বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ: অনুসন্ধানভিত্তিক তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ – ইউ এস বাংলা নিউজ




ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ৩১ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ: অনুসন্ধানভিত্তিক তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ৩১ জুলাই, ২০২৬ |
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে দাবি করেছেন, “গত ১৭ বছরে দেশে কোনো গ্যাসকূপ খনন করা হয়নি,” যা একটি “নির্জলা অসত্য”। মন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে একাধিক অনুষ্ঠানে ও সংসদে এই বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেছেন। যেমন—গত ৭ই জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে কোনোদিন কোন কুপ খনন করা হয়নি এবং তার সরকারই প্রথম ড্রিলিং শুরু করেছে। এমনকি এই জবাবের পরও আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের আগের প্রতিশ্রুতি (১লা মে থেকে) বাস্তবায়িত না হওয়ায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্ত্রীকে মনে করিয়ে দেন যে তিনি সংসদে ১ তারিখ থেকে গ্যাস

সরবরাহের কথা বলেছিলেন, যা বাস্তবায়িত হয়নি, এবং ভবিষ্যতে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়া এক পৃথক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছর দেশে একটি ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকার ক্ষমতায় ছিল, যারা দেশীয় সম্পদ অবহেলা করে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করেছিল। অর্থাৎ, মন্ত্রীর এই বক্তব্য হুট করে মুখ ফসকে ভুল-বলে-ফেলা মন্তব্য নয়, বরং তার একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থান—যা তিনি একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। এটা “সচেতন তথ্য বিকৃতি” বিগত দুইদশকে বাংলাদেশের গ্যাসের সার্বিক অবস্থা কি, সেটা একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাকঃ ১. বিএনপি সরকার (২০০১–২০০৬) ২০০১ সালে বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট (MMCFD) এর কাছাকাছি। ২০০৬ সাল নাগাদ এটি বেড়ে

দৈনিক ১,৪০০-১,৫০০ এমএমসিএফডি এর আশেপাশে পৌঁছায়। তখনকার দৈনিক চাহিদা ছিল উৎপাদনের চেয়ে বেশি, তবে ঘাটতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল (প্রায় কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট)। বিএনপি সরকারের গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহে কর্মকাণ্ড এই সময়ে নাইকো রিসোর্সেসের সঙ্গে চাতক (টেংরাটিলা) ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি (২০০৩) ও গ্যাস ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (২০০৬) করা হয়। কিন্তু ২০০৫ সালে টেংরাটিলায় দুটি বড় বিস্ফোরণে বিপুল গ্যাস নষ্ট হয় এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বা ব্যাপক অনুসন্ধানের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি সীমিত থাকে এবং আমদানিনির্ভরতার ভিত্তি তৈরি হয়। এই সময়কার সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তীকালে দুর্নীতি ও ক্ষতির অভিযোগে বিতর্কিত হয়। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বিদ্যুৎ,

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ সময় কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার অ্যাগ্রিমেন্ট (২০০৩) ও গ্যাস ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (২০০৬) সম্পাদিত হয়। চাতক (টেংরাটিলা) ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের দায়িত্ব পায় নাইকো। ২০০৫ সালে টেংরাটিলায় দুটি বড় বিস্ফোরণে বিপুল গ্যাস পুড়ে যায় এবং পরিবেশগত ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের ক্ষতি এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে অনুমান করা হয়। নাইকোর বিরুদ্ধে ঘুষ প্রদানের অভিযোগ ওঠে (কানাডিয়ান আদালতে কোম্পানি দোষ স্বীকার করে জরিমানা দেয়) এবং বাংলাদেশের আদালত চুক্তিগুলোকে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাপ্ত বলে অবৈধ ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে (ICSID) দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে। এই সময়কার সিদ্ধান্তগুলো জ্বালানি খাতে দুর্নীতি

ও ক্ষতির একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ২. আওয়ামী লীগ সরকার (২০০৯–২০২৪) আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশের গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ক্রমাগত বেড়েছে। ২০০৯ সালে চাহিদা ছিল প্রায় ২,০০০-২,৫০০ এমএমসিএফডি-এর আশেপাশে। কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে চাহিদা ধীরে ধীরে বেড়ে ২০২৪ সাল নাগাদ সর্বোচ্চ ৩,৮০০-৪,০০০ এমএমসিএফডি (প্রায় ৪ বিলিয়ন ঘনফুট) পর্যন্ত পৌঁছায়। শেষের দিকে (২০২৩-২০২৪) চাহিদা স্থিতিশীলভাবে ৩,৮০০+ এমএমসিএফডি-এর কাছাকাছি ছিল, যেখানে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ চাহিদার কাছাকাছি হলেও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থেকে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিল মাত্র ১,৭৪৪

এমএমসিএফডি। পরবর্তী ১৫ বছরে দেশীয় অনুসন্ধান, কূপ খনন ও আমদানির সমন্বয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কোভিড-পূর্ববর্তী সময়ে তা প্রায় ২,৭৫০ এমএমসিএফডিতে পৌঁছায়। ২০১৮ সালে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) যুক্ত হওয়ার পর মোট সরবরাহ সক্ষমতা ৩,৫০০+ এমএমসিএফডিতে উন্নীত হয়। এ সময়ে ১৫৫টি কূপ খনন, ছয়টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, ব্যাপক সিসমিক জরিপ এবং সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধান চালানো হয়। ৩. ভবিষ্যৎ ঘাটতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ২০২৬-২৮ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৯৮৫ এমএমসিএফডি যোগ করার লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন/ওয়ার্কওভার, মহেশখালীতে তৃতীয় এফএসআরইউ (৬০০ এমএমসিএফডি, সামিট গ্রুপের সঙ্গে ২০২৪ সালের ৩০শে মার্চ চুক্তি), পায়রায় চতুর্থ এফএসআরইউ, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট নাগাদ ৫০টি কূপের

কাজ চলমান ছিল, যা থেকে ২০২৫-২৮ সালে উল্লেখযোগ্য গ্যাস যোগ হওয়ার কথা ছিল। এই পরিকল্পিত উদ্যোগগুলো জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মহেশখালীতে তৃতীয় এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) প্রকল্পের চুক্তি ২০২৪ সালের ৩০শে মার্চ সামিট গ্রুপের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়। এটি বাংলাদেশের তৃতীয় এবং সামিটের দ্বিতীয় এফএসআরইউ প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পিত ছিল, যার দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট ক্ষমতা এবং ১৫ বছর মেয়াদে পরিচালনার কথা ছিল। চুক্তির পর সামিট গ্রুপ প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু অগ্রগতি করে, যেমন প্রায় ১৫-২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ (লং লিড আইটেম, স্টাডি ইত্যাদি)। তবে ৫ই আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে (পরবর্তীতে জানুয়ারি ২০২৫-এ আনুষ্ঠানিকভাবে) পেট্রোবাংলা চুক্তিটি বাতিল করে। সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তির শর্ত পূরণে ব্যর্থতা (যেমন পারফরম্যান্স বন্ড) ও ২০১০ সালের বিশেষ আইন বাতিলকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যদিও সামিট গ্রুপ এটিকে অন্যায় বলে দাবি করে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায় এবং আইনি পদক্ষেপ নেয়। এই ঘটনা দেশের এলএনজি সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা ছিল। চুক্তি অনুসারে (৩০শে মার্চ ২০২৪), সামিট গ্রুপের এই দ্বিতীয় এফএসআরইউ (বাংলাদেশের তৃতীয়) ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বা মাঝামাঝি সময়ে (early/mid-2026) কমিশনিংয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট এলএনজি সাপ্লাই চুক্তি (SPA) অনুসারে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে বার্ষিক ১.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা ছিল। টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি আমদানি চুক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কাতারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে পেট্রোবাংলা ও কাতার এনার্জির (তৎকালীন রাসগ্যাস) সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় বার্ষিক ১.৮-২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের জুনে আরেকটি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় অতিরিক্ত ১.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি ২০২৬ সাল থেকে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা ছিল। এসব চুক্তি বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ নিরাপত্তা জোরদার করেছিল এবং দেশীয় গ্যাসের হ্রাসমান উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা ব্যবস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ ও সরবরাহ স্থিতিশীলতার পরিকল্পনার অংশ ছিল। ৪. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সরকারের অনেকগুলো চলমান ও পরিকল্পিত প্রকল্প বাতিল বা স্থবির হয়ে পড়ে। মহেশখালীতে তৃতীয় এফএসআরইউ-এর চুক্তি (যা ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা ছিল এবং সামিট গ্রুপ ইতোমধ্যে কিছু বিনিয়োগ করেছিল) অক্টোবর ২০২৪-এ বাতিল করা হয়। অনুরূপভাবে অন্যান্য এফএসআরইউ, কূপ খনন ও অবকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে অতিরিক্ত ১,০০০+ এমএমসিএফডি গ্যাস যোগের সম্ভাবনা হারিয়ে যায়। ৫. বিএনপি সরকারের আমল (২০২৬ থেকে) ফেব্রুয়ারী ২০২৬-এ বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহন করার পর ইরান যুদ্ধ গ্যাস সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশীয় অনুসন্ধানের পরিবর্তে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির নীতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি ক্রয় এবং ১৩টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের (গেবনর/গানভরসহ) সঙ্গে ১৩ বছর মেয়াদি চুক্তিতে প্রতি ইউনিট প্রায় ২২ ডলার দরে এলএনজি ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন ও অনুসন্ধানে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে উচ্চমূল্যে আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি করেছে। অথচ বর্তমানে যেসব নতুন কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সবগুলোই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জরিপ, অনুসন্ধান ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা কূপ। উদাহরণস্বরূপ, নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া ‘সুন্দরপুর-৪’ গ্যাস কূপের খননকাজ বাপেক্স পরিচালনা করছে। এ কূপ থেকে দৈনিক ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ১৫৫টি কূপ খননের পাশাপাশি যেসব কূপের কাজ চলমান ছিল (যেমন ২০২৪ সালের আগস্ট নাগাদ ৫০টি কূপের কাজ), সেগুলো থেকেই বর্তমান সরকার গ্যাস উত্তোলনের সুবিধা পাচ্ছে। এই কূপগুলোর মাধ্যমে ২০২৫-২৮ সালে অতিরিক্ত ৯৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যোগ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, যা পূর্ববর্তী পরিকল্পিত উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে চিহ্নিত। এই বৈপরীত্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ও আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ৬. সর্বশেষ পরিস্থিতি বর্তমানে দৈনিক সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২,১০০-২,২০০ এমএমসিএফডিতে, যেখানে চাহিদা অনেক বেশি। মহেশখালীর একটি এফএসআরইউ অচল হওয়ায় শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক সেক্টরে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নতুন কিছু উদ্যোগ (যেমন চীনের সঙ্গে G2G এফএসআরইউ) নেওয়া হলেও সেগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং বাস্তবায়নে সময় লাগবে। এই সিদ্ধান্তগুলোর কারণে পূর্ববর্তী পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং সংকট দীর্ঘমেয়াদি হয়ে ওঠে। গ্যাস সংকটের ফলে দেশের অর্ধেক শিল্পাঞ্চল কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। গ্যাসের অভাবে সার কারখানাগুলো পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারছে বিগর ২ বছর ধরে। এছাড়া গৃহস্থালী আর সিএনজি চালিত গাড়ির জন্য গ্যাসের তীব্র হাহাকার দেখা দিয়েছে সারা দেশ জুড়ে। ৭. যুদ্ধের পরে কাতার এলএনজি রপ্তানি শুরু করেছে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। তবে বর্তমানে কাতার পুরোদমে উৎপাদন ও রপ্তানি পুনরায় শুরু করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে এলএনজি আমদানির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক বেশি উচ্চমূল্যে এলএনজি ক্রয় করছে। এই সিদ্ধান্ত জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আরও চাপ সৃষ্টি করছে। ৮. মহেশখালিতে তৃতীয় টার্মিনালে চীনের সাথে নতুন চুক্তি মহেশখালীর কুতুবজোমে (কক্সবাজার) তৃতীয় এফএসআরইউ প্রকল্পটি চীনের সঙ্গে G2G (Government-to-Government) ভিত্তিতে এগোচ্ছে। চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (CNEE)-এর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২৮ জুলাই ২০২৬-এ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (CCEA) নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের আওতায় প্রক্রিয়াধীন। বর্তমান অবস্থা ও সময়সূচী এখনো চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। এটি প্রাথমিক অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। আলোচনা, বিস্তারিত চুক্তি, সম্ভাব্যতা যাচাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ হলে কাজ শুরু হবে সম্ভবত ২০২৬-এর শেষার্ধে বা ২০২৭-এর শুরুতে। এই ভাসমান টার্মিনালের থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে ২০২৮ সালের আগে কোনভাবেই সম্ভবপর না। ৯. ভবিষ্যৎ আরও চ্যালেঞ্জিং জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সাধারণত কয়েক বছর লাগে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব প্রকল্প চলমান বা পরিকল্পিত ছিল, সেগুলো বন্ধ বা বিলম্বিত হওয়ায় অতিরিক্ত ১,০০০+ এমএমসিএফডি গ্যাস যোগের সম্ভাবনা হারিয়ে গেছে। ফলে সংকট শুধু বর্তমানের নয়, আগামী কয়েক বছর ধরে অব্যাহত থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকারের সময়ে নতুন করে কিছু উদ্যোগ (যেমন চীনের সঙ্গে G2G এফএসআরইউ) নেওয়া হলেও, সেগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং বাস্তবায়ন দেরিতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সংসদে দেওয়া বক্তব্য — “গত ১৭ বছরে কোনো গ্যাসকূপ খনন হয়নি” — স্পষ্টভাবে তথ্য বিকৃতির উদাহরণ। বাস্তবে শতাধিক কূপ খনন ও নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারের তথ্য সরকারি রেকর্ডে রয়েছে। টুকু নিজে ২০০১-২০০৬ সালে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন এবং নাইকো চুক্তির (যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং বাংলাদেশ বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়) সময়কালের সঙ্গে যুক্ত। এখন তিনি পূর্ববর্তী সরকারের অর্জনকে অস্বীকার করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন বলে সমালোচনা উঠেছে। পরিশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পিত প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেগুলো বাতিল বা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমান গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিত উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হতে পারে। এটি শুধু বর্তমানের সমস্যা নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ: অনুসন্ধানভিত্তিক তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের পর কাশ্মীরেও বিদ্রোহ দানা বাধছে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশে ৫ বাক্স আম পাঠালো পাকিস্তান ২৭তম বিসিএসের ৫৬ জন শিক্ষানবিশ এএসপিকে পূর্ণ প্রশিক্ষণ ছাড়াই পদায়ন বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাতিসংঘের বিশেষ দূতদের চিঠি: বাংলাদেশে নির্যাতন ও গুম প্রতিরোধে আইনি সংস্কারের আহ্বান আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা ও সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ফেনীতে ছাত্রলীগের মিছিল হুথিদের ঠেকাতে সৌদি-নেতৃত্বাধীন নতুন জোটে বাংলাদেশ: ভয়ংকর প্রক্সি যুদ্ধে জড়াচ্ছে নৌবাহিনী? নোয়াখালীতে গভীর রাতে ব্যবসায়ীর বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, আহত ৫ আরো ২৩ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ যুক্তরাষ্ট্র, চলতি বছর এ পর্যন্ত ফিরলেন ৮৮ জন যা জানা প্রয়োজন মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর সম্পর্কে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ৩০ ভরি স্বর্ণ লুট: কক্সবাজারে এক রাতেই দুই বাড়িতে সশস্ত্র ডাকাতি, এলাকায় চরম আতঙ্ক বন্যার্তদের বঞ্চিত করে ত্রাণের চাল বিক্রি: কাপ্তাইয়ে গাড়ি ও চালসহ হাতেনাতে আটক বিএনপি সভাপতি ফিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত ইউরোপের ৫৫ দেশের কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে খেলবে ব্রাজিল কক্সবাজার হোটেলের কাছেই খালি মাঠে কর্মচারীর মরদেহ উদ্ধার, শরীরে আঘাতের চিহ্ন রোহিঙ্গা-ক্যাম্পে দিনদিন বাড়ছে সহিংসতা: মসজিদে যাওয়ার পথে উগ্রবাদী সংগঠন আরসা কমান্ডারকে গুলি করে হত্যা কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নারী সাংবাদিককে চাকুরিচ্যুতি: তদন্ত চলাকালে সম্পাদক মিন্টুর পদত্যাগ পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে উদ্বেগ: দুই বছরে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ১ বিলিয়ন ঘনফুট অর্থ সংকটে দরপ্রস্তাব প্রত্যাহার: হচ্ছে না মেট্রোরেল লাইন-পাঁচের উড়াল অংশের কাজ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার সর্বনিম্ন