ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
জুলাইর ‘শহীদ’ বহাল তবিয়তে কাজ করেন সৌদিতে, বাদী উধাও! আসামি শেখ হাসিনাসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষ
বালুচিস্তানের ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’: ভাইরাল দাবি, তবে আন্তর্জাতিকভাবে অস্বীকৃত ও পাকিস্তানের প্রত্যাখ্যান
দেশে সবচেয়ে বেশি ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত ঢাকায়
চরম দুর্ভোগে রাঙামাটি: বাঘাইছড়িতে পানিবন্দী ২০ হাজার মানুষ, ৬ দিনে ১০৪ পাহাড়ধস
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট ব্যবস্থা ফিরল
ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত শহিদ মিনারের চারপাশ ঘিরে শৌচাগার নির্মাণ
জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
২ বছরেও শেষ হয়নি ৮৬% জুলাই মামলার তদন্ত: হয়নি ময়নাতদন্ত, ঢালাও আসামি-মামলা বাণিজ্যে ভজঘট অবস্থা!
জুলাই বিক্ষোভে হতাহতের ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬২টি। প্রায় ২ বছরে মাত্র ২৫৪ মামলার (১৩.৬৪ শতাংশ) তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। বাকি ৮৬.৩৬ শতাংশ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের বিক্ষোভে হতাহতের ঘটনায় করা মামলাগুলো তদন্ত করতে পুলিশ নানা রকম জটিলতার মুখে পড়েছে। কারণ, বেশির ভাগ ঘটনায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করা হয়েছে। এখন লাশ তুলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতে সময় লাগছে। ঘটনার সময়ই ময়নাতদন্ত হলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু বা মৃত্যুর সঠিক কারণ উল্লেখ থাকত।
এখন দীর্ঘ সময় পর লাশের ময়নাতদন্ত হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
এ ছাড়া মামলার বিবরণে ঘটনাস্থলের ভুল বর্ণনা,
একই ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন ঘটনাস্থল দেখিয়ে একাধিক মামলা হওয়া, অনেক মামলায় ঢালাও আসামি করা ইত্যাদি অসংগতির কারণে তদন্তকাজে বিলম্ব হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি—অপরাধ) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফরেনসিক প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে সময় লাগছে। অনেকের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত সেসব ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় মামলা ও তদন্ত করাও সমস্যা। এসব নিয়ে জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ত্রুটি, পদ্ধতিগত জটিলতা ও ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার চিত্র না পাওয়ায় অনেক মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে, বলেন তিনি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০শে জুন পর্যন্ত বিক্ষোভে
হতাহতের ঘটনায় হওয়া ১ হাজার ৮৬২ মামলার মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৯৯টির। অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় ৫৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। বিক্ষোভের ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছিল ৭৯৯টি। এসব মামলায় মোট আসামি ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৪১ জন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ৬৫ হাজার ২১০ এবং সন্দেহভাজন আসামি ২ লাখ ৬২ হাজার ৬৩১ জন। মামলাগুলো তদন্ত করছে থানা, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), অ্যান্টিটেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ৬৩টির ক্ষেত্রে প্রমাণ পাওয়ায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আর ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা না পেয়ে ৩৭টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত
আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯৩। পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বিক্ষোভে আহত হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৩টি। মোট আসামি ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮৯ হাজার ১২১ এবং সন্দেহভাজন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫৮। তদন্ত শেষে ১৫৪টি মামলার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ১৩৬টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ১৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এতে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা ১০ হাজার ২০২। ঢালাও মামলায় নিরীহ মানুষও আসামি ২০২৪ সালের জুলাইতে আন্দোলনকারীদের সহিংসতা দমনে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৪ ও ৫ই আগস্ট সারাদেশে প্রায় ৫শ থানা ও ফাঁড়িতে হামলা চালায় আন্দোলনকারী উন্মত্ত লোকজন। এতে অসংখ্য পুলিশ সদস্য শহিদ
হন। অনেকের মরদেহ বিকৃত করে, আগুনে পুড়িয়ে, ঝুলিয়ে রাখা হয়। একইসাথে লুটপাট করা হয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের অনেক সদস্য আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। পুরো পুলিশি কার্যক্রম ভেঙে পড়ে। ৮ই আগস্ট মোহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা নেওয়ার পর বিভিন্ন থানার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর শুরু হয় গণ-মামলার হিড়িক। সে সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রকম বিপর্যস্ত ছিল, একইসাথে চলছিল গণ-বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর, অবসর থেকে অনেককে ফিরিয়ে এনে পদায়নসহ সংস্কারের নামে নানাবিধ কর্মকাণ্ড। এসবের ডামাডোলে পুলিশও মামলার সঠিক তদারকি করতে পারেনি। পূর্বশত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা
করা, চাঁদাবাজি, হয়রানি করতে ও বিদ্বেষের কারণে অনেক নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে জুলাই মামলায়। কাদের আসামি করা হবে, তা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা। মামলায় ঢালাও আসামি করার বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ২০২৪ সালের ১৪ই অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। যারা এ ধরনের মামলা করে অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেওয়া হয়। আর হয়রানিমূলকভাবে যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে সরকারের উচ্চপর্যায় ও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়। জুলাই বিক্ষোভের ঘটনায় মামলার তদন্ত তদারকে বিশেষ মনিটরিং দল গঠন করে পুলিশ
সদর দপ্তর। ঢালাও আসামি ঢাকার মিরপুর মডেল থানা-সংলগ্ন মিরপুর শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গুলিতে আহত হয়ে পরে মারা যায় কলেজছাত্রী রিতা আক্তার। ওই ঘটনায় করা মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী, পুলিশসহ ৩৯৫ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিন ও শাহ আলী থানার ডি ব্লকের বাসিন্দা কাজী জয়নালের নামও রয়েছে। ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিন বলেন, তাকে ফাঁসানো হয় তার ভাইয়ের হত্যা মামলা তুলে না নেওয়ার কারণে। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চাঁদার জন্য বিএনপির শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা তার বড় ভাই ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে। ভাইয়ের হত্যা মামলার আসামিরাই তাকে রিতা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে। মামলার বাদী রিতার বাবা আশরাফ আলী পেশায় রিকশাচালক। ঘটনার সময় থাকতেন মিরপুর-২ নম্বর সেকশনে। এখন থাকেন গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের কালাইয়ে। তিনি বলেন, ‘বিএনপির লোকেরা থানায় ছিল। তারা আসামির তালিকা ঠিক করে দিয়েছে। আমাকে সই করতে বলেছে, সই করেছি। আসামি কতজন, সঠিক বলতে পারব না।’ আসামির তালিকায় থাকা আফরোজ ও কাজী জয়নালকে চেনেন কি না, জানতে চাইলে বাদী আশরাফ বলেন, ‘আমি চিনব কীভাবে। বিএনপির লোকজন আমাকে কিছু টাকাপয়সা দিছিল, তারাই তো মামলায় নাম ঢুকাইছে। ভালো-মন্দ সবাই মামলায় ঢুইক্যা গ্যাছে। হামি সাক্ষ্য দিয়ে নির্দোষ লোকদের বাঁচাতে চাই।’ মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই। এর সঙ্গে যুক্ত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ডে আফরোজ উদ্দিনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। পুলিশসহ এ মামলায় অনেক আসামি। তাই তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে সময় লাগছে। আফরোজ উদ্দিনসহ যারা জড়িত নন, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হবে। জুলাইর মামলাগুলোর তদন্তকাজ তত্ত্বাবধান করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের নেতারা হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক তথ্য দিতেন। এখন তারা কথা বলতে চান না। এ অবস্থায় হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পুলিশের এই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আরও বলেন, একই ব্যক্তি হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল তিন জায়গা দেখিয়ে পৃথক তিন থানায় ঢালাও আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এ রকম অনেক মামলা রয়েছে, যেখানে নিহত ব্যক্তির ভাই বা স্বজন পরিচয় দিয়ে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলা নিয়ে বাণিজ্যও হচ্ছে। অনেক ঘটনার তদন্তে বাদীর সঙ্গে নিহত ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ভুয়া মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংরক্ষণ করেনি কেউ পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, বেশির ভাগ মামলা হয়েছে ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই এবং ৪ ও ৫ই আগস্টের হতাহতের ঘটনায়। ১৯শে জুলাই রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় নিহত হন দেড় শতাধিক মানুষ। এরপর ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর এবং আগের দিন ৪ঠা আগস্ট ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। তখন তীব্র আন্দোলনের মুহূর্তে মরদেহগুলো কোথায় যাচ্ছে, কোথায় দাফন করা হচ্ছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কে, কীভাবে মারা গেছেন, সেসব তথ্য পুরোপুরি সংরক্ষণ করেনি হাসপাতাল, পুলিশ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সূত্র বলছে, ৪ ও ৫ই আগস্ট নিহতের একটা বড় অংশ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ৫ই আগস্ট থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে নিহত হন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা। জুলাই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৮৪৩ জন নিহতের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এখন পর্যন্ত হত্যা মামলা হয়েছে ৭৯৯টি। এ অবস্থায় বাকি হত্যা ঘটনাগুলোর বিচারের কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্দোলনে অনেক নিহতের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। আবার গেজেটে থাকা নামগুলোর কয়েকটির বিষয়ে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এসব কারণে সব ঘটনায় হত্যা মামলা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হলে এবং নিহতের পরিচয় পাওয়া গেলে পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা করা হতে পারে। মানবাধিকারকর্মী নূর খানের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত হতাহত ব্যক্তিদের নাম লিপিবদ্ধ করতে তিনি হাসপাতালে যান। তখন পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক কর্মীরা তার কাছ থেকে কাগজপত্র কেড়ে নেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থা ও দলীয় লোকদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে অনেক চিকিৎসককে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার দাবিও করেন তিনি। অনেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনার পথে মারা গেলে একই ব্যক্তিরা লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত না করিয়ে তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। মরদেহ স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে হতাহতের বেশির ভাগ রেকর্ড নষ্ট হয়ে গেছে। মৃতের আঙুলের ছাপ থেকে লাশ চিহ্নিতের সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। ৫ই আগস্টের পর ক্ষমতার বলয়ে আসা রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বৃত্ত কর্মীরা জোর খাটিয়ে এসব মামলায় ঢালাওভাবে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে আসামি করে মামলা-বাণিজ্য করেছে। ফলে মামলাগুলোর তদন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৬ রায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় আড়াই মাস পর ২০২৪ সালের ১৪ই অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের খোল-নলচে বদলে সংস্কারের নামে পুনর্গঠন করে ইউনূস সরকার। বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে গত বছরের ৮ই মে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ১৯ মাসে জুলাইয়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার ৬টি মামলায় রায় দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ৬১ আসামির মধ্যে ৪০ জনই নিখোঁজ, কারাগারে আছেন ২১ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পুলিশের সাবেক ১১ সদস্যের মধ্যে ৭ জন নিখোঁজ এবং ৪ জন কারাবন্দী। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান। তদন্ত দ্রুত শেষ করা জরুরি এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘বিক্ষোভের ঘটনায় হওয়া অনেক মামলায় ঢালাও আসামি করে অনেক নির্দোষ মানুষকে আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে। এসব মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করে তাদের তত্ত্বাবধানে সময় বেঁধে দিয়ে মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করা জরুরি। তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে শক্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযোগপত্রভুক্ত না করতে পুলিশকে নির্দেশনা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে পুলিশকে পৃথক ক্ষমতা দিতে হবে। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশি প্রতিবেদন দিতে হবে।
একই ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন ঘটনাস্থল দেখিয়ে একাধিক মামলা হওয়া, অনেক মামলায় ঢালাও আসামি করা ইত্যাদি অসংগতির কারণে তদন্তকাজে বিলম্ব হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি—অপরাধ) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, বিক্ষোভে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফরেনসিক প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে সময় লাগছে। অনেকের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত সেসব ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় মামলা ও তদন্ত করাও সমস্যা। এসব নিয়ে জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ত্রুটি, পদ্ধতিগত জটিলতা ও ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার চিত্র না পাওয়ায় অনেক মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে, বলেন তিনি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০শে জুন পর্যন্ত বিক্ষোভে
হতাহতের ঘটনায় হওয়া ১ হাজার ৮৬২ মামলার মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৯৯টির। অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় ৫৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। বিক্ষোভের ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছিল ৭৯৯টি। এসব মামলায় মোট আসামি ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৪১ জন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ৬৫ হাজার ২১০ এবং সন্দেহভাজন আসামি ২ লাখ ৬২ হাজার ৬৩১ জন। মামলাগুলো তদন্ত করছে থানা, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), অ্যান্টিটেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ৬৩টির ক্ষেত্রে প্রমাণ পাওয়ায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আর ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা না পেয়ে ৩৭টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত
আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯৩। পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বিক্ষোভে আহত হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৩টি। মোট আসামি ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮৯ হাজার ১২১ এবং সন্দেহভাজন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫৮। তদন্ত শেষে ১৫৪টি মামলার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। ১৩৬টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ১৮টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এতে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা ১০ হাজার ২০২। ঢালাও মামলায় নিরীহ মানুষও আসামি ২০২৪ সালের জুলাইতে আন্দোলনকারীদের সহিংসতা দমনে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৪ ও ৫ই আগস্ট সারাদেশে প্রায় ৫শ থানা ও ফাঁড়িতে হামলা চালায় আন্দোলনকারী উন্মত্ত লোকজন। এতে অসংখ্য পুলিশ সদস্য শহিদ
হন। অনেকের মরদেহ বিকৃত করে, আগুনে পুড়িয়ে, ঝুলিয়ে রাখা হয়। একইসাথে লুটপাট করা হয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের অনেক সদস্য আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। পুরো পুলিশি কার্যক্রম ভেঙে পড়ে। ৮ই আগস্ট মোহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা নেওয়ার পর বিভিন্ন থানার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর শুরু হয় গণ-মামলার হিড়িক। সে সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রকম বিপর্যস্ত ছিল, একইসাথে চলছিল গণ-বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর, অবসর থেকে অনেককে ফিরিয়ে এনে পদায়নসহ সংস্কারের নামে নানাবিধ কর্মকাণ্ড। এসবের ডামাডোলে পুলিশও মামলার সঠিক তদারকি করতে পারেনি। পূর্বশত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা
করা, চাঁদাবাজি, হয়রানি করতে ও বিদ্বেষের কারণে অনেক নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে জুলাই মামলায়। কাদের আসামি করা হবে, তা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা। মামলায় ঢালাও আসামি করার বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ২০২৪ সালের ১৪ই অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। যারা এ ধরনের মামলা করে অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেওয়া হয়। আর হয়রানিমূলকভাবে যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে সরকারের উচ্চপর্যায় ও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়। জুলাই বিক্ষোভের ঘটনায় মামলার তদন্ত তদারকে বিশেষ মনিটরিং দল গঠন করে পুলিশ
সদর দপ্তর। ঢালাও আসামি ঢাকার মিরপুর মডেল থানা-সংলগ্ন মিরপুর শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গুলিতে আহত হয়ে পরে মারা যায় কলেজছাত্রী রিতা আক্তার। ওই ঘটনায় করা মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী, পুলিশসহ ৩৯৫ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিন ও শাহ আলী থানার ডি ব্লকের বাসিন্দা কাজী জয়নালের নামও রয়েছে। ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিন বলেন, তাকে ফাঁসানো হয় তার ভাইয়ের হত্যা মামলা তুলে না নেওয়ার কারণে। ২০০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চাঁদার জন্য বিএনপির শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা তার বড় ভাই ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে। ভাইয়ের হত্যা মামলার আসামিরাই তাকে রিতা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে। মামলার বাদী রিতার বাবা আশরাফ আলী পেশায় রিকশাচালক। ঘটনার সময় থাকতেন মিরপুর-২ নম্বর সেকশনে। এখন থাকেন গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের কালাইয়ে। তিনি বলেন, ‘বিএনপির লোকেরা থানায় ছিল। তারা আসামির তালিকা ঠিক করে দিয়েছে। আমাকে সই করতে বলেছে, সই করেছি। আসামি কতজন, সঠিক বলতে পারব না।’ আসামির তালিকায় থাকা আফরোজ ও কাজী জয়নালকে চেনেন কি না, জানতে চাইলে বাদী আশরাফ বলেন, ‘আমি চিনব কীভাবে। বিএনপির লোকজন আমাকে কিছু টাকাপয়সা দিছিল, তারাই তো মামলায় নাম ঢুকাইছে। ভালো-মন্দ সবাই মামলায় ঢুইক্যা গ্যাছে। হামি সাক্ষ্য দিয়ে নির্দোষ লোকদের বাঁচাতে চাই।’ মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই। এর সঙ্গে যুক্ত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ডে আফরোজ উদ্দিনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। পুলিশসহ এ মামলায় অনেক আসামি। তাই তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে সময় লাগছে। আফরোজ উদ্দিনসহ যারা জড়িত নন, তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হবে। জুলাইর মামলাগুলোর তদন্তকাজ তত্ত্বাবধান করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের নেতারা হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক তথ্য দিতেন। এখন তারা কথা বলতে চান না। এ অবস্থায় হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পুলিশের এই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আরও বলেন, একই ব্যক্তি হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল তিন জায়গা দেখিয়ে পৃথক তিন থানায় ঢালাও আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এ রকম অনেক মামলা রয়েছে, যেখানে নিহত ব্যক্তির ভাই বা স্বজন পরিচয় দিয়ে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলা নিয়ে বাণিজ্যও হচ্ছে। অনেক ঘটনার তদন্তে বাদীর সঙ্গে নিহত ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ভুয়া মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংরক্ষণ করেনি কেউ পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, বেশির ভাগ মামলা হয়েছে ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই এবং ৪ ও ৫ই আগস্টের হতাহতের ঘটনায়। ১৯শে জুলাই রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় নিহত হন দেড় শতাধিক মানুষ। এরপর ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর এবং আগের দিন ৪ঠা আগস্ট ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। তখন তীব্র আন্দোলনের মুহূর্তে মরদেহগুলো কোথায় যাচ্ছে, কোথায় দাফন করা হচ্ছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কে, কীভাবে মারা গেছেন, সেসব তথ্য পুরোপুরি সংরক্ষণ করেনি হাসপাতাল, পুলিশ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সূত্র বলছে, ৪ ও ৫ই আগস্ট নিহতের একটা বড় অংশ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ৫ই আগস্ট থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে নিহত হন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা। জুলাই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৮৪৩ জন নিহতের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এখন পর্যন্ত হত্যা মামলা হয়েছে ৭৯৯টি। এ অবস্থায় বাকি হত্যা ঘটনাগুলোর বিচারের কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্দোলনে অনেক নিহতের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। আবার গেজেটে থাকা নামগুলোর কয়েকটির বিষয়ে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এসব কারণে সব ঘটনায় হত্যা মামলা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হলে এবং নিহতের পরিচয় পাওয়া গেলে পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা করা হতে পারে। মানবাধিকারকর্মী নূর খানের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত হতাহত ব্যক্তিদের নাম লিপিবদ্ধ করতে তিনি হাসপাতালে যান। তখন পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক কর্মীরা তার কাছ থেকে কাগজপত্র কেড়ে নেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থা ও দলীয় লোকদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে অনেক চিকিৎসককে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার দাবিও করেন তিনি। অনেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনার পথে মারা গেলে একই ব্যক্তিরা লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত না করিয়ে তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। মরদেহ স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে হতাহতের বেশির ভাগ রেকর্ড নষ্ট হয়ে গেছে। মৃতের আঙুলের ছাপ থেকে লাশ চিহ্নিতের সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। ৫ই আগস্টের পর ক্ষমতার বলয়ে আসা রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বৃত্ত কর্মীরা জোর খাটিয়ে এসব মামলায় ঢালাওভাবে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে আসামি করে মামলা-বাণিজ্য করেছে। ফলে মামলাগুলোর তদন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৬ রায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় আড়াই মাস পর ২০২৪ সালের ১৪ই অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের খোল-নলচে বদলে সংস্কারের নামে পুনর্গঠন করে ইউনূস সরকার। বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে গত বছরের ৮ই মে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ১৯ মাসে জুলাইয়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার ৬টি মামলায় রায় দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ৬১ আসামির মধ্যে ৪০ জনই নিখোঁজ, কারাগারে আছেন ২১ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পুলিশের সাবেক ১১ সদস্যের মধ্যে ৭ জন নিখোঁজ এবং ৪ জন কারাবন্দী। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান। তদন্ত দ্রুত শেষ করা জরুরি এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘বিক্ষোভের ঘটনায় হওয়া অনেক মামলায় ঢালাও আসামি করে অনেক নির্দোষ মানুষকে আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে। এসব মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করে তাদের তত্ত্বাবধানে সময় বেঁধে দিয়ে মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করা জরুরি। তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে শক্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযোগপত্রভুক্ত না করতে পুলিশকে নির্দেশনা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে পুলিশকে পৃথক ক্ষমতা দিতে হবে। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশি প্রতিবেদন দিতে হবে।



