নিয়ন্ত্রণের ছায়া, স্বাধীনতার প্রশ্ন – ইউ এস বাংলা নিউজ




ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ২১ এপ্রিল, ২০২৬

নিয়ন্ত্রণের ছায়া, স্বাধীনতার প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২১ এপ্রিল, ২০২৬ |
নিয়ন্ত্রণের ছায়া, স্বাধীনতার প্রশ্ন ১. সন্ত্রাসবিরোধী আইন, সংশোধনী এবং ক্ষমতার ভাষা রাষ্ট্র যখন কথা বলে, তার সবচেয়ে দৃঢ় ভাষা হয় আইন। কারণ আইন শুধু নির্দেশ দেয় না, বৈধতাও তৈরি করে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি নিছক আইনি আলোচনা নয়-এটি ক্ষমতার প্রয়োগের সীমা কোথায়, সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে যে ধারাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-‘যুক্তিসংগত কারণ’ দেখিয়ে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করার ক্ষমতা-সেটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। কারণ ‘যুক্তিসংগত’ শব্দটি যতটা নিরপেক্ষ শোনায়, বাস্তবে তার ব্যাখ্যা ততটাই পরিবর্তনশীল। আজ যা যুক্তিসংগত, কাল তা অযৌক্তিক হয়ে যেতে পারে, যদি ব্যাখ্যাকারী বদলে যায়। এখানেই

আসে রাজনীতির সূক্ষ্ম খেলা। আইন যখন ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে, তখন সেটি শুধু আইন থাকে না, হয়ে ওঠে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর যখন সেই হাতিয়ার ব্যবহার করা হয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, তখন ন্যায়বিচার আর নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। আওয়ামী লীগকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি এই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। তৃণমূল থেকে নেতাদের দেশে ফিরতে বলা হচ্ছে-‘দল বাঁচানোর’ তাগিদে। কিন্তু সেই ফেরা কি নিছক রাজনৈতিক সাহসের প্রতীক, না-কি এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা, যেখানে আইনের প্রয়োগ অনিশ্চিত? বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, আইন অনেক সময় রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। কখনো আইন ক্ষমতাকে রক্ষা করে, কখনো ক্ষমতা আইনের সীমা নির্ধারণ করে। ফলে প্রশ্নটি

থেকে যায়-এই সংশোধনী কি ন্যায়বিচারের পথকে শক্তিশালী করবে, না-কি এটি ক্ষমতার প্রয়োগকে আরও সহজ করবে? এখানে আরেকটি বিষয় খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করে, আইনের ভয় এবং আইনের প্রতি আস্থা। যদি নাগরিক মনে করে আইন তার সুরক্ষা দেবে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়ে। কিন্তু যদি মনে হয় আইন যেকোনো সময় তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে, তাহলে সেই আইনই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দ্বৈততা থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম হয় এবং সমাজে একটি অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যা অনেক সময় প্রকাশ পায় না, কিন্তু সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ২. আওয়ামী লীগের সংকট : ক্ষমতা হারানোর পরের রাজনীতি ক্ষমতা যখন থাকে, তখন রাজনীতি একরকম আর ক্ষমতা চলে

গেলে রাজনীতি অন্যরকম হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকট সেই পরিবর্তনের এক জীবন্ত উদাহরণ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর দলটি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাকে নতুন করে নিজের অবস্থান খুঁজতে হচ্ছে। তৃণমূলের আহ্বান নেতারা দেশে ফিরুন-এটি একদিকে আবেগের প্রকাশ, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। কারণ দল তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নেতৃত্ব ও তৃণমূলের মধ্যে একটি দৃঢ় সম্পর্ক থাকে। কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘ সময় সেই সম্পর্ককে অনেক সময় দূরত্বে পরিণত করে। এই দূরত্ব এখন সামনে চলে এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে-দল কি সেই দূরত্ব কমাতে পারবে? নাকি এটি আরও বাড়বে? রাজনীতিতে একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট-মানুষ ক্ষমতাকে মনে রাখে না, তারা আচরণকে মনে রাখে।

ক্ষমতায় থাকার সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই পরে দলকে তাড়া করে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা এখন দৃশ্যমান। এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। ক্ষমতা মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলে নিয়ন্ত্রণে। যখন সেই নিয়ন্ত্রণ চলে যায়, তখন একটি শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান সেই সংকটেরই প্রতিফলন-যেখানে দলটি বুঝতে পারছে, তাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, কিন্তু কীভাবে, সেই উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। আরেকটি বাস্তবতা হলো-দল যখন বিপদে পড়ে তখন তার ভিতরের বিভাজনগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেউ সামনে আসে, কেউ আড়ালে সরে যায়, কেউ অবস্থান বদলায়। এই প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু

এটি দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আওয়ামী লীগের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংকটকে কী তারা পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে নেবে, নাকি এটি তাদের আরও দুর্বল করে দেবে? ৩. মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা : ইতিহাসের ভিতরের দ্বন্দ্ব ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি বর্তমানের পরিচয় এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু যখন সেই মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটি শুধু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক থাকে না এটি একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষে পরিণত হয়। জামায়াতকে ঘিরে যে আলোচনা আবার সামনে এসেছে তাদের ভূমিকা, তাদের অবস্থান এসব প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু নতুনভাবে এই প্রশ্নগুলো তোলার পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কাজ করছে। প্রশ্ন

হচ্ছে এই আলোচনা কী সত্য অনুসন্ধানের জন্য, নাকি এটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি অংশ? ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, যখন সেটিকে বারবার নতুন করে লেখা হয় তখন একটি সময় আসে, যখন মানুষ আর নিশ্চিত থাকতে পারে না-কোনটি সত্য, কোনটি ব্যাখ্যা। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং একটি আবেগ, একটি পরিচয়-সেখানে এই ধরনের বিতর্ক সমাজকে বিভক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার ইতিহাস নিয়ে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য থাকে। যদি সেই ঐকমত্য ভেঙে যায়, তাহলে সমাজের ভিতরে একটি স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অস্থিরতাই এখন ধীরে ধীরে সামনে আসছে-যেখানে ইতিহাস শুধু অতীতের বিষয় নয়, বরং বর্তমানের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছে। এখানে আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ, ইতিহাসের নৈতিকতা। আমরা যদি ইতিহাসকে কেবল ক্ষমতার প্রেক্ষাপটে দেখি, তাহলে তার মানবিক দিক হারিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক বিজয়ের গল্প নয়, এটি মানুষের ত্যাগ, বেদনা এবং সংগ্রামের ইতিহাস। সেই মানবিকতাকে বাদ দিয়ে যদি শুধুই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাহলে ইতিহাসের আত্মাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪. কূটনীতি ও প্রতিবেশীর বাস্তবতা : সম্পর্ক না সমীকরণ? বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সব সময়ই বহুস্তরীয়। এখানে বন্ধুত্ব আছে, নির্ভরতা আছে, আবার একধরনের অস্বস্তিও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার প্রসঙ্গ, দিল্লি-ঢাকার যোগাযোগ-এসব বিষয় আবারও সেই জটিলতাকে সামনে নিয়ে আসছে। কূটনীতি কখনো সরল হয় না। এটি সব সময়ই স্বার্থের হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বড় দেশ তার স্বার্থ দেখে, ছোট দেশ তার সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিজের জায়গা তৈরি করতে চায়। বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাকে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে হবে। শুধু সম্পর্ক বজায় রাখা নয়, সেই সম্পর্কের ভিতরে নিজের স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করা, এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কূটনীতি কখনোই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের ভিতরের অস্থিরতা যত বাড়ে, বাইরের সম্পর্ক ততটাই জটিল হয়ে ওঠে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। এখানে বিশ্বাসের প্রশ্ন আছে, আবার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও আছে। একটি সম্পর্ক তখনই টেকসই হয়, যখন সেখানে পারস্পরিক সম্মান থাকে। কিন্তু যদি সেই সম্পর্কের ভিতরে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বেশি থাকে, তাহলে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় কাজ করে, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক। আমরা অনেক সময় সম্পর্ককে আবেগ দিয়ে বিচার করি, কিন্তু কূটনীতি চলে স্বার্থ দিয়ে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে না পারলে হতাশা জন্ম নেয় এবং সেই হতাশা আবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয়। শেষ কথা এই চারটি প্রসঙ্গ-আইন, দল, ইতিহাস, কূটনীতি-প্রথমে আলাদা মনে হলেও আসলে তারা একটি জায়গায় এসে মিলিত হয়। সেই জায়গাটি হলো, নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব। রাষ্ট্র কি আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে? দল কি ক্ষমতা ফিরে পেতে চায়, নাকি নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে চায়? ইতিহাস কি সত্যের অনুসন্ধান করছে, নাকি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার শিকার হচ্ছে? কূটনীতি কি পারস্পরিক সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে, নাকি একপক্ষীয় প্রভাবের ওপর? এই প্রশ্নগুলো শুধু রাষ্ট্রের জন্য নয়, মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। মানুষের ভিতরেও একটি অদৃশ্য রাজনীতি কাজ করে। কেউ সম্পর্কের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ খোঁজে, কেউ স্বাধীনতা দেয়। কেউ ভালোবাসাকে আটকে রাখতে চায়, কেউ সেটিকে মুক্ত রাখতে চায়। এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র-সবকিছুর চরিত্র নির্ধারণ করে। সব দৌড় সম্মানের নয়, কখনো তা ভয়েরও প্রতিফলন। সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা শক্তির নয়, কখনো সরে আসাই সবচেয়ে বড় শক্তি। সব কথা বলতে হয় না, নীরবতাও অনেক সময় সবচেয়ে গভীর ভাষা। আমরা যদি সত্যিকারের পরিবর্তন চাই, তাহলে শুধু আইন বা সরকার বদলালেই হবে না। বদলাতে হবে আমাদের ভিতরের রাজনীতিকে যেখানে নিয়ন্ত্রণের বদলে সম্মান থাকবে আর ভয় নয়, থাকবে আত্মবিশ্বাস। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার মানুষের ভিতরের স্বাধীনতা দিয়ে-আইনের ধারায় নয় বরং বিবেকের আলোয়। লেখক: প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
একই পরিবারের ৭ সদস্যের বিরুদ্ধে সিআইডির মানিলন্ডারিং মামলা মোদির উদ্বোধনের আগেই আগুনে পুড়ল ভারতের তেল শোধনাগার ‘সুরভি স্কুলে’ মার্কিন বিশেষ দূত, শিশু কল্যাণে সহযোগিতার আশ্বাস ‘অর্থকষ্টে’ সরকার! নিয়ন্ত্রণের ছায়া, স্বাধীনতার প্রশ্ন ঋণ করে আমলাদের ঘি খাওয়ানো বন্ধ হবে কবে? কোরআন আত্ম-পরিচয়ের আয়না বিশ্ববাজারে কমে গেল স্বর্ণের দাম একটি ছাড়া সবই ১৪০ কিমি গতির বল করেছেন নাহিদ রানা সকাল ৮টার মধ্যে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে যেসব অঞ্চলে এসএসসি পরীক্ষায় বসছে ১৮ লাখ পরীক্ষার্থী কান উৎসবে প্রাধান্য পাচ্ছেন স্বাধীন নির্মাতারা যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ না তুললে পাকিস্তানে ইরানের প্রতিনিধি দল যাবে না ১২ কেজি এলপিজির দাম বেড়ে ১৯৪০ টাকা প্রতিনিধিরা আলোচনার জন্য পাকিস্তানে যাচ্ছেন, শান্তি চুক্তি ‘হবে’ : ট্রাম্প দেশে মজুত গ্যাস দিয়ে ১২ বছর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব: জ্বালানিমন্ত্রী ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আইএমএফের সম্পর্ক নেই যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ না তোলা পর্যন্ত হরমুজ বন্ধ থাকবে: আইআরজিসি