ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
শুক্রবার সন্ধ্যায় শপথ নেবেন নতুন রাষ্ট্রপতি: চিফ হুইপ
২ হাজার টাকার জন্য খুন, বাথরুমে মিললো ছুরি
‘টেলিভিশনের খবরে জানতে পারি, আমার বাবা বন্দুকযুদ্ধে নিহত’
জালিয়াতির অভিযোগ, হান্নান মাসউদের এমপি পদ শূন্য ঘোষণা চেয়ে রিট
১৫ অগাস্টের কর্মসূচির চেষ্টা করায় বাংলাদেশ জাসদের কার্যালয় উচ্ছেদ করছে সরকার
ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী: দ্রব্যমূল্য কমাতে সময় লাগবে, ছয় মাসে দৃশ্যমান ফল চাওয়া ঠিক নয়
রাশিয়া থেকে গম আমদানি ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ, ব্যাখ্যা দিলো রুশ দূতাবাস
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের নতুন কূটনৈতিক ফাঁদ?
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার মধ্যেই হঠাৎ করে মিয়ানমার সরকারের নতুন বিবৃতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে নিজেদের সদিচ্ছা দেখানোর পাশাপাশি ওই বিবৃতিতে সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে নেপিডো।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু প্রত্যাবাসনের ঘোষণা নয়; বরং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতা থেকে নিজেদের অবস্থান রক্ষার একটি কৌশলও হতে পারে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৫ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া তালিকার মধ্যে যাচাই করা প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুকূলে এলে তাদের প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত রয়েছে দেশটি।
তবে একই সঙ্গে মিয়ানমার ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে
আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং সংকটের আন্তর্জাতিক বর্ণনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। হঠাৎ কেন এই বিবৃতি? দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় কার্যকর অগ্রগতি না থাকা সত্ত্বেও এখন কেন এমন ঘোষণা দিল মিয়ানমার? ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিনে কেনই বা এই বিবৃতি দিল দেশটি? বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, রাখাইন পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং মানবাধিকার ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্যও নেপিডো এমন বার্তা দিতে চাইছে যে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আগ্রহী। আসিয়ানের চাপ ও আঞ্চলিক
কূটনীতি মিয়ানমার বর্তমানে আঞ্চলিক পর্যায়েও চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে আসিয়ানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় মিয়ানমারকে নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটও আসিয়ানের জন্য একটি বড় মানবিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ফলে আঞ্চলিক চাপ কমাতেও মিয়ানমার নতুন এই বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আইসিজের রায় থেকে বাঁচার কৌশল? রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা মামলাও মিয়ানমারের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আদালতের কার্যক্রমে মিয়ানমার বারবার দাবি করেছে যে
তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করছে এবং আন্তর্জাতিক অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত। চলতি বছরের শেষে আইসিজের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হবে। বেশ কয়েকটি সূত্র জানায়, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান দেখিয়ে মিয়ানমার ভবিষ্যতে আইসিজের যেকোনো পর্যবেক্ষণ বা রায়ের প্রভাব মোকাবিলার জন্য একটি কূটনৈতিক ঢাল তৈরি করতে চাইছে। তারা দেখাতে চাইছে যে সংকট সমাধানে তারা উদ্যোগী, যদিও বাস্তবে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অধিকার ও আস্থার সংকট এখনো রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা মিয়ানমারের বিবৃতির আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করা। দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করে আসছে। এখন মিয়ানমার বলতে চাইছে, তারা প্রত্যাবাসনের পথ বন্ধ করেনি, বরং
যাচাই করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। তবে সমালোচকদের মতে, শুধু প্রত্যাবাসনের সংখ্যা ঘোষণা করলেই সংকটের সমাধান হবে না। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের অধিকার এবং স্থায়ী সমাধানের বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার সতর্ক পর্যবেক্ষণ মিয়ানমারের বিবৃতি নিয়ে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে এই বিবৃতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে ঢাকা। বাংলাদেশের মূল অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে। বাংলাদেশ মনে করে, শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, রোহিঙ্গাদের মূল সমস্যা নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্ব সংকট এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন কার্যকর হবে না। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ মিয়ানমারের এই বক্তব্যকে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে কোনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতার
সঙ্গে দেখবে। মিয়ানমারের বিবৃতিতে কী আছে? রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে একপাক্ষিক ও ভুল তথ্যনির্ভর দাবি করে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে মিয়ানমার। গত ১৫ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করে, রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুতদের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সমন্বিত হামলা চালায়। এসব ঘটনার পর দেশটির সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। এর ফলে স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর মানুষ অন্য এলাকায় চলে যায় এবং বিপুলসংখ্যক বাঙালি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মিয়ানমারের দাবি, এআরএসএ হামলার আগে রাখাইনের
বুথিডং, মংডু ও রাথেডং এলাকায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাঙালি বসবাস করতেন। হামলার পর প্রায় ২ লাখ মানুষ ওই এলাকায় থেকে যান এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে চলে যান। ফলে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের যে তথ্য প্রচলিত রয়েছে, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছে দেশটি। বিবৃতিতে বলা হয়, বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই মাসের মধ্যে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে। এসব চুক্তির আওতায় ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে কোনো বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি ওই তিন দফায় মিয়ানমারে ফিরে যায়নি। মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করা হয়েছে। যাচাইকৃতদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে থাকা সব ক্যাম্পবাসী মিয়ানমারের নাগরিক, এমন দাবির সঙ্গে তারা একমত নয়। একইভাবে বিভিন্ন দেশে যাওয়া ‘বোট পিপল’ দের মিয়ানমারের কোনো নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটি। মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, ১৯৭৮, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালের অভিবাসন যাচাই কার্যক্রমের সময় রাখাইন থেকে কিছু বাঙালি বাংলাদেশে চলে এসেছিল। তবে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ১৯৭৮-৭৯ সালে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ জন এবং ১৯৯২-২০০৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৫ জনকে মিয়ানমার গ্রহণ করেছিল। বিবৃতিতে বলা হয়, যাচাইকৃত ও রাখাইনের সাবেক বাসিন্দাদের দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ‘কাম অ্যান্ড সি’ সফর, বাংলাদেশে ‘গো অ্যান্ড টক’ সফর, সরেজমিন যাচাই এবং পাইলট প্রকল্পের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুতদের গ্রহণ করা হবে। দেশটি বলেছে, প্রত্যাবাসন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমাধানযোগ্য দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং এ ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণে তারা অসন্তুষ্ট। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। বিশ্লেষকরা যা বলছেন মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার এবারও অতীতের মতো সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। তার মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের নামে মিয়ানমার বারবার জটিলতা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, অতীতেও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তালিকা হস্তান্তর করার পর মিয়ানমার বিভিন্ন অজুহাতে যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করেছিল। এমনকি প্রত্যাবাসনে সম্মতি দেওয়ার পরও তারা যে তালিকা তৈরি করেছিল, সেখানে পরিবারভিত্তিক বিভাজন তৈরি করা হয়। একই পরিবারের কাউকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও অন্য সদস্যকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাদের নানা ধরনের দুষ্টু কৌশলের কারণেই অতীতে প্রত্যাবাসন কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং সংকটের আন্তর্জাতিক বর্ণনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। হঠাৎ কেন এই বিবৃতি? দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় কার্যকর অগ্রগতি না থাকা সত্ত্বেও এখন কেন এমন ঘোষণা দিল মিয়ানমার? ১৫ আগস্ট মিয়ানমারের সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিনে কেনই বা এই বিবৃতি দিল দেশটি? বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, রাখাইন পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং মানবাধিকার ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্যও নেপিডো এমন বার্তা দিতে চাইছে যে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আগ্রহী। আসিয়ানের চাপ ও আঞ্চলিক
কূটনীতি মিয়ানমার বর্তমানে আঞ্চলিক পর্যায়েও চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে আসিয়ানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় মিয়ানমারকে নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটও আসিয়ানের জন্য একটি বড় মানবিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ফলে আঞ্চলিক চাপ কমাতেও মিয়ানমার নতুন এই বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আইসিজের রায় থেকে বাঁচার কৌশল? রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার করা মামলাও মিয়ানমারের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আদালতের কার্যক্রমে মিয়ানমার বারবার দাবি করেছে যে
তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করছে এবং আন্তর্জাতিক অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত। চলতি বছরের শেষে আইসিজের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হবে। বেশ কয়েকটি সূত্র জানায়, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান দেখিয়ে মিয়ানমার ভবিষ্যতে আইসিজের যেকোনো পর্যবেক্ষণ বা রায়ের প্রভাব মোকাবিলার জন্য একটি কূটনৈতিক ঢাল তৈরি করতে চাইছে। তারা দেখাতে চাইছে যে সংকট সমাধানে তারা উদ্যোগী, যদিও বাস্তবে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অধিকার ও আস্থার সংকট এখনো রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা মিয়ানমারের বিবৃতির আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করা। দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করে আসছে। এখন মিয়ানমার বলতে চাইছে, তারা প্রত্যাবাসনের পথ বন্ধ করেনি, বরং
যাচাই করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। তবে সমালোচকদের মতে, শুধু প্রত্যাবাসনের সংখ্যা ঘোষণা করলেই সংকটের সমাধান হবে না। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের অধিকার এবং স্থায়ী সমাধানের বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার সতর্ক পর্যবেক্ষণ মিয়ানমারের বিবৃতি নিয়ে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে এই বিবৃতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে ঢাকা। বাংলাদেশের মূল অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে। বাংলাদেশ মনে করে, শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, রোহিঙ্গাদের মূল সমস্যা নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্ব সংকট এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন কার্যকর হবে না। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ মিয়ানমারের এই বক্তব্যকে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে কোনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতার
সঙ্গে দেখবে। মিয়ানমারের বিবৃতিতে কী আছে? রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে একপাক্ষিক ও ভুল তথ্যনির্ভর দাবি করে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে মিয়ানমার। গত ১৫ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করে, রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুতদের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সমন্বিত হামলা চালায়। এসব ঘটনার পর দেশটির সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। এর ফলে স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর মানুষ অন্য এলাকায় চলে যায় এবং বিপুলসংখ্যক বাঙালি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মিয়ানমারের দাবি, এআরএসএ হামলার আগে রাখাইনের
বুথিডং, মংডু ও রাথেডং এলাকায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাঙালি বসবাস করতেন। হামলার পর প্রায় ২ লাখ মানুষ ওই এলাকায় থেকে যান এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে চলে যান। ফলে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের যে তথ্য প্রচলিত রয়েছে, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছে দেশটি। বিবৃতিতে বলা হয়, বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই মাসের মধ্যে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে। এসব চুক্তির আওতায় ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে কোনো বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি ওই তিন দফায় মিয়ানমারে ফিরে যায়নি। মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করা হয়েছে। যাচাইকৃতদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে থাকা সব ক্যাম্পবাসী মিয়ানমারের নাগরিক, এমন দাবির সঙ্গে তারা একমত নয়। একইভাবে বিভিন্ন দেশে যাওয়া ‘বোট পিপল’ দের মিয়ানমারের কোনো নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটি। মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, ১৯৭৮, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালের অভিবাসন যাচাই কার্যক্রমের সময় রাখাইন থেকে কিছু বাঙালি বাংলাদেশে চলে এসেছিল। তবে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ১৯৭৮-৭৯ সালে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ জন এবং ১৯৯২-২০০৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৫ জনকে মিয়ানমার গ্রহণ করেছিল। বিবৃতিতে বলা হয়, যাচাইকৃত ও রাখাইনের সাবেক বাসিন্দাদের দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ‘কাম অ্যান্ড সি’ সফর, বাংলাদেশে ‘গো অ্যান্ড টক’ সফর, সরেজমিন যাচাই এবং পাইলট প্রকল্পের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত বাস্তুচ্যুতদের গ্রহণ করা হবে। দেশটি বলেছে, প্রত্যাবাসন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমাধানযোগ্য দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং এ ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণে তারা অসন্তুষ্ট। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। বিশ্লেষকরা যা বলছেন মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার এবারও অতীতের মতো সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। তার মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের নামে মিয়ানমার বারবার জটিলতা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, অতীতেও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তালিকা হস্তান্তর করার পর মিয়ানমার বিভিন্ন অজুহাতে যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করেছিল। এমনকি প্রত্যাবাসনে সম্মতি দেওয়ার পরও তারা যে তালিকা তৈরি করেছিল, সেখানে পরিবারভিত্তিক বিভাজন তৈরি করা হয়। একই পরিবারের কাউকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও অন্য সদস্যকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাদের নানা ধরনের দুষ্টু কৌশলের কারণেই অতীতে প্রত্যাবাসন কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।



