্য বদলায় না
যেভাবে ডিপ স্টেট-এর খপ্পরে বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের তেল-গ্যাস লবির সফল কৌশলঃ ইউনুসের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল
উৎপাদনশীলতার সক্ষমতা, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সনদ
অটিজম, স্নায়ুবৈচিত্র্যতা আন্দোলন এবং অন্তর্ভুক্তির হিসেব-নিকেশ
স্কুলে এসে শিশুরা যেন পাঠ্যপুস্তকে বৈষম্য না দেখে—এই অবদান শেখ হাসিনার একান্ত
২৬ মার্চ-বাংলাদেশের জন্মদিন
মার্কিন অর্থায়নে শেখ হাসিনার সরকারের পতন: নথিতে মিলল ৩২৫ মিলিয়ন ডলারের ভাগীদারদের হদিস
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন-সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যখন ব্যস্ত, তখন ভেতরে ভেতরে চলছিল একটি গোপন অনুসন্ধান- বাংলাদেশে মার্কিন বিভিন্ন সংস্থার অনুদানের ডাটাবেজ, কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্য এবং প্রকাশিত কর্মসূচি নিয়ে পর্যালোচনা। এই প্রতিবেদনে উঠেছে এসেছে সেসব আর্থিক অনুদানের তথ্য, যাতে জানা গেছে টাকা কোথায় কোথায় ঢুকেছে, কারা পেয়েছে; যে অনুদানের পরই একটি দেশের নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটল।
আর্থিক অনুদানের পরিমাণ সম্পর্কিত তথ্য ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নামও জানা গেছে। কারা এই অর্থ পেয়েছে, তারও রেকর্ড আছে। তবে এতদিন এসব তথ্য-উপাত্ত ছিল বিচ্ছিন্নভাবে, পৃথক পৃথক প্রতিবেদনে। এখানে সেসব একত্রিত করা হলো।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর আর্থিক পরিমাণ
২০২৪ অর্থবছরে মার্কিন
সরকার বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ForeignAssistance.gov-এর ৩১শে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ সহায়তা। এই অর্থ অনেকগুলো খাতে ব্যয় হয়েছে। তবে এর ভেতরে কিছু ভিন্ন কর্মসূচি আছে— যা ইউএসএইড, পররাষ্ট্র দপ্তর এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত; এসব অর্থায়নকে সাধারণ ‘উন্নয়ন সহায়তা’ বলা যায় না। মার্কিন সরকারের প্রকাশ্য অনুদান ও চুক্তির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি জিহান জেনিফার হাসানের গবেষণা নথি থেকে জানা যায়, গত এক দশকে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে অন্তত ৩২,৫৫,৮৯,৬২২ ডলার অনুদান এবং ২৭,৭৯,৯০৩ ডলার চুক্তির অর্থ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার ডিএফআইডি-এর “স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল পার্টিসিপেশন
২” (এসপিপি২) কর্মসূচির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৬.৯ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছে। এই প্রকল্পটি এপ্রিল ২০১৭ থেকে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত চলেছে এবং এর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে ১৬.২ মিলিয়ন পাউন্ড। নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “এখানে কেবল সেই টাকার হিসাব দেওয়া হয়েছে, যার উৎস বের করা সম্ভব হয়েছে। এর বাইরেও আরও অনেক আর্থিক হিসাব রয়েছে, যা আমাদের বর্তমান তথ্যসূত্র দিয়ে শনাক্ত করা যায়নি।” শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আইআরআই, এনইডি ও ইউএসএআইডি’র সম্মিলিত চক্রান্তের স্বরূপ অশনাক্তকৃত অর্থের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে— হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদ্রাসায় পৌঁছানো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থায়ন, ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন, জাতিসংঘ ফাউন্ডেশন-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, রোহিঙ্গা সহায়তার নামে বিভিন্ন ইউরোপীয় ও কানাডীয় দূতাবাসের অর্থ বিতরণ, এবং ইউনূস স্পোর্টস
হাব। এই প্রতিবেদন কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়নি। এগুলো সরাসরি হিসাবের খাতার তথ্য, যার পরিপূর্ণ তথ্য রয়েছে সিএসবি নিউজের হাতে। বাংলাদেশে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর নামে কোন কোন খাতে অর্থায়ন করা হয়েছিল অনুদানের তথ্যগুলো থেকে একটি নির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। গভর্নেন্স খাতে সবচেয়ে বড় অনুদান পেয়েছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি ইউএসএইড-এর কাছ থেকে ২,৯৯,০০,০০০ ডলার পেয়েছে “স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (এসপিএল) ইন বাংলাদেশ” কর্মসূচির জন্য, যা মার্চ ২০১৭ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত চলেছে। এটি ছোট কোনো প্রকল্প ছিল না। এসপিএল প্রকল্পের অধীনে বড় ধরনের উপ-অনুদান কাঠামো তৈরি করা হয়। যার মাধ্যমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল-এর মাধ্যমে একই ইউএসএইড চ্যানেল থেকে আরও যেসব সংস্থা
অর্থ পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— দ্য গ্লোবাল হাঙ্গার প্রজেক্ট (দুইবারে ৯,৫১,৭৪৭ ডলার করে), মেসার্স বিটনিক (১,০২,১৯৯ ডলার) এবং সমকাল পত্রিকা (দুই কিস্তিতে ২৯,৪৩৮ ডলার)। কনসোর্টিয়াম ফর ইলেকশনস অ্যান্ড পলিটিক্যাল প্রসেস স্ট্রেংদেনিং (সিইপিপিএস)— যা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস)-এর যৌথ উদ্যোগ—“আমার ভোট আমার” (এভিএ) কর্মসূচির জন্য ২,১০,০০,০০০ ডলার পেয়েছে। এই প্রকল্পটি আগস্ট ২০২২ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত চলে। এই কর্মসূচির অধীনে উপ-অনুদানের পরিমাণই কয়েক কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর মধ্যে আইআরআই পেয়েছে ১৮ মিলিয়নের বেশি, আইএফইএস পেয়েছে ১৬ মিলিয়নের বেশি এবং এনডিআই বিভিন্ন ধাপে মোট ৪.৮ মিলিয়নের বেশি ডলার পেয়েছে—সবই একই এভিএ কর্মসূচির আওতায়। শেখ
হাসিনার সরকার উৎখাতে বিপুল অর্থ ঢেলেছে বাইডেন প্রশাসন, দাবী ইলন মাস্কের ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের অন্তর্ভুক্ত গ্লোবাল ইউথ লিডারশিপ সেন্টারকে দেওয়া হয় আরেকটি অনুদান। অর্থাৎ শেখ হাসিনা সরকারকে অপসারণের কয়েক সপ্তাহ পর- এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, তরুণদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করা, “যাতে তা শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে।” অর্থাৎ, শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর পর দায়িত্ব নেওয়া ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার যেন কোনো বাধার মুখে না পড়ে এবং নিরবচ্ছিন্ন গতিতে এগিয়ে যেতে পারে, সেজন্য তরুণদের সংগঠিত রাখাই ছিল এই অর্থায়নের উদ্দেশ্য। এই অনুদান ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এখানে বিষয়টি লক্ষণীয়—যে কাঠামো
বহু বছর ধরে তরুণদের রাজনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তুলছিল, একই অর্থায়ন চক্রে সেটিই আবার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার দিকে পরিচালিত হয়েছে। উইনরক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র মিশনের কাছ থেকে ৩,৮৫,০০,০০০ ডলার পেয়েছে “এসো শিখি” শিক্ষা কর্মসূচির জন্য, যা কক্সবাজারে প্রান্তিক শিশুদের নিয়ে নভেম্বর ২০২১ থেকে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলেছে। কেমোনিকস ইন্টারন্যাশনাল পেয়েছে ৫,৫২,০০,০০০ ডলার, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাসংক্রান্ত একটি কার্যক্রমের জন্য, যা আগস্ট ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৮ পর্যন্ত চলবে। এই কর্মসূচিগুলোর উন্নয়নমূলক গুরুত্ব যাই হোক না কেন, এগুলো এমন সব রাজনৈতিক-সংবেদনশীল এলাকায় পরিচালিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক সংকটের সময়ের সঙ্গে মিল থাকায় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেভাবে ডিপ স্টেট-এর খপ্পরে বাংলাদেশ ব্র্যাক-ইউএসএইড অংশীদারিত্বে পরিচালিত “বাংলাদেশ-আমেরিকান মৈত্রী কর্মসূচি (বিএএমএ)” প্রকল্পের মূল্য ১,৪৭,০০,০০০ ডলার। এর লক্ষ্য ছিল—অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিভিন্ন ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী বেসরকারি সংস্থা হিসেবে ব্র্যাক এমন একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়ে। সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা এই অর্থায়ন কাঠামোর একটি কম আলোচিত দিক হলো— মার্কিন নৌবাহিনীর (ডিওডি-ইউএসএন) অংশ নেভাল সাপ্লাই সিস্টেমস কমান্ড (এনএভিএসইউপি)-এর ভূমিকা। প্রায় এক দশক ধরে এনএভিএসইউপি বা ন্যাভসাপ বাংলাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য চুক্তিভিত্তিক অর্থ দিয়েছে। এসব কর্মসূচির শিরোনামের মধ্যে ছিল— “প্রমোটিং ইকুয়ালেটি ইন মাদ্রাসা স্টুডেন্টস”, “স্টুডেন্টস লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপস”, “বাংলাদেশ অ্যান্টি-ভায়োলেন্স প্রোগ্রাম”, “বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস কাউন্টার-র্যাডিকেলাইজেশন প্রোগ্রাম” এবং “সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিকস ফর বাংলাদেশ”। এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে অনুদান পেয়েছে— বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি), বাংলাদেশ ইউথ লিডারশিপ সেন্টার, আনন্দধারা কনসালটেন্ট, এক্সপ্রেশসন্স লিমিটেড. এবং মেসার্স বিটনিক। সব মিলিয়ে তারা প্রায় ২৭,৭৯,৯০৩ ডলার পেয়েছে। ময়দান ফর্মূলায় যেভাবে বাংলাদেশে ইউনূস, ইউএসএআইডি ও জঙ্গিরা অভ্যুত্থান ঘটালো প্রতিটি চুক্তির আর্থিক পরিমাণ আলাদাভাবে খুব বড় না হলেও, এগুলো একটি নির্দিষ্ট ধারা নির্দেশ করে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংস্থা বাংলাদেশে তরুণদের সংগঠিত করা, উগ্রবাদ প্রতিরোধমূলক বার্তা প্রচার, শিক্ষার্থী কর্মশালা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণের মতো কার্যক্রমে অর্থ দিচ্ছিল। আর এসবই পরিচালিত হচ্ছিল ন্যাভসাপ সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, বেসামরিক সহায়তা চ্যানেলের বাইরে। এর মধ্যে মেসার্স বিটনিক-এর “সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিকস ফর বাংলাদেশ” (৯৯,৪০০ ডলার, মে ২০২১ থেকে জুলাই ২০২২) চুক্তিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি কোনো খাদ্য সহায়তা নয়, অবকাঠামো নির্মাণও নয়—বরং এটি সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষণ, যা গোয়েন্দা কার্যক্রমের অনুরূপ প্রোগ্রাম। আর এটি করা হয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর চুক্তির আওতায়; এবং এমন একটি দেশে, যেখানে পরবর্তীতে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে অপসারণ করা হয়েছে। এনইডি-এর সাক্ষ্যে স্বীকারোক্তি ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি)-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও ড্যামন উইলসন যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ সাবকমিটি (ন্যাশনাল সিকিউরিটি, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি)–এর সামনে সাক্ষ্য দেন। আইএএনএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি উল্লেখ করেন—বাংলাদেশে “এনইডি-এর সহায়তা দেশটিকে ১০ বছরের বেশি সময়ের ‘স্বৈরশাসন’, সহিংসতা ও অস্থিরতা থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করছে,” যা তিনি শেখ হাসিনার সরকারের প্রসঙ্গেই বলেন। তিনি আরও বলেন, এনইডি-সমর্থিত কার্যক্রমগুলো সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে “নির্বাচনী সংস্কার এগিয়ে নিতে, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণ করতে এবং ভোটারদের সচেতনতা বাড়াতে” সহায়তা করেছে। শেষে তিনি শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশকে বর্ণনা করেন “শান্তি পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক শাসন এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ” হিসেবে। এটি নিরপেক্ষ কোনো উন্নয়ন সহায়তার ভাষা নয়। বরং এটি এমন একটি কর্মসূচির ভাষা, যা নির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের উদ্দেশ্যের সফলতা হিসেবে বিবেচনা করে। মাইক বেঞ্জের বক্তব্য মাইক বেঞ্জ কোনো সাধারণ ব্লগার নন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি (আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও তথ্যনীতি)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছেন, কীভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি প্রণেতারা “সিভিল সোসাইটি” কাঠামোকে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। টাকার কার্লসন শো-এ ব্যাপকভাবে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে মাইক বেঞ্জ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বক্তব্য দেন, যা পুরোপুরি পড়া প্রয়োজন আগ্রহীদের। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি (বেঞ্জ) বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন: “ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে বাংলাদেশে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা জরুরি, যাতে চীনকে মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এতে রাজি নন। তখন আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিকল্পনাকারীরা সিদ্ধান্ত নেয়—সরকার পরিবর্তন করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, একবার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে “দেশকে অস্থিতিশীল করার সব ধরনের উপায়” প্রয়োগ করা হয়—বিরোধী শক্তিকে সমর্থন দেওয়া থেকে শুরু করে তথাকথিত ‘কালার রেভল্যুশন’ সংগঠিত করা পর্যন্ত, যেখানে নেতাদের “ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, কখনও কখনও তারা হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যায়।” জুলাই আন্দোলনে বিদেশী অর্থায়ন: ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল পেয়েছিল ৫১ মিলিয়ন ডলার ৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়েন। বেঞ্জের বক্তব্য কেবল কৌশলেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়, তারও বর্ণনা দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—উপরের অনুদানের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এটিকে উপেক্ষা করা কঠিন। বেঞ্জ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে বাংলাদেশের র্যাপ ব্যান্ডগুলোকে অর্থায়ন করা হয়েছিল, যেন তারা উস্কানিমূলক প্রতিবাদী গান তৈরি করে। লক্ষ্য ছিল “শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ”-এর নাম দিয়ে মানুষকে রাস্তায় নামানো, যা পরে দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে—এবং বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। এটি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। আবারও অনুদানের তালিকায় তাকালে দেখা যায়— অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকান ভয়েসেস পেয়েছে ৬৬,৬০০ ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো থেকে, “ইউথ এক্সেলেন্স অন স্টেজ (ইয়েস) অ্যাকাডেমি” পরিচালনার জন্য, যেখানে বাংলাদেশি তরুণদের আমেরিকান হিপ-হপ সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন-এর ইউথ-রাইজ কর্মসূচি পেয়েছে ইউএসএইড থেকে ৪,০,০০,০০০ ডলার, যা “পিপল টু পিপল রিকনসিলিয়েশন ফান্ড” হিসেবে বর্ণিত—যার লক্ষ্য ছিল এমন তরুণদের সংগঠিত করা, যারা সহনশীল, সব নেটওয়ার্কে সংযুক্ত, সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ এবং সক্রিয়। গ্লোবাল ইউথ লিডারশিপ সেন্টার পেয়েছে ১,৩৩,৪৯৩ ডলার, “কাউন্টারিং ডিজইনফরমেশন” বিষয়ে একটি টেকক্যাম্প আয়োজনের জন্য, যেখানে তরুণদের স্থানীয় সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখানো হয়েছে। র্যাপ সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ তরুণ, পারস্পরিক যোগাযোগভিত্তিক নেটওয়ার্ক, বার্তা প্রচারের প্রশিক্ষণ—আলাদাভাবে এগুলোকে সাংস্কৃতিক বা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বলা যেতে পারে। কিন্তু একসাথে দেখলে এগুলোর পেছনে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সংগঠিত ও সুসংবদ্ধ কাঠামোতে আনার উদ্দেশ্য ছিল। উল্লেখ্য, মাইক বেঞ্জই প্রথম ব্যক্তি নন, যিনি বলেছেন—২০২৪ সালে বাংলাদেশে এই কাঠামো সক্রিয় করা হয়েছিল। চীনের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক পরিকল্পনা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের নৌ-প্রভাব সীমিত করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছিল, যাতে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগের বড় ভূমিকা ছিল। এই অবস্থানটি একটি বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল—এখন আর তা নেই। ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা: এসপিপি২ কাঠামো যুক্তরাজ্যের ডিএফআইডি-এর “স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল পার্টিসিপেশন ২ (এসপিপি২)” (প্রোগ্রাম কোড ২০৩৪৮৭) কর্মসূচির মূল্য ছিল ১৬.২ মিলিয়ন পাউন্ড, যা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে পর্যালোচনা করা হয়। সরকারি নথিতে এটিকে ডিএফআইডি বাংলাদেশের “প্রধান রাজনৈতিক গভর্নেন্স কর্মসূচি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন অংশীদারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে: ইউএসএইড, যার অধীনে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনাল কাজ করেছে এফসিও, যার সঙ্গে ছিল ম্যানেজমেন্ট রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রো গভর্নেন্স রিসার্চ সেন্টার (ডিইউএমজিআরসি) দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন (টিএএফ) ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস), যার সঙ্গে ছিল দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) এটি চারটি পক্ষ কিন্তু আলাদা দ্বিপাক্ষিক প্রকল্প ছিল না। বরং এটি ছিল একটি সমন্বিত ট্রান্সআটলান্টিক কাঠামো, যা একসাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম, যুব সংগঠন এবং বিচারব্যবস্থার ওপর কাজ করেছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল— রাজনৈতিক দলগুলোকে নীতিনির্ভর করা, দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং এফসিও-এর যৎসামান্য অর্থায়নের মাধ্যমে “গণমাধ্যম ও তরুণদের ব্যবহার করে শান্তি, সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” উৎসাহিত করা। ২০২০ সালের মার্চের একটি অভ্যন্তরীণ বার্ষিক পর্যালোচনায় এক আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়: “আমি তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, এবং তারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে… আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে যে দেয়াল ছিল, তা ভেঙে গেছে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।” সেই ভাঙা দেয়াল পরে কাজে এসেছিল। অর্থায়নের ধারাপ্রবাহ ForeignAssistance.gov–এর বাংলাদেশ সম্পর্কিত তথ্যচিত্র একটি স্পষ্ট গ্রাফ দেখা যায়। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, ২০১৮ সালের দিকে তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, এবং ২০২৪ অর্থবছরে ৫৭,২৫,৩০,৮১৯ ডলারে পৌঁছে সর্বোচ্চ হয়। এরপর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তা কমতে শুরু করে—যদিও এই দুই বছরকে “আংশিক প্রতিবেদন” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্রাফের এই ঊর্ধ্বমুখী উল্লম্ফন সময়টি লক্ষ্যণীয়—যে বছর শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান, ঠিক সেই বছরই সর্বোচ্চ অর্থায়ন হয়। এরপরই তা কমতে থাকে। এটি সাধারণ অর্থে কাকতালীয় সম্পর্ক নয়। বরং এটি একটি কর্মসূচির জীবনচক্রের মতো—রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সময় অর্থায়ন বাড়ে, পরিবর্তনের মুহূর্তে তা সর্বোচ্চ হয়, এবং লক্ষ্য পূরণ হলে তা কমে যায়। সমগ্র অর্থায়নই কি ষড়যন্ত্রের পেছনে? এটা বলা যায় না যে, বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সব সহায়তাই খারাপ বা ক্ষতিকর ছিল। রোহিঙ্গা সংকট বাস্তব, এবং এর জন্য মানবিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চিকিৎসা গবেষণা, কৃষি উন্নয়ন এবং শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি—এসবই বাস্তব ও ইতিবাচক উদ্যোগ। যেমন, কর্নেল ইউনিভিার্সিটি–এর কম আয়ের বাংলাদেশিদের আয় অনিশ্চয়তা নিয়ে স্বাস্থ্য গবেষণা একটি বৈধ বৈজ্ঞানিক কাজ। কিন্তু উপরে যে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তা কেবল মানবিক উদ্দেশ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ঢাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণ প্রকল্প কোনো মানবিক সহায়তা ছিল না। বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট–ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ২১ মিলিয়ন ডলার দেওয়া—এটিও নিরপেক্ষ উন্নয়ন সহায়তা নয়। এমনকি “সোশ্যাল মুভমেন্টস অ্যান্ড কালেক্টিভ অ্যাকশন এক্সপার্টিজ” শিরোনামে ৯,২৩,৪০০ ডলারের একটি চুক্তি—যা আগস্ট ২০২৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত চলেছে—এটিও কোনো খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ছিল না। যে প্রশ্নটি রয়ে যায় শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন। তাঁর সময়ে সড়ক-অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, এবং এশিয়ার উল্লেখযোগ্য উন্নয়নধারার একটি পর্ব পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে, তাঁর শাসনের শেষদিকে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বেড়েছে এবং বিরোধীদের দমন করা হয়েছে—এই দুটো বিষয়ই একসাথে সত্য। কিন্তু বাংলাদেশে কী ধরনের সরকার থাকবে—এই সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক ও নৈতিকভাবে বাংলাদেশের জনগণেরই নেওয়ার কথা। উপরে যে নথিপত্রের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে, তার আলোকে বলার উপায় নেই যে, দেশের মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরং এতে স্পষ্ট যে, এখানে একটি বিদেশি শক্তি ও তার মিত্ররা এক দশকের বেশি সময় ধরে শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের পেছনে ছুটেছে, এবং পরে সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করেছে। এটি গণতন্ত্র উন্নয়নের প্রচেষ্টা নয়। এটি সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং নথিপত্র। নথিগুলো প্রকাশ্য। অর্থের উৎসও অনুসরণ করা যায়। এখন প্রশ্ন হলো— ঢাকায় কিংবা বিশ্বের কোথাও—এই অর্থ ব্যয়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাউকে কি জবাবদিহির আওতায় আনা হবে? লেখক: আবু উবায়দা অরিন আবু উবায়দা আরিন বাংলাদেশি লেখক-বিশ্লেষক, রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সামাজিক প্রভাব নিয়ে কাজ করেন
সরকার বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ForeignAssistance.gov-এর ৩১শে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ সহায়তা। এই অর্থ অনেকগুলো খাতে ব্যয় হয়েছে। তবে এর ভেতরে কিছু ভিন্ন কর্মসূচি আছে— যা ইউএসএইড, পররাষ্ট্র দপ্তর এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত; এসব অর্থায়নকে সাধারণ ‘উন্নয়ন সহায়তা’ বলা যায় না। মার্কিন সরকারের প্রকাশ্য অনুদান ও চুক্তির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি জিহান জেনিফার হাসানের গবেষণা নথি থেকে জানা যায়, গত এক দশকে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে অন্তত ৩২,৫৫,৮৯,৬২২ ডলার অনুদান এবং ২৭,৭৯,৯০৩ ডলার চুক্তির অর্থ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার ডিএফআইডি-এর “স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল পার্টিসিপেশন
২” (এসপিপি২) কর্মসূচির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৬.৯ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছে। এই প্রকল্পটি এপ্রিল ২০১৭ থেকে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত চলেছে এবং এর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে ১৬.২ মিলিয়ন পাউন্ড। নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “এখানে কেবল সেই টাকার হিসাব দেওয়া হয়েছে, যার উৎস বের করা সম্ভব হয়েছে। এর বাইরেও আরও অনেক আর্থিক হিসাব রয়েছে, যা আমাদের বর্তমান তথ্যসূত্র দিয়ে শনাক্ত করা যায়নি।” শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আইআরআই, এনইডি ও ইউএসএআইডি’র সম্মিলিত চক্রান্তের স্বরূপ অশনাক্তকৃত অর্থের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে— হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদ্রাসায় পৌঁছানো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থায়ন, ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন, জাতিসংঘ ফাউন্ডেশন-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, রোহিঙ্গা সহায়তার নামে বিভিন্ন ইউরোপীয় ও কানাডীয় দূতাবাসের অর্থ বিতরণ, এবং ইউনূস স্পোর্টস
হাব। এই প্রতিবেদন কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়নি। এগুলো সরাসরি হিসাবের খাতার তথ্য, যার পরিপূর্ণ তথ্য রয়েছে সিএসবি নিউজের হাতে। বাংলাদেশে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর নামে কোন কোন খাতে অর্থায়ন করা হয়েছিল অনুদানের তথ্যগুলো থেকে একটি নির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। গভর্নেন্স খাতে সবচেয়ে বড় অনুদান পেয়েছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি ইউএসএইড-এর কাছ থেকে ২,৯৯,০০,০০০ ডলার পেয়েছে “স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (এসপিএল) ইন বাংলাদেশ” কর্মসূচির জন্য, যা মার্চ ২০১৭ থেকে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত চলেছে। এটি ছোট কোনো প্রকল্প ছিল না। এসপিএল প্রকল্পের অধীনে বড় ধরনের উপ-অনুদান কাঠামো তৈরি করা হয়। যার মাধ্যমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল-এর মাধ্যমে একই ইউএসএইড চ্যানেল থেকে আরও যেসব সংস্থা
অর্থ পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— দ্য গ্লোবাল হাঙ্গার প্রজেক্ট (দুইবারে ৯,৫১,৭৪৭ ডলার করে), মেসার্স বিটনিক (১,০২,১৯৯ ডলার) এবং সমকাল পত্রিকা (দুই কিস্তিতে ২৯,৪৩৮ ডলার)। কনসোর্টিয়াম ফর ইলেকশনস অ্যান্ড পলিটিক্যাল প্রসেস স্ট্রেংদেনিং (সিইপিপিএস)— যা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস)-এর যৌথ উদ্যোগ—“আমার ভোট আমার” (এভিএ) কর্মসূচির জন্য ২,১০,০০,০০০ ডলার পেয়েছে। এই প্রকল্পটি আগস্ট ২০২২ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত চলে। এই কর্মসূচির অধীনে উপ-অনুদানের পরিমাণই কয়েক কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর মধ্যে আইআরআই পেয়েছে ১৮ মিলিয়নের বেশি, আইএফইএস পেয়েছে ১৬ মিলিয়নের বেশি এবং এনডিআই বিভিন্ন ধাপে মোট ৪.৮ মিলিয়নের বেশি ডলার পেয়েছে—সবই একই এভিএ কর্মসূচির আওতায়। শেখ
হাসিনার সরকার উৎখাতে বিপুল অর্থ ঢেলেছে বাইডেন প্রশাসন, দাবী ইলন মাস্কের ৩০শে সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের অন্তর্ভুক্ত গ্লোবাল ইউথ লিডারশিপ সেন্টারকে দেওয়া হয় আরেকটি অনুদান। অর্থাৎ শেখ হাসিনা সরকারকে অপসারণের কয়েক সপ্তাহ পর- এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, তরুণদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করা, “যাতে তা শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে।” অর্থাৎ, শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানোর পর দায়িত্ব নেওয়া ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার যেন কোনো বাধার মুখে না পড়ে এবং নিরবচ্ছিন্ন গতিতে এগিয়ে যেতে পারে, সেজন্য তরুণদের সংগঠিত রাখাই ছিল এই অর্থায়নের উদ্দেশ্য। এই অনুদান ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এখানে বিষয়টি লক্ষণীয়—যে কাঠামো
বহু বছর ধরে তরুণদের রাজনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তুলছিল, একই অর্থায়ন চক্রে সেটিই আবার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার দিকে পরিচালিত হয়েছে। উইনরক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র মিশনের কাছ থেকে ৩,৮৫,০০,০০০ ডলার পেয়েছে “এসো শিখি” শিক্ষা কর্মসূচির জন্য, যা কক্সবাজারে প্রান্তিক শিশুদের নিয়ে নভেম্বর ২০২১ থেকে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলেছে। কেমোনিকস ইন্টারন্যাশনাল পেয়েছে ৫,৫২,০০,০০০ ডলার, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাসংক্রান্ত একটি কার্যক্রমের জন্য, যা আগস্ট ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৮ পর্যন্ত চলবে। এই কর্মসূচিগুলোর উন্নয়নমূলক গুরুত্ব যাই হোক না কেন, এগুলো এমন সব রাজনৈতিক-সংবেদনশীল এলাকায় পরিচালিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক সংকটের সময়ের সঙ্গে মিল থাকায় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেভাবে ডিপ স্টেট-এর খপ্পরে বাংলাদেশ ব্র্যাক-ইউএসএইড অংশীদারিত্বে পরিচালিত “বাংলাদেশ-আমেরিকান মৈত্রী কর্মসূচি (বিএএমএ)” প্রকল্পের মূল্য ১,৪৭,০০,০০০ ডলার। এর লক্ষ্য ছিল—অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিভিন্ন ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী বেসরকারি সংস্থা হিসেবে ব্র্যাক এমন একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়ে। সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা এই অর্থায়ন কাঠামোর একটি কম আলোচিত দিক হলো— মার্কিন নৌবাহিনীর (ডিওডি-ইউএসএন) অংশ নেভাল সাপ্লাই সিস্টেমস কমান্ড (এনএভিএসইউপি)-এর ভূমিকা। প্রায় এক দশক ধরে এনএভিএসইউপি বা ন্যাভসাপ বাংলাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য চুক্তিভিত্তিক অর্থ দিয়েছে। এসব কর্মসূচির শিরোনামের মধ্যে ছিল— “প্রমোটিং ইকুয়ালেটি ইন মাদ্রাসা স্টুডেন্টস”, “স্টুডেন্টস লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কশপস”, “বাংলাদেশ অ্যান্টি-ভায়োলেন্স প্রোগ্রাম”, “বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস কাউন্টার-র্যাডিকেলাইজেশন প্রোগ্রাম” এবং “সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিকস ফর বাংলাদেশ”। এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে অনুদান পেয়েছে— বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি), বাংলাদেশ ইউথ লিডারশিপ সেন্টার, আনন্দধারা কনসালটেন্ট, এক্সপ্রেশসন্স লিমিটেড. এবং মেসার্স বিটনিক। সব মিলিয়ে তারা প্রায় ২৭,৭৯,৯০৩ ডলার পেয়েছে। ময়দান ফর্মূলায় যেভাবে বাংলাদেশে ইউনূস, ইউএসএআইডি ও জঙ্গিরা অভ্যুত্থান ঘটালো প্রতিটি চুক্তির আর্থিক পরিমাণ আলাদাভাবে খুব বড় না হলেও, এগুলো একটি নির্দিষ্ট ধারা নির্দেশ করে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংস্থা বাংলাদেশে তরুণদের সংগঠিত করা, উগ্রবাদ প্রতিরোধমূলক বার্তা প্রচার, শিক্ষার্থী কর্মশালা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণের মতো কার্যক্রমে অর্থ দিচ্ছিল। আর এসবই পরিচালিত হচ্ছিল ন্যাভসাপ সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, বেসামরিক সহায়তা চ্যানেলের বাইরে। এর মধ্যে মেসার্স বিটনিক-এর “সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিকস ফর বাংলাদেশ” (৯৯,৪০০ ডলার, মে ২০২১ থেকে জুলাই ২০২২) চুক্তিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি কোনো খাদ্য সহায়তা নয়, অবকাঠামো নির্মাণও নয়—বরং এটি সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষণ, যা গোয়েন্দা কার্যক্রমের অনুরূপ প্রোগ্রাম। আর এটি করা হয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর চুক্তির আওতায়; এবং এমন একটি দেশে, যেখানে পরবর্তীতে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে অপসারণ করা হয়েছে। এনইডি-এর সাক্ষ্যে স্বীকারোক্তি ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি)-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও ড্যামন উইলসন যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ সাবকমিটি (ন্যাশনাল সিকিউরিটি, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি)–এর সামনে সাক্ষ্য দেন। আইএএনএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি উল্লেখ করেন—বাংলাদেশে “এনইডি-এর সহায়তা দেশটিকে ১০ বছরের বেশি সময়ের ‘স্বৈরশাসন’, সহিংসতা ও অস্থিরতা থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করছে,” যা তিনি শেখ হাসিনার সরকারের প্রসঙ্গেই বলেন। তিনি আরও বলেন, এনইডি-সমর্থিত কার্যক্রমগুলো সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে “নির্বাচনী সংস্কার এগিয়ে নিতে, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণ করতে এবং ভোটারদের সচেতনতা বাড়াতে” সহায়তা করেছে। শেষে তিনি শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশকে বর্ণনা করেন “শান্তি পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক শাসন এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ” হিসেবে। এটি নিরপেক্ষ কোনো উন্নয়ন সহায়তার ভাষা নয়। বরং এটি এমন একটি কর্মসূচির ভাষা, যা নির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের উদ্দেশ্যের সফলতা হিসেবে বিবেচনা করে। মাইক বেঞ্জের বক্তব্য মাইক বেঞ্জ কোনো সাধারণ ব্লগার নন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি (আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও তথ্যনীতি)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছেন, কীভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি প্রণেতারা “সিভিল সোসাইটি” কাঠামোকে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। টাকার কার্লসন শো-এ ব্যাপকভাবে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে মাইক বেঞ্জ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বক্তব্য দেন, যা পুরোপুরি পড়া প্রয়োজন আগ্রহীদের। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি (বেঞ্জ) বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন: “ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে বাংলাদেশে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা জরুরি, যাতে চীনকে মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এতে রাজি নন। তখন আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিকল্পনাকারীরা সিদ্ধান্ত নেয়—সরকার পরিবর্তন করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, একবার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে “দেশকে অস্থিতিশীল করার সব ধরনের উপায়” প্রয়োগ করা হয়—বিরোধী শক্তিকে সমর্থন দেওয়া থেকে শুরু করে তথাকথিত ‘কালার রেভল্যুশন’ সংগঠিত করা পর্যন্ত, যেখানে নেতাদের “ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, কখনও কখনও তারা হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যায়।” জুলাই আন্দোলনে বিদেশী অর্থায়ন: ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল পেয়েছিল ৫১ মিলিয়ন ডলার ৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে দেশ ছাড়েন। বেঞ্জের বক্তব্য কেবল কৌশলেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়, তারও বর্ণনা দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—উপরের অনুদানের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এটিকে উপেক্ষা করা কঠিন। বেঞ্জ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে বাংলাদেশের র্যাপ ব্যান্ডগুলোকে অর্থায়ন করা হয়েছিল, যেন তারা উস্কানিমূলক প্রতিবাদী গান তৈরি করে। লক্ষ্য ছিল “শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ”-এর নাম দিয়ে মানুষকে রাস্তায় নামানো, যা পরে দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে—এবং বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। এটি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। আবারও অনুদানের তালিকায় তাকালে দেখা যায়— অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকান ভয়েসেস পেয়েছে ৬৬,৬০০ ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো থেকে, “ইউথ এক্সেলেন্স অন স্টেজ (ইয়েস) অ্যাকাডেমি” পরিচালনার জন্য, যেখানে বাংলাদেশি তরুণদের আমেরিকান হিপ-হপ সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন-এর ইউথ-রাইজ কর্মসূচি পেয়েছে ইউএসএইড থেকে ৪,০,০০,০০০ ডলার, যা “পিপল টু পিপল রিকনসিলিয়েশন ফান্ড” হিসেবে বর্ণিত—যার লক্ষ্য ছিল এমন তরুণদের সংগঠিত করা, যারা সহনশীল, সব নেটওয়ার্কে সংযুক্ত, সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ এবং সক্রিয়। গ্লোবাল ইউথ লিডারশিপ সেন্টার পেয়েছে ১,৩৩,৪৯৩ ডলার, “কাউন্টারিং ডিজইনফরমেশন” বিষয়ে একটি টেকক্যাম্প আয়োজনের জন্য, যেখানে তরুণদের স্থানীয় সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখানো হয়েছে। র্যাপ সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ তরুণ, পারস্পরিক যোগাযোগভিত্তিক নেটওয়ার্ক, বার্তা প্রচারের প্রশিক্ষণ—আলাদাভাবে এগুলোকে সাংস্কৃতিক বা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বলা যেতে পারে। কিন্তু একসাথে দেখলে এগুলোর পেছনে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সংগঠিত ও সুসংবদ্ধ কাঠামোতে আনার উদ্দেশ্য ছিল। উল্লেখ্য, মাইক বেঞ্জই প্রথম ব্যক্তি নন, যিনি বলেছেন—২০২৪ সালে বাংলাদেশে এই কাঠামো সক্রিয় করা হয়েছিল। চীনের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক পরিকল্পনা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের নৌ-প্রভাব সীমিত করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছিল, যাতে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগের বড় ভূমিকা ছিল। এই অবস্থানটি একটি বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল—এখন আর তা নেই। ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা: এসপিপি২ কাঠামো যুক্তরাজ্যের ডিএফআইডি-এর “স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল পার্টিসিপেশন ২ (এসপিপি২)” (প্রোগ্রাম কোড ২০৩৪৮৭) কর্মসূচির মূল্য ছিল ১৬.২ মিলিয়ন পাউন্ড, যা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে পর্যালোচনা করা হয়। সরকারি নথিতে এটিকে ডিএফআইডি বাংলাদেশের “প্রধান রাজনৈতিক গভর্নেন্স কর্মসূচি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন অংশীদারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে: ইউএসএইড, যার অধীনে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনাল কাজ করেছে এফসিও, যার সঙ্গে ছিল ম্যানেজমেন্ট রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রো গভর্নেন্স রিসার্চ সেন্টার (ডিইউএমজিআরসি) দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন (টিএএফ) ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমস (আইএফইএস), যার সঙ্গে ছিল দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) এটি চারটি পক্ষ কিন্তু আলাদা দ্বিপাক্ষিক প্রকল্প ছিল না। বরং এটি ছিল একটি সমন্বিত ট্রান্সআটলান্টিক কাঠামো, যা একসাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম, যুব সংগঠন এবং বিচারব্যবস্থার ওপর কাজ করেছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল— রাজনৈতিক দলগুলোকে নীতিনির্ভর করা, দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং এফসিও-এর যৎসামান্য অর্থায়নের মাধ্যমে “গণমাধ্যম ও তরুণদের ব্যবহার করে শান্তি, সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” উৎসাহিত করা। ২০২০ সালের মার্চের একটি অভ্যন্তরীণ বার্ষিক পর্যালোচনায় এক আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়: “আমি তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, এবং তারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে… আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে যে দেয়াল ছিল, তা ভেঙে গেছে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।” সেই ভাঙা দেয়াল পরে কাজে এসেছিল। অর্থায়নের ধারাপ্রবাহ ForeignAssistance.gov–এর বাংলাদেশ সম্পর্কিত তথ্যচিত্র একটি স্পষ্ট গ্রাফ দেখা যায়। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, ২০১৮ সালের দিকে তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, এবং ২০২৪ অর্থবছরে ৫৭,২৫,৩০,৮১৯ ডলারে পৌঁছে সর্বোচ্চ হয়। এরপর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তা কমতে শুরু করে—যদিও এই দুই বছরকে “আংশিক প্রতিবেদন” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্রাফের এই ঊর্ধ্বমুখী উল্লম্ফন সময়টি লক্ষ্যণীয়—যে বছর শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান, ঠিক সেই বছরই সর্বোচ্চ অর্থায়ন হয়। এরপরই তা কমতে থাকে। এটি সাধারণ অর্থে কাকতালীয় সম্পর্ক নয়। বরং এটি একটি কর্মসূচির জীবনচক্রের মতো—রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সময় অর্থায়ন বাড়ে, পরিবর্তনের মুহূর্তে তা সর্বোচ্চ হয়, এবং লক্ষ্য পূরণ হলে তা কমে যায়। সমগ্র অর্থায়নই কি ষড়যন্ত্রের পেছনে? এটা বলা যায় না যে, বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সব সহায়তাই খারাপ বা ক্ষতিকর ছিল। রোহিঙ্গা সংকট বাস্তব, এবং এর জন্য মানবিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চিকিৎসা গবেষণা, কৃষি উন্নয়ন এবং শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি—এসবই বাস্তব ও ইতিবাচক উদ্যোগ। যেমন, কর্নেল ইউনিভিার্সিটি–এর কম আয়ের বাংলাদেশিদের আয় অনিশ্চয়তা নিয়ে স্বাস্থ্য গবেষণা একটি বৈধ বৈজ্ঞানিক কাজ। কিন্তু উপরে যে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তা কেবল মানবিক উদ্দেশ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ঢাকায় মার্কিন নৌবাহিনীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণ প্রকল্প কোনো মানবিক সহায়তা ছিল না। বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট–ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ২১ মিলিয়ন ডলার দেওয়া—এটিও নিরপেক্ষ উন্নয়ন সহায়তা নয়। এমনকি “সোশ্যাল মুভমেন্টস অ্যান্ড কালেক্টিভ অ্যাকশন এক্সপার্টিজ” শিরোনামে ৯,২৩,৪০০ ডলারের একটি চুক্তি—যা আগস্ট ২০২৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত চলেছে—এটিও কোনো খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ছিল না। যে প্রশ্নটি রয়ে যায় শেখ হাসিনা টানা ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন। তাঁর সময়ে সড়ক-অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, এবং এশিয়ার উল্লেখযোগ্য উন্নয়নধারার একটি পর্ব পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে, তাঁর শাসনের শেষদিকে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বেড়েছে এবং বিরোধীদের দমন করা হয়েছে—এই দুটো বিষয়ই একসাথে সত্য। কিন্তু বাংলাদেশে কী ধরনের সরকার থাকবে—এই সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক ও নৈতিকভাবে বাংলাদেশের জনগণেরই নেওয়ার কথা। উপরে যে নথিপত্রের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে, তার আলোকে বলার উপায় নেই যে, দেশের মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরং এতে স্পষ্ট যে, এখানে একটি বিদেশি শক্তি ও তার মিত্ররা এক দশকের বেশি সময় ধরে শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের পেছনে ছুটেছে, এবং পরে সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করেছে। এটি গণতন্ত্র উন্নয়নের প্রচেষ্টা নয়। এটি সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং নথিপত্র। নথিগুলো প্রকাশ্য। অর্থের উৎসও অনুসরণ করা যায়। এখন প্রশ্ন হলো— ঢাকায় কিংবা বিশ্বের কোথাও—এই অর্থ ব্যয়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাউকে কি জবাবদিহির আওতায় আনা হবে? লেখক: আবু উবায়দা অরিন আবু উবায়দা আরিন বাংলাদেশি লেখক-বিশ্লেষক, রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সামাজিক প্রভাব নিয়ে কাজ করেন



