ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
বিশ্ববাজারে কমল স্বর্ণের দাম, ভরি কত?
ফেডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় স্বর্ণ, বাড়বে দাম?
তিন মাসে ব্যাংকে কোটির বেশি টাকার হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার
ঋণের সুদ কমলেও বিনিয়োগে গতি নেই
পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট, বিক্রির চাপে ক্রেতা কম
খেলাপি ঋণের চাপে ১৫ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা
মাছ-মুরগি-ডিমের চড়া দাম: বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না বোতলজাত ভোজ্যতেল
কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে চললেও কমছে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা, দরিদ্রের খাবারে পড়েছে টান
সকালে বাসা থেকে ভাত খেয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে বের হন মো. সাইমন। বেলা ১১টা থেকে ১২টার দিকে ক্ষুধা লাগলে মিরপুরের কোনো টং দোকানে এক কাপ চায়ের সঙ্গে বনরুটি বা বাটারবান খান। খুব বেশি খরচের খাবার নয়। কিন্তু সেই খাবারটিও এখন তার হিসাবের মধ্যে পড়ছে। কয়েক দিন ধরে আশপাশের কিছু দোকানে বনরুটি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার দাম বাড়ার কথাও শুনছেন।
সাইমনের কথায়, ‘সবকিছুর দাম বাড়ে, আমাদের খরচ বাড়ে। খালি আমাদের ইনকাম বাড়ে না।’
সাইমনের এই অভিজ্ঞতা দেশের অর্থনীতির একটি বড় বৈপরীত্যের দিক সামনে আনে। একদিকে ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বাড়ছে, এসব হিসাবে জমা অর্থও বাড়ছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও
আয় বৃদ্ধির ধীরগতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামলাতে গিয়ে অনেককে খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। মার্চ শেষে এ ধরনের হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। একই সময়ে এসব হিসাবে জমা অর্থ বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। মার্চ শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে জমা ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৮ লাখ
৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। তবে এসব হিসাবকে সরাসরি ‘নতুন কোটিপতি’ বলা যাবে না। কারণ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব রয়েছে। বরং এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে দেশের আয়-বণ্টন, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের তথ্য মিলিয়ে দেখলে অর্থনীতিতে বৈষম্যের একটি চিত্র পাওয়া যায়। ব্যক্তির হিসাবে উল্টো চিত্র সামগ্রিকভাবে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বাড়লেও ব্যক্তি পর্যায়ে চিত্রটি ভিন্ন। জুন শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তি হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৯০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যক্তি পর্যায়ে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৪০ হাজার ৬৩০টি। তখন
এসব হিসাবে জমা ছিল ৯১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ব্যক্তি পর্যায়ে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বেড়েছে মাত্র ৭১টি। কিন্তু এসব হিসাবে জমা অর্থ কমেছে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। অন্যদিকে সামগ্রিক কোটি টাকার হিসাব ও আমানত বৃদ্ধির পেছনে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের ভূমিকা রয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে পড়ে থাকতে পারে। ফলে ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বাড়লেও সেটিকে ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পদ বৃদ্ধির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে অর্থনীতির দুই প্রান্তের বাস্তবতা যে আলাদা, তা অন্য পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। আয়ের বড়
অংশ শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে মোট আয়ের ৪০.৯২ শতাংশ ছিল। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ৩৮.০৯ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে ছিল মোট আয়ের মাত্র ১.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে যে পরিমাণ আয় যায়, তা সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশের তুলনায় বহু গুণ বেশি। আয় বৈষম্যের পরিমাপক জিনি সহগও বেড়েছে। ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে জিনি সহগ ছিল ০.৪৮২। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ০.৪৯৯। শহরাঞ্চলে বৈষম্য আরও বেশি; সেখানে জিনি সহগ ছিল ০.৫৩৯। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি বড় হলেও সেই অর্থনৈতিক
অগ্রগতির সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। দাম বাড়ছে, আয় সেই হারে বাড়ছে না বৈষম্যের এই চিত্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি যুক্ত হয়ে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির অর্থ হলো, একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কেনা যায়। আয় একই থাকলে বা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম বাড়লে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে যাদের আয়ের বড় অংশ খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি পণ্যের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্যও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ২১.৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বনরুটিতেও কাটছাঁট নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সবচেয়ে সরাসরি প্রকাশ পাওয়া যায় খাবারের বাজারে। মিরপুরের টং দোকানে যে বনরুটি বা বাটারবান একসময় সামান্য খরচে ক্ষুধা মেটানোর খাবার ছিল, সেটিও এখন দামের চাপে পড়েছে। মিরপুরের একটি চায়ের দোকানের বিক্রেতা জোৎস্না বলেন, তিন দিন ধরে বনরুটি ও বাটারবান সরবরাহ করা হচ্ছে না। বেকারির লোকজন দাম বাড়ানোর কথা বলছেন। ২০ টাকার বাটারবান ২৫ টাকা করার কথাও তারা জানিয়েছেন। মিরপুর-১ এলাকার আরেক দোকানি রাহেলা বেগম বলেন, কয়েক দিন ধরে এলাকার বেকারিগুলো থেকে মাল দেওয়া বন্ধ রয়েছে। তার ধারণা, দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। তবে সব বেকারি দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছে না। মিরপুর-২ এলাকার একটি বেকারির সরবরাহের দায়িত্বে থাকা এক কর্মী বলেন, গত বছর দুই দফায় দাম বাড়ানোর পর বিক্রি কমে গেছে। আবার দাম বাড়ালে বিক্রি আরও কমতে পারে। তিনি বলেন, ‘মানুষের ইনকাম তো আসলে বাড়ে নাই। কিন্তু খরচ অনেক বেড়েছে। এখন একটা বনরুটি যেটা ১০ টাকা বিক্রি করছে সেটা ১৫ টাকা করলে মানুষ তো খাবে না।’ অর্থাৎ উৎপাদক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই চাপে রয়েছে। কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আবার দাম বাড়ালে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই দামে কমছে পণ্যের ওজন দাম বাড়ানোর পাশাপাশি আরেকটি প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে—একই দামে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া। মিরপুর-২ এলাকার বনলতা লাইভ বেকারির শাখা ব্যবস্থাপক মকিদুল ইসলাম শিশির বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান এখনো দাম বাড়ানোর বা ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে বাজার পরিস্থিতিতে দুই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তার ভাষ্য, ৪০০ গ্রামের পাউরুটি হয়তো ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রাম করা হতে পারে। আর দাম বাড়ানো হলে ৪০০ গ্রামই রাখা হবে। ভোক্তার জন্য দুই ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে। সরাসরি দাম বাড়লে বেশি টাকা দিতে হয়। আর একই দাম রেখে ওজন কমানো হলে একই টাকায় কম পণ্য পাওয়া যায়। কাঁচামাল ও জ্বালানির বাড়তি খরচ বেকারি মালিকদের সংগঠনের সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, ময়দা, ডালডা, তেল ও প্যাকেজিং সামগ্রীর দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন এবং কিছু পণ্যের ওজন কমিয়েছেন। তিনি জানান, ময়দা, তেলসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালাতে বাড়তি জ্বালানি খরচ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে। জালাল উদ্দিনের দাবি, তাদের ক্রেতাদের বড় অংশ শ্রমজীবী মানুষ—দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার। ফলে দাম বাড়লে তার চাপ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই পড়ে। এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রুটি ও বনরুটির মতো পণ্য অনেক প্রান্তিক মানুষের খাবারের অংশ। তাই দাম বাড়ানো বা ওজন কমানোর আগে সাধারণ মানুষের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধি আছে, স্বস্তি কোথায় বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সাফল্য ছিল গত এক দশকে দারিদ্র্য কমানো। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ৩৭.১ শতাংশ থেকে ১৮.৭ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য কমানোর গতি কমেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তুলনামূলকভাবে বেশি গেছে মধ্য ও উচ্চ আয়ের মানুষের দিকে। বিশ্বব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। কর্মসংস্থান দুর্বল হয়েছে, প্রকৃত মজুরি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ তৈরি করেছে। এদিকে ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেও বিনিয়োগ ও ঋণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে অর্থনীতিতে টাকা আছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—টাকাটি কোথায় যাচ্ছে এবং তা কতটা কর্মসংস্থান ও আয় তৈরি করছে। বৈষম্যের সবচেয়ে বড় হিসাব মানুষের ঘরে ব্যাংকের হিসাবে কোটি টাকা থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে—এটি অর্থনীতির একটি তথ্য। কিন্তু সেটি দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার পূর্ণ ছবি নয়। কারণ এর মধ্যে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই রয়েছে। আয়-বণ্টনের তথ্য, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও মজুরির প্রবণতা একসঙ্গে দেখলে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট: অর্থনীতির ওপরের দিকে অর্থের প্রবাহ এবং নিচের দিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একই গতিতে এগোচ্ছে না। একদিকে ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব তিন মাসে বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি এবং এসব হিসাবে জমা অর্থ বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ৫ টাকা বাড়তি দামও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০ টাকার বাটারবান ২৫ টাকা হলে সেটি শুধু পাঁচ টাকার পার্থক্য নয়; মাসের শেষে সেটি পরিবারের অন্য কোনো প্রয়োজন বাদ দেওয়ার কারণ হতে পারে। সাইমনের মতো মানুষের কাছে তাই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির হিসাব খুব সহজ—আয় কত বাড়ল, বাজারে কত টাকা লাগে, আর দিনের শেষে হাতে কত টাকা থাকে। ব্যাংকের হিসাবে কোটির অঙ্ক বাড়ছে। কিন্তু সেই অর্থনীতিতে যদি একজন রিকশাচালককে দুপুরের আগে একটি বনরুটি কেনার হিসাবও করতে হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আরেকটি হিসাব সামনে আসে—সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ছে? শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ব্যাংকের আমানতের অঙ্কে নয়, মানুষের খাবারের তালিকায়। সেই তালিকা যদি ছোট হতে থাকে, তাহলে কোটির টাকা বাড়ার পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বৈষম্যের হিসাবটিও আরও বড় হয়ে উঠবে। বাংলা ট্রিবিউন
আয় বৃদ্ধির ধীরগতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামলাতে গিয়ে অনেককে খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। মার্চ শেষে এ ধরনের হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। একই সময়ে এসব হিসাবে জমা অর্থ বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। মার্চ শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে জমা ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৮ লাখ
৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। তবে এসব হিসাবকে সরাসরি ‘নতুন কোটিপতি’ বলা যাবে না। কারণ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব রয়েছে। বরং এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে দেশের আয়-বণ্টন, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের তথ্য মিলিয়ে দেখলে অর্থনীতিতে বৈষম্যের একটি চিত্র পাওয়া যায়। ব্যক্তির হিসাবে উল্টো চিত্র সামগ্রিকভাবে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বাড়লেও ব্যক্তি পর্যায়ে চিত্রটি ভিন্ন। জুন শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তি হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৯০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যক্তি পর্যায়ে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৪০ হাজার ৬৩০টি। তখন
এসব হিসাবে জমা ছিল ৯১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ব্যক্তি পর্যায়ে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বেড়েছে মাত্র ৭১টি। কিন্তু এসব হিসাবে জমা অর্থ কমেছে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। অন্যদিকে সামগ্রিক কোটি টাকার হিসাব ও আমানত বৃদ্ধির পেছনে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের ভূমিকা রয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে পড়ে থাকতে পারে। ফলে ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব বাড়লেও সেটিকে ব্যক্তি পর্যায়ে সম্পদ বৃদ্ধির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে অর্থনীতির দুই প্রান্তের বাস্তবতা যে আলাদা, তা অন্য পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। আয়ের বড়
অংশ শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে মোট আয়ের ৪০.৯২ শতাংশ ছিল। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ৩৮.০৯ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে ছিল মোট আয়ের মাত্র ১.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে যে পরিমাণ আয় যায়, তা সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশের তুলনায় বহু গুণ বেশি। আয় বৈষম্যের পরিমাপক জিনি সহগও বেড়েছে। ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে জিনি সহগ ছিল ০.৪৮২। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ০.৪৯৯। শহরাঞ্চলে বৈষম্য আরও বেশি; সেখানে জিনি সহগ ছিল ০.৫৩৯। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি বড় হলেও সেই অর্থনৈতিক
অগ্রগতির সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। দাম বাড়ছে, আয় সেই হারে বাড়ছে না বৈষম্যের এই চিত্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি যুক্ত হয়ে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির অর্থ হলো, একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কেনা যায়। আয় একই থাকলে বা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম বাড়লে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে যাদের আয়ের বড় অংশ খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি পণ্যের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্যও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ২১.৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বনরুটিতেও কাটছাঁট নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সবচেয়ে সরাসরি প্রকাশ পাওয়া যায় খাবারের বাজারে। মিরপুরের টং দোকানে যে বনরুটি বা বাটারবান একসময় সামান্য খরচে ক্ষুধা মেটানোর খাবার ছিল, সেটিও এখন দামের চাপে পড়েছে। মিরপুরের একটি চায়ের দোকানের বিক্রেতা জোৎস্না বলেন, তিন দিন ধরে বনরুটি ও বাটারবান সরবরাহ করা হচ্ছে না। বেকারির লোকজন দাম বাড়ানোর কথা বলছেন। ২০ টাকার বাটারবান ২৫ টাকা করার কথাও তারা জানিয়েছেন। মিরপুর-১ এলাকার আরেক দোকানি রাহেলা বেগম বলেন, কয়েক দিন ধরে এলাকার বেকারিগুলো থেকে মাল দেওয়া বন্ধ রয়েছে। তার ধারণা, দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। তবে সব বেকারি দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছে না। মিরপুর-২ এলাকার একটি বেকারির সরবরাহের দায়িত্বে থাকা এক কর্মী বলেন, গত বছর দুই দফায় দাম বাড়ানোর পর বিক্রি কমে গেছে। আবার দাম বাড়ালে বিক্রি আরও কমতে পারে। তিনি বলেন, ‘মানুষের ইনকাম তো আসলে বাড়ে নাই। কিন্তু খরচ অনেক বেড়েছে। এখন একটা বনরুটি যেটা ১০ টাকা বিক্রি করছে সেটা ১৫ টাকা করলে মানুষ তো খাবে না।’ অর্থাৎ উৎপাদক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই চাপে রয়েছে। কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আবার দাম বাড়ালে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই দামে কমছে পণ্যের ওজন দাম বাড়ানোর পাশাপাশি আরেকটি প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে—একই দামে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া। মিরপুর-২ এলাকার বনলতা লাইভ বেকারির শাখা ব্যবস্থাপক মকিদুল ইসলাম শিশির বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান এখনো দাম বাড়ানোর বা ওজন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে বাজার পরিস্থিতিতে দুই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তার ভাষ্য, ৪০০ গ্রামের পাউরুটি হয়তো ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রাম করা হতে পারে। আর দাম বাড়ানো হলে ৪০০ গ্রামই রাখা হবে। ভোক্তার জন্য দুই ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে। সরাসরি দাম বাড়লে বেশি টাকা দিতে হয়। আর একই দাম রেখে ওজন কমানো হলে একই টাকায় কম পণ্য পাওয়া যায়। কাঁচামাল ও জ্বালানির বাড়তি খরচ বেকারি মালিকদের সংগঠনের সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, ময়দা, ডালডা, তেল ও প্যাকেজিং সামগ্রীর দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন এবং কিছু পণ্যের ওজন কমিয়েছেন। তিনি জানান, ময়দা, তেলসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালাতে বাড়তি জ্বালানি খরচ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে। জালাল উদ্দিনের দাবি, তাদের ক্রেতাদের বড় অংশ শ্রমজীবী মানুষ—দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার। ফলে দাম বাড়লে তার চাপ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই পড়ে। এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রুটি ও বনরুটির মতো পণ্য অনেক প্রান্তিক মানুষের খাবারের অংশ। তাই দাম বাড়ানো বা ওজন কমানোর আগে সাধারণ মানুষের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধি আছে, স্বস্তি কোথায় বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সাফল্য ছিল গত এক দশকে দারিদ্র্য কমানো। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ৩৭.১ শতাংশ থেকে ১৮.৭ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য কমানোর গতি কমেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তুলনামূলকভাবে বেশি গেছে মধ্য ও উচ্চ আয়ের মানুষের দিকে। বিশ্বব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। কর্মসংস্থান দুর্বল হয়েছে, প্রকৃত মজুরি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ তৈরি করেছে। এদিকে ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেও বিনিয়োগ ও ঋণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে অর্থনীতিতে টাকা আছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—টাকাটি কোথায় যাচ্ছে এবং তা কতটা কর্মসংস্থান ও আয় তৈরি করছে। বৈষম্যের সবচেয়ে বড় হিসাব মানুষের ঘরে ব্যাংকের হিসাবে কোটি টাকা থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে—এটি অর্থনীতির একটি তথ্য। কিন্তু সেটি দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার পূর্ণ ছবি নয়। কারণ এর মধ্যে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই রয়েছে। আয়-বণ্টনের তথ্য, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও মজুরির প্রবণতা একসঙ্গে দেখলে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট: অর্থনীতির ওপরের দিকে অর্থের প্রবাহ এবং নিচের দিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা একই গতিতে এগোচ্ছে না। একদিকে ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব তিন মাসে বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি এবং এসব হিসাবে জমা অর্থ বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ৫ টাকা বাড়তি দামও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০ টাকার বাটারবান ২৫ টাকা হলে সেটি শুধু পাঁচ টাকার পার্থক্য নয়; মাসের শেষে সেটি পরিবারের অন্য কোনো প্রয়োজন বাদ দেওয়ার কারণ হতে পারে। সাইমনের মতো মানুষের কাছে তাই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির হিসাব খুব সহজ—আয় কত বাড়ল, বাজারে কত টাকা লাগে, আর দিনের শেষে হাতে কত টাকা থাকে। ব্যাংকের হিসাবে কোটির অঙ্ক বাড়ছে। কিন্তু সেই অর্থনীতিতে যদি একজন রিকশাচালককে দুপুরের আগে একটি বনরুটি কেনার হিসাবও করতে হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আরেকটি হিসাব সামনে আসে—সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ছে? শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ব্যাংকের আমানতের অঙ্কে নয়, মানুষের খাবারের তালিকায়। সেই তালিকা যদি ছোট হতে থাকে, তাহলে কোটির টাকা বাড়ার পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বৈষম্যের হিসাবটিও আরও বড় হয়ে উঠবে। বাংলা ট্রিবিউন



