সৈয়দ ইফেতেখার হোসেন
আরও খবর
শেখ হাসিনা খাঁটি দেশপ্রেমিক, মানুষ ভুল বুঝতে পেরে তাঁকে ফেরত চাইবে’
বিশ্লেষণঃ গনহত্যার দায় ও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ
জুলাই-আগস্টের ৭.৬২ মি.মি. বুলেটের সুত্র অনুসন্ধান: বরখাস্তকৃত লেঃ কর্নেল ও সেনাবাহিনীর আর্টিলারি বিভাগের সম্পৃক্ততা
সরকারের সর্বনাশে মঈনরাই যথেষ্ট
ঋণখেলাপি: শুধু তালিকা নয়, ব্যবস্থা নিন
মার্কিন অর্থায়নে শেখ হাসিনার সরকারের পতন: নথিতে মিলল ৩২৫ মিলিয়ন ডলারের ভাগীদারদের হদিস
গার্বেজ গিলে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত প্রত্যেকের নিজের, এতে ইতিহাসের সত্য বদলায় না
১৭ এপ্রিল-বাংলাদেশের নূতন সূর্যোদয়
১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন| একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বৈধ সরকার কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার এক আম্রকুঞ্জে দেশ-বিদেশের শতাধিক সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণের সামনে দেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন| ঐতিহাসিক ভাবে এটি ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ। শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী| অধ্যাপক ইউসুফ আলী একসময় নবাবগঞ্জ কলেজের এবং পরবর্তীকালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যাপক ছিলেন| পরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ১৯৭০-এর নির্বাচনে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৭ এপ্রিলের আগে ১০ এপ্রিল ভারতের অংশের তিস্তা নদীর উজানে বাগডোগরা নামক স্থানে
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের (যাঁরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন) নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের বৈঠক বসে। সেই সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য স্পিকার মনোনীত করা হয় অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে ৩ এপ্রিল একটি ছোট প্রতিনিধিদল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সহায়তা কামনা করেন। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী প্রতিনিধি দলকে পরামর্শ দেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা একটি সরকার গঠন করলে এই ধরনের সহায়তা করতে সহজ হবে| প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়
এই তথ্যগুলো এই লেখককে জানিয়েছিলেন| স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি রচনা করে তিনি তা নিয়ে গিয়েছিলেন কোলকাতা হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরীর কাছে| তিনি পড়ে বলেছিলেন, এই ঘোষণাপত্রে সংযোজন করার কিছু বাকি নেই| ঠিক একই সময় আরো দুটি গোষ্ঠী পৃথকভাবে প্রবাসী সরকার গঠনের চেষ্টা করে।প্রথম গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন কিছু তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা, আর অন্যদিকে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া কিছু সেনা অফিসার| কিন্তু উভয় পক্ষের সঙ্গে কোনো বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিল না বলে তা সম্ভব হয়নি। ১৭ এপ্রিলের আগের দিন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এম এ মান্নান ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম কোলকাতা প্রেস ক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের জানিয়ে দিলেন, পরদিন
নবগঠিত প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেবেন এবং তাঁদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, তাঁরা যেন প্রস্তুত থাকেন| নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টা সম্পর্কে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়| প্রথমে ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিভাবে যেন সংবাদটি জানাজানি হয়ে যায়।ফলে সেখানে পাকিস্তান বিমানবাহিনী হামলা করা শুরু করে।তাই স্থান পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত হলো। পুরো অনুষ্ঠান আয়োজন করার দায়িত্ব কাঁধে নিলেন পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক নূরুল কাদের খান ও মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী (বীরবিক্রম), বর্তমানে যিনি কল্পনা প্রসূত হত্যা মামলা নিয়ে বিনা বিচারে কারাগারে আছেন। পূর্বে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন | তাঁদের সহায়তা করলেন স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ ও জনগণ এবং ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী, বিএসএফ। ১৭ এপ্রিল খুব ভোরে কলকাতা থেকে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তাঁদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেয় বিএসএফ। মেহেরপুর সীমান্তবর্তী মহকুমা। সকাল ১১টা নাগাদ ছোট একটি গাড়ি বহর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেহেরপুরে প্রবেশ করে সীমান্ত সংলগ্ন বড় এক আম্রকুঞ্জ, বৈদ্যনাথতলায় অবস্থান নেয়। স্থানীয় একটি গির্জা থেকে কিছু টুল-টেবিল এনে বানানো হয় একটি ছোট মঞ্চ। সামনে বিদেশি সাংবাদিকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। অনুষ্ঠানের পরিচালক সংসদ সদস্য এম এ মান্নান অনুষ্ঠান সম্পর্কে সবাইকে ব্রিফ করেন। খুবই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে প্রথমে সংসদ সদস্য
অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন যা এখন বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথমেই অন্তর্ভূক্ত।তারপর বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে একটি চার সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। এও ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন তাজউদ্দীন আহমদ।অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও উপরাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী। কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অনুষ্ঠান শেষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ উপস্থিত জনগণ ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তাঁরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা ও
সমর্থন দেওয়ার আহবান জানান। সব শেষে ঝিনাইদহের পুলিশের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়, যাতে অংশ নেন স্থানীয় পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা| এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম বৈধ সরকার। সেই সরকারের একটি মন্ত্রীসভা ছিল, একজন স্পিকার (অধ্যাপক ইউসুফ আলী) আর একজন সেনাপ্রধান ছিল। শুনেছি সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) হাফিজউদ্দিন, বীর বিক্রম সহ তার আরো কয়েক সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধা। ঠিক এমন একটি ঘটনা ঘটিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিরা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে।এই দুইটি ঘটনার বাইরে এমন নজির আর কোথাও নেই। এই সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই, কারণ যাঁরা সরকারের সদস্য ছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।তখন থেকে এই স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।কোনো কোনো অর্বাচীন বলে থাকেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল (তখন মেজর) জিয়া।তারা ভুলে যান জিয়ার রাষ্ট্রপতি হওয়ার কোনো বৈধ সুযোগ ছিল না।কারণ তিনি কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন না, আর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কোনো শপথও নেননি।তারা আরো ভুলে যান জিয়া সহ যারা প্রথম সরকারের অধীনে কাজ করেছেন এবং যারা আগে সরকারি কর্মচারী ছিলেন অথবা পরবর্তীকালে সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা সবাই সরকার থেকে একটি প্রতীকী বেতন পেতেন। তবে অনেকেই বাস্তব বেতন নেয়ার সুযোগ পান নি। যে স্থানে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়েছিল সেখানে একটি মুক্তিযুদ্ধের যাদুঘর নির্মিত হয়েছিল| ছিল সেই দিনের অনুষ্ঠানের স্মরণে একটি প্রতীকি ভাষ্কর্য। ২০২৪ সালে ‘কোট বিরোধী’ আন্দোলনের ছত্রছায় এর সন্ত্রাসী নৈরাজ্যের পর পরই পাকিস্তানিদের ঔরষজাত কিছু দূর্বৃত্ত সেগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে | তাদের কেউ কেউ সম্প্রতি বায়তুল মোকার&রমের সামনে ব্যানার ঝুলিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সাথে একত্রিকরণের দাবিও জানিয়েছে | তারা ‘পাকিস্তান ভাঙ্গার’ দায়ে শেখ মুজিবকে দায়ী করেছে | স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হয়| উল্লেখ করা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২৬ মার্চ রাতে ঢাকায় যথাযথভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান|’ সেই প্রস্তাবনায় স্বাধীন বাংলাদেশ কিভাবে পরিচালিত হবে তার একটা স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয় এবং এও ঘোষণা করা হয়, এই ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর হবে এবং একটি সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত এই ঘোষণাপত্রের আলোকেই দেশ পরিচালনা করা হবে| ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার কথা জোর দিয়ে বলা হয়| অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাঁদের বক্তৃতায় এসব বিষয় উল্লেখ করা ছাড়াও আরো বলেন, বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র এবং এই দেশ জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ মেনে চলবে| স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭২ সালে সংবিধানে সপ্তম তফসিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়| অথচ এমন একটা দলিলকে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর জিয়া সংবিধান থেকে বাতিল করে দেন| যে চার জাতীয় নেতাকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, তাঁদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়| অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তা আবার সংবিধানে সংযোজিত হয়। খালেদা জিয়া ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তা আবার বাতিল করে দেন। অথচ এই প্রস্তাবনা ছিল বৈধ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মসনদ।দূর্ভাগ্য জাতির যখনই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে তখনই তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কিছু মৌলিক মিমাংসিত বিষয়ের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছে যদিও দলটিতে বেশ কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধা আছেন| ৫৫ বছর পার করল স্বাধীন বাংলাদেশ।এই ৫৫ বছরে বাংলাদেশ অর্জন করেছে অনেক কিছু; কিন্তু যা হারিয়েছে তাও কম নয়।এই ৫৫ বছরে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ অনেকটা হারিয়ে গেছে। সামাজিক ন্যায়বিচার এখন অনেকটা নির্বাসিত।আর্থ-সামাজিক বৈষম্য বর্তমানে চরম বেদনাদায়ক অবস্থায় আছে। সমাজে অসৎ মানুষের দোর্দন্ড প্রতাপ। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি আমল থেকেও বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি বর্তমানে অনেক বেশি শক্তিশালী। বর্তমানে মহান জাতীয় সংসদে তাদের উল্লাস নৃত্য দেখলে মনে হওয়ার কারণ নেই এটি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে বিধৌত অর্জিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। বাঙালি সংস্কৃতিকে ধর্মের দোহাই দিয়ে এক শ্রেণির ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী কোণঠাসা করে ফেলেছে।বাংলা নববর্ষ পালনে তারা হিন্দুয়ানি দেখে ।এটি পালনে আয়োজিত শোভা যাত্রা ‘মঙ্গল’ শোভা যাত্রা হবে না ‘বৈশাখি’ শোভা যাত্রা হবে তা নিয়ে কূতর্ক করে রাতের ঘুম হারাম করে।‘আনন্দ’ শোভা যাত্রাতেই তাদের আপত্তি।শ্রেণিকক্ষে বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলে একজন হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে কারাগারে যেতে হয়েছিল কয়েকবছর আগে।ক’দিন আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন।চুয়াডাঙ্গায় আরেকজন আমানত উল্লাহ খান বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে বলে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এই দেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এসব বিষয়ে মাঠ গরম করার সুযোগ পায় অনেকটা বিভিন্ন সময়ে সরকারের তোষণ নীতির কারণে। সব সময় সরকার সম্ভবত বুঝতে অক্ষম, এরা বাংলাদেশকে আরেকটি আফগানিস্তান বানাতে চায়। কায়েম করতে চায় তালেবানি শাসন। এদের লাগাম টেনে ধরা বর্তমানে কঠিন। এরা জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে । ফিরে যাই সেই অগ্নিঝরা একাত্তরে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কিংবা ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনার অনেকগুলো বর্তমানে নির্বাসিত। বর্তমান সরকারের আমলে এই সব কিছু ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও সদিচ্ছা থাকলে কিছুটা সম্ভব।মনে রাথতে হবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ট দল বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সংসদে সরকারি দল যদি একাত্তরের চেতনা রক্ষা করতে না পারে তা হলে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের হয়তো খোলসটা থাকবে, বাকি সব হারিয়ে যাবে| একটি অন্ধকার যুগে প্রবেশ করবে বঙ্গবন্ধু ও ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও তিন লক্ষ সম্ভ্রম হারানো মা বোনের স্বপ্নের বাংলাদেশ। সময় থাকতে সাবধান না হলে আগামী দিনে একাত্তরের বাংলাদেশকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে বিএনপি যাদের মিত্র ভেবে এখন গলাগলিতে লিপ্ত সুযোগ পেলেই তারা ছোবল মারতে এক মিনিটও চিন্তা করবে না। লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক |
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের (যাঁরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন) নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের বৈঠক বসে। সেই সংসদে সভাপতিত্ব করার জন্য স্পিকার মনোনীত করা হয় অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে ৩ এপ্রিল একটি ছোট প্রতিনিধিদল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সহায়তা কামনা করেন। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী প্রতিনিধি দলকে পরামর্শ দেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা একটি সরকার গঠন করলে এই ধরনের সহায়তা করতে সহজ হবে| প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়
এই তথ্যগুলো এই লেখককে জানিয়েছিলেন| স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি রচনা করে তিনি তা নিয়ে গিয়েছিলেন কোলকাতা হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরীর কাছে| তিনি পড়ে বলেছিলেন, এই ঘোষণাপত্রে সংযোজন করার কিছু বাকি নেই| ঠিক একই সময় আরো দুটি গোষ্ঠী পৃথকভাবে প্রবাসী সরকার গঠনের চেষ্টা করে।প্রথম গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন কিছু তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা, আর অন্যদিকে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া কিছু সেনা অফিসার| কিন্তু উভয় পক্ষের সঙ্গে কোনো বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিল না বলে তা সম্ভব হয়নি। ১৭ এপ্রিলের আগের দিন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এম এ মান্নান ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম কোলকাতা প্রেস ক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের জানিয়ে দিলেন, পরদিন
নবগঠিত প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেবেন এবং তাঁদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, তাঁরা যেন প্রস্তুত থাকেন| নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টা সম্পর্কে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়| প্রথমে ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিভাবে যেন সংবাদটি জানাজানি হয়ে যায়।ফলে সেখানে পাকিস্তান বিমানবাহিনী হামলা করা শুরু করে।তাই স্থান পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত হলো। পুরো অনুষ্ঠান আয়োজন করার দায়িত্ব কাঁধে নিলেন পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক নূরুল কাদের খান ও মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী (বীরবিক্রম), বর্তমানে যিনি কল্পনা প্রসূত হত্যা মামলা নিয়ে বিনা বিচারে কারাগারে আছেন। পূর্বে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন | তাঁদের সহায়তা করলেন স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ ও জনগণ এবং ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী, বিএসএফ। ১৭ এপ্রিল খুব ভোরে কলকাতা থেকে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তাঁদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেয় বিএসএফ। মেহেরপুর সীমান্তবর্তী মহকুমা। সকাল ১১টা নাগাদ ছোট একটি গাড়ি বহর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেহেরপুরে প্রবেশ করে সীমান্ত সংলগ্ন বড় এক আম্রকুঞ্জ, বৈদ্যনাথতলায় অবস্থান নেয়। স্থানীয় একটি গির্জা থেকে কিছু টুল-টেবিল এনে বানানো হয় একটি ছোট মঞ্চ। সামনে বিদেশি সাংবাদিকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। অনুষ্ঠানের পরিচালক সংসদ সদস্য এম এ মান্নান অনুষ্ঠান সম্পর্কে সবাইকে ব্রিফ করেন। খুবই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে প্রথমে সংসদ সদস্য
অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন যা এখন বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথমেই অন্তর্ভূক্ত।তারপর বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে একটি চার সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। এও ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন তাজউদ্দীন আহমদ।অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও উপরাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী। কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অনুষ্ঠান শেষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ উপস্থিত জনগণ ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তাঁরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা ও
সমর্থন দেওয়ার আহবান জানান। সব শেষে ঝিনাইদহের পুলিশের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়, যাতে অংশ নেন স্থানীয় পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা| এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম বৈধ সরকার। সেই সরকারের একটি মন্ত্রীসভা ছিল, একজন স্পিকার (অধ্যাপক ইউসুফ আলী) আর একজন সেনাপ্রধান ছিল। শুনেছি সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) হাফিজউদ্দিন, বীর বিক্রম সহ তার আরো কয়েক সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধা। ঠিক এমন একটি ঘটনা ঘটিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিরা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে।এই দুইটি ঘটনার বাইরে এমন নজির আর কোথাও নেই। এই সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই, কারণ যাঁরা সরকারের সদস্য ছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।তখন থেকে এই স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।কোনো কোনো অর্বাচীন বলে থাকেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল (তখন মেজর) জিয়া।তারা ভুলে যান জিয়ার রাষ্ট্রপতি হওয়ার কোনো বৈধ সুযোগ ছিল না।কারণ তিনি কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন না, আর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কোনো শপথও নেননি।তারা আরো ভুলে যান জিয়া সহ যারা প্রথম সরকারের অধীনে কাজ করেছেন এবং যারা আগে সরকারি কর্মচারী ছিলেন অথবা পরবর্তীকালে সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা সবাই সরকার থেকে একটি প্রতীকী বেতন পেতেন। তবে অনেকেই বাস্তব বেতন নেয়ার সুযোগ পান নি। যে স্থানে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়েছিল সেখানে একটি মুক্তিযুদ্ধের যাদুঘর নির্মিত হয়েছিল| ছিল সেই দিনের অনুষ্ঠানের স্মরণে একটি প্রতীকি ভাষ্কর্য। ২০২৪ সালে ‘কোট বিরোধী’ আন্দোলনের ছত্রছায় এর সন্ত্রাসী নৈরাজ্যের পর পরই পাকিস্তানিদের ঔরষজাত কিছু দূর্বৃত্ত সেগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে | তাদের কেউ কেউ সম্প্রতি বায়তুল মোকার&রমের সামনে ব্যানার ঝুলিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সাথে একত্রিকরণের দাবিও জানিয়েছে | তারা ‘পাকিস্তান ভাঙ্গার’ দায়ে শেখ মুজিবকে দায়ী করেছে | স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হয়| উল্লেখ করা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২৬ মার্চ রাতে ঢাকায় যথাযথভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান|’ সেই প্রস্তাবনায় স্বাধীন বাংলাদেশ কিভাবে পরিচালিত হবে তার একটা স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয় এবং এও ঘোষণা করা হয়, এই ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর হবে এবং একটি সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত এই ঘোষণাপত্রের আলোকেই দেশ পরিচালনা করা হবে| ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার কথা জোর দিয়ে বলা হয়| অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাঁদের বক্তৃতায় এসব বিষয় উল্লেখ করা ছাড়াও আরো বলেন, বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র এবং এই দেশ জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ মেনে চলবে| স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭২ সালে সংবিধানে সপ্তম তফসিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়| অথচ এমন একটা দলিলকে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর জিয়া সংবিধান থেকে বাতিল করে দেন| যে চার জাতীয় নেতাকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, তাঁদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়| অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তা আবার সংবিধানে সংযোজিত হয়। খালেদা জিয়া ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তা আবার বাতিল করে দেন। অথচ এই প্রস্তাবনা ছিল বৈধ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মসনদ।দূর্ভাগ্য জাতির যখনই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে তখনই তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কিছু মৌলিক মিমাংসিত বিষয়ের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছে যদিও দলটিতে বেশ কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধা আছেন| ৫৫ বছর পার করল স্বাধীন বাংলাদেশ।এই ৫৫ বছরে বাংলাদেশ অর্জন করেছে অনেক কিছু; কিন্তু যা হারিয়েছে তাও কম নয়।এই ৫৫ বছরে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ অনেকটা হারিয়ে গেছে। সামাজিক ন্যায়বিচার এখন অনেকটা নির্বাসিত।আর্থ-সামাজিক বৈষম্য বর্তমানে চরম বেদনাদায়ক অবস্থায় আছে। সমাজে অসৎ মানুষের দোর্দন্ড প্রতাপ। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি আমল থেকেও বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি বর্তমানে অনেক বেশি শক্তিশালী। বর্তমানে মহান জাতীয় সংসদে তাদের উল্লাস নৃত্য দেখলে মনে হওয়ার কারণ নেই এটি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে বিধৌত অর্জিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। বাঙালি সংস্কৃতিকে ধর্মের দোহাই দিয়ে এক শ্রেণির ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী কোণঠাসা করে ফেলেছে।বাংলা নববর্ষ পালনে তারা হিন্দুয়ানি দেখে ।এটি পালনে আয়োজিত শোভা যাত্রা ‘মঙ্গল’ শোভা যাত্রা হবে না ‘বৈশাখি’ শোভা যাত্রা হবে তা নিয়ে কূতর্ক করে রাতের ঘুম হারাম করে।‘আনন্দ’ শোভা যাত্রাতেই তাদের আপত্তি।শ্রেণিকক্ষে বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলে একজন হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে কারাগারে যেতে হয়েছিল কয়েকবছর আগে।ক’দিন আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন।চুয়াডাঙ্গায় আরেকজন আমানত উল্লাহ খান বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে বলে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এই দেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এসব বিষয়ে মাঠ গরম করার সুযোগ পায় অনেকটা বিভিন্ন সময়ে সরকারের তোষণ নীতির কারণে। সব সময় সরকার সম্ভবত বুঝতে অক্ষম, এরা বাংলাদেশকে আরেকটি আফগানিস্তান বানাতে চায়। কায়েম করতে চায় তালেবানি শাসন। এদের লাগাম টেনে ধরা বর্তমানে কঠিন। এরা জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে । ফিরে যাই সেই অগ্নিঝরা একাত্তরে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কিংবা ১৯৭২-এর সংবিধানের মূল চেতনার অনেকগুলো বর্তমানে নির্বাসিত। বর্তমান সরকারের আমলে এই সব কিছু ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও সদিচ্ছা থাকলে কিছুটা সম্ভব।মনে রাথতে হবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ট দল বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সংসদে সরকারি দল যদি একাত্তরের চেতনা রক্ষা করতে না পারে তা হলে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের হয়তো খোলসটা থাকবে, বাকি সব হারিয়ে যাবে| একটি অন্ধকার যুগে প্রবেশ করবে বঙ্গবন্ধু ও ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও তিন লক্ষ সম্ভ্রম হারানো মা বোনের স্বপ্নের বাংলাদেশ। সময় থাকতে সাবধান না হলে আগামী দিনে একাত্তরের বাংলাদেশকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে বিএনপি যাদের মিত্র ভেবে এখন গলাগলিতে লিপ্ত সুযোগ পেলেই তারা ছোবল মারতে এক মিনিটও চিন্তা করবে না। লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক |



