ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা: অর্থনীতি, জঙ্গিবাদ ও পররাষ্ট্রনীতিতে ইউনূস ও বিএনপি সরকার দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে
মাত্র এক সপ্তাহে নদী থেকে উদ্ধার ১৭ মরদেহ
শুভেন্দুর বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন ‘পুশ-ইন’ ঠেকাতে সতর্ক বিজিবি
ঈদ উপলক্ষে মেট্রোরেলের বিশেষ সময়সূচি ঘোষণা
পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির সভা শেষ, কী সিদ্ধান্ত হলো
রামিসার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান মাশরাফি সাকিব মুশফিকরা
দেশের প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মাঠে ছিল, এখন ব্যারাকে ফিরছে: সেনাপ্রধান
এইচএসসি পাস ‘প্রফেসর’ থেকে জামায়াত আমিরের উপদেষ্টা মাহমুদুলের দুই যুগের প্রতারণার ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতিটি বাঁকে নিজের রঙ বদলে ক্ষমতার কেন্দ্রে ঢুকে পড়ার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখেন মাহমুদুল হাসান। তিনি একজন পেশাদার প্রতারক — যার প্রতারণার জাল বিস্তৃত দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও।
ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি মুখোশের আড়ালে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছেন — কখনো ধরা পড়েছেন, কখনো পার পেয়েছেন ক্ষমতার ছায়া ব্যবহার করে।
তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বলতে ঢাকার ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস। অথচ নামের আগে তিনি ব্যবহার করেন ‘প্রফেসর’ এবং ‘ড.’ উপাধি। নর্থ আমেরিকান কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনের দাবিতে এই ‘ড.’ তকমা লাগিয়েছেন নামের সঙ্গে।
এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন দেশের নামকরা
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে (এআইইউবি)। ছাত্রজীবনেই প্রতারণার শুরু মাহমুদুল হাসানের প্রতারণার যাত্রা শুরু হয়েছিল তার ছাত্রজীবনেই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ আওয়াল সম্পর্কে তার মায়ের মামা হন। এই পারিবারিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি ১৯৯৯ সালের ফল সেমিস্টারে নর্থ সাউথে বিবিএতে ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ না দিয়ে সেখানে শুরু করেন ভর্তি বাণিজ্য। পরবর্তীতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলেকে নর্থ সাউথে ভর্তিতে সহায়তার সুবাদে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। সেই পরিবারের সহায়তায় পাড়ি জমান লন্ডনে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তথ্য অধিকার আইনে দেওয়া একটি চিঠিতে পরে জানিয়েছে, মাহমুদুল হাসান ১৯৯৯ সালের ফল
সেমিস্টার থেকে ২০০৩ সালের সামার সেমিস্টার পর্যন্ত সেখানে শিক্ষার্থী ছিলেন বটে, কিন্তু কোর্স শেষ করেননি। লন্ডনে আন্তর্জাতিক জালিয়াতি যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পরই মাহমুদুলের প্রতারণা আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ তৈরি ও বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। এতে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়। একই সঙ্গে ‘ই-ফাইভ-কাউন্সিল’ নামে একটি নামসর্বস্ব সংগঠন খুলে নিজেকে সেটির চেয়ারম্যান দাবি করে দেশের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে বিদেশি প্রতিনিধিদল আনার লোভ দেখিয়ে সাক্ষাতের সুযোগ নিতেন। এ ছাড়া লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করতেন। ২০০৯ সালের দিকে এই জালিয়াতি হাতেনাতে ধরা পড়লে
তার ওপর যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞা বা ‘ব্যান’ জারি করা হয় বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে। ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাজ্য থেকে বিতাড়িত মাহমুদুল কিছুদিন আত্মগোপনে থাকেন। এরপর দ্রুত রাজনৈতিক রঙ বদলে কট্টর আওয়ামী লীগার সেজে ওঠেন এবং নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’ পরিচয় দিয়ে দেশে নতুন প্রতারণার জাল পাতেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টাদের কোনো তালিকায় তার নাম কখনো ছিল না। প্রতারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি ‘প্রিমিয়াম পাস লিমিটেড’ ও ‘পিএপি ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুটি ভুঁইফোঁড় এনজিও খোলেন। এই সংগঠনদুটির প্যাড ব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিদেশি প্রতিনিধিদের মেইল
পাঠিয়ে সাক্ষাতের সময় বের করতেন। ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে সাজানো আভিজাত্য প্রদর্শনও ছিল তার কৌশলের অংশ। ২০১৮ সালের ২৬শে মার্চ তিনি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের লোকেশন যুক্ত করে লেখেন, ‘উইথ হার এক্সেলেন্সি শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার, গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ।’ ওই বছরের ১৫ই মার্চ গণভবনের লোকেশন ব্যবহার করে লেখেন, ‘উইথ অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার।’ ২০২১ সালের ১৪ই মার্চ পোস্ট দেন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে। এসব সাজানো পোস্ট টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থবাণিজ্যের ফাঁদ পাততেন। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে গৃহকর্মীকে ধর্ষণ, জেল, তারপর সাক্ষীদের হুমকি মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে
আদালতে দায়ের হওয়া একটি ধর্ষণ মামলার অভিযোগ রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সেখানকার ১৪ বছর বয়সী গৃহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান তিনি। মেডিকেল রিপোর্টে সেই কিশোরীর সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কের প্রমাণ মেলে। মিরপুর থানা পুলিশের তদন্তে মাহমুদুলের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে ২০২০ সালের ২৭শে আগস্ট ৩১৬ নম্বর অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার হয়ে বেশ কয়েক মাস জেলও খাটেন তিনি। পড়ুন: কিশোরী গৃহকর্মীকে নিয়মিত ধর্ষণ, জামায়াত নেতা ড. মাহমুদুল হাসান কারাগারে জামিনে বের হয়ে সাক্ষীদের হুমকি দিতে শুরু করেন মাহমুদুল। নিজেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে সাক্ষীদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া ও পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এর
ফলে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে না যাওয়ায় বিচারক তাকে খালাস দেন। যদিও মামলায় পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় দেওয়া অন্তত চারটি জবানবন্দি রয়ে গেছে। সাক্ষীদের একজন, মাহমুদুলের সাবেক স্ত্রীর মামা মো. নুর মোহাম্মদ জানান, মাহমুদুল তাকে এবং তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। তিনি বলেন, তার ভাগনি ছিলেন মেধাবী ছাত্রী, জীবনে কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। দুই সন্তান মাথায় নিয়ে তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। সাক্ষ্য দিতে না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেই সময় মাহমুদুল শেখ হাসিনার লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, প্রাণের ভয়ে আদালতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সাবেক স্ত্রীর বয়ানে নির্যাতনের রোমহর্ষক চিত্র মাহমুদুলের সাবেক এক স্ত্রী — যার সঙ্গে এক যুগ আগে বিচ্ছেদ হয়েছে — প্রথমে ভয়ে কথা বলতে রাজি ছিলেন না। নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে মাহমুদুলের ভুয়া মামলায় জর্জরিত তিনি ও তার পরিবার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাহমুদুল তিন দিনের সরকারি সফরের কথা বলে হঠাৎ বিয়ে করেন। পরে জানা যায় তিনি লন্ডনে ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত এবং ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন। এর প্রতিবাদ করলে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। একদিন নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীকে জানাতেই সন্তান নিতে অস্বীকার করে গর্ভপাতের চাপ দেওয়া হয়। তখনই তার প্রকৃত চরিত্র বুঝতে পারেন ওই নারী। তিনি জানান, মাহমুদুল তার পরিবারের বিরুদ্ধে জঙ্গি মামলার অভিযোগ দিয়েছেন। বৃদ্ধ মা-বাবাও বাদ পড়েননি। র্যাব ও পুলিশ বলত, এসব অভিযোগ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসছে। থানায় গিয়ে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে মাহমুদুল আসলে একজন প্রতারক। সন্তান জন্মের পর তিনি তালাক দেন এবং এককভাবে সন্তান লালন-পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন চাকরি ছেড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন ক্লাস নিয়ে সংসার চালিয়েছেন। তিনি আরও জানান, ৫ই আগস্টের পর মাহমুদুল পুলিশের বিশেষ শাখার মাধ্যমে তার ঠিকানা ও ছেলের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করেন। পরে ছেলের ইমিগ্রেশন আটকে দেওয়া হয়, যার ফলে তিনি সন্তানকে রেখে কোনো প্রয়োজনে বিদেশেও যেতে পারছেন না। এআইইউবিতে প্রতারণার পাঠ ভুয়া সনদে এআইইউবিতে গেস্ট টিচার হিসেবে চাকরি করেছেন মাহমুদুল হাসান। সেখানে মাহমুদুল হাসানের ছাত্র ছিলেন— এমন কয়েকজনের একজন সাবেক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘২০১২-২০১৩ সালের দিকে আমি তখন মেজর পদবির একজন অফিসার হিসেবে ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলাম। একই সময়ে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে আমি এআইইউবিতে এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হই। সেখানে এইচআর কোর্সের প্রথম ক্লাসে একজন ফ্যাকাল্টি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। প্রথম দিন তিনি কোনো একাডেমিক ক্লাস না নিয়ে মূলত উচ্চারণ নিয়ে আলোচনা করেন এবং ইউকেতে থাকার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ড নেন। তিনি ক্লাসে না পড়িয়ে নিজেকে শো-অফ করতেন। যেমন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনি সারা দিন কাজ করেন। তিনি এত ব্যস্ত যে সেনাপ্রধান, পুলিশ প্রধানসহ বিভিন্ন হাই অফিসিয়াল তার কাছে সহায়তা চান, কিন্তু তিনি যেতে পারেন না।’ সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কয়েকদিন পর মাহমুদুল হাসান আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তার অফিসে ডাকেন। সেখানে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আমার কাছে ডিজিএফআই মহাপরিচালকের সঙ্গে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন—একজনের কাছে তিনি ৫ লাখ টাকা পাবেন, ওই ব্যক্তি টাকাটা দিচ্ছেন না। পরে আমি তাকে বলি—এ বিষয়ের জন্য আপনি ডিজিএফআইয়ের ডিজির কাছে যাবেন! আপনি তো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বললেই পারেন। পুলিশ প্রধানের সঙ্গেও তো শুনেছি আপনার ভালো সম্পর্ক, তাকে বললেও পারেন। তখন তিনি বলেন, এত ছোট বিষয়ে তাদের বলা যায় না। আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। একজন ফ্যাকাল্টি সদস্য হয়ে এমন অনুরোধ এবং তার আচরণ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। ফলে আমি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাই।’ খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে জানতে পারি সেখানে আমার অন্য ক্লাসমেট ছিল এসএসএফে—তাকে অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শিডিউল নিয়ে দেওয়ার জন। আরও অন্য যারা সহপাঠী ছিল সবাইকে উনি বিভিন্ন জায়গায় লিংক-লবিং করিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাতে থাকেন। পরে আমার নিজেরা কথা বলে সিদ্ধান্ত নিই উনাকে আমরা কোথাও লিংক করিয়ে দেব না। এরপর উনি ক্লাসে আমাদের থ্রেট দিতে থাকেন যে— কোর্সে নম্বর কম দেবেন! পরে আমরা এআইইউবি কর্তৃপক্ষকে তার বিষয়ে বলি, কিন্তু তারা জানায়—উনার রেফারেন্স (উচ্চপর্যায় থেকে সুপারিশ) আছে। রেফারেন্সের জন্যই নেওয়া (চাকরিতে) হয়েছে।’ ২০টি সংস্কার কমিশনের কাল্পনিক সদস্যপদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাহমুদুল তার এক সাবেক স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় নিজেকে ভিআইপি প্রমাণ করতে গিয়ে দাবি করেন যে তিনি আন্তর্জাতিক ঋণ নীতিমালা, পররাষ্ট্র প্রশাসন, রাজস্ব আহরণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, নির্বাচন পদ্ধতি, জনপ্রশাসন, সংবিধান, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, সাইবার প্রযুক্তি, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, জনশক্তি ব্যবস্থাপনা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, এনজিও অনুদান নীতিমালা এবং ব্যাংকিং খাতসহ মোট ২০টি সংস্কার কমিশনে কাজ করেছেন। বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। সেগুলোর কোনোটির সদস্য তালিকায় মাহমুদুল হাসানের নাম পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে মাহমুদুল হাসানকে তিনি চেনেনই না। জামায়াত আমিরের উপদেষ্টার পদ যেভাবে বাগালেন ৫ই আগস্টের পরিবর্তনের পর মাহমুদুল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, পুরোনো ছবি ব্যবহার করে নৈকট্য দাবি করেন। একজন পূর্বপরিচিত সাংবাদিক বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জানিয়ে দেওয়ার পর সেখানে তার প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। তখন জামায়াতে ইসলামীকে নতুন সিঁড়ি হিসেবে বেছে নেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের সুসম্পর্কের সুযোগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পদ বাগিয়ে নেন। কিন্তু আমিরের অনুমতি না নিয়েই নিজেকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োগের সুপারিশ করে দলীয় প্যাডে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। ঘটনা জানাজানি হলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে জামায়াত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, বিভিন্ন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজনে তাকে নেওয়া হয়েছিল। পরে একটি বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং তার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। যোগাযোগের চেষ্টায় নীরবতা অভিযোগগুলোর বিষয়ে মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন, ওয়েবসাইটে উল্লিখিত তিনটি টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগ — কোনোটিতেই সাড়া মেলেনি। একবার ফোন ধরে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ৪৪ সেকেন্ড নীরব থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট ১২টি প্রশ্ন পাঠানো হলে বার্তা ডেলিভার হয়েছে, কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নিজের পরিবারকে ব্যবহার করে প্রতারণার জাল বুনে চলা এই ব্যক্তি এখনো ফেসবুক ও এক্স অ্যাকাউন্টে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্যসূত্র: কালবেলা
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে (এআইইউবি)। ছাত্রজীবনেই প্রতারণার শুরু মাহমুদুল হাসানের প্রতারণার যাত্রা শুরু হয়েছিল তার ছাত্রজীবনেই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ আওয়াল সম্পর্কে তার মায়ের মামা হন। এই পারিবারিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি ১৯৯৯ সালের ফল সেমিস্টারে নর্থ সাউথে বিবিএতে ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ না দিয়ে সেখানে শুরু করেন ভর্তি বাণিজ্য। পরবর্তীতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলেকে নর্থ সাউথে ভর্তিতে সহায়তার সুবাদে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। সেই পরিবারের সহায়তায় পাড়ি জমান লন্ডনে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তথ্য অধিকার আইনে দেওয়া একটি চিঠিতে পরে জানিয়েছে, মাহমুদুল হাসান ১৯৯৯ সালের ফল
সেমিস্টার থেকে ২০০৩ সালের সামার সেমিস্টার পর্যন্ত সেখানে শিক্ষার্থী ছিলেন বটে, কিন্তু কোর্স শেষ করেননি। লন্ডনে আন্তর্জাতিক জালিয়াতি যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পরই মাহমুদুলের প্রতারণা আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া সনদ তৈরি ও বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। এতে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়। একই সঙ্গে ‘ই-ফাইভ-কাউন্সিল’ নামে একটি নামসর্বস্ব সংগঠন খুলে নিজেকে সেটির চেয়ারম্যান দাবি করে দেশের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে বিদেশি প্রতিনিধিদল আনার লোভ দেখিয়ে সাক্ষাতের সুযোগ নিতেন। এ ছাড়া লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করতেন। ২০০৯ সালের দিকে এই জালিয়াতি হাতেনাতে ধরা পড়লে
তার ওপর যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞা বা ‘ব্যান’ জারি করা হয় বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে। ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাজ্য থেকে বিতাড়িত মাহমুদুল কিছুদিন আত্মগোপনে থাকেন। এরপর দ্রুত রাজনৈতিক রঙ বদলে কট্টর আওয়ামী লীগার সেজে ওঠেন এবং নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘উপদেষ্টা’ পরিচয় দিয়ে দেশে নতুন প্রতারণার জাল পাতেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টাদের কোনো তালিকায় তার নাম কখনো ছিল না। প্রতারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি ‘প্রিমিয়াম পাস লিমিটেড’ ও ‘পিএপি ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুটি ভুঁইফোঁড় এনজিও খোলেন। এই সংগঠনদুটির প্যাড ব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিদেশি প্রতিনিধিদের মেইল
পাঠিয়ে সাক্ষাতের সময় বের করতেন। ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে সাজানো আভিজাত্য প্রদর্শনও ছিল তার কৌশলের অংশ। ২০১৮ সালের ২৬শে মার্চ তিনি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের লোকেশন যুক্ত করে লেখেন, ‘উইথ হার এক্সেলেন্সি শেখ হাসিনা, প্রাইম মিনিস্টার, গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ।’ ওই বছরের ১৫ই মার্চ গণভবনের লোকেশন ব্যবহার করে লেখেন, ‘উইথ অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার।’ ২০২১ সালের ১৪ই মার্চ পোস্ট দেন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে। এসব সাজানো পোস্ট টোপ হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থবাণিজ্যের ফাঁদ পাততেন। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে গৃহকর্মীকে ধর্ষণ, জেল, তারপর সাক্ষীদের হুমকি মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে
আদালতে দায়ের হওয়া একটি ধর্ষণ মামলার অভিযোগ রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সেখানকার ১৪ বছর বয়সী গৃহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান তিনি। মেডিকেল রিপোর্টে সেই কিশোরীর সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কের প্রমাণ মেলে। মিরপুর থানা পুলিশের তদন্তে মাহমুদুলের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে ২০২০ সালের ২৭শে আগস্ট ৩১৬ নম্বর অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার হয়ে বেশ কয়েক মাস জেলও খাটেন তিনি। পড়ুন: কিশোরী গৃহকর্মীকে নিয়মিত ধর্ষণ, জামায়াত নেতা ড. মাহমুদুল হাসান কারাগারে জামিনে বের হয়ে সাক্ষীদের হুমকি দিতে শুরু করেন মাহমুদুল। নিজেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে সাক্ষীদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া ও পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এর
ফলে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে না যাওয়ায় বিচারক তাকে খালাস দেন। যদিও মামলায় পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় দেওয়া অন্তত চারটি জবানবন্দি রয়ে গেছে। সাক্ষীদের একজন, মাহমুদুলের সাবেক স্ত্রীর মামা মো. নুর মোহাম্মদ জানান, মাহমুদুল তাকে এবং তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। তিনি বলেন, তার ভাগনি ছিলেন মেধাবী ছাত্রী, জীবনে কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। দুই সন্তান মাথায় নিয়ে তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। সাক্ষ্য দিতে না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেই সময় মাহমুদুল শেখ হাসিনার লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, প্রাণের ভয়ে আদালতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সাবেক স্ত্রীর বয়ানে নির্যাতনের রোমহর্ষক চিত্র মাহমুদুলের সাবেক এক স্ত্রী — যার সঙ্গে এক যুগ আগে বিচ্ছেদ হয়েছে — প্রথমে ভয়ে কথা বলতে রাজি ছিলেন না। নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে মাহমুদুলের ভুয়া মামলায় জর্জরিত তিনি ও তার পরিবার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাহমুদুল তিন দিনের সরকারি সফরের কথা বলে হঠাৎ বিয়ে করেন। পরে জানা যায় তিনি লন্ডনে ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত এবং ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন। এর প্রতিবাদ করলে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। একদিন নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে জানতে পারেন তিনি অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীকে জানাতেই সন্তান নিতে অস্বীকার করে গর্ভপাতের চাপ দেওয়া হয়। তখনই তার প্রকৃত চরিত্র বুঝতে পারেন ওই নারী। তিনি জানান, মাহমুদুল তার পরিবারের বিরুদ্ধে জঙ্গি মামলার অভিযোগ দিয়েছেন। বৃদ্ধ মা-বাবাও বাদ পড়েননি। র্যাব ও পুলিশ বলত, এসব অভিযোগ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসছে। থানায় গিয়ে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে মাহমুদুল আসলে একজন প্রতারক। সন্তান জন্মের পর তিনি তালাক দেন এবং এককভাবে সন্তান লালন-পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন চাকরি ছেড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন ক্লাস নিয়ে সংসার চালিয়েছেন। তিনি আরও জানান, ৫ই আগস্টের পর মাহমুদুল পুলিশের বিশেষ শাখার মাধ্যমে তার ঠিকানা ও ছেলের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করেন। পরে ছেলের ইমিগ্রেশন আটকে দেওয়া হয়, যার ফলে তিনি সন্তানকে রেখে কোনো প্রয়োজনে বিদেশেও যেতে পারছেন না। এআইইউবিতে প্রতারণার পাঠ ভুয়া সনদে এআইইউবিতে গেস্ট টিচার হিসেবে চাকরি করেছেন মাহমুদুল হাসান। সেখানে মাহমুদুল হাসানের ছাত্র ছিলেন— এমন কয়েকজনের একজন সাবেক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল খাইরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘২০১২-২০১৩ সালের দিকে আমি তখন মেজর পদবির একজন অফিসার হিসেবে ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলাম। একই সময়ে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে আমি এআইইউবিতে এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হই। সেখানে এইচআর কোর্সের প্রথম ক্লাসে একজন ফ্যাকাল্টি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে। প্রথম দিন তিনি কোনো একাডেমিক ক্লাস না নিয়ে মূলত উচ্চারণ নিয়ে আলোচনা করেন এবং ইউকেতে থাকার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ড নেন। তিনি ক্লাসে না পড়িয়ে নিজেকে শো-অফ করতেন। যেমন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনি সারা দিন কাজ করেন। তিনি এত ব্যস্ত যে সেনাপ্রধান, পুলিশ প্রধানসহ বিভিন্ন হাই অফিসিয়াল তার কাছে সহায়তা চান, কিন্তু তিনি যেতে পারেন না।’ সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কয়েকদিন পর মাহমুদুল হাসান আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তার অফিসে ডাকেন। সেখানে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি আমার কাছে ডিজিএফআই মহাপরিচালকের সঙ্গে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন—একজনের কাছে তিনি ৫ লাখ টাকা পাবেন, ওই ব্যক্তি টাকাটা দিচ্ছেন না। পরে আমি তাকে বলি—এ বিষয়ের জন্য আপনি ডিজিএফআইয়ের ডিজির কাছে যাবেন! আপনি তো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বললেই পারেন। পুলিশ প্রধানের সঙ্গেও তো শুনেছি আপনার ভালো সম্পর্ক, তাকে বললেও পারেন। তখন তিনি বলেন, এত ছোট বিষয়ে তাদের বলা যায় না। আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। একজন ফ্যাকাল্টি সদস্য হয়ে এমন অনুরোধ এবং তার আচরণ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। ফলে আমি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাই।’ খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে জানতে পারি সেখানে আমার অন্য ক্লাসমেট ছিল এসএসএফে—তাকে অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শিডিউল নিয়ে দেওয়ার জন। আরও অন্য যারা সহপাঠী ছিল সবাইকে উনি বিভিন্ন জায়গায় লিংক-লবিং করিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাতে থাকেন। পরে আমার নিজেরা কথা বলে সিদ্ধান্ত নিই উনাকে আমরা কোথাও লিংক করিয়ে দেব না। এরপর উনি ক্লাসে আমাদের থ্রেট দিতে থাকেন যে— কোর্সে নম্বর কম দেবেন! পরে আমরা এআইইউবি কর্তৃপক্ষকে তার বিষয়ে বলি, কিন্তু তারা জানায়—উনার রেফারেন্স (উচ্চপর্যায় থেকে সুপারিশ) আছে। রেফারেন্সের জন্যই নেওয়া (চাকরিতে) হয়েছে।’ ২০টি সংস্কার কমিশনের কাল্পনিক সদস্যপদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাহমুদুল তার এক সাবেক স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় নিজেকে ভিআইপি প্রমাণ করতে গিয়ে দাবি করেন যে তিনি আন্তর্জাতিক ঋণ নীতিমালা, পররাষ্ট্র প্রশাসন, রাজস্ব আহরণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, নির্বাচন পদ্ধতি, জনপ্রশাসন, সংবিধান, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, সাইবার প্রযুক্তি, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, জনশক্তি ব্যবস্থাপনা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, এনজিও অনুদান নীতিমালা এবং ব্যাংকিং খাতসহ মোট ২০টি সংস্কার কমিশনে কাজ করেছেন। বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। সেগুলোর কোনোটির সদস্য তালিকায় মাহমুদুল হাসানের নাম পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে মাহমুদুল হাসানকে তিনি চেনেনই না। জামায়াত আমিরের উপদেষ্টার পদ যেভাবে বাগালেন ৫ই আগস্টের পরিবর্তনের পর মাহমুদুল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, পুরোনো ছবি ব্যবহার করে নৈকট্য দাবি করেন। একজন পূর্বপরিচিত সাংবাদিক বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জানিয়ে দেওয়ার পর সেখানে তার প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। তখন জামায়াতে ইসলামীকে নতুন সিঁড়ি হিসেবে বেছে নেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে জামায়াতের সুসম্পর্কের সুযোগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পদ বাগিয়ে নেন। কিন্তু আমিরের অনুমতি না নিয়েই নিজেকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োগের সুপারিশ করে দলীয় প্যাডে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। ঘটনা জানাজানি হলে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে জামায়াত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, বিভিন্ন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজনে তাকে নেওয়া হয়েছিল। পরে একটি বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং তার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। যোগাযোগের চেষ্টায় নীরবতা অভিযোগগুলোর বিষয়ে মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন, ওয়েবসাইটে উল্লিখিত তিনটি টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগ — কোনোটিতেই সাড়া মেলেনি। একবার ফোন ধরে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ৪৪ সেকেন্ড নীরব থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট ১২টি প্রশ্ন পাঠানো হলে বার্তা ডেলিভার হয়েছে, কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নিজের পরিবারকে ব্যবহার করে প্রতারণার জাল বুনে চলা এই ব্যক্তি এখনো ফেসবুক ও এক্স অ্যাকাউন্টে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে তোলা ছবি পোস্ট করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্যসূত্র: কালবেলা



