ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন: ভুল কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ
শেখ হাসিনার ‘চক্ষু রাঙানি উপেক্ষা’ বনাম বর্তমানের ‘অনুমতি ভিক্ষা’: কোন পথে বাংলাদেশ?
এন্টিবায়োটিক ঔষধকে বাঁচান
দ্যা প্রজেক্ট ওসমান হাদি (হাদিমাদি) ও এর ভবিষ্যত
‘ইরানে হামলা প্রমাণ করে চীন ও ভারত এখনো মার্কিন প্রশাসনের আক্রমনের লক্ষ্যবস্তু’
বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রপতি, উদ্ধত শাসনব্যবস্থা এবং মব সন্ত্রাস
বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রপতি, উদ্ধত শাসনব্যবস্থা এবং মব সন্ত্রাস
শেখ মুজিব-বাঙালির একমাত্র মাহানায়ক
গত শতকের সাতচল্লিশ পূর্ববর্তি সময়ে অনেক বাঙালি রাজনৈতিক নেতা শত বছর ধরে শোষিত বাঙালি বা ভারতবাসির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির জন্য নানা ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রনয়ন করে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছিলেন । এদের মাঝে রাসবিহারী বসু, শরৎ চন্দ্র বসু, সুভাস চন্দ্র বসু (নেতাজি ) এ কে ফজুল হক, হোসেন শহিদ সোহরোওয়ার্দি, মাস্টারদা সূর্য সেনের নাম উল্লেখযোগ্য । সূর্য সেন ও সুভাস বসুর চিন্তা ছিল এক সশন্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করা যাবে । তারা চেষ্টা করেছিলেন সফল হন নি । হয়তো তাদের কৌশলে ভুল ছিল । জনগনকে তারা সাথে নিতে পারেননি । ইংরাজদের উপমহাদেশের জনগনের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি
করার পরিকল্পনার কারনে তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ব্যার্থ হন । এরই মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার নামে ভাগ হলো বাংলা আর পাঞ্জাব । এই ভাগের পিছনে ছিল ইংরেজদের দূরভিসন্ধিমূলক কূটকৌশল আর রাজনীতিবিদদের অপরিনামদর্শি চিন্তাধারা । অভিভক্ত বাংলায় বৃটিশ বিরোধী যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত শতকের ত্রিশের দশকে সে আন্দোলনে একজন রাজপথের সৈনিক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন ১৯২০ সালে ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া কলকাতার ইসলামিয় কলেজ পড়ূয়া তরুণ ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। মা বাবার আদুরে নাম খোকা যিনি আজ বিশে^র বাঙালিদের কাছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হিসেবে পরিচিত । এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ বছর
১৭ মার্চ তাঁর জন্মের ১০৬ বছর পূর্তি হবে । এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশে হবেনা কোন সভা সমাবেশ, গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে না কোন অনুষ্ঠান আরা কেউ যদি এমন কিছু করার চেষ্ঠা করেন তা হলে তাকে নির্ঘাত যেতে হবে কারাগারে কারণ এই মুহুর্তে দেশে যে সরকার আছে তারা বাঙলা, বাঙালি আর বাংলাদেশের চিন্তাধারায় বিশ্বাস করেন না । তাদের মতে শেখ মুজিব ১৯৭১ সালে স্বাধিন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে তাদের প্রিয় পাকিস্তানের অভূতপূর্ব ক্ষতি করেছেন । তারা প্রায় সকলেই নিজেেেদর ১৯৭১ সাল বা তার পূর্বের পাকিস্তানিদেও ঔরষজাত সন্তান বলে মনে করেন । বাংলাদেশকে এই পাকিস্তান বানানোর কর্মসূচিটা সূতন করের শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই
মাসে যখন একটি দেশীয় ও বিদেশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্ভর যড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করে বিদেশ হতে ড. ইউনুসের মতো আর একজন পাকিস্তানি চিন্তাধারার মানুষকে উড়িয়ে এনে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন । পরবর্তি দেড় বছরে তিনি ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সম্পূর্ন ভাবে ধ্বংস করেছেন । বাল্যকাল থেকেই মুজিব যা কিছুকে সঠিক মনে করতেন তার প্রতিবাদ করছেন । পড়া লেখার হাতেখড়ি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে । এই জেলায় মুসলিম, দলিত ও মতুয়া সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুরা সব সময় নানা ধরণের বৈষম্যের স্বীকার হতেন । দলতি ও মতুয়ারাতো সাধারণত স্কুলেই ভর্তি হতে পারতো না । টুঙ্গিপাড়ার মতুয়াদের
বিখ্যাত ধর্মগুরু হরিচান্দ ঠাকুরতো কোন স্কুলে ভর্তি হতে না পেরে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু করেছিলেন একটি মাদ্রাসায় । ২০২১ সালে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বঙ্গবন্ধু জন্ম শত বর্ষে ঢাকা আসেন তিনি কিছু সময়ের জন্য গিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে ও হরিচাঁন্দ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত ওরাকান্দা মন্দিরে পুজো দিতে । স্কুলে ক্লাসের সামনের সীটে বসা ছিল মুসলমান আর নিম্নবর্গের হিন্দুদের জন্য নিষিদ্ধ । এই প্রথা ভাঙ্গেন বালক শেখ মুজিব । স্কুলের প্রথম দিনেই তিনি গিয়ে বসলেন সামনের বেঞ্চে । ক্লাসের অন্যান্য ছাত্ররা এতে কিছুটা সংকিত হলেও শ্রেণীর শিক্ষক গিরিশ বাবু ঘটনাটি এড়িয়ে যান কারণ তিনি শেখ পরিবারের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে
ওয়াকিবাহাল ছিলেন । হাইস্কুল পাশ করার পর, শেখ মুজিবকে ১৯৪২ সালে কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) পডার জন্য কোলকাতায় পাঠানো হয, এবং সেখানে তার দিনগুলি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত গঠন করে। তিনি মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস উভয়ের রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শে আসেন। এটা এমন একটা সময় যখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নেতাজি সুভাষ বোস এবং মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল আর অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে তছনছ করে দিচ্ছিল । মুজিবের প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন নেতাজি, গান্ধী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন সোহরাওয়ার্দী , শরৎ চন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিমের মতো রাজনীতিবিদদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। মুজিব কোলকাতা যাওয়ার আগেই নেতাজি ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়ে
জার্মানি চলে গিয়েছিলেন । ১৯৪৩ সালে, ব্রিটিশ সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণে, বাংলা একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় যাতে প্রায় পঁঞ্চাশ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায় । এই দূর্ভিক্ষের জন্য বিভিন্ন গবষেক বৃটেনের যুদ্ধকালিন প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দায়ি করেন । স্কুল জীবন থেকেই মুজিব একজন ভালো সংগঠক ছিলেন এবং তিনি অবিলম্বে কলকাতা ও গোপালগঞ্জের ক্ষুধার্ত মানুষদের সাহায্য করার জন্য ত্রাণ দল গঠন করেছিলেন। এই সময় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী বলা হয়) ছিলেন মুসলিম লীগের খাজা নাজিম উদ্দিন । হোসেন শহীদ সোহরাওর্দী ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী । দূেির্ভক্ষের সময় মুজিবের মানবিক কাজ তাকে সোহরাওয়ার্দির কাছাকাছি নিয়ে আসে। সোহরাওয়ার্দি পরবর্তীতে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরুতে পরিণত হন। বাংলার দুর্ভিক্ষ বাংলার রাজনীতিতে ও রাজনীতিবিদরে চিন্তাধারায় সামগ্রিক পরিবর্তন এনেছিল। মুসলিম লীগ, কংগ্রেস এবং অন্যান্য ছোটখাটো দলগুলির রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চিত ছিলেন যে সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য, ব্র্রিটিশদের ভারত ত্যাগ করতে হবে এবং ভারতকে তার প্রাপ্য স্বাধীনতা দিতে হবে। ব্রটিশরা চলে গেলে ভারতের কী হবে সে সম্পর্কে বেশ কিছু বিকল্প ছিল। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশ্ন উঠলো ভারত কি একটি একক দেশ থাকবে নাকি তাকে ইংরেজদের সুবিধা অনুযায়ি খন্ডিত করা হবে এই বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু করে। এই কাজটি তারা অত্যন্ত সফলতার সাথে মধ্যপ্রাচ্যে করেছিল । মুজিব তাঁর আত্মজীবনি মূলক গ্রন্থ ‘দ্য আনফিনিশড মেমোয়ার্সে-এ লিখেছেন: “এটি (পরিকল্পনা) অনুসারে, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র দফতর এবং যোগাযোগ মন্ত্রক কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে থাকবে এবং বাকি মন্ত্রকগুলি নব গঠিত প্রদেশগুলিতে ফিরে যাবে । প্রথমে কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন মেনে নিলেও পরে তারা তাদের এই সিদ্ধান্ত হতে সরে আসে । এর পিছনে বড় ভ’মিকা ছিল কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরুর । ফলস্বরূপ, ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হয়েছিল।” এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন হতো তা হলে ভারত একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হতো হবে এবং ভারতের বিভাজন এড়ানো সম্ভব হতো । গান্ধী পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য প্রস্তাব করেছিলেন ভারতকে এক রাখার স্বার্থে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত জিন্নাহ। নেহেরু গান্ধীর প্রস্তাবে সায় দেন নি । মুজিব লিখেছেন, ” আমার কাছে মনে হয়েছিল ব্রিটিশরা, ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা (অন্যটি মুসলিম লীগ) হস্তান্তর করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারত ত্যাগ করতে চায়। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ সরকারকে ভালোভাবে জানতেন এবং তাঁর মতো কাউকে ধোঁকা দেওয়া সহজ ছিল না। এই প্রেক্ষাপটেই জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন যে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট হবে “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে” । মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমির জন্য ‘মুসলিম সংহতি’ প্রদর্শনের দিন। তিনি একটি বিবৃতি দিয়ে সবাইকে এই দিনটি শান্তিপূর্ণ ভাবে পালন করার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতের দশ কোটি মুসলমান যে কোনো মূল্যে পাকিস্তান অর্জন করতে বদ্ধপরিকর। কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার নেতারা দাবি করে বিবৃতি দিতে শুরু করে যে “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে” আসলে তাদের বিরুদ্ধে ডাকা হয়েছিল।” তাদের এই বক্তব্য মোটেও সত্য ছিল না । মুসলিম লীগ নেতারা সেদিন পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই দাঙ্গায় জড়িয়ে পরে যার ফলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ (মুসলমান ও হিন্দু উভয়ই ) প্রাণ হারায় । এ’সময় মুজিব এবং তার তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা উভয় সম্প্রদাযয়ের মানুষকে রক্ষা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রক্তপাত ছিল বেশ ভারী। দাঙ্গা চলে তিন দিন। এই একটি ঘটনাই তরুণ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনকে বদলে দেয় এবং তার কাছে ভারত বিভাজন তখন অনিবার্য মনে হয় । ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট মধ্যরাতে ঘটে উপমহাদেশের ইতিহাসে সব চেয়ে বড় ট্রাজেডি । যে ভারতবর্ষ আবহমনা ধরে একটি অটুট একক সত্তা ছিল-কিছু স্বার্থপর রাজনীতিবিদ এবং ধূর্ত ব্রিটিশদের নিজ স্বার্থের বলি হয়ে বিভক্তির মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামক পৃথক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয় । ওই একটি ঘটনা চিরকালের জন্য এ অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রতি বিনষ্ট করেছে । আপনকে করেছে পর আর নিজ দেশে কোটি মানুষকে করেছে পরবাসি । তরুণ মুজিব নিজেকে কোলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানন্তিরত করেন ১৯৪৭ সালে । কিছু সময়ের জন্য পূর্বের ধারাবাহিকতায় তিনি মুসলিম লীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। মুজিবের রাজননৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৯৪৮ সাল । সে বছর মার্চ মাসের ২১ তারিখ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ঢাকা সফর মুজিবের রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে দেয়। জিন্নাহ নিজে উর্দুর একটি শব্দও বলতে পারতেন না কিন্তু রমনার রেসকোর্সে এক জনসভায়া বক্তৃতা দিতে গিয়ে ইংরেজিতে বলেছিলেন যে উর্দু-যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ (অধিকাংশই উত্তর প্রদেশর ও বিহার হতে আসা মোহাজেরদের ভাষা ) পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। এই ঘোষণাই ছিল অখন্ড পাকিস্তানের কফিনে প্রথম পেরেক । সাধারণ জনগণ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর জন্য এক বিশেষ সমাবর্তেনে তিনি একই কথা উচ্চারণ করলে বিশ^বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা এই অপরিনামদর্শী বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায় । সেই সমার্বতনে উপস্থিত ছিলেন মুজিব। মুজিব একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন । তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে পাকিস্তানি শাসতদের বিভিন্ন ধরণের অন্যায় নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই ধরনের বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবে না। প্রতিবাদকে একটি সংগঠিত আন্দোলনে পরিণত করার জন্য তাদের একটি সংগঠনের প্রয়োজন হবে । তাঁর হাতেই ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের জন্ম হয় (পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়) । ছাত্রনেতা হিসেবে এটিই ছিল পূর্ব বাংলায় মুজিবের রাজনীতিতে প্রথম পদক্ষেপ। পরের বছর, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নামে নামকরণ করা হয় । ) প্রতিষ্ঠিত হয় । আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুজিব জীবনের অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের ১৩ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন শ্রেফ বাঙালিদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার জন্য । পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা আওয়ামী লীগকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করেছিল । এটিই একমাত্র দল যা পাকিস্তানের ‘ঐক্যে’র জন্য সবসময় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে । ২০২৪ এর জুলাই এর পর ড. ইউনুস নিজ ক্ষমতা বলে এক নির্বাহি আদেশের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রম সম্পূর্ণূ বেআইনি ভাবে আবার নিষিদ্ধ করেন । মুজিব দুটি পৃথক সময়ে মৃত্যু’র মুখোমুখি হন। একবার ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আর দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৬৯ সালে এক তিব্র গণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ছাত্র জনতা আর দেশের মানুষের কাছ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’-বাংলার বন্ধু উপাধি লাভ করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এক অভূতপূর্ব বিজয়ের পর নানা ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষাপটে শুরু হয় পাকিস্তানে বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যার সফল সমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর । দেশের জন্য এই যুদ্ধের নিজের জীবন উৎসর্গ করেস ত্রিশ লক্ষ মানুষ । এই প্রেক্ষাপটে মুজিব একটি নতুন জাতির পিতা হিসাবে জনগনের স্বিকৃতি লাভ করেন। মুজিব হয়ে উঠেন মুক্তিকামি বিশ্বের এক উজ্জল নক্ষত্র । স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দেশে মুজিক বেঁচে ছিলন সাড়ে তিন বছর । ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রাতে মুজিবকে পাকিস্তানপস্থি একদল সেনা সদ্যসের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে জীবন দিতে হয় । যে দেশটির জন্য মুজিব আজীবন ক্লান্তিহীন সংগ্রাম করেছেন সেই দেশে মুজিব মাত্র ৫২ বছর বেঁচে ছিলেন। তার জীবদ্দশায় শেখ মুজিব শুধু এই উপমহাদেশের ইতিহাস ও ভূগোল পরিবর্তনই দেখেননি; তিনি তার অংশ ছিলেন । তিনি তিনটি পতাকার নিচে বসবাস করছেন, জন্মের সময় দেশভাগ পর্যন্ত ব্রিটিশ, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের পতাকার নিচে বসবাস করেন, যার সৃষ্টিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন সত্যিকারের নেতা যার দূরদৃষ্টি ছিল এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন। তাঁর আত্মা শাস্তিতে থাকুক এবং তাঁর স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকুক। ইতিহাস মনে রাখে শুধু নায়কদের, ভুলে যায় খলনায়কদের। জোসেফ ক্যাম্পবেল, একজন আমেরিকান সাহিত্যের অধ্যাপক, লিখেছেন: “একজন নায়ক হলেন এমন একজন মানুষ যিনি নিজের জীবনকে নিজের চেয়ে বড় কিছুর জন্য উৎসর্গ করেছেন।” এই জাতির ইতিহাসে মুজিবের অবদানের মূল্যায়ন করলে এর চেয়ে সত্য কথা আর কিছু হতে পারে না। এই বছর জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে হয়তো তাঁর সৃষ্টি এই দেশে তেমন কিছু হবে না কিস্তু তিনি ইতিহাসের বরপূত্র হিসেবে হাজার বছর বেঁচে থাকবেন এই দেশের মানুষের হৃদয়ে । জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু । লেখক সৈয়দ ইফতেখার হোসেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ১৭ই মার্চ, ২০২৬
করার পরিকল্পনার কারনে তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ব্যার্থ হন । এরই মধ্যে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার নামে ভাগ হলো বাংলা আর পাঞ্জাব । এই ভাগের পিছনে ছিল ইংরেজদের দূরভিসন্ধিমূলক কূটকৌশল আর রাজনীতিবিদদের অপরিনামদর্শি চিন্তাধারা । অভিভক্ত বাংলায় বৃটিশ বিরোধী যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত শতকের ত্রিশের দশকে সে আন্দোলনে একজন রাজপথের সৈনিক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন ১৯২০ সালে ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া কলকাতার ইসলামিয় কলেজ পড়ূয়া তরুণ ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। মা বাবার আদুরে নাম খোকা যিনি আজ বিশে^র বাঙালিদের কাছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হিসেবে পরিচিত । এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ বছর
১৭ মার্চ তাঁর জন্মের ১০৬ বছর পূর্তি হবে । এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশে হবেনা কোন সভা সমাবেশ, গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে না কোন অনুষ্ঠান আরা কেউ যদি এমন কিছু করার চেষ্ঠা করেন তা হলে তাকে নির্ঘাত যেতে হবে কারাগারে কারণ এই মুহুর্তে দেশে যে সরকার আছে তারা বাঙলা, বাঙালি আর বাংলাদেশের চিন্তাধারায় বিশ্বাস করেন না । তাদের মতে শেখ মুজিব ১৯৭১ সালে স্বাধিন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে তাদের প্রিয় পাকিস্তানের অভূতপূর্ব ক্ষতি করেছেন । তারা প্রায় সকলেই নিজেেেদর ১৯৭১ সাল বা তার পূর্বের পাকিস্তানিদেও ঔরষজাত সন্তান বলে মনে করেন । বাংলাদেশকে এই পাকিস্তান বানানোর কর্মসূচিটা সূতন করের শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই
মাসে যখন একটি দেশীয় ও বিদেশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্ভর যড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করে বিদেশ হতে ড. ইউনুসের মতো আর একজন পাকিস্তানি চিন্তাধারার মানুষকে উড়িয়ে এনে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন । পরবর্তি দেড় বছরে তিনি ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সম্পূর্ন ভাবে ধ্বংস করেছেন । বাল্যকাল থেকেই মুজিব যা কিছুকে সঠিক মনে করতেন তার প্রতিবাদ করছেন । পড়া লেখার হাতেখড়ি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে । এই জেলায় মুসলিম, দলিত ও মতুয়া সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুরা সব সময় নানা ধরণের বৈষম্যের স্বীকার হতেন । দলতি ও মতুয়ারাতো সাধারণত স্কুলেই ভর্তি হতে পারতো না । টুঙ্গিপাড়ার মতুয়াদের
বিখ্যাত ধর্মগুরু হরিচান্দ ঠাকুরতো কোন স্কুলে ভর্তি হতে না পেরে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু করেছিলেন একটি মাদ্রাসায় । ২০২১ সালে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বঙ্গবন্ধু জন্ম শত বর্ষে ঢাকা আসেন তিনি কিছু সময়ের জন্য গিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে ও হরিচাঁন্দ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত ওরাকান্দা মন্দিরে পুজো দিতে । স্কুলে ক্লাসের সামনের সীটে বসা ছিল মুসলমান আর নিম্নবর্গের হিন্দুদের জন্য নিষিদ্ধ । এই প্রথা ভাঙ্গেন বালক শেখ মুজিব । স্কুলের প্রথম দিনেই তিনি গিয়ে বসলেন সামনের বেঞ্চে । ক্লাসের অন্যান্য ছাত্ররা এতে কিছুটা সংকিত হলেও শ্রেণীর শিক্ষক গিরিশ বাবু ঘটনাটি এড়িয়ে যান কারণ তিনি শেখ পরিবারের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে
ওয়াকিবাহাল ছিলেন । হাইস্কুল পাশ করার পর, শেখ মুজিবকে ১৯৪২ সালে কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) পডার জন্য কোলকাতায় পাঠানো হয, এবং সেখানে তার দিনগুলি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যত গঠন করে। তিনি মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস উভয়ের রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শে আসেন। এটা এমন একটা সময় যখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নেতাজি সুভাষ বোস এবং মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল আর অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে তছনছ করে দিচ্ছিল । মুজিবের প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন নেতাজি, গান্ধী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন সোহরাওয়ার্দী , শরৎ চন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিমের মতো রাজনীতিবিদদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। মুজিব কোলকাতা যাওয়ার আগেই নেতাজি ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়ে
জার্মানি চলে গিয়েছিলেন । ১৯৪৩ সালে, ব্রিটিশ সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণে, বাংলা একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় যাতে প্রায় পঁঞ্চাশ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায় । এই দূর্ভিক্ষের জন্য বিভিন্ন গবষেক বৃটেনের যুদ্ধকালিন প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দায়ি করেন । স্কুল জীবন থেকেই মুজিব একজন ভালো সংগঠক ছিলেন এবং তিনি অবিলম্বে কলকাতা ও গোপালগঞ্জের ক্ষুধার্ত মানুষদের সাহায্য করার জন্য ত্রাণ দল গঠন করেছিলেন। এই সময় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী বলা হয়) ছিলেন মুসলিম লীগের খাজা নাজিম উদ্দিন । হোসেন শহীদ সোহরাওর্দী ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী । দূেির্ভক্ষের সময় মুজিবের মানবিক কাজ তাকে সোহরাওয়ার্দির কাছাকাছি নিয়ে আসে। সোহরাওয়ার্দি পরবর্তীতে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরুতে পরিণত হন। বাংলার দুর্ভিক্ষ বাংলার রাজনীতিতে ও রাজনীতিবিদরে চিন্তাধারায় সামগ্রিক পরিবর্তন এনেছিল। মুসলিম লীগ, কংগ্রেস এবং অন্যান্য ছোটখাটো দলগুলির রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চিত ছিলেন যে সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য, ব্র্রিটিশদের ভারত ত্যাগ করতে হবে এবং ভারতকে তার প্রাপ্য স্বাধীনতা দিতে হবে। ব্রটিশরা চলে গেলে ভারতের কী হবে সে সম্পর্কে বেশ কিছু বিকল্প ছিল। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশ্ন উঠলো ভারত কি একটি একক দেশ থাকবে নাকি তাকে ইংরেজদের সুবিধা অনুযায়ি খন্ডিত করা হবে এই বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু করে। এই কাজটি তারা অত্যন্ত সফলতার সাথে মধ্যপ্রাচ্যে করেছিল । মুজিব তাঁর আত্মজীবনি মূলক গ্রন্থ ‘দ্য আনফিনিশড মেমোয়ার্সে-এ লিখেছেন: “এটি (পরিকল্পনা) অনুসারে, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র দফতর এবং যোগাযোগ মন্ত্রক কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে থাকবে এবং বাকি মন্ত্রকগুলি নব গঠিত প্রদেশগুলিতে ফিরে যাবে । প্রথমে কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশন মেনে নিলেও পরে তারা তাদের এই সিদ্ধান্ত হতে সরে আসে । এর পিছনে বড় ভ’মিকা ছিল কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরুর । ফলস্বরূপ, ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হয়েছিল।” এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন হতো তা হলে ভারত একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হতো হবে এবং ভারতের বিভাজন এড়ানো সম্ভব হতো । গান্ধী পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য প্রস্তাব করেছিলেন ভারতকে এক রাখার স্বার্থে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত জিন্নাহ। নেহেরু গান্ধীর প্রস্তাবে সায় দেন নি । মুজিব লিখেছেন, ” আমার কাছে মনে হয়েছিল ব্রিটিশরা, ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের কাছে ক্ষমতা (অন্যটি মুসলিম লীগ) হস্তান্তর করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারত ত্যাগ করতে চায়। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ সরকারকে ভালোভাবে জানতেন এবং তাঁর মতো কাউকে ধোঁকা দেওয়া সহজ ছিল না। এই প্রেক্ষাপটেই জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন যে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট হবে “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে” । মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমির জন্য ‘মুসলিম সংহতি’ প্রদর্শনের দিন। তিনি একটি বিবৃতি দিয়ে সবাইকে এই দিনটি শান্তিপূর্ণ ভাবে পালন করার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতের দশ কোটি মুসলমান যে কোনো মূল্যে পাকিস্তান অর্জন করতে বদ্ধপরিকর। কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার নেতারা দাবি করে বিবৃতি দিতে শুরু করে যে “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে” আসলে তাদের বিরুদ্ধে ডাকা হয়েছিল।” তাদের এই বক্তব্য মোটেও সত্য ছিল না । মুসলিম লীগ নেতারা সেদিন পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই দাঙ্গায় জড়িয়ে পরে যার ফলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ (মুসলমান ও হিন্দু উভয়ই ) প্রাণ হারায় । এ’সময় মুজিব এবং তার তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা উভয় সম্প্রদাযয়ের মানুষকে রক্ষা করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রক্তপাত ছিল বেশ ভারী। দাঙ্গা চলে তিন দিন। এই একটি ঘটনাই তরুণ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনকে বদলে দেয় এবং তার কাছে ভারত বিভাজন তখন অনিবার্য মনে হয় । ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট মধ্যরাতে ঘটে উপমহাদেশের ইতিহাসে সব চেয়ে বড় ট্রাজেডি । যে ভারতবর্ষ আবহমনা ধরে একটি অটুট একক সত্তা ছিল-কিছু স্বার্থপর রাজনীতিবিদ এবং ধূর্ত ব্রিটিশদের নিজ স্বার্থের বলি হয়ে বিভক্তির মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামক পৃথক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয় । ওই একটি ঘটনা চিরকালের জন্য এ অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রতি বিনষ্ট করেছে । আপনকে করেছে পর আর নিজ দেশে কোটি মানুষকে করেছে পরবাসি । তরুণ মুজিব নিজেকে কোলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানন্তিরত করেন ১৯৪৭ সালে । কিছু সময়ের জন্য পূর্বের ধারাবাহিকতায় তিনি মুসলিম লীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। মুজিবের রাজননৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৯৪৮ সাল । সে বছর মার্চ মাসের ২১ তারিখ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ঢাকা সফর মুজিবের রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে দেয়। জিন্নাহ নিজে উর্দুর একটি শব্দও বলতে পারতেন না কিন্তু রমনার রেসকোর্সে এক জনসভায়া বক্তৃতা দিতে গিয়ে ইংরেজিতে বলেছিলেন যে উর্দু-যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ (অধিকাংশই উত্তর প্রদেশর ও বিহার হতে আসা মোহাজেরদের ভাষা ) পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। এই ঘোষণাই ছিল অখন্ড পাকিস্তানের কফিনে প্রথম পেরেক । সাধারণ জনগণ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর জন্য এক বিশেষ সমাবর্তেনে তিনি একই কথা উচ্চারণ করলে বিশ^বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা এই অপরিনামদর্শী বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায় । সেই সমার্বতনে উপস্থিত ছিলেন মুজিব। মুজিব একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন । তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে পাকিস্তানি শাসতদের বিভিন্ন ধরণের অন্যায় নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই ধরনের বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবে না। প্রতিবাদকে একটি সংগঠিত আন্দোলনে পরিণত করার জন্য তাদের একটি সংগঠনের প্রয়োজন হবে । তাঁর হাতেই ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের জন্ম হয় (পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়) । ছাত্রনেতা হিসেবে এটিই ছিল পূর্ব বাংলায় মুজিবের রাজনীতিতে প্রথম পদক্ষেপ। পরের বছর, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নামে নামকরণ করা হয় । ) প্রতিষ্ঠিত হয় । আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুজিব জীবনের অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের ১৩ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন শ্রেফ বাঙালিদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার জন্য । পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা আওয়ামী লীগকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করেছিল । এটিই একমাত্র দল যা পাকিস্তানের ‘ঐক্যে’র জন্য সবসময় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে । ২০২৪ এর জুলাই এর পর ড. ইউনুস নিজ ক্ষমতা বলে এক নির্বাহি আদেশের মাধ্যমে দলটির কার্যক্রম সম্পূর্ণূ বেআইনি ভাবে আবার নিষিদ্ধ করেন । মুজিব দুটি পৃথক সময়ে মৃত্যু’র মুখোমুখি হন। একবার ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আর দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৬৯ সালে এক তিব্র গণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ছাত্র জনতা আর দেশের মানুষের কাছ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’-বাংলার বন্ধু উপাধি লাভ করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এক অভূতপূর্ব বিজয়ের পর নানা ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষাপটে শুরু হয় পাকিস্তানে বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যার সফল সমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর । দেশের জন্য এই যুদ্ধের নিজের জীবন উৎসর্গ করেস ত্রিশ লক্ষ মানুষ । এই প্রেক্ষাপটে মুজিব একটি নতুন জাতির পিতা হিসাবে জনগনের স্বিকৃতি লাভ করেন। মুজিব হয়ে উঠেন মুক্তিকামি বিশ্বের এক উজ্জল নক্ষত্র । স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দেশে মুজিক বেঁচে ছিলন সাড়ে তিন বছর । ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রাতে মুজিবকে পাকিস্তানপস্থি একদল সেনা সদ্যসের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে জীবন দিতে হয় । যে দেশটির জন্য মুজিব আজীবন ক্লান্তিহীন সংগ্রাম করেছেন সেই দেশে মুজিব মাত্র ৫২ বছর বেঁচে ছিলেন। তার জীবদ্দশায় শেখ মুজিব শুধু এই উপমহাদেশের ইতিহাস ও ভূগোল পরিবর্তনই দেখেননি; তিনি তার অংশ ছিলেন । তিনি তিনটি পতাকার নিচে বসবাস করছেন, জন্মের সময় দেশভাগ পর্যন্ত ব্রিটিশ, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের পতাকার নিচে বসবাস করেন, যার সৃষ্টিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন সত্যিকারের নেতা যার দূরদৃষ্টি ছিল এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন। তাঁর আত্মা শাস্তিতে থাকুক এবং তাঁর স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকুক। ইতিহাস মনে রাখে শুধু নায়কদের, ভুলে যায় খলনায়কদের। জোসেফ ক্যাম্পবেল, একজন আমেরিকান সাহিত্যের অধ্যাপক, লিখেছেন: “একজন নায়ক হলেন এমন একজন মানুষ যিনি নিজের জীবনকে নিজের চেয়ে বড় কিছুর জন্য উৎসর্গ করেছেন।” এই জাতির ইতিহাসে মুজিবের অবদানের মূল্যায়ন করলে এর চেয়ে সত্য কথা আর কিছু হতে পারে না। এই বছর জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে হয়তো তাঁর সৃষ্টি এই দেশে তেমন কিছু হবে না কিস্তু তিনি ইতিহাসের বরপূত্র হিসেবে হাজার বছর বেঁচে থাকবেন এই দেশের মানুষের হৃদয়ে । জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু । লেখক সৈয়দ ইফতেখার হোসেন একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ১৭ই মার্চ, ২০২৬



