বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: এক বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ১৪ লাখ মানুষ – ইউ এস বাংলা নিউজ




ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ৩০ আগস্ট, ২০২৬

আরও খবর

ফুলবাড়ি উন্মুক্ত কয়লা খনিতে কর্মসংস্থানের “অবাস্তব” সংখ্যা: জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা

নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’ স্বীকৃতি দেন জিয়া: বিএনপির অসত্য দাবি বঙ্গবন্ধু সরকারের অবদান মুছে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা

ইউনূস সরকারের বাতিল করা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো আবার শূন্য থেকে শুরু বিএনপি’রঃ গত দুইবছরে গ্রিডে যুক্ত হয়নি এক ইউনিট বিদ্যুৎ

দুর্ভিক্ষের সকল লক্ষণ দৃশ্যমান কৃষি ও উৎপাদন ব্যবস্থায়: তবে কি সেদিকেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ?

সামনে বিএনপি-আ.লীগ পেছনে প্রশাসন সিন্ডিকেট

চরম পর্যায়ে লোডশেডিং: ভোগান্তিতে বাড়ছে জনরোষ, নিরাপত্তা শঙ্কায় বিদ্যুৎকর্মীরা

সারাদেশে ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ডঃ বন্ধ ৪১ বিদ্যুতকেন্দ্র

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: এক বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ১৪ লাখ মানুষ

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ৩০ আগস্ট, ২০২৬ |
২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বৃদ্ধি পাওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট গভীর থেকে গভীরতর হওয়ার চিত্রটি ফুটে উঠেছে। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে যখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার নতুন ঝুঁকি দেখা দিয়েছে, ঠিক তখনই আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল লক্ষ্য ঘোষণা করেছে সরকার। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। এই অবস্থার প্রত্যক্ষ প্রভাবে ২০২৬ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের কূল থেকে উদ্ধার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীও পুনরায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড

ডেভেলপমেন্ট’-এর আওতায় ২০৩১ সাল নাগাদ এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান গড়ার পরিকল্পনায় অবিচল রয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনায় সেবা খাতে ৫৮ লাখ ৭০ হাজার এবং শিল্প খাতে ৩৩ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেশের শ্রমবাজারের চরম বৈপরীত্যই খালি চোখে ধরা পড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন হ্রাস ও তীব্র জ্বালানি সংকটে বর্তমানে বিদ্যমান চাকরিগুলো যখন টিকিয়ে রাখাই দায়, তখন ২০২৫ সালে ১৪ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অপরদিকে, নতুন কাজের বিশাল সুযোগ তৈরির আশ্বাস দেওয়া হলেও বেশ কিছু শিল্পে অটোমেশন ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে, যার ফলে উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও শ্রমিকের

প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। কাজেই, বিদ্যমান বাস্তবতায় একদিকে যেমন ২০২৫ সালের এই নতুন ১৪ লাখ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে এক কোটি নতুন মানসম্মত ও টেকসই কাজের সুযোগ তৈরির সরকারি লক্ষ্য কতটা ফলপ্রসূ হবে—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে। সংকটের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলটি চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি লাগাম টেনে রাখা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি আনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এই মহাপরিকল্পনার দূরবর্তী লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে

উন্নীত করা। নির্ধারিত এক কোটি নতুন কাজের মধ্যে উৎপাদনমুখী শিল্পে ২২ লাখ ৮০ হাজার এবং নির্মাণসহ অন্যান্য খাতে ১০ লাখ ৪০ হাজার মিলিয়ে শিল্প খাতেই মোট ৩৩ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান গড়ার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশের মধ্যে সেবা খাতে ৫৮ লাখ ৭০ হাজার, কৃষি খাতে প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার এবং বৈদেশিক শ্রমবাজারে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ নতুন কাজের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ২০২৫ সালে দরিদ্র জনসংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেয় যে, কৌশলগত পরিকল্পনার সাথে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির বিরাট ফারাক রয়েছে। দুর্বল বিনিয়োগ, তীব্র জ্বালানি অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের ডামাডোল এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবেশকে বাঁধাগ্রস্ত

করছে। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক মনে করেন, এক কোটি কর্মসংস্থান গড়ার এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রয়োজন। তিনি জানান, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশের উপরে থাকলে প্রতি বছর ১০ থেকে ১১ লাখ কাজ তৈরি হয়, যা ৬ শতাংশে উন্নীত করা গেলে এক কোটি কর্মসংস্থান সম্ভব। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সঠিক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না এলে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে না এবং কেবল সরকারি খাতের উদ্যোগে বিপুল সংখ্যক কাজের সুযোগ তৈরি করা অসম্ভব। নতুন চাকরি তো দূরের কথা, বিদ্যমান চাকরিই ঝুঁকিতে সরকার যখন কোটি নতুন কাজের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য তখন ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে—যেখানে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত

দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ কর্মী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বাজেট সহায়তার পর্যালোচনায় প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের জুন মাসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও উৎপাদন খরচ বাড়লে সামগ্রিক বাজারে কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে ধাক্কা খাবে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়ে গেছে। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত না হলে ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে পারতেন, এখন সেই সম্ভাবনা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, যখন বিদ্যমান চাকরিগুলো রক্ষা করতেই অর্থনীতিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে এবং নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছেন, তখন সরকারের বিশাল কর্মসংস্থান লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে

রূপ দেওয়া আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিল্পে উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিক কমছে সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হলো শিল্প খাত, কিন্তু তৈরি পোশাকের মতো প্রধান খাতগুলোতে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র—উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে বা নতুন নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে, আশুলিয়ার একটি বৃহৎ তৈরি পোশাক কারখানায় ২০২১ সালে কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার থাকলেও, বর্তমানে তা কমে সাড়ে ১৩ হাজারে পৌঁছেছে—অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে কেবল একটি কারখানাতেই আড়াই হাজার কাজ বিলুপ্ত হয়েছে। কর্মী কমলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এই বিষয়ে জানান, তৈরি পোশাক খাতে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো লোকবল দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অটোমেশন ও এআই প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারের কারণে অফিসে ও কারখানায় কর্মী কমলেও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, এই প্রযুক্তি বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় সবাই এটি ব্যবহার করতে পারছে না, তবে যারা প্রয়োগ করছে তাদের প্রতিষ্ঠানে মানুষের শ্রমের চাহিদা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এখানেই প্রকাশ পায় সরকারের কৌশলগত ভাবনার বৈপরীত্য—কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত শিল্প খাত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমনির্ভরতা কমিয়ে আনছে। অবশ্য প্রযুক্তি বর্জন করা সমাধান নয়; বরং প্রযুক্তির কারণে যে কাজগুলো নষ্ট হচ্ছে, তার বদলে শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা যায় কি না—সেটিই এখন মূল ভাবনার বিষয়। সেবা খাতে বড় আশা, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানই বেশি সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ভরসা ধরা হয়েছে সেবা খাতকে, যেখানে ৫৮ লাখ ৭০ হাজার নতুন কাজ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেবা খাতের আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে সেবা খাতের আকার বৃদ্ধি পাওয়া মানেই যে কাজের মান কিংবা নিরাপত্তামূলক কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে, তেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিবহন ও হোটেল-রেস্তোরাঁর মতো বিশাল সেবা খাতে কোটি মানুষ যুক্ত থাকলেও, তার সিংহভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। জাতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্যমতে, কেবল পরিবহন ও সংরক্ষণ খাতেই ৩০ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত আছেন। প্রকৃতপক্ষে, দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক, যেখানে নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট বেতন স্কেল, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক সুরক্ষার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই, যদি সরকার এক কোটি কর্মসংস্থানের সংখ্যাগত লক্ষ্য পূরণও করে, ২০২৫ সালের দারিদ্র্য বৃদ্ধির গতি সামলে তার কতটুকু শোভন ও সুরক্ষিত কাজ হবে—তা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মন্তব্য করেন যে, সরকারের কৌশলপত্রে মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেয়ে কেবল দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাস্তব প্রয়োগের সময়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনীতি সেবা খাতনির্ভর হলেও এখানে ছোট ও অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রাধান্য বেশি। এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় রূপ দিতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং নিয়োজিত শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া অপরিহার্য। ২৬ লাখ বেকার, উচ্চশিক্ষিতই ৮ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান পরিকল্পনার অন্যতম বড় গলদ হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত জ্ঞান এবং কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার মধ্যকার চরম সামঞ্জস্যহীনতা। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ থেকে জানা যায়, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার, যার মধ্যে স্নাতক ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যাই ৮ লাখ ৮৫ হাজার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর বিপুল তরুণ ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও শ্রমবাজারের মানসম্পন্ন কাজের দক্ষতার অভাব থাকায় উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ক্রমাগত বাড়ছে, যা ২০২৫ সালের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি আইএলও-র আন্তর্জাতিক সংজ্ঞাগত জটিলতাও রয়েছে—সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা বেতনের বিনিময়ে কাজ করলেই তাকে কর্মজীবী ধরা হয়, যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় জীবনধারণের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। সুতরাং, কেবল খাতা-কলমে বেকারের সংখ্যা কমালে শ্রমবাজারের প্রকৃত করুণ চিত্র এবং দারিদ্র্যের প্রকৃত চাপ আড়ালেই থেকে যাবে। জ্বালানি সংকটই এখন বড় বাধা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় স্বল্পমেয়াদি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট। দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির অর্ধেকের বেশি জোগায় প্রাকৃতিক গ্যাস, কিন্তু ২০১৬ সালের শীর্ষ উৎপাদনের তুলনায় বর্তমানে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে, আমদানিকৃত তেলের ৬০-৬৫% এবং এলএনজির ৫৫-৬০% আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার ফলে ওই অঞ্চলের চলমান অস্থিরতা সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে। ইতিমধ্যে পেট্রোবাংলার পাঁচটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে এলএনজির মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠে গেছে। জ্বালানির এই তীব্র সংকটের প্রভাবে শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অনেক জায়গায় শিফট কমানো হচ্ছে এবং কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নতুন গ্যাস সংযোগ না পাওয়া, কর্মঘণ্টা হ্রাস এবং জ্বালানি ঘাটতিতে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ কাজ হারানোর ঝুঁকি কেবল কাগজের তথ্য নয়, বরং ২০২৫ সালে ১৪ লাখ মানুষের দরিদ্র হওয়ার ধারাবাহিকতায় আরও বড় অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কৃষিতেও কর্মসংস্থান বাড়ানোর হিসাব, কিন্তু বাড়ছে ঝুঁকি সরকার কৃষিখাতে বিদ্যমান ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার কর্মসংস্থান বাড়িয়ে ৩ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে, অর্থাৎ এতে নতুন ৫ লাখ ৯০ হাজার কাজের লক্ষ্য রয়েছে। তবে শিল্প খাতের মতো কৃষিখাতও জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির থাবা থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না। অতিরিক্ত সারনির্ভর বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৯১.৯ কেজি সার ব্যবহৃত হয়, যার একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হয়। গ্যাস সংকটের সরাসরি শিকার হয়ে দেশের ৬টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে ৫টিরই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে, যার সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ৩০% বৃদ্ধির তথ্য যুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে, সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হতে পারে, তাই কৃষিতে কেবল কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বরং কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ফসলের সঠিক দাম পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যও বড় অভ্যন্তরীণ বাজারের দারিদ্র্য ও চাকরির সংকট সামলাতে সরকার বিদেশে লোক পাঠানোর সংখ্যা বাড়িয়ে বছরে ১৫ লাখ ৮০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে, যেখানে বর্তমানে যায় ১১ লাখ ২০ হাজার কর্মী। প্রতি বছর অতিরিক্ত ৪ লাখ ৬০ হাজার কর্মী হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে মোট ২৩ লাখ অতিরিক্ত কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বিশাল লক্ষ্য অর্জন করাও সহজ নয়, কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার মতো মূল বাজারগুলোতে নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। রামরুর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, মূল বাজারগুলো বন্ধ বা সীমিত থাকায় হঠাৎ করে বছরে ১৫ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, বিদেশের বাজারে এখন দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেশি হলেও বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগই যাচ্ছে অদক্ষ কর্মী। তাই লক্ষ্য পূরণের চেয়ে অদক্ষ শ্রমিক তৈরি ও শোষণের পথ বন্ধ করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই সরকারের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শুধু সংখ্যা দিয়ে কর্মসংস্থানের সাফল্য মাপা যাবে না যদিও সরকারি পরিকল্পনায় কর্মীদের রি-স্কিলিং ও আপ-স্কিলিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তবুও বাস্তব রূপায়ণে রয়েছে দীর্ঘ পথ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন অবশ্য দাবি করেন, দেশের পোশাক খাত সহ অধিকাংশ শিল্প এখনো শ্রমনির্ভর এবং এক লাফেই অটোমেশন এসে বিপুল মানুষকে বেকার করে দেবে না। তিনি মনে করেন, আগামীতে সেবা খাতই হবে কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। বর্তমানের জ্বালানি সংকট সাময়িক এবং অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে নতুন নতুন কাজের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে। দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়; এর জন্য উপযুক্ত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। মূল প্রশ্ন পরিকল্পনার নয়, বাস্তবায়নের ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কাতারে শামিল হওয়ার পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থানের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করা কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে। জ্বালানি ঘাটতি, অটোমেশন প্রযুক্তি, সেবা খাতের অনানুষ্ঠানিকতা, উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব এবং বিদেশের বাজারে অদক্ষ কর্মীর সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ভিত্তিটিই এখন প্রবল নড়বড়ে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাংকের সেই আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস—মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কাটলে যেখানে ২০২৬ সালে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারতেন, তা এখন কমে ৫ লাখে নেমে আসবে এবং চাকরি হারাতে পারেন আরও ৬ লাখ মানুষ। সুতরাং, কেবল কত লাখ মানুষকে কাজে যুক্ত করা হলো—সেই সংখ্যা দিয়ে সরকারের সফলতার বিচারে না গিয়ে দেখতে হবে কাজগুলো কতটা টেকসই, নিরাপদ এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে সক্ষম। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে নতুন কাজের সুযোগ নিশ্চিতভাবেই তৈরি হবে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও দক্ষতার উন্নয়ন ছাড়া এই এক কোটি কর্মসংস্থানের স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের আগেই যদি ২০২৫ সালের মতো দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তবে সরকারের প্রধান কর্তব্য নতুন এক কোটি চাকরি তৈরি করা নয়—বরং বিদ্যমান কর্মসংস্থানগুলো বাঁচিয়ে রেখে দেশের মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে রক্ষা করা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
১ কোটি কর্মসংস্থানের সরকারি মূলা ও বাস্তবতা: বিশ্বব্যাংক বলছে কর্মহীন হবেন ৬ লাখ মানুষ, বাড়বে দারিদ্র মাদক-চাঁদাবাজির বিরোধিতা করায় প্রবাসীর জমি দখল করলেন গাজীপুর বিএনপির সদস্য সচিব ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার ঘন্টা যানজটে আটকে অ্যাম্বুলেন্সেই রোগীর মৃত্যু বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: এক বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ১৪ লাখ মানুষ আবেগঘন বার্তায় শ্রমিকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে কারখানা বন্ধ ঘোষণা: ‘টিকিয়ে রাখার অনেক চেষ্টা করেছি, পারলাম না’ ‘শেখের বেটি আইতাছে’ স্লোগানে মিছিল, আনোয়ারায় ১৩৮ জনের নামে মামলা বিষাদময় গ্রীষ্ম পার করার পর এখন মেসির সামনে কী? থার্ড টার্মিনাল: ৯৯.৯১% কাজ শেষ হলেও ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে ৯০২ কোটি টাকা রাজনীতি থেকে ধর্ম- অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়: ঝুঁকিতে সাংবাদিকতা-বাকস্বাধীনতা নারায়ণগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর কিশোরী, নিখোঁজ অর্ধ শতাধিক ভেনেজুয়েলার তেল-সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট, ট্রাম্পের সন্তোষ প্রকাশ রণধীর জয়সওয়াল: বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলায় উদ্বেগ, কড়া নজর রাখছে ভারত ৪০০ বিলিয়ন রপ্তানির কানাডা বলছে ‘না’, অথচ ৮ বিলিয়ন রপ্তানির বাংলাদেশ মানছে সব মার্কিন শর্ত চ্যাম্পিয়নস লিগ ড্র: লিগ পর্বেই পিএসজি-বার্সা-ম্যান সিটি ধামাকা রদ্রি ও গর্ডনের অভিষেক, রাফিনিয়া-লোপেসের গোলে বার্সেলোনার জয় ইমরান-পুত্রদের সাক্ষাৎকার নেওয়ায় স্কাই স্পোর্টসকে ম্যাচ বর্জনের হুমকি পাকিস্তানের জুলাইবিরোধিতায় অভিযুক্ত ২৩১ শিক্ষকের একাডেমিক ফ্রিডম নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা ৬ মাসে কর্মহীন ৬২ হাজার মানুষ, তারেক রহমানের বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধস: ‘সারা বিশ্ব বাংলাদেশে আসছে না’, বরং মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে রাশিয়ার মিগ-২৯ থেকে চীনা জে-১০: গল্পটি সক্ষমতার, মিথ্যা এবং ধোঁকাবাজিরও