ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
রাজপথে সন্তানের সাথে মিছিলে মা, ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়
‘যুদ্ধবিরতি’র পরেও থামছে না হত্যা — গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মৃতের সংখ্যা ৯৮৩
২৭ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১,০৮১ কোটির বরাদ্দ: ইমাম-মুয়াজ্জিনের জীবন বদলাবে, নাকি ভোটের মাঠ গরম হবে?
রাউজানে প্রকাশ্যে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা, দলীয় কোন্দলকে দুষছেন কর্মীরা
আকারে নয়, বাস্তবায়নে বাজেটের সাফল্য: সিপিডি
শক্তিশালী মহলের প্রভাবে ধামাচাপা পড়ে গেল স্বামী-শাশুড়ির নির্যাতনে নিহত ডা. নাফিসা দিপ্রার নাম
আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল, হাসপাতাল ছাড়ছেন রোগীরা
দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা: ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে জনগণের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা উপেক্ষা করতে পারি না
নয়াদিল্লি থেকে ‘এই সময়’-কে দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন ছেড়ে আসা, ইস্তফা না-দেওয়ার কারণ থেকে বর্তমান সরকারের মূল্যায়ন, নিজের ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা— সব বিষয়েই খোলামেলা সবিস্তার কথা বলেছেন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা।
ভারতে বসেই রাজনীতি থেকে অবসরের কথাই একটা সময়ে ভেবেছিলেন বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এখন সেই ভাবনা খারিজ। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চিন্তা সরিয়ে রেখে নিজের দেশের মানুষের পাশে থাকার সিদ্ধান্তই নিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, ‘আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে মানুষের দুঃসময়ে তাঁদের পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৮১–তে আমি যখন
সব হারিয়ে দেশে ফিরেছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের কর্মীরাই ছিলেন আমার পরিবার। আজ সেই নেতাকর্মীরা নির্যাতিত, আমার দেশের জনগণের জীবন আজ বিপর্যস্ত। আমি কীভাবে তাদের ছেড়ে বিশ্রামে যাই?’ শেখ হাসিনার এই ‘বিশ্রামে’ যাওয়ার জল্পনা জোরালো হয়েছিল তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে। সেই সূত্রেই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি দিল্লি আসার পরে আপনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছিলেন, আপনি রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। আপনি কি এখনও সেই সিদ্ধান্তে অনড়? সে ক্ষেত্রে দল ও দেশের নেতৃত্ব আপনি কার বা কাদের হাতে ছেড়ে যেতে চান?’ জবাবে আওয়ামী সভাপতি বলেন, ‘জয়ের বক্তব্য আমার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ সারাজীবন একই দায়িত্বে থাকে
না। আমিও বহুবার বলেছি, নতুন নেতৃত্ব আসুক, তরুণেরা দায়িত্ব নিক। আওয়ামী লীগের বিগত দুই কাউন্সিলেও আমি নতুন নেতৃত্বের কথা বলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।’ তা হলে এই ভাবনার বদল কেন? শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্র আক্রান্ত। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করার আইন করা হয়েছে। আমার নেতাকর্মীরা কারাগারে। অনেকে ঘরছাড়া। সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন। নিরীহ শিশুরা টিকার অভাবে মারা যাচ্ছে, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রকে ১৯৭১-এর পথ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন একটা সময়ে আমি কীভাবে বলি, আমি বিশ্রামে যাচ্ছি?’ মুজিব–কন্যার সংযোজন, ‘আমি ক্ষমতা চাই না। কিন্তু জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা উপেক্ষা
করতে পারি না।’ শেখ হাসিনার ঘোষণা, ‘বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, তাঁদের উন্নত জীবনমান ও অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, সকলের সমানাধিকার এবং আওয়ামী লীগের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আগামী দিনের সাফল্য নিশ্চিত করে, তার পরেই আমি অবসর নেব।’ পরবর্তী নেতৃত্ব সেক্ষেত্রে কার হাতে যাবে? শেখ হাসিনার জবাব, ‘নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, সেটি কোনও ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। আওয়ামী লীগ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়, একটি গণতান্ত্রিক দল। কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে, কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে, যোগ্যতা, ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক দৃঢ়তার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।’ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পদাধিকারীদের পরিবর্তন করে নতুনদের দায়িত্ব বণ্টনের কথা দলের
অনেকে বলছেন। অসুস্থ ও অশক্ত নেতাদের সরিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে দলকে সংগঠিত করার কোনও পরিকল্পনা কি আপনি রূপায়ণ করতে চলেছেন? সেটা কেমন হতে পারে?’ শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দলীয় পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া। আমরা এই মুহূর্তে একটা প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যাঁরা আদর্শের জন্য এই দলে ছিলেন, তাঁরা আজকের দুর্দিনে আরও দৃঢ়ভাবে দলের পাশে আছেন। আর যাঁরা ব্যক্তিগত সুবিধা ও ক্ষমতার আশায় ছিলেন, তাঁরা ইতিমধ্যে ভোল পাল্টে ফেলেছেন বা চুপ করে গিয়েছেন। এটা দলকে দুর্বল করেনি, বরং খাঁটি করেছে।’ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘নেতৃত্ব কোনও অলঙ্কার নয়। নেতৃত্ব একটি পবিত্র দায়িত্ব। যাঁরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, যাঁরা কর্মীদের পাশে
দাঁড়াতে পারবেন না, যাঁরা কঠিন সময়ে সংগঠনকে ধরে রাখতে পারবেন না, তাঁদের বিষয়ে দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, আমাদের অনেক প্রবীণ নেতা সারা জীবন দলকে দিয়েছেন, জেল খেটেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাঁদের অবদান কখনও অস্বীকার করা যাবে না। তাঁদের অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পদ।’ আপাতত নেতৃত্বে বড়সড় বদলের সম্ভাবনা নেই ইঙ্গিত দিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে নতুন কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করা হবে। নতুন প্রজন্মের মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। সেই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে।’ তাঁর কথায়, ‘তরুণ নেতৃত্বের বিষয়ে আমি সর্বদাই উৎসাহী। আমাদের অনেক তরুণ
নেতারা আজ নিজ নিজ অবস্থান থেকে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন মোকাবিলা করে দৃঢ়তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পতাকা ধরে রেখেছেন। এঁরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।’ শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, মাথা উঁচু করে খুব দ্রুত আপনি বাংলাদেশের মাটিতে ফিরবেন। বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আপনার ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীদের প্রত্যাবর্তন ও রাজনীতি শুরু করাটা কতটা বাস্তবসম্মত?’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না। আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় তো নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত।’ তাঁর সংযোজন, ‘জনগণ বুঝতে পেরেছেন আওয়ামী লীগই তাঁদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে ফিরব, দেশ পুনর্গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ফিরব।’ প্রাণ বাঁচাতে আধ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্তুত হয়ে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন- ‘গণভবন’ ছাড়তে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে বিস্তর জলঘোলা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাব বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমি জানতামই না, দেশের বাইরে যাচ্ছি।’ তাঁর কথায়, ‘আমাকে পদত্যাগপত্র লেখার সময়ও দেওয়া হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী স্বহস্তে লিখিত পদত্যাগপত্র সশরীরে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সামনে উপস্থিত থেকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়াটাই নিয়ম। কিন্তু সে সুযোগ আমি পাইনি।… গণভবন আক্রমণ করতে এলে আমার হাতে সাকুল্যে ৩০-৪০ মিনিট সময় ছিল।’ ঢাকার একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও এক সাংবাদিক সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ২০২৪-এর ৫ই অগস্ট আন্দোলনকারীরা গণভবন ঘিরে ফেললে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তিন পাতার একটি পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন। সেই চিঠি তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক কর্মীকে দিয়ে টাইপ করাতে চেয়েছিলেন। ওই সাংবাদিকের দাবি, তড়িঘড়ি দেশ ছাড়তে হওয়ায় তিন পাতার সেই পদত্যাগপত্র তিনি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে পুরে নিয়ে চলে যান। শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের একটি দাবি ঘিরে আপনার পদত্যাগের বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। আপনি কি আদৌ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সাহেবের হাতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন? অথবা তিন পাতার একটি পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন, যা পরে আর স্বাক্ষর করে জমা দেননি?’ এই প্রশ্নের উত্তরে মুজিব–কন্যা বলেছেন, ‘আমাকে দেশ ছেড়ে চলে আসতে হবে, এটা আমি কোনওদিনই ভাবতে পারিনি। আমি দেশের মানুষের আর্থ–সামাজিক উন্নয়নের জন্য, তাঁদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। তাঁদের লাশ বানিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চিন্তা আমার কখনওই ছিল না।’ শেখ হাসিনার সংযোজন, ‘৫ই অগস্ট (২০২৪) কোনও স্বাভাবিক দিন ছিল না। সে দিন বাংলাদেশকে একটি ভয়াবহ সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল গণভবনের দিকে উন্মত্ত লোকজন অগ্রসর হচ্ছিল। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। পুলিশ, প্রশাসন, নিরাপত্তা কাঠামোসহ সব জায়গায় চাপ, বিভ্রান্তি এবং পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছিল।’ শেখ হাসিনার ভাষ্য, বোন রেহানা এবং তাঁকে হত্যার জন্যই আন্দোলনকারীরা গণভবনে আক্রমণ করেছিল। তাঁর কথায়, ‘আমার নিরাপত্তা নিয়ে সকলে খুব উদ্বিগ্ন ছিল। আন্দোলনকারীরা রেহানা এবং আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্য নিয়েই গণভবন আক্রমণ করতে এসেছিল। তাদের অনেকের বক্তব্যেই এটি উঠে এসেছে যে ‘লাশ ফেললে সরকার পড়ে যাবে’। ভুয়া আইডি কার্ড বানিয়ে গণভবনে লোক নিয়ে আসা হয়, এই কথা (আন্দোলনের) সমন্বয়করাই স্বীকার করেছে।’ শেখ হাসিনা জানান, সেই অল্প সময়ে (৩০-৪০ মিনিট) বসে বসে পদত্যাগপত্র লেখার সময়ও তাঁর ছিল না। শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘জুলাই-আন্দোলন মোকাবিলায় প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আপনাকে নির্দেশদাতা হিসাবে অভিযুক্ত করে দণ্ড দিয়েছে। সম্প্রতি আপনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে আইনজীবীর চিঠি পাঠিয়ে তাঁদের রিপোর্টে দেওয়া প্রাণহানির তথ্য সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশে ‘রেজিম চেঞ্জ’ পরিকল্পনায় জাতিসংঘের এই শাখা সংস্থাটিও যুক্ত বলে কি আপনি মনে করেন?’ শেখ হাসিনার জবাব, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আইসিটি (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) গঠন করা হয়েছিল। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার বেআইনিভাবে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আমাকে যে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনও বিচার নয়, এটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ মাত্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪–এর জুলাই-আগস্টে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটি কোনও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল না। কোটা পরিবর্তনের দাবির আড়ালে এটি ছিল একটি সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলন, যাতে দেশি ও বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জড়িত ছিল। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ক্ষমতা দখল করা (মুহাম্মদ) ইউনূস নিজেই এই আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজ়াইনড’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ষড়যন্ত্রকে সফল করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরাই হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নিয়েছিল।’ তাঁর সংযোজন, ‘এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে বলেছে, আন্দোলন সফল করার জন্য তারা পুলিশ হত্যা করেছে, মেট্রোরেলে আগুন দিয়েছে। আন্দোলন সফল না হলে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনার কথাও তারা স্বীকার করেছে।’ আওয়ামী লীগ সুপ্রিমো শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোন মৃত্যুই কাম্য নয়। প্রথম হতাহতের ঘটনার পরেই তাই আমি সঠিকভাবে তদন্ত করার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। কিন্তু দেশবিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে সেই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে দিয়েছে। এমনকী, নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত পর্যন্ত করতে দেয়নি।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘কী ভয় ছিল তাদের? কেন আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে?’ জাতিসংঘের মানবাধিকার শাখা (ওএইচসিএইচআর)-র রিপোর্ট প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা এই তদন্ত করেছিল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে। যারা চক্রান্ত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করল, তাদের আমন্ত্রণে পরিচালিত তদন্ত কীভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে পারে? এই প্রতিবেদনে জুলাই-অগস্টে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এর সপক্ষে কোনও প্রমাণ দেওয়া হয়নি। খোদ অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৮৩৪। এমনকি গেজেটেও নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মিথ্যা নাম সংযোজন করা হয়েছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওএইচসিএইচআর-এর কমিশনার ভলকার টুর্ক ২০২৫–এর মার্চে বিবিসি-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন— তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, আন্দোলন দমনে কঠোর হলে শান্তিরক্ষী মিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এটি দৃশ্যতই একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল, যা জাতিসংঘের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।’ তাঁর কথায়, ‘এটা পরিষ্কার, জুলাই-অগস্টের ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলন চলার সময়ে এবং প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’ ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের জমানাতেই নয়াদিল্লির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে ঢাকা যে ইসলামাবাদের কাছাকাছি আসছে, তেমন অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচনের পরেও পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়ে চলেছে সে দেশের বর্তমান বিএনপি সরকার, এমনই দাবি বিভিন্ন মহলের। সরকারি তরফে একে ‘নতুন কূটনীতি’ বা ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ বলে যুক্তিও দেওয়া হয়েছে। যদিও শেখ হাসিনার পর্যবেক্ষণ, ‘রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া, দুটো এক বিষয় নয়।’ মুজিব–কন্যা বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনও সম্পর্ক হতে হবে ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে, ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষা করে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে। কিন্তু আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করা, পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে— তার মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।’ শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘প্রথমে ইউনূস ও পরে তারেক রহমানের আমলে কি পাকিস্তানের অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ? মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশের এই অবস্থান পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?’ আওয়ামী সুপ্রিমোর জবাব, ‘যাঁরা আজ পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতি ঘনিষ্ঠতাকে ‘নতুন কূটনীতি’ বলে প্রচার করছেন, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন— পাকিস্তান কি ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে? তারা কি যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে? তারা কি বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতকে সম্মান দিয়েছে? যদি না করে, তা হলে এত তাড়াহুড়ো করে সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা কেন? পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যাঁরা ১৯৭১–কে ভুলে যান, তাঁরা বাংলাদেশকে বুঝতে পারেন না। যাঁরা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ায় ফেরাতে চান, তাঁরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছেন।’ ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে নির্বাচনের পরে বহু মানুষ প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তান-পন্থী মৌলবাদী শক্তি’ জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে তাঁরা বাধ্য হয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার কি জামায়াত-বিরোধী সেই রায়ের মর্যাদা দিতে পারছে?’ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা উত্তরে বলেন, ‘যাঁরা ভেবেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে, তাঁরা ইতিহাস ভুলে গিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামীর পূনর্বাসন হয়েছে। জামায়াত বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী, মুখে ভিন্ন নীতি-আদর্শের কথা বললেও তারা উভয়েই মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার অংশীদার। এদের ভিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’ শেখ হাসিনার পাল্টা প্রশ্ন, ‘যদি মানুষ জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়ে থাকে, তা হলে বিএনপি কেন মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? কেন মাজারে হামলা হচ্ছে? কেন সুফিদের দরগা নিরাপদ নয়? কেন সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন? কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া, আদিবাসী— কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না? কেন পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সব জায়গায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপরে আঘাত আসছে?’ শেখ হাসিনার উদ্দেশে প্রশ্ন ছিল, ‘বিএনপি সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ‘নতুন ইনিংস’ শুরু করেছে। এর ফলে কি আপনার অবস্থান দুর্বল হচ্ছে? সম্পর্কের স্বার্থে ভারত যদি আপনাকে বিচারের জন্য ঢাকায় ফেরত পাঠাতে চায়, আপনার পদক্ষেপ কী হবে?’ শেখ হাসিনা উত্তরে বলেন, ‘একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে ভারতের যে যোগাযোগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক।’ শেখ হাসিনার কথায়, ‘এর সঙ্গে আমার অবস্থান দুর্বল হওয়ার প্রশ্ন জড়িত নয়। কারণ আমার অবস্থান নির্ভর করে বাংলাদেশের মানুষের উপরে। আমি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ কঠিন সময়ে তাঁরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমার অবস্থান অন্য কোনও রাষ্ট্র কিংবা সরকারের সমর্থনের উপরে নির্ভরশীল নয়। সরকারে থাকতে আমি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কখনও বিসর্জন দিইনি।’ তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন না শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘দু’দেশের টেকসই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। যাঁরা এগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, প্রতিনিয়ত হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারত-বিরোধী অপপ্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এবং অতীতে ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের সঙ্গে ভারতের কোনও নতুন ইনিংসই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়।’ ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে শুধু যে টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছিল, তা-ই নয়, গোটা স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস করে দিয়েছে বলে অভিযোগ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাঁর কথায়, এই কারণেই মহামারি হিসেবে হাম ছড়িয়ে পড়েছে, লক্ষাধিক শিশু তাতে আক্রান্ত হয়েছে, সরকারি হিসেবেই মারা গিয়েছে সাড়ে ছ’শো। শেখ হাসিনার ভাষ্য, ‘বর্তমান সরকারও এ সবের তদন্ত না-করে আওয়ামী লীগকে দোষারোপের মিথ্যাচারে ব্যস্ত।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, হামে শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী প্রতিটি ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে! যাঁরা টিকাকরণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাঁরা ‘হু’-র সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন, যাঁরা টিকা সরবরাহ ব্যাহত করেছেন, তাঁদের জবাব দিতেই হবে। স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে অবহেলা, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হবে, তাঁদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।’ মুজিব–কন্যার সংযোজন, ‘সব চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো— এই শিশুরা এমন একটা রোগে মারা যাচ্ছে, যা আমরা প্রায় নির্মূল করার পর্যায়ে ছিলাম এবং সব ঠিক থাকলে ২০২৬–এই আমরা বাংলাদেশকে হাম-মুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করতাম।’ তা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন? শেখ হাসিনার জবাব, শুধু টিকাদান কর্মসূচি বন্ধই নয়, পুরো স্বাস্থ্য খাতকেই ইউনূস সরকার ধ্বংস করেছে। শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সরকারি হাসপাতালগুলিতে জরুরি চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ নেই।’ শেখ হাসিনার উদ্দেশে প্রশ্ন ছিল, ‘ইউনূসের নোবেল শান্তি পুরস্কার কেড়ে নেওয়া উচিত, এমন দাবিও উঠছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?’ বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জবাব, ‘পুরস্কার কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি নোবেল কমিটির এক্তিয়ার। সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না। কিন্তু নৈতিক প্রশ্ন তো উঠবেই। যে ব্যক্তির স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশু মারা যায়, তার ‘নোবেল শান্তি’ পরিচয়ের অর্থ কী?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘তা হলে বাজেটের ৪২ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?’ শেখ হাসিনার অভিযোগ, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বিএনপি ও জামায়াত— এই দুই দলকে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির কথায়, ‘অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে বাংলাদেশে যে দমনমূলক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরও স্থায়ী করেছে বর্তমান সরকার। শুধু মুখ বদলেছে, কোনও নীতির পরিবর্তন হয়নি।’ শেখ হাসিনা যোগ করেন, ‘২০০১-০৬ নাগাদ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশকে যেমনভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, ১০০ দিনে সেই স্মৃতিই ফিরিয়ে এনেছে বর্তমান সরকার।’ শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘তারেক রহমান কি পুরো পাঁচটা বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন বলে আপনি বিশ্বাস করেন? নাকি মাঝপথে ‘অন্য শক্তি’র ক্ষমতা দখলের আশঙ্কা করেন?’ মুজিব–কন্যার ব্যাখ্যা, ‘কখন ‘অন্য শক্তি’ আসে? যখন রাজনীতি ব্যর্থ হয়। যখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। যখন নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। যখন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করে, কিন্তু মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক পরিসর কখনও শূন্য থাকে না। সে জায়গা দখল করে অগণতান্ত্রিক শক্তি, সামরিক শক্তি, অথবা বিদেশি প্রভাবিত শক্তি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি চাই না, বাংলাদেশ আবার সেই অন্ধকার পথে যাক। আমি চাই না, বাংলাদেশের মানুষ আবার অনিশ্চয়তা, সামরিক হস্তক্ষেপ, উগ্রবাদ বা অদৃশ্য শক্তির রাজনীতির মধ্যে পড়ুক। আমি চাই জনগণের ভোটে, সংবিধানের পথে, সব দলের অংশগ্রহণে, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরে আসুক। বন্দুকের জোর, মামলা-হামলা, নিষেধাজ্ঞা বা মব দিয়ে কিছু দিন ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, তার পরে সেটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। জনগণের আস্থা ছাড়া রাষ্ট্র চালানো যায় না।’ ‘এই পরিস্থিতিতে আপনার রণকৌশল কী’— এই প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনও শাসকের দয়ার দান নয়। এই দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না।’ আওয়ামী সুপ্রিমোর সংযোজন, ‘জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগের মূল রণকৌশল হচ্ছে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা, তাঁদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করা। জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে কোনও প্রতিবন্ধকতা টিকতে পারে না। আমরা এখন সেই কাজটা করে যাচ্ছি। আমার দলের নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছে। জনগণ বুঝতে পেরেছেন, আওয়ামী লীগই তাঁদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব।’
সব হারিয়ে দেশে ফিরেছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের কর্মীরাই ছিলেন আমার পরিবার। আজ সেই নেতাকর্মীরা নির্যাতিত, আমার দেশের জনগণের জীবন আজ বিপর্যস্ত। আমি কীভাবে তাদের ছেড়ে বিশ্রামে যাই?’ শেখ হাসিনার এই ‘বিশ্রামে’ যাওয়ার জল্পনা জোরালো হয়েছিল তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে। সেই সূত্রেই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি দিল্লি আসার পরে আপনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছিলেন, আপনি রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। আপনি কি এখনও সেই সিদ্ধান্তে অনড়? সে ক্ষেত্রে দল ও দেশের নেতৃত্ব আপনি কার বা কাদের হাতে ছেড়ে যেতে চান?’ জবাবে আওয়ামী সভাপতি বলেন, ‘জয়ের বক্তব্য আমার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ সারাজীবন একই দায়িত্বে থাকে
না। আমিও বহুবার বলেছি, নতুন নেতৃত্ব আসুক, তরুণেরা দায়িত্ব নিক। আওয়ামী লীগের বিগত দুই কাউন্সিলেও আমি নতুন নেতৃত্বের কথা বলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।’ তা হলে এই ভাবনার বদল কেন? শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্র আক্রান্ত। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করার আইন করা হয়েছে। আমার নেতাকর্মীরা কারাগারে। অনেকে ঘরছাড়া। সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন। নিরীহ শিশুরা টিকার অভাবে মারা যাচ্ছে, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রকে ১৯৭১-এর পথ থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমন একটা সময়ে আমি কীভাবে বলি, আমি বিশ্রামে যাচ্ছি?’ মুজিব–কন্যার সংযোজন, ‘আমি ক্ষমতা চাই না। কিন্তু জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা উপেক্ষা
করতে পারি না।’ শেখ হাসিনার ঘোষণা, ‘বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, তাঁদের উন্নত জীবনমান ও অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, সকলের সমানাধিকার এবং আওয়ামী লীগের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আগামী দিনের সাফল্য নিশ্চিত করে, তার পরেই আমি অবসর নেব।’ পরবর্তী নেতৃত্ব সেক্ষেত্রে কার হাতে যাবে? শেখ হাসিনার জবাব, ‘নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, সেটি কোনও ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। আওয়ামী লীগ কারও পারিবারিক সম্পত্তি নয়, একটি গণতান্ত্রিক দল। কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে, কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে, যোগ্যতা, ত্যাগ, সাহস ও আদর্শিক দৃঢ়তার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে।’ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পদাধিকারীদের পরিবর্তন করে নতুনদের দায়িত্ব বণ্টনের কথা দলের
অনেকে বলছেন। অসুস্থ ও অশক্ত নেতাদের সরিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে দলকে সংগঠিত করার কোনও পরিকল্পনা কি আপনি রূপায়ণ করতে চলেছেন? সেটা কেমন হতে পারে?’ শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দলীয় পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া। আমরা এই মুহূর্তে একটা প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যাঁরা আদর্শের জন্য এই দলে ছিলেন, তাঁরা আজকের দুর্দিনে আরও দৃঢ়ভাবে দলের পাশে আছেন। আর যাঁরা ব্যক্তিগত সুবিধা ও ক্ষমতার আশায় ছিলেন, তাঁরা ইতিমধ্যে ভোল পাল্টে ফেলেছেন বা চুপ করে গিয়েছেন। এটা দলকে দুর্বল করেনি, বরং খাঁটি করেছে।’ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘নেতৃত্ব কোনও অলঙ্কার নয়। নেতৃত্ব একটি পবিত্র দায়িত্ব। যাঁরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, যাঁরা কর্মীদের পাশে
দাঁড়াতে পারবেন না, যাঁরা কঠিন সময়ে সংগঠনকে ধরে রাখতে পারবেন না, তাঁদের বিষয়ে দলীয় কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, আমাদের অনেক প্রবীণ নেতা সারা জীবন দলকে দিয়েছেন, জেল খেটেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাঁদের অবদান কখনও অস্বীকার করা যাবে না। তাঁদের অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পদ।’ আপাতত নেতৃত্বে বড়সড় বদলের সম্ভাবনা নেই ইঙ্গিত দিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে নতুন কাউন্সিল (সম্মেলন)-এর মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করা হবে। নতুন প্রজন্মের মেধাবী, দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। সেই পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে।’ তাঁর কথায়, ‘তরুণ নেতৃত্বের বিষয়ে আমি সর্বদাই উৎসাহী। আমাদের অনেক তরুণ
নেতারা আজ নিজ নিজ অবস্থান থেকে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন মোকাবিলা করে দৃঢ়তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পতাকা ধরে রেখেছেন। এঁরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।’ শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, মাথা উঁচু করে খুব দ্রুত আপনি বাংলাদেশের মাটিতে ফিরবেন। বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আপনার ও আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীদের প্রত্যাবর্তন ও রাজনীতি শুরু করাটা কতটা বাস্তবসম্মত?’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না। আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় তো নয়। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত।’ তাঁর সংযোজন, ‘জনগণ বুঝতে পেরেছেন আওয়ামী লীগই তাঁদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে ফিরব, দেশ পুনর্গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ফিরব।’ প্রাণ বাঁচাতে আধ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্তুত হয়ে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন- ‘গণভবন’ ছাড়তে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে বিস্তর জলঘোলা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাব বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমি জানতামই না, দেশের বাইরে যাচ্ছি।’ তাঁর কথায়, ‘আমাকে পদত্যাগপত্র লেখার সময়ও দেওয়া হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী স্বহস্তে লিখিত পদত্যাগপত্র সশরীরে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সামনে উপস্থিত থেকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়াটাই নিয়ম। কিন্তু সে সুযোগ আমি পাইনি।… গণভবন আক্রমণ করতে এলে আমার হাতে সাকুল্যে ৩০-৪০ মিনিট সময় ছিল।’ ঢাকার একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও এক সাংবাদিক সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ২০২৪-এর ৫ই অগস্ট আন্দোলনকারীরা গণভবন ঘিরে ফেললে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তিন পাতার একটি পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন। সেই চিঠি তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক কর্মীকে দিয়ে টাইপ করাতে চেয়েছিলেন। ওই সাংবাদিকের দাবি, তড়িঘড়ি দেশ ছাড়তে হওয়ায় তিন পাতার সেই পদত্যাগপত্র তিনি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে পুরে নিয়ে চলে যান। শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের একটি দাবি ঘিরে আপনার পদত্যাগের বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। আপনি কি আদৌ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সাহেবের হাতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন? অথবা তিন পাতার একটি পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন, যা পরে আর স্বাক্ষর করে জমা দেননি?’ এই প্রশ্নের উত্তরে মুজিব–কন্যা বলেছেন, ‘আমাকে দেশ ছেড়ে চলে আসতে হবে, এটা আমি কোনওদিনই ভাবতে পারিনি। আমি দেশের মানুষের আর্থ–সামাজিক উন্নয়নের জন্য, তাঁদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। তাঁদের লাশ বানিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চিন্তা আমার কখনওই ছিল না।’ শেখ হাসিনার সংযোজন, ‘৫ই অগস্ট (২০২৪) কোনও স্বাভাবিক দিন ছিল না। সে দিন বাংলাদেশকে একটি ভয়াবহ সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল গণভবনের দিকে উন্মত্ত লোকজন অগ্রসর হচ্ছিল। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। পুলিশ, প্রশাসন, নিরাপত্তা কাঠামোসহ সব জায়গায় চাপ, বিভ্রান্তি এবং পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছিল।’ শেখ হাসিনার ভাষ্য, বোন রেহানা এবং তাঁকে হত্যার জন্যই আন্দোলনকারীরা গণভবনে আক্রমণ করেছিল। তাঁর কথায়, ‘আমার নিরাপত্তা নিয়ে সকলে খুব উদ্বিগ্ন ছিল। আন্দোলনকারীরা রেহানা এবং আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্য নিয়েই গণভবন আক্রমণ করতে এসেছিল। তাদের অনেকের বক্তব্যেই এটি উঠে এসেছে যে ‘লাশ ফেললে সরকার পড়ে যাবে’। ভুয়া আইডি কার্ড বানিয়ে গণভবনে লোক নিয়ে আসা হয়, এই কথা (আন্দোলনের) সমন্বয়করাই স্বীকার করেছে।’ শেখ হাসিনা জানান, সেই অল্প সময়ে (৩০-৪০ মিনিট) বসে বসে পদত্যাগপত্র লেখার সময়ও তাঁর ছিল না। শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘জুলাই-আন্দোলন মোকাবিলায় প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আপনাকে নির্দেশদাতা হিসাবে অভিযুক্ত করে দণ্ড দিয়েছে। সম্প্রতি আপনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে আইনজীবীর চিঠি পাঠিয়ে তাঁদের রিপোর্টে দেওয়া প্রাণহানির তথ্য সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশে ‘রেজিম চেঞ্জ’ পরিকল্পনায় জাতিসংঘের এই শাখা সংস্থাটিও যুক্ত বলে কি আপনি মনে করেন?’ শেখ হাসিনার জবাব, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আইসিটি (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) গঠন করা হয়েছিল। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার বেআইনিভাবে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আমাকে যে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনও বিচার নয়, এটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ মাত্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪–এর জুলাই-আগস্টে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটি কোনও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল না। কোটা পরিবর্তনের দাবির আড়ালে এটি ছিল একটি সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলন, যাতে দেশি ও বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জড়িত ছিল। অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ক্ষমতা দখল করা (মুহাম্মদ) ইউনূস নিজেই এই আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজ়াইনড’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ষড়যন্ত্রকে সফল করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরাই হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নিয়েছিল।’ তাঁর সংযোজন, ‘এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্ররা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে বলেছে, আন্দোলন সফল করার জন্য তারা পুলিশ হত্যা করেছে, মেট্রোরেলে আগুন দিয়েছে। আন্দোলন সফল না হলে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনার কথাও তারা স্বীকার করেছে।’ আওয়ামী লীগ সুপ্রিমো শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোন মৃত্যুই কাম্য নয়। প্রথম হতাহতের ঘটনার পরেই তাই আমি সঠিকভাবে তদন্ত করার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। কিন্তু দেশবিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে সেই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে দিয়েছে। এমনকী, নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত পর্যন্ত করতে দেয়নি।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘কী ভয় ছিল তাদের? কেন আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে?’ জাতিসংঘের মানবাধিকার শাখা (ওএইচসিএইচআর)-র রিপোর্ট প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা এই তদন্ত করেছিল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে। যারা চক্রান্ত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করল, তাদের আমন্ত্রণে পরিচালিত তদন্ত কীভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে পারে? এই প্রতিবেদনে জুলাই-অগস্টে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এর সপক্ষে কোনও প্রমাণ দেওয়া হয়নি। খোদ অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৮৩৪। এমনকি গেজেটেও নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মিথ্যা নাম সংযোজন করা হয়েছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওএইচসিএইচআর-এর কমিশনার ভলকার টুর্ক ২০২৫–এর মার্চে বিবিসি-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন— তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, আন্দোলন দমনে কঠোর হলে শান্তিরক্ষী মিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এটি দৃশ্যতই একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল, যা জাতিসংঘের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।’ তাঁর কথায়, ‘এটা পরিষ্কার, জুলাই-অগস্টের ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলন চলার সময়ে এবং প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’ ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের জমানাতেই নয়াদিল্লির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে ঢাকা যে ইসলামাবাদের কাছাকাছি আসছে, তেমন অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচনের পরেও পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়ে চলেছে সে দেশের বর্তমান বিএনপি সরকার, এমনই দাবি বিভিন্ন মহলের। সরকারি তরফে একে ‘নতুন কূটনীতি’ বা ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ বলে যুক্তিও দেওয়া হয়েছে। যদিও শেখ হাসিনার পর্যবেক্ষণ, ‘রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া, দুটো এক বিষয় নয়।’ মুজিব–কন্যা বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনও সম্পর্ক হতে হবে ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে, ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষা করে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে। কিন্তু আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করা, পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে— তার মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।’ শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘প্রথমে ইউনূস ও পরে তারেক রহমানের আমলে কি পাকিস্তানের অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ? মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশের এই অবস্থান পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?’ আওয়ামী সুপ্রিমোর জবাব, ‘যাঁরা আজ পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতি ঘনিষ্ঠতাকে ‘নতুন কূটনীতি’ বলে প্রচার করছেন, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন— পাকিস্তান কি ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে? তারা কি যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে? তারা কি বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতকে সম্মান দিয়েছে? যদি না করে, তা হলে এত তাড়াহুড়ো করে সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা কেন? পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যাঁরা ১৯৭১–কে ভুলে যান, তাঁরা বাংলাদেশকে বুঝতে পারেন না। যাঁরা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ায় ফেরাতে চান, তাঁরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছেন।’ ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে নির্বাচনের পরে বহু মানুষ প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তান-পন্থী মৌলবাদী শক্তি’ জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে তাঁরা বাধ্য হয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার কি জামায়াত-বিরোধী সেই রায়ের মর্যাদা দিতে পারছে?’ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা উত্তরে বলেন, ‘যাঁরা ভেবেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে, তাঁরা ইতিহাস ভুলে গিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামীর পূনর্বাসন হয়েছে। জামায়াত বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী, মুখে ভিন্ন নীতি-আদর্শের কথা বললেও তারা উভয়েই মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার অংশীদার। এদের ভিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’ শেখ হাসিনার পাল্টা প্রশ্ন, ‘যদি মানুষ জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়ে থাকে, তা হলে বিএনপি কেন মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? কেন মাজারে হামলা হচ্ছে? কেন সুফিদের দরগা নিরাপদ নয়? কেন সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন? কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া, আদিবাসী— কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না? কেন পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সব জায়গায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপরে আঘাত আসছে?’ শেখ হাসিনার উদ্দেশে প্রশ্ন ছিল, ‘বিএনপি সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ‘নতুন ইনিংস’ শুরু করেছে। এর ফলে কি আপনার অবস্থান দুর্বল হচ্ছে? সম্পর্কের স্বার্থে ভারত যদি আপনাকে বিচারের জন্য ঢাকায় ফেরত পাঠাতে চায়, আপনার পদক্ষেপ কী হবে?’ শেখ হাসিনা উত্তরে বলেন, ‘একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে ভারতের যে যোগাযোগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক।’ শেখ হাসিনার কথায়, ‘এর সঙ্গে আমার অবস্থান দুর্বল হওয়ার প্রশ্ন জড়িত নয়। কারণ আমার অবস্থান নির্ভর করে বাংলাদেশের মানুষের উপরে। আমি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ কঠিন সময়ে তাঁরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমার অবস্থান অন্য কোনও রাষ্ট্র কিংবা সরকারের সমর্থনের উপরে নির্ভরশীল নয়। সরকারে থাকতে আমি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কখনও বিসর্জন দিইনি।’ তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন না শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘দু’দেশের টেকসই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। যাঁরা এগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, প্রতিনিয়ত হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারত-বিরোধী অপপ্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এবং অতীতে ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের সঙ্গে ভারতের কোনও নতুন ইনিংসই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়।’ ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে শুধু যে টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছিল, তা-ই নয়, গোটা স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস করে দিয়েছে বলে অভিযোগ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাঁর কথায়, এই কারণেই মহামারি হিসেবে হাম ছড়িয়ে পড়েছে, লক্ষাধিক শিশু তাতে আক্রান্ত হয়েছে, সরকারি হিসেবেই মারা গিয়েছে সাড়ে ছ’শো। শেখ হাসিনার ভাষ্য, ‘বর্তমান সরকারও এ সবের তদন্ত না-করে আওয়ামী লীগকে দোষারোপের মিথ্যাচারে ব্যস্ত।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, হামে শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী প্রতিটি ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে! যাঁরা টিকাকরণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাঁরা ‘হু’-র সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন, যাঁরা টিকা সরবরাহ ব্যাহত করেছেন, তাঁদের জবাব দিতেই হবে। স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে অবহেলা, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হবে, তাঁদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।’ মুজিব–কন্যার সংযোজন, ‘সব চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো— এই শিশুরা এমন একটা রোগে মারা যাচ্ছে, যা আমরা প্রায় নির্মূল করার পর্যায়ে ছিলাম এবং সব ঠিক থাকলে ২০২৬–এই আমরা বাংলাদেশকে হাম-মুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করতাম।’ তা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন? শেখ হাসিনার জবাব, শুধু টিকাদান কর্মসূচি বন্ধই নয়, পুরো স্বাস্থ্য খাতকেই ইউনূস সরকার ধ্বংস করেছে। শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সরকারি হাসপাতালগুলিতে জরুরি চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ নেই।’ শেখ হাসিনার উদ্দেশে প্রশ্ন ছিল, ‘ইউনূসের নোবেল শান্তি পুরস্কার কেড়ে নেওয়া উচিত, এমন দাবিও উঠছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?’ বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জবাব, ‘পুরস্কার কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি নোবেল কমিটির এক্তিয়ার। সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না। কিন্তু নৈতিক প্রশ্ন তো উঠবেই। যে ব্যক্তির স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশু মারা যায়, তার ‘নোবেল শান্তি’ পরিচয়ের অর্থ কী?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘তা হলে বাজেটের ৪২ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?’ শেখ হাসিনার অভিযোগ, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বিএনপি ও জামায়াত— এই দুই দলকে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির কথায়, ‘অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে বাংলাদেশে যে দমনমূলক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরও স্থায়ী করেছে বর্তমান সরকার। শুধু মুখ বদলেছে, কোনও নীতির পরিবর্তন হয়নি।’ শেখ হাসিনা যোগ করেন, ‘২০০১-০৬ নাগাদ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশকে যেমনভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, ১০০ দিনে সেই স্মৃতিই ফিরিয়ে এনেছে বর্তমান সরকার।’ শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘তারেক রহমান কি পুরো পাঁচটা বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন বলে আপনি বিশ্বাস করেন? নাকি মাঝপথে ‘অন্য শক্তি’র ক্ষমতা দখলের আশঙ্কা করেন?’ মুজিব–কন্যার ব্যাখ্যা, ‘কখন ‘অন্য শক্তি’ আসে? যখন রাজনীতি ব্যর্থ হয়। যখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। যখন নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। যখন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করে, কিন্তু মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক পরিসর কখনও শূন্য থাকে না। সে জায়গা দখল করে অগণতান্ত্রিক শক্তি, সামরিক শক্তি, অথবা বিদেশি প্রভাবিত শক্তি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি চাই না, বাংলাদেশ আবার সেই অন্ধকার পথে যাক। আমি চাই না, বাংলাদেশের মানুষ আবার অনিশ্চয়তা, সামরিক হস্তক্ষেপ, উগ্রবাদ বা অদৃশ্য শক্তির রাজনীতির মধ্যে পড়ুক। আমি চাই জনগণের ভোটে, সংবিধানের পথে, সব দলের অংশগ্রহণে, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরে আসুক। বন্দুকের জোর, মামলা-হামলা, নিষেধাজ্ঞা বা মব দিয়ে কিছু দিন ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, তার পরে সেটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। জনগণের আস্থা ছাড়া রাষ্ট্র চালানো যায় না।’ ‘এই পরিস্থিতিতে আপনার রণকৌশল কী’— এই প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনও শাসকের দয়ার দান নয়। এই দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকরা পারেনি, খুনিরা পারেনি, ষড়যন্ত্রকারীরা পারেনি, আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারবে না।’ আওয়ামী সুপ্রিমোর সংযোজন, ‘জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগের মূল রণকৌশল হচ্ছে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা, তাঁদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করা। জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে কোনও প্রতিবন্ধকতা টিকতে পারে না। আমরা এখন সেই কাজটা করে যাচ্ছি। আমার দলের নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছে। জনগণ বুঝতে পেরেছেন, আওয়ামী লীগই তাঁদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। এই জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব।’



