সৈয়দ বদরুল আহসান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
আরও খবর
বহু নারী-শিশুকে অন্যায়ভাবে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ
দূষণের মাত্রা বেড়েছে ঢাকার বাতাসে
শিশু হত্যা ও ধর্ষণ: রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নাকি সমাজের অবক্ষয়?
স্বাধীনতোত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদ
‘মে মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতন ৩২৬, ধর্ষণ বেড়েছে ৪৪ শতাংশ’
‘ভ্যানিটি ব্যাগে পদত্যাগপত্র’ — মতিউর রহমান চৌধুরীর দাবি সত্য হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবৈধ?
হামে মৃত্যু ছাড়াল ৫৮৩ — থামছে না শিশুমৃত্যুর মিছিল
তোফায়েল আহমেদ: ইতিহাসের এক অবিনাশী অধ্যায়
বাংলাদেশ আজও ইতিহাসবিরোধিতার নিষ্ঠুর চক্রে আটকে আছে। এই সত্য আরও একবার প্রমাণিত হলো গত সপ্তাহে, যখন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি অগণতান্ত্রিক ও অসম্পূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণে যে নির্লিপ্ততা দেখাল, তা কেবল অকৃতজ্ঞতা নয় — এটি ইতিহাসের সঙ্গে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো শোকবার্তা এলো না। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার নাগরিক প্রচেষ্টাকে ক্ষমতাসীনরা বাধা দিল। জানাজায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ওঠামাত্র পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং কোনো কারণ ছাড়াই বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করল। সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকে জানাজার পরপরই ‘নিরাপত্তার’ অজুহাত দেখিয়ে গাড়িতে তুলে নেওয়া হলো। ভোলায় — তোফায়েল
আহমেদের নিজের জমিনে — বিএনপির অনুগত গোষ্ঠী জানাজা পর্যন্ত ঠেকানোর চেষ্টা করল। যে মানুষ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগুনে বাংলার তারুণ্যকে একত্রিত করেছিলেন, তাঁকে মৃত্যুর পরও রাষ্ট্র শ্রদ্ধা জানাতে পারল না — এটি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির আত্মার ক্ষতি। কিন্তু এত কিছুও তোফায়েল আহমেদের জাতীয় মর্যাদা এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসের যেকোনো নিরপেক্ষ মূল্যায়নে তাঁর স্থান থাকবে অগ্রভাগে — কারণ তিনি কেবল ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন না, তিনি ইতিহাস নির্মাতাও ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে আইয়ুব খানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে যে দুর্বার গণজোয়ার উঠেছিল, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সেই আন্দোলনের জ্বলন্ত কণ্ঠস্বর। পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র আন্দোলনকে তিনি বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও কারাবন্দী
শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবির সঙ্গে একসূত্রে গেঁথেছিলেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে রাওয়ালপিন্ডির ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইরত বাঙালি তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার হলে কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির সামনে উপস্থাপনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়েছিল তোফায়েল আহমেদের কাঁধে। সেই জনসমুদ্রে তিনিই সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন — বাংলার বন্ধু। এই একটি মুহূর্তই তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে কারাবরণ, ৩৩ মাস জিয়াউর রহমানের কারাগারে কাটানো — প্রতিটি পরীক্ষায় তোফায়েল আহমেদ তাঁর আদর্শের প্রতি অটল থেকেছেন। যে সময়ে তাঁর সমসাময়িক অনেক নেতা দল
ও আদর্শ পরিবর্তন করেছেন, তখনও তিনি বিচ্যুত হননি। “তুমি আমার সাথে বাংলায় কথা বলছ না কেন?” — কোয়েটায় এক তরুণকে এই কথা বলেছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সারাজীবন এই বাংলার জন্যই লড়েছিলেন তিনি। কিছু বছর আগে একটি লাইভ টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি এক বিএনপি নেতার মিথ্যা প্রচারণা রুখে দেন — যিনি দাবি করছিলেন যে ১৯৭৪ সালে লাহোরে ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘৃণ্য রাজাকার শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন। তোফায়েল আহমেদ, যিনি সেই প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন, নির্ভীকভাবে সেই মিথ্যা খণ্ডন করেন। দেখা গেল, ছবিতে যাকে শাহ আজিজ বলা হচ্ছিল, তিনি আসলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফজলে এলাহী চৌধুরী। ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে এই লড়াইই ছিল তাঁর জীবনের শেষ
যুদ্ধগুলোর একটি। তোফায়েল আহমেদ চলে গেছেন। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর অমরত্ব নিশ্চিত। তাঁর জীবনের গল্প — এবং তাঁর প্রজন্মের অন্য সংগ্রামীদের গল্প — নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন জরুরি। বিশেষত এই সময়ে, যখন ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক অবৈধতার ধারাবাহিকতায় আবারও ইতিহাসের ঘড়ি পেছনে ঠেলার চেষ্টা চলছে। একটি জাতি যদি তার নির্মাতাদের ভুলে যায়, তাহলে সে জাতি নিজেকেই ভুলে যায়। তোফায়েল আহমেদকে ভুলে যাওয়া মানে বাংলাদেশকে ভুলে যাওয়া।
আহমেদের নিজের জমিনে — বিএনপির অনুগত গোষ্ঠী জানাজা পর্যন্ত ঠেকানোর চেষ্টা করল। যে মানুষ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগুনে বাংলার তারুণ্যকে একত্রিত করেছিলেন, তাঁকে মৃত্যুর পরও রাষ্ট্র শ্রদ্ধা জানাতে পারল না — এটি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির আত্মার ক্ষতি। কিন্তু এত কিছুও তোফায়েল আহমেদের জাতীয় মর্যাদা এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসের যেকোনো নিরপেক্ষ মূল্যায়নে তাঁর স্থান থাকবে অগ্রভাগে — কারণ তিনি কেবল ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন না, তিনি ইতিহাস নির্মাতাও ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে আইয়ুব খানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে যে দুর্বার গণজোয়ার উঠেছিল, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সেই আন্দোলনের জ্বলন্ত কণ্ঠস্বর। পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র আন্দোলনকে তিনি বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও কারাবন্দী
শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবির সঙ্গে একসূত্রে গেঁথেছিলেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে রাওয়ালপিন্ডির ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইরত বাঙালি তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার হলে কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির সামনে উপস্থাপনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়েছিল তোফায়েল আহমেদের কাঁধে। সেই জনসমুদ্রে তিনিই সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন — বাংলার বন্ধু। এই একটি মুহূর্তই তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে কারাবরণ, ৩৩ মাস জিয়াউর রহমানের কারাগারে কাটানো — প্রতিটি পরীক্ষায় তোফায়েল আহমেদ তাঁর আদর্শের প্রতি অটল থেকেছেন। যে সময়ে তাঁর সমসাময়িক অনেক নেতা দল
ও আদর্শ পরিবর্তন করেছেন, তখনও তিনি বিচ্যুত হননি। “তুমি আমার সাথে বাংলায় কথা বলছ না কেন?” — কোয়েটায় এক তরুণকে এই কথা বলেছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সারাজীবন এই বাংলার জন্যই লড়েছিলেন তিনি। কিছু বছর আগে একটি লাইভ টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি এক বিএনপি নেতার মিথ্যা প্রচারণা রুখে দেন — যিনি দাবি করছিলেন যে ১৯৭৪ সালে লাহোরে ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘৃণ্য রাজাকার শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন। তোফায়েল আহমেদ, যিনি সেই প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন, নির্ভীকভাবে সেই মিথ্যা খণ্ডন করেন। দেখা গেল, ছবিতে যাকে শাহ আজিজ বলা হচ্ছিল, তিনি আসলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফজলে এলাহী চৌধুরী। ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে এই লড়াইই ছিল তাঁর জীবনের শেষ
যুদ্ধগুলোর একটি। তোফায়েল আহমেদ চলে গেছেন। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর অমরত্ব নিশ্চিত। তাঁর জীবনের গল্প — এবং তাঁর প্রজন্মের অন্য সংগ্রামীদের গল্প — নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন জরুরি। বিশেষত এই সময়ে, যখন ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক অবৈধতার ধারাবাহিকতায় আবারও ইতিহাসের ঘড়ি পেছনে ঠেলার চেষ্টা চলছে। একটি জাতি যদি তার নির্মাতাদের ভুলে যায়, তাহলে সে জাতি নিজেকেই ভুলে যায়। তোফায়েল আহমেদকে ভুলে যাওয়া মানে বাংলাদেশকে ভুলে যাওয়া।



