ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
৩ দিনে কোলকাতা দখলের হুমকি দেয়া সাবেক সেনাসদস্যরা এখন প্রতারণা ও ডাকাতি চক্রের হোতা
বিদ্যুৎ খাতে ভয়াবহ বিপর্যয়! ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট সক্ষমতা, তবু বাংলাদেশ কেন অন্ধকারে?
বিদ্বেষ সত্ত্বেও বেড়ে চলেছে ভারতীয় পণ্য আমদানি: বাংলাদেশ কেন ভারতে বাজার পাচ্ছে না?
সাভারে এসআই-কে পিটিয়ে হত্যা: জুলাই ২০২৪ থেকে চলমান পুলিশ হত্যা থামছেই না
সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞা উঠলেও কাটেনি ভয়: বৈরী আবহাওয়া ও দস্যু আতঙ্কে জেলে-পর্যটকরা
জামিনেও মেলেনি মুক্তি, কারাবন্দি অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু: পরিকল্পিত হত্যা- অভিযোগ পরিবারের
৩৮ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ: বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে এনবিআর কমিশনার মিতু স্বপদে বহাল!
আমেনা, কুবরা, আরতী, কল্পনা চাকমারা—অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নের পথ ছেড়ে আবারও নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায়?
যে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর স্বাধীনতা ও নারীর অংশগ্রহণের পথে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছিল, আজ হঠাৎ করেই যেন সেই অগ্রযাত্রা থমকে গিয়ে আমাদের আবার নতুন করে নারীদের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হচ্ছে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা আজ প্রশ্নের মুখে।
আগস্ট ২০২৪-এর আগের চিত্র
আগস্ট ২০২৪-এর আগে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর অগ্রগতির দৃষ্টান্তই ছিল না, আন্তর্জাতিক সূচকেও ছিল এগিয়ে। Global Gender Gap Report 2023-এ দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল প্রথম। অর্থাৎ শিক্ষা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তখন অঞ্চলের নেতৃত্বে ছিল।
কিন্তু আগস্ট ২০২৪-এর পর সেই ছবিটা বদলাতে শুরু করে।
পরিবর্তনের শুরু: আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২৪
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে,
আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে নথিভুক্ত সহিংসতা বেড়ে যায় ২৭ শতাংশ। ধর্ষণের ঘটনা ৮ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩টিতে, আর গণধর্ষণ ৭ থেকে বেড়ে হয় ১১টি। এটা শুধু কয়েকটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়। কারণ একই সময়ে জনপরিসরেও নারীর ওপর প্রকাশ্য হেনস্তা ও তথাকথিত ‘মোরাল পুলিশিং’-এর ঘটনা সামনে আসতে থাকে। ২০২৫ সালের হিসাব: প্রবণতা আরও স্পষ্ট পুলিশের তথ্য বলছে, এক বছরে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশ—৫ হাজার ৫৬৬ থেকে ৭ হাজার ৬৮-তে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট মামলাও বেড়েছে ২৫ শতাংশ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবর্তন দেখা যায় শিশুদের ক্ষেত্রে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা আগের
বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৭৬ শতাংশ—২৫০ থেকে ৪৪১-এ। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু নারীর নিরাপত্তার সংকট নয়; এই পুরো সময় জুড়ে শিশুরাও ক্রমেই বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। কন্যাশিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। প্রথম সাত মাসে ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ—১৭৫ থেকে ৩০৬-এ। আর মাত্র সাত মাসেই ২০২৫ সালের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ২০২৪ সালের পুরো বছরের কন্যাশিশু ধর্ষণের সংখ্যা। কেন এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়। কারণ কোনো একটি অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। কিন্তু ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন এবং প্রকাশ্য নারী হেনস্তা—বিভিন্ন সূচকে যদি একই সময়ে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়, তাহলে সেটাকে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। ২০২৬
সালেও থামেনি প্রবণতা আর এই প্রবণতা ২০২৬ সালেও থামেনি। HRSS-এর হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি উদ্বেগ—নারী কী পরবে, কোথায় যাবে, খেলাধুলা করবে কি না, কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেবে কি না—এসব নিয়েও জনপরিসরে সংগঠিত আপত্তি ও চাপের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংকটটি শুধু ‘নারী কতটা নিরাপদ?’—এই প্রশ্নে আটকে নেই। মূল প্রশ্ন: স্বাধীনতা কি সংকুচিত হচ্ছে? প্রশ্ন হচ্ছে—নারী কি আগের মতো স্বাধীনভাবে জনপরিসরে থাকতে পারছে? তাই আগস্ট ২০২৪-কে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের তারিখ হিসেবে নয়, বরং একটি before-and-after marker হিসেবে দেখলে প্রশ্নটা আরও স্পষ্ট হয়। আগস্ট
২০২৪-এর আগে যে বাংলাদেশ নারী-অগ্রগতির সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছিল, আগস্ট ২০২৪-এর পর সেই বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং জনপরিসরে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কেন এতগুলো নতুন প্রশ্ন তৈরি হলো? পরিসংখ্যানের উত্তর হয়তো পুরোটা দেয় না। কিন্তু পরিসংখ্যান যে একটি পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছে, সেটা অস্বীকার করাও কঠিন। একটি জাতির অগ্রগতি মাপার অন্যতম মাপকাঠি হলো তার নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদে, কতটা স্বাধীনভাবে জনপরিসরে বিচরণ করতে পারে। সেই মাপকাঠিতে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান যে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, তার উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি। নিরাপত্তার সংকটের পাশাপাশি আরেকটি সংকট: উপার্জন সক্ষমতা হারাচ্ছেন নারীরা নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ—নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। কারণ চাকরি
ও উপার্জনের সুযোগই নারীকে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে সমাজ গঠনে অংশ নেওয়ার সবচেয়ে বড় ভিত্তি তৈরি করে দেয়। সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, ঠিক এই জায়গাতেই নারীরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছেন—শ্রমবাজারের প্রায় সব স্তরে। গার্মেন্টস ও কলকারখানায় নারীর অবস্থান সংকুচিত হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। কিন্তু এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত কমছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন—এই তিন বছরে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত মোট ৪০২টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই পোশাক খাতের। শুধু বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৮০টি
কারখানাতেই ছাঁটাই হয়েছেন ১৯ হাজার ১৮৮ জন শ্রমিক, যার মধ্যে ২৭টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, শুধু প্রথম পাঁচ মাসেই আটটি শিল্পাঞ্চলের ৭৯টি কারখানায় ৭ হাজার ৭৮৪ জন শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। পোশাক খাতের এই কর্মী ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের পেছনে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংকের কঠোর নীতি ও আর্থিক সংকটের কথা বলা হলেও, বাস্তবতা হলো—এই খাতে ঐতিহাসিকভাবে নারী শ্রমিকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ফলে খাতটিতে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নারীর কর্মসংস্থানের ওপরই। সর্বশেষ বিসিএসেও নারীর প্রতিনিধিত্ব উদ্বেগজনকভাবে কম শুধু বেসরকারি শিল্প খাত নয়, সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তর বিসিএসেও নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত কমছে। পিএসসির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী নারীদের চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্তির হারের ধারাবাহিক চিত্র— ৩৪তম বিসিএস (২০১৫): ৩৫.৬৩ শতাংশ নারী ৪১তম বিসিএস: ২৬.৭১ শতাংশ নারী ৪৩তম বিসিএস: ১৯.৪৬ শতাংশ নারী (আগের কয়েকটি বিসিএসের তুলনায় সবচেয়ে নিচে নেমে যাওয়া একটি হার) ৪৪তম বিসিএস: ২০.১৭ শতাংশ নারী ৪৭তম বিসিএস (৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিকতম বিসিএস): ২২ শতাংশ নারী—১ হাজার ৩৩৪ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে নারী মাত্র ২৯৪ জন অর্থাৎ ২০১৫ সালে যেখানে প্রতি ১০০ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে প্রায় ৩৬ জন ছিলেন নারী, সাম্প্রতিক বিসিএসগুলোতে তা নেমে এসেছে ২০-এর ঘরে। খোদ পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম স্বীকার করেছেন, সাম্প্রতিক বিসিএস পরীক্ষাগুলোয় নারী প্রার্থীদের সাফল্য ‘অ্যালার্মিংলি’ বা উদ্বেগজনক হারে কমছে। পিএসসি সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমানও বলেছেন, সরকারি প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাবনতির ধারায় আছে—বর্তমানে সরকারি প্রশাসনে নারীর হার মাত্র ২৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে নারী কোটাসহ একাধিক কোটা সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়; আগে যেখানে সরকারি চাকরিতে মোট কোটা ছিল ৫৬ শতাংশ, তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭ শতাংশে। বিশ্লেষক ও পিএসসি কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, নারী কোটা সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রভাবও এই নিম্নমুখী প্রবণতার একটি কারণ হতে পারে, যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও কয়েকটি বিসিএসের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন। প্রশ্নটা তাই আরও গভীর গার্মেন্টস ও কলকারখানায় নারীর কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া, আর সর্বোচ্চ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় নারীর প্রতিনিধিত্ব ক্রমাগত কমে যাওয়া—এই দুটি চিত্র পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নারীর উপার্জন সক্ষমতা যদি একদিকে বেসরকারি শিল্প খাতে এবং অন্যদিকে সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তরে—উভয় জায়গাতেই ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে সেটা কি নিছক অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রতিযোগিতার ফল, নাকি এর মধ্য দিয়ে নারীকে সমাজ গঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে সূক্ষ্মভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে—এই প্রশ্নটি ভাববার সময় এসেছে। কারণ উপার্জনের সুযোগ কেড়ে নেওয়া মানে শুধু একটি চাকরি হারানো নয়। এটি নারীর আর্থিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং জনপরিসরে তার উপস্থিতির ভিত্তিটাকেই দুর্বল করে দেয়। তাই নিরাপত্তার সংকট আর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সংকট—এই দুটোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে, একটি সামগ্রিক প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করার সময় এখনই।
আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে নথিভুক্ত সহিংসতা বেড়ে যায় ২৭ শতাংশ। ধর্ষণের ঘটনা ৮ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩টিতে, আর গণধর্ষণ ৭ থেকে বেড়ে হয় ১১টি। এটা শুধু কয়েকটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়। কারণ একই সময়ে জনপরিসরেও নারীর ওপর প্রকাশ্য হেনস্তা ও তথাকথিত ‘মোরাল পুলিশিং’-এর ঘটনা সামনে আসতে থাকে। ২০২৫ সালের হিসাব: প্রবণতা আরও স্পষ্ট পুলিশের তথ্য বলছে, এক বছরে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশ—৫ হাজার ৫৬৬ থেকে ৭ হাজার ৬৮-তে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট মামলাও বেড়েছে ২৫ শতাংশ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবর্তন দেখা যায় শিশুদের ক্ষেত্রে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা আগের
বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৭৬ শতাংশ—২৫০ থেকে ৪৪১-এ। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু নারীর নিরাপত্তার সংকট নয়; এই পুরো সময় জুড়ে শিশুরাও ক্রমেই বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। কন্যাশিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। প্রথম সাত মাসে ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ—১৭৫ থেকে ৩০৬-এ। আর মাত্র সাত মাসেই ২০২৫ সালের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ২০২৪ সালের পুরো বছরের কন্যাশিশু ধর্ষণের সংখ্যা। কেন এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়। কারণ কোনো একটি অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। কিন্তু ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন এবং প্রকাশ্য নারী হেনস্তা—বিভিন্ন সূচকে যদি একই সময়ে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়, তাহলে সেটাকে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। ২০২৬
সালেও থামেনি প্রবণতা আর এই প্রবণতা ২০২৬ সালেও থামেনি। HRSS-এর হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি উদ্বেগ—নারী কী পরবে, কোথায় যাবে, খেলাধুলা করবে কি না, কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেবে কি না—এসব নিয়েও জনপরিসরে সংগঠিত আপত্তি ও চাপের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ সংকটটি শুধু ‘নারী কতটা নিরাপদ?’—এই প্রশ্নে আটকে নেই। মূল প্রশ্ন: স্বাধীনতা কি সংকুচিত হচ্ছে? প্রশ্ন হচ্ছে—নারী কি আগের মতো স্বাধীনভাবে জনপরিসরে থাকতে পারছে? তাই আগস্ট ২০২৪-কে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের তারিখ হিসেবে নয়, বরং একটি before-and-after marker হিসেবে দেখলে প্রশ্নটা আরও স্পষ্ট হয়। আগস্ট
২০২৪-এর আগে যে বাংলাদেশ নারী-অগ্রগতির সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছিল, আগস্ট ২০২৪-এর পর সেই বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং জনপরিসরে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কেন এতগুলো নতুন প্রশ্ন তৈরি হলো? পরিসংখ্যানের উত্তর হয়তো পুরোটা দেয় না। কিন্তু পরিসংখ্যান যে একটি পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছে, সেটা অস্বীকার করাও কঠিন। একটি জাতির অগ্রগতি মাপার অন্যতম মাপকাঠি হলো তার নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদে, কতটা স্বাধীনভাবে জনপরিসরে বিচরণ করতে পারে। সেই মাপকাঠিতে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান যে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, তার উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি। নিরাপত্তার সংকটের পাশাপাশি আরেকটি সংকট: উপার্জন সক্ষমতা হারাচ্ছেন নারীরা নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ—নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। কারণ চাকরি
ও উপার্জনের সুযোগই নারীকে সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে সমাজ গঠনে অংশ নেওয়ার সবচেয়ে বড় ভিত্তি তৈরি করে দেয়। সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, ঠিক এই জায়গাতেই নারীরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছেন—শ্রমবাজারের প্রায় সব স্তরে। গার্মেন্টস ও কলকারখানায় নারীর অবস্থান সংকুচিত হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। কিন্তু এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত কমছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন—এই তিন বছরে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত মোট ৪০২টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই পোশাক খাতের। শুধু বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৮০টি
কারখানাতেই ছাঁটাই হয়েছেন ১৯ হাজার ১৮৮ জন শ্রমিক, যার মধ্যে ২৭টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, শুধু প্রথম পাঁচ মাসেই আটটি শিল্পাঞ্চলের ৭৯টি কারখানায় ৭ হাজার ৭৮৪ জন শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। পোশাক খাতের এই কর্মী ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের পেছনে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংকের কঠোর নীতি ও আর্থিক সংকটের কথা বলা হলেও, বাস্তবতা হলো—এই খাতে ঐতিহাসিকভাবে নারী শ্রমিকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ফলে খাতটিতে সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নারীর কর্মসংস্থানের ওপরই। সর্বশেষ বিসিএসেও নারীর প্রতিনিধিত্ব উদ্বেগজনকভাবে কম শুধু বেসরকারি শিল্প খাত নয়, সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তর বিসিএসেও নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত কমছে। পিএসসির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী নারীদের চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্তির হারের ধারাবাহিক চিত্র— ৩৪তম বিসিএস (২০১৫): ৩৫.৬৩ শতাংশ নারী ৪১তম বিসিএস: ২৬.৭১ শতাংশ নারী ৪৩তম বিসিএস: ১৯.৪৬ শতাংশ নারী (আগের কয়েকটি বিসিএসের তুলনায় সবচেয়ে নিচে নেমে যাওয়া একটি হার) ৪৪তম বিসিএস: ২০.১৭ শতাংশ নারী ৪৭তম বিসিএস (৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিকতম বিসিএস): ২২ শতাংশ নারী—১ হাজার ৩৩৪ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে নারী মাত্র ২৯৪ জন অর্থাৎ ২০১৫ সালে যেখানে প্রতি ১০০ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে প্রায় ৩৬ জন ছিলেন নারী, সাম্প্রতিক বিসিএসগুলোতে তা নেমে এসেছে ২০-এর ঘরে। খোদ পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম স্বীকার করেছেন, সাম্প্রতিক বিসিএস পরীক্ষাগুলোয় নারী প্রার্থীদের সাফল্য ‘অ্যালার্মিংলি’ বা উদ্বেগজনক হারে কমছে। পিএসসি সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমানও বলেছেন, সরকারি প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাবনতির ধারায় আছে—বর্তমানে সরকারি প্রশাসনে নারীর হার মাত্র ২৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে নারী কোটাসহ একাধিক কোটা সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়; আগে যেখানে সরকারি চাকরিতে মোট কোটা ছিল ৫৬ শতাংশ, তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭ শতাংশে। বিশ্লেষক ও পিএসসি কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, নারী কোটা সম্পূর্ণ বিলুপ্তির প্রভাবও এই নিম্নমুখী প্রবণতার একটি কারণ হতে পারে, যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও কয়েকটি বিসিএসের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন। প্রশ্নটা তাই আরও গভীর গার্মেন্টস ও কলকারখানায় নারীর কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া, আর সর্বোচ্চ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় নারীর প্রতিনিধিত্ব ক্রমাগত কমে যাওয়া—এই দুটি চিত্র পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নারীর উপার্জন সক্ষমতা যদি একদিকে বেসরকারি শিল্প খাতে এবং অন্যদিকে সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তরে—উভয় জায়গাতেই ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তাহলে সেটা কি নিছক অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রতিযোগিতার ফল, নাকি এর মধ্য দিয়ে নারীকে সমাজ গঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে সূক্ষ্মভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে—এই প্রশ্নটি ভাববার সময় এসেছে। কারণ উপার্জনের সুযোগ কেড়ে নেওয়া মানে শুধু একটি চাকরি হারানো নয়। এটি নারীর আর্থিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং জনপরিসরে তার উপস্থিতির ভিত্তিটাকেই দুর্বল করে দেয়। তাই নিরাপত্তার সংকট আর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সংকট—এই দুটোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে, একটি সামগ্রিক প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করার সময় এখনই।



