ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
দেশ বাঁচাতে এগিয়ে আসুন সবাই
ঢাকাসহ সারাদেশের জন্য বড় দুঃসংবাদ
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ভুল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার: সংস্কৃতিমন্ত্রী
সার সংকট : বিএনপি সরকারের আমলে সারের জন্য জীবন যায় কৃষকের
তেল খুঁজতেই ‘তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে’
সরকার বনাম ব্যবসায়ী বক্তব্য যুদ্ধে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন
আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে রাষ্ট্রীয় প্রতিশোধের বৈধতা নাকি সংবিধান অকার্যকরের প্রচেষ্টা?
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ১০ই মে এক বিতর্কিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। সে সময় অন্তর্বর্তী সরকার এক বিবৃতিতে জানায় যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন বা আইসিটি আইনের আওতায় শত শত বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর ঘটনায় দলটি ও এর শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চলমান বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের নেতৃত্বে সংসদে উক্ত অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সর্বশেষ উদ্যোগ—যার মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে কোনো একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দল ও তার সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম ও অভিব্যক্তির ওপর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ প্রশস্ত করা
হয়েছে—বাংলাদেশের সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনি অঙ্গীকারের সঙ্গে এক গভীর ও উদ্বেগজনক বিচ্ছেদকে স্পষ্ট করে। এর আগেই, ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করা হয়। সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সিদ্ধান্তটি সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে সংবিধানের সর্বোচ্চ অবস্থান ঘোষণা করা হয়েছে এবং সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো নির্বাহী বা আইনগত কার্যক্রমকে বাতিল ও অকার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছে। রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও প্রতিযোগিতামূলক দলীয় রাজনীতি সংবিধানের প্রান্তিক কোনো বৈশিষ্ট্য নয়; বরং অনুচ্ছেদ ১১ ও ৫৫ এবং মৌলিক অধিকার অধ্যায় একত্রে যে গণতান্ত্রিক কাঠামো কল্পনা করে, তার মূলভিত্তিই হলো এই বহুত্ববাদ। নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত
দায়ের ভিত্তিতে বিচারিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি নির্বাহী অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সব কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা কার্যত সমষ্টিগত শাস্তির শামিল, যা সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। এই অর্ডিন্যান্সটি আইনে পরিণত হলে তা হবে সংবিধানের ৩৬ থেকে ৪০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই অনুচ্ছেদগুলো চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশ, সংগঠন, চিন্তা ও বিবেক, মতপ্রকাশ এবং পেশার স্বাধীনতাকে সুরক্ষা প্রদান করেছে। যদিও এসব অধিকার আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতার অধীন হতে পারে, তবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় ‘যুক্তিসংগত’ বলতে সর্বদা আনুপাতিকতা, অপরিহার্যতা এবং প্রক্রিয়াগত সুরক্ষাকে বোঝানো হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের সভা, বক্তব্য, প্রকাশনা, অনলাইন অভিব্যক্তি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত—যা বছরের পর বছর চলতে
পারে—সার্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ কোনোভাবেই আনুপাতিক বা সীমিত বলা যায় না। এর ফলে ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে সাময়িক অভিযোগ লক্ষ লক্ষ সমর্থকের রাজনৈতিক অধিকার উপভোগের ক্ষেত্রে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, অথচ সংবিধান তাদের প্রত্যেককে একজন নাগরিক হিসেবে পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আরও গুরুতর হলো- সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যেখানে বলা হয়েছে যে, আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতীত জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি সাধনকারী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। নির্বাহী সন্তুষ্টি ও জনচাপ দ্বারা প্রভাবিত অধ্যাদেশনির্ভর এই নিষেধাজ্ঞা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তগুলো—আগাম নোটিস, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, যুক্তিসংগত ও কারণসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত, এবং অধিকার হরণের পূর্বে কার্যকর বিচারিক পর্যালোচনা—সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম
কোর্ট দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে, সংসদ ব্যাপকভাবে আইন প্রণয়ন করলেও নির্বাহী ক্ষমতা অবশ্যই বিচারযোগ্য ও সীমাবদ্ধ থাকবে। বর্তমান পদক্ষেপ সেই মৌলিক নীতিকে উল্টে দিতে যাচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কারাগারে আটক বা গণহারে দায়ের করা প্রায় অভিন্ন মামলার মুখোমুখি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও তৃণমূল পর্যায়ের হাজার হাজার কর্মীদের পরিস্থিতি আইনগতভাবে অত্যন্ত সংকটজনক করে তুললো। একবার নির্বাহী সিদ্ধান্তে কোনো রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করা হলে, সেই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পশ্চাদপটে গিয়ে অপরাধের দাগ বহন করে, ফলে ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায় ও বৈধ রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে চলমান মামলাগুলো এমন প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়, যেখানে গ্রেপ্তার ও আটক ব্যক্তি
সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর নয়, বরং ধারণাভিত্তিক সমষ্টিগত দোষারোপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ ধরনের অবস্থান সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের আলোকে আইনের সুরক্ষার অধিকার লঙ্ঘন করে এবং পরোক্ষভাবে আগাম শাস্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। একই সঙ্গে এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মৌল নীতিগুলোকেও লঙ্ঘন করে— “নেমো জুডেক্স ইন কসা সুয়া” নীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্র নিজেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষে পরিণত হয়, আর “অডি অল্টারাম পার্টেম” নীতির পরিপন্থী কোনো আদালতের রায় ছাড়াই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ব্যক্তিদের কার্যত দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আইনের শাসনের অধীনে ফৌজদারি বিচার অপরাধমূলক আচরণ বিচার করে, রাজনৈতিক পরিচয় নয়। বিচারাধীন অবস্থায় সংগঠন ও মতপ্রকাশকে অপরাধে পরিণত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র ন্যায্য বিচার অধিকারের বাস্তব প্রয়োগকে অর্থহীন
করে তোলে, বন্দিদের প্রকাশ্যে বা সাংগঠনিকভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সক্ষমতা সংকুচিত করে এবং বিচার-পূর্ব আটককে অনির্দিষ্টকালের রাজনৈতিক অন্তরীণতায় রূপান্তরিত করে—যা সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং আইনি দৃষ্টিতে অসহনীয়। দেশীয় আইনের গণ্ডি ছাড়িয়ে এ নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকে তার বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের অবস্থানে দাঁড় করায়। বাংলাদেশ ২০০০ সালে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এ যোগ দেয়। এই চুক্তির ১৯, ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সংগঠনের স্বাধীনতা সুরক্ষা দেয়, যার মধ্যে রাজনৈতিক দল গঠন ও তাতে অংশগ্রহণের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। এসব অধিকারের ওপর যেকোনো সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আইনের দ্বারা নির্ধারিত হতে হবে এবং বৈধ উদ্দেশ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১১ গৃহীত সাধারণ মন্তব্য নং ৩৪-এ জোর দিয়ে বলেছে যে, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য এবং রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞা প্রাথমিকভাবেই ১৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসঙ্গত। পরবর্তীতে ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০ গৃহীত সাধারণ মন্তব্য নং ৩৭‑এ সমাবেশের অধিকার প্রসঙ্গে জনশৃঙ্খলার নামে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দমনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সতর্কতা প্রদান করা হয়। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকরাও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ২১শে মে ২০১২ তারিখে মানবাধিকার পরিষদে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে (A/HRC/20/27) শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকারের বিশেষ প্রতিবেদক উল্লেখ করেন যে, কঠোর অপরিহার্যতার মানদণ্ড পূরণকারী স্বাধীন আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংগঠন স্থগিত বা বিলুপ্ত করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। একইভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ২৯শে আগস্ট ২০১৮ তারিখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে (A/73/348) নিরাপত্তার যুক্তিতে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংগঠনের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞাকে খামখেয়ালি হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আন্তর্জাতিক বিচারিক রায়ও এই নীতিগুলোকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। ৯ই জুলাই ২০০৪ তারিখে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দেওয়াল নির্মাণের আইনি পরিণতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতে বলা হয় যে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের সময়েও মানবাধিকার চুক্তিসমূহ প্রযোজ্য থাকে এবং ব্যাপক নির্বাহী ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলো স্থগিত করা যায় না। এর আগেই, ২৭শে জুন ১৯৮৬ তারিখে নিকারাগুয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র মামলায় আইসিজে জোর দিয়ে উল্লেখ করে যে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতেও রাষ্ট্রীয় আচরণ অবশ্যই আইন ও অখামখেয়ালিপনার নীতির অধীন থাকতে হবে। এ সবকিছুর অর্থ এই নয় যে, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সহিংসতার সময় সংঘটিত গুরুতর অপরাধের তদন্ত ও বিচার এড়িয়ে যাওয়া যাবে। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় শুধু বৈধই নয়, বরং অপরিহার্য। কিন্তু সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন যেটি নিষিদ্ধ করে, তা হলো যথাযথ প্রক্রিয়ার স্থলে রাজনৈতিক নিশ্চিহ্নকরণ আরোপ করা। একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক জীবনকে অধ্যাদেশ ও সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্র জবাবদিহিতাকে প্রতিশোধে রূপান্তরিত করার ঝুঁকি নিচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাশুল দিতে হবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক গণতন্ত্রকেই—সব নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার ক্রমক্ষয়ের মাধ্যমে এবং এমন এক নির্বাহী ক্ষমতার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে, যা সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনকে অতিক্রম করে নিজেকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যদিও এই আইনগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অঙ্গীকার রাষ্ট্র নিজেই ইতিপূর্বে করেছে।
হয়েছে—বাংলাদেশের সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনি অঙ্গীকারের সঙ্গে এক গভীর ও উদ্বেগজনক বিচ্ছেদকে স্পষ্ট করে। এর আগেই, ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করা হয়। সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সিদ্ধান্তটি সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে সংবিধানের সর্বোচ্চ অবস্থান ঘোষণা করা হয়েছে এবং সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো নির্বাহী বা আইনগত কার্যক্রমকে বাতিল ও অকার্যকর বলে গণ্য করা হয়েছে। রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও প্রতিযোগিতামূলক দলীয় রাজনীতি সংবিধানের প্রান্তিক কোনো বৈশিষ্ট্য নয়; বরং অনুচ্ছেদ ১১ ও ৫৫ এবং মৌলিক অধিকার অধ্যায় একত্রে যে গণতান্ত্রিক কাঠামো কল্পনা করে, তার মূলভিত্তিই হলো এই বহুত্ববাদ। নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত
দায়ের ভিত্তিতে বিচারিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি নির্বাহী অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সব কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা কার্যত সমষ্টিগত শাস্তির শামিল, যা সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। এই অর্ডিন্যান্সটি আইনে পরিণত হলে তা হবে সংবিধানের ৩৬ থেকে ৪০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই অনুচ্ছেদগুলো চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশ, সংগঠন, চিন্তা ও বিবেক, মতপ্রকাশ এবং পেশার স্বাধীনতাকে সুরক্ষা প্রদান করেছে। যদিও এসব অধিকার আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতার অধীন হতে পারে, তবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় ‘যুক্তিসংগত’ বলতে সর্বদা আনুপাতিকতা, অপরিহার্যতা এবং প্রক্রিয়াগত সুরক্ষাকে বোঝানো হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের সভা, বক্তব্য, প্রকাশনা, অনলাইন অভিব্যক্তি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত—যা বছরের পর বছর চলতে
পারে—সার্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ কোনোভাবেই আনুপাতিক বা সীমিত বলা যায় না। এর ফলে ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে সাময়িক অভিযোগ লক্ষ লক্ষ সমর্থকের রাজনৈতিক অধিকার উপভোগের ক্ষেত্রে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, অথচ সংবিধান তাদের প্রত্যেককে একজন নাগরিক হিসেবে পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আরও গুরুতর হলো- সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যেখানে বলা হয়েছে যে, আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতীত জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি সাধনকারী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। নির্বাহী সন্তুষ্টি ও জনচাপ দ্বারা প্রভাবিত অধ্যাদেশনির্ভর এই নিষেধাজ্ঞা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্তগুলো—আগাম নোটিস, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, যুক্তিসংগত ও কারণসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত, এবং অধিকার হরণের পূর্বে কার্যকর বিচারিক পর্যালোচনা—সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম
কোর্ট দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে, সংসদ ব্যাপকভাবে আইন প্রণয়ন করলেও নির্বাহী ক্ষমতা অবশ্যই বিচারযোগ্য ও সীমাবদ্ধ থাকবে। বর্তমান পদক্ষেপ সেই মৌলিক নীতিকে উল্টে দিতে যাচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কারাগারে আটক বা গণহারে দায়ের করা প্রায় অভিন্ন মামলার মুখোমুখি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও তৃণমূল পর্যায়ের হাজার হাজার কর্মীদের পরিস্থিতি আইনগতভাবে অত্যন্ত সংকটজনক করে তুললো। একবার নির্বাহী সিদ্ধান্তে কোনো রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করা হলে, সেই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পশ্চাদপটে গিয়ে অপরাধের দাগ বহন করে, ফলে ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায় ও বৈধ রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে চলমান মামলাগুলো এমন প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়, যেখানে গ্রেপ্তার ও আটক ব্যক্তি
সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর নয়, বরং ধারণাভিত্তিক সমষ্টিগত দোষারোপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ ধরনের অবস্থান সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের আলোকে আইনের সুরক্ষার অধিকার লঙ্ঘন করে এবং পরোক্ষভাবে আগাম শাস্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। একই সঙ্গে এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মৌল নীতিগুলোকেও লঙ্ঘন করে— “নেমো জুডেক্স ইন কসা সুয়া” নীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্র নিজেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষে পরিণত হয়, আর “অডি অল্টারাম পার্টেম” নীতির পরিপন্থী কোনো আদালতের রায় ছাড়াই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ব্যক্তিদের কার্যত দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আইনের শাসনের অধীনে ফৌজদারি বিচার অপরাধমূলক আচরণ বিচার করে, রাজনৈতিক পরিচয় নয়। বিচারাধীন অবস্থায় সংগঠন ও মতপ্রকাশকে অপরাধে পরিণত করার মাধ্যমে রাষ্ট্র ন্যায্য বিচার অধিকারের বাস্তব প্রয়োগকে অর্থহীন
করে তোলে, বন্দিদের প্রকাশ্যে বা সাংগঠনিকভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সক্ষমতা সংকুচিত করে এবং বিচার-পূর্ব আটককে অনির্দিষ্টকালের রাজনৈতিক অন্তরীণতায় রূপান্তরিত করে—যা সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং আইনি দৃষ্টিতে অসহনীয়। দেশীয় আইনের গণ্ডি ছাড়িয়ে এ নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকে তার বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের অবস্থানে দাঁড় করায়। বাংলাদেশ ২০০০ সালে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এ যোগ দেয়। এই চুক্তির ১৯, ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সংগঠনের স্বাধীনতা সুরক্ষা দেয়, যার মধ্যে রাজনৈতিক দল গঠন ও তাতে অংশগ্রহণের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। এসব অধিকারের ওপর যেকোনো সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আইনের দ্বারা নির্ধারিত হতে হবে এবং বৈধ উদ্দেশ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১১ গৃহীত সাধারণ মন্তব্য নং ৩৪-এ জোর দিয়ে বলেছে যে, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য এবং রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞা প্রাথমিকভাবেই ১৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসঙ্গত। পরবর্তীতে ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০ গৃহীত সাধারণ মন্তব্য নং ৩৭‑এ সমাবেশের অধিকার প্রসঙ্গে জনশৃঙ্খলার নামে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দমনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সতর্কতা প্রদান করা হয়। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকরাও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ২১শে মে ২০১২ তারিখে মানবাধিকার পরিষদে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে (A/HRC/20/27) শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকারের বিশেষ প্রতিবেদক উল্লেখ করেন যে, কঠোর অপরিহার্যতার মানদণ্ড পূরণকারী স্বাধীন আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংগঠন স্থগিত বা বিলুপ্ত করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। একইভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ২৯শে আগস্ট ২০১৮ তারিখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে (A/73/348) নিরাপত্তার যুক্তিতে রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংগঠনের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞাকে খামখেয়ালি হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আন্তর্জাতিক বিচারিক রায়ও এই নীতিগুলোকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। ৯ই জুলাই ২০০৪ তারিখে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দেওয়াল নির্মাণের আইনি পরিণতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতে বলা হয় যে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের সময়েও মানবাধিকার চুক্তিসমূহ প্রযোজ্য থাকে এবং ব্যাপক নির্বাহী ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলো স্থগিত করা যায় না। এর আগেই, ২৭শে জুন ১৯৮৬ তারিখে নিকারাগুয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র মামলায় আইসিজে জোর দিয়ে উল্লেখ করে যে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতেও রাষ্ট্রীয় আচরণ অবশ্যই আইন ও অখামখেয়ালিপনার নীতির অধীন থাকতে হবে। এ সবকিছুর অর্থ এই নয় যে, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সহিংসতার সময় সংঘটিত গুরুতর অপরাধের তদন্ত ও বিচার এড়িয়ে যাওয়া যাবে। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় শুধু বৈধই নয়, বরং অপরিহার্য। কিন্তু সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন যেটি নিষিদ্ধ করে, তা হলো যথাযথ প্রক্রিয়ার স্থলে রাজনৈতিক নিশ্চিহ্নকরণ আরোপ করা। একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক জীবনকে অধ্যাদেশ ও সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্র জবাবদিহিতাকে প্রতিশোধে রূপান্তরিত করার ঝুঁকি নিচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাশুল দিতে হবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক গণতন্ত্রকেই—সব নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার ক্রমক্ষয়ের মাধ্যমে এবং এমন এক নির্বাহী ক্ষমতার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে, যা সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনকে অতিক্রম করে নিজেকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যদিও এই আইনগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অঙ্গীকার রাষ্ট্র নিজেই ইতিপূর্বে করেছে।



