ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
ছবি তোলা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ালেন ট্রাম্প-মেলোনি
‘কারও সহানুভূতি নেই’, ইসরায়েলকে কড়া বার্তা ভ্যান্সের
একাত্তেরর লজ্জাজনক পরাজয়ের পর আবারও বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানি সাবমেরিন
ঐতিহাসিক চুক্তিতে ইরানের বিজয়
পাকিস্তানের চা, আতিথেয়তা ও বিয়ের ঐতিহ্যের প্রেমে মার্কিন কূটনীতিক
এক আপেল, দুই রঙ! নিউজিল্যান্ডে বিরল আপেল দেখতে উৎসুক জনতার ভিড়
এক ঝড়েই শেষ বিশ্বের ৭% বিরল বানর
চুক্তিতে জয়-পরাজয়, ইরান ৭-১ যুক্তরাষ্ট্র
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে। স্মারকের ১৪টি দফার দিকে তাকালে এই দাবিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। দুই পক্ষই কিছু ক্ষেত্রে জয়ী হয়েছে। প্রশ্ন হলো, পাল্টাপাল্টি জয়ের ব্যবধান কত?
এই হিসাব যখন করা হবে তখন মুদ্রার উল্টো পিঠ হিসেবে পরাজয়ের ব্যবধানও সামনে আসবে। যেহেতু যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে এই অন্তর্বর্তী চুক্তি করা হয়েছে, সেহেতু ১৪টি দফাকে জয়-পরাজয়ের মাপকাঠিও বলা যেতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে সমঝোতার নথি প্রকাশ করেছেন। সেখানে তাঁর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও স্বাক্ষর আছে। তিন পাতার ওই নথিতে কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও
এই নথির ১৪টি দফা প্রকাশ করেছে। সেগুলো ধরে দেখা যাক, কার লক্ষ্য কতটা পূরণ হলো। ইরান যেখানে এগিয়ে ১৪টি দফার মধ্যে ইরান স্পষ্টভাবে এগিয়ে আছে ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ১১ ও ১৪ নম্বরে। স্মারকের দুই নম্বর দফায় পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানানোর কথা আছে। অর্থাৎ, এই দফা মেনে একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। যুদ্ধের আগে ইরানে যখন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল, তখন দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপের কথা বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আন্দোলনকারীদের ‘সহায়তা’ দিতে চেয়েছিলেন। ইসলামিক শাসনব্যবস্থা বদলানোরও লক্ষ্য ছিল তাঁর। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে হত্যা করা হলেও শাসনব্যবস্থা বদল হয়নি। উল্টো চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ
বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে। ইরানের শাসকরাও বছরের পর বছর মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরোধীতা করেছেন। সুতরাং এই দফার মাধ্যমে ইরান তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছে। চার নম্বর দফাটিও ইরানের পক্ষে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। পাশাপাশি ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে সরানো করা হবে মার্কিন সেনা। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে ধাপে ধাপে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে যতগুলো জাহাজ যেতে দেবে, যুক্তরাষ্ট্রও তত সংখ্যক জাহাজকে ইরানের বন্দরে যেতে বাধা দেবে না। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তই ছিল। ফলে এটি আবার উন্মুক্ত হওয়াটা ইরানের কোনো ছাড় দেওয়াকে ইঙ্গিত করে না। বরং নৌ
অবরোধ প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্রই পিছু হটেছে। চুক্তির পঞ্চম দফায় হরমুজ প্রণালির কথা আলাদা করে উল্লেখ আছে। তবে এই দফার ভাষাগত বিষয়টি ভালো করে লক্ষ্য করা প্রয়োজন। বলা হয়েছে, ‘প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কেবল ৬০ দিনের জন্য কোনো টোল নেওয়া হবে না। ভবিষ্যত প্রশাসনিক বিষয় নির্ধারণের জন্য ইরান ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে।’ এ ছাড়া, প্রণালির পরিসর হিসেবে উল্লেখ আছে- পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত। এই দফাটি ইরানের আগের ইচ্ছারই প্রতিফলন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেহরান বলে আসছিল, হরমুজ প্রণালি আর আগের অবস্থায় (কারও কর্তৃত্বহীন) ফিরবে না। এমনকি দেশটির পার্লামেন্টে টোল নির্ধারণের বিষয়েও বিল উত্থাপনের
চেষ্টা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘কিছু সেবার বিনিময়ে জাহাজগুলো থেকে ফি নেওয়া হবে, এগুলো টোল নয়’। একইসঙ্গে এই চুক্তিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ষষ্ঠ দফায় আছে ইরান পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা। যেটি তৈরি করবে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা। চূড়ান্ত চুক্তির ৬০ দিনের মধ্যে এই অর্থায়ন ব্যবস্থার বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ হবে। যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের নিবন্ধন, ছাড়পত্র ও অনুমোদন দেবে। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি উল্টো সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওমাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, ‘তৎকালীন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে জেসিপিওএ চুক্তির জন্য ১.৭
বিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি।’ তবে খোদ মার্কিন গণমাধ্যম ‘এমএস নাউ’ ট্রাম্পের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা লিখেছে, ‘এই ব্যাখ্যা বা প্রচার কেউ বিশ্বাস করছে না। তেহরানকে বিপুল আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রশাসন মরিয়া হয়ে প্রমাণের চেষ্টা করছে যে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রকৃত বাস্তবতা হলো- ট্রাম্প ইরানিদের কৌশলের শিকার হয়েছেন।’ সপ্তম দফায় থাকা ‘নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের’ বিষয়টিও ইরানের পক্ষে গেছে। নৌ অবরোধ শুরুর পর ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তেল বিক্রি করতে না পারায় ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। এখন তিনিই অর্থের প্রবাহ স্বাভাবিক করতে জাতিসংঘসহ নিজেদের আরোপ করা বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। সমঝোতার ১১তম দফায় থাকা ‘জব্দকৃত
সম্পদ ছাড়ের’ অঙ্গীকারও ইরানের পক্ষে। জব্দকৃত সম্পদ বলতে ইরানের তেল বিক্রির অর্থ মার্কিন লেনদেন ব্যবস্থার বিভিন্ন চ্যানেলে ‘ব্লক’ থাকাকে বোঝায়। যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নেয় ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর। পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরে জব্দের মাত্রা আরও বাড়ায়। যা প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। ট্রাম্প এখন নিজেই বলছেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদের অর্থ। আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি আটকে দিয়েছিলাম। এখন তা ফিরিয়ে দিতে হবে।’ সবশেষ ১৪তম দফায় ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন’-এর কথা আছে। সমঝোতার আগে থেকেই ইরান এই দাবি জানাচ্ছিল। সবশেষ গত সোমবার (১৫ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তেহরান এবার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোবে। আমেরিকানদের ওপর কোনো বিশ্বাস নেই। তাই তারা চূড়ান্ত চুক্তিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন চান।’ উল্লেখ্য নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে চীন ও রাশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। গত এপ্রিলে ইসলামাবাদে আলোচনা শুরুর পর চীনকে চুক্তির ‘গ্যারান্টার’ বা জামিনদার হওয়ার অনুরোধ করেছিল মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। এ নিয়ে সূত্রের বরাত দিয়ে তখন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বার্তা সংস্থা এএফপি। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যপূরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে ৮ নম্বর দফায়। সেখানে বলা হয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা কেনার পথ থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একইসঙ্গে বর্তমানে যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে, সেটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয়পক্ষ আলোচনা করতে রাজি। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলতি বছরের শুরুতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার ৯৯.৯ শতাংশ লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা ঠেকানো। যুক্তরাষ্ট্রকে এই দফায় এগিয়ে রাখার কারণ, ইরানের ছাড় পাওয়ার কিছু বিষয় এই শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল। যেমন- সপ্তম দফায় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে কথা আছে, সেটি ৮ নম্বর দফার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করলেই কেবল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মধ্যস্থতায় পারমাণবিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরানের কাছে অস্ত্র তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকাকে নিজেদের ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করে তেল আবিব। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছিল, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইন্ধনেই ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে জড়িয়েছেন। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়াই ছিল যৌথ হামলার অন্যতম লক্ষ্য। যেসব দফা দোদুল্যমান সমঝোতা স্মারকের ১, ৩, ৯, ১০, ১২ ও ১৩ নম্বর দফাগুলো পারস্পরিক ও তৃতীয় পক্ষের পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল। যেমন- ১ নম্বর দফায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। যা লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সংঘাতকে ইঙ্গিত করছে। নথিতে মাসুদ পেজেশকিয়ান, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শেহবাজ শরিফ স্বাক্ষর করলেও ইসরায়েলের কাউকে রাখা হয়নি। ফলে দেশটি হামলা অব্যাহত রেখেছে। তৃতীয় দফাটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনার সময়সীমা ও মেয়াদ বাড়ানো সংক্রান্ত। স্বাক্ষরের পরপরই এই আলোচনা শুরুর কথা থাকলেও তা এখনো (শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত) হয়নি। সম্ভাব্য ভেন্যু সুইজারল্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আলোচনা শুক্রবার হচ্ছে না। নবম ও দশম দফা উভয়পক্ষের পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্থিতাবস্থা এবং ইরানের তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্যসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবায় নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া সংক্রান্ত। তবে এটি নির্ভর করবে ৮ নম্বর দফায় থাকা ইউরেনিয়ামের মজুত ব্যবস্থাপনার ওপর। ১২ নম্বর দফায় ‘চুক্তির শর্ত মানার বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য যৌথ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার কথা আছে। আর ১৩ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর দফা মেনে চলার ভিত্তিতে উভয়পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেবে। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শুরু না হওয়ার পেছনে ১৩ নম্বর দফাটি কারণ হতে পারে। কারণ, ১ নম্বর দফা (লেবাননে হামলা বন্ধ) এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্বাক্ষরের আগেই নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি লেবানন থেকে সেনা সরাবেন না। ফলে শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে পুনরায় সংঘাত বাধলে তাতে যুক্তরাষ্ট্র নাও জড়াতে পারে। কারণ, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়ার দফাগুলো দেখাচ্ছে- এই সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে শুধু যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজেছে।
এই নথির ১৪টি দফা প্রকাশ করেছে। সেগুলো ধরে দেখা যাক, কার লক্ষ্য কতটা পূরণ হলো। ইরান যেখানে এগিয়ে ১৪টি দফার মধ্যে ইরান স্পষ্টভাবে এগিয়ে আছে ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ১১ ও ১৪ নম্বরে। স্মারকের দুই নম্বর দফায় পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানানোর কথা আছে। অর্থাৎ, এই দফা মেনে একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। যুদ্ধের আগে ইরানে যখন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল, তখন দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপের কথা বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আন্দোলনকারীদের ‘সহায়তা’ দিতে চেয়েছিলেন। ইসলামিক শাসনব্যবস্থা বদলানোরও লক্ষ্য ছিল তাঁর। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে হত্যা করা হলেও শাসনব্যবস্থা বদল হয়নি। উল্টো চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ
বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে। ইরানের শাসকরাও বছরের পর বছর মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরোধীতা করেছেন। সুতরাং এই দফার মাধ্যমে ইরান তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছে। চার নম্বর দফাটিও ইরানের পক্ষে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে। পাশাপাশি ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে সরানো করা হবে মার্কিন সেনা। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে ধাপে ধাপে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে যতগুলো জাহাজ যেতে দেবে, যুক্তরাষ্ট্রও তত সংখ্যক জাহাজকে ইরানের বন্দরে যেতে বাধা দেবে না। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তই ছিল। ফলে এটি আবার উন্মুক্ত হওয়াটা ইরানের কোনো ছাড় দেওয়াকে ইঙ্গিত করে না। বরং নৌ
অবরোধ প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্রই পিছু হটেছে। চুক্তির পঞ্চম দফায় হরমুজ প্রণালির কথা আলাদা করে উল্লেখ আছে। তবে এই দফার ভাষাগত বিষয়টি ভালো করে লক্ষ্য করা প্রয়োজন। বলা হয়েছে, ‘প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কেবল ৬০ দিনের জন্য কোনো টোল নেওয়া হবে না। ভবিষ্যত প্রশাসনিক বিষয় নির্ধারণের জন্য ইরান ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে।’ এ ছাড়া, প্রণালির পরিসর হিসেবে উল্লেখ আছে- পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত। এই দফাটি ইরানের আগের ইচ্ছারই প্রতিফলন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেহরান বলে আসছিল, হরমুজ প্রণালি আর আগের অবস্থায় (কারও কর্তৃত্বহীন) ফিরবে না। এমনকি দেশটির পার্লামেন্টে টোল নির্ধারণের বিষয়েও বিল উত্থাপনের
চেষ্টা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘কিছু সেবার বিনিময়ে জাহাজগুলো থেকে ফি নেওয়া হবে, এগুলো টোল নয়’। একইসঙ্গে এই চুক্তিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ষষ্ঠ দফায় আছে ইরান পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা। যেটি তৈরি করবে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা। চূড়ান্ত চুক্তির ৬০ দিনের মধ্যে এই অর্থায়ন ব্যবস্থার বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ হবে। যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের নিবন্ধন, ছাড়পত্র ও অনুমোদন দেবে। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি উল্টো সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওমাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, ‘তৎকালীন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে জেসিপিওএ চুক্তির জন্য ১.৭
বিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি।’ তবে খোদ মার্কিন গণমাধ্যম ‘এমএস নাউ’ ট্রাম্পের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা লিখেছে, ‘এই ব্যাখ্যা বা প্রচার কেউ বিশ্বাস করছে না। তেহরানকে বিপুল আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রশাসন মরিয়া হয়ে প্রমাণের চেষ্টা করছে যে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রকৃত বাস্তবতা হলো- ট্রাম্প ইরানিদের কৌশলের শিকার হয়েছেন।’ সপ্তম দফায় থাকা ‘নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের’ বিষয়টিও ইরানের পক্ষে গেছে। নৌ অবরোধ শুরুর পর ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তেল বিক্রি করতে না পারায় ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। এখন তিনিই অর্থের প্রবাহ স্বাভাবিক করতে জাতিসংঘসহ নিজেদের আরোপ করা বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। সমঝোতার ১১তম দফায় থাকা ‘জব্দকৃত
সম্পদ ছাড়ের’ অঙ্গীকারও ইরানের পক্ষে। জব্দকৃত সম্পদ বলতে ইরানের তেল বিক্রির অর্থ মার্কিন লেনদেন ব্যবস্থার বিভিন্ন চ্যানেলে ‘ব্লক’ থাকাকে বোঝায়। যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নেয় ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর। পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরে জব্দের মাত্রা আরও বাড়ায়। যা প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। ট্রাম্প এখন নিজেই বলছেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদের অর্থ। আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি আটকে দিয়েছিলাম। এখন তা ফিরিয়ে দিতে হবে।’ সবশেষ ১৪তম দফায় ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন’-এর কথা আছে। সমঝোতার আগে থেকেই ইরান এই দাবি জানাচ্ছিল। সবশেষ গত সোমবার (১৫ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তেহরান এবার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোবে। আমেরিকানদের ওপর কোনো বিশ্বাস নেই। তাই তারা চূড়ান্ত চুক্তিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন চান।’ উল্লেখ্য নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে চীন ও রাশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। গত এপ্রিলে ইসলামাবাদে আলোচনা শুরুর পর চীনকে চুক্তির ‘গ্যারান্টার’ বা জামিনদার হওয়ার অনুরোধ করেছিল মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। এ নিয়ে সূত্রের বরাত দিয়ে তখন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বার্তা সংস্থা এএফপি। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যপূরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে ৮ নম্বর দফায়। সেখানে বলা হয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা কেনার পথ থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একইসঙ্গে বর্তমানে যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে, সেটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয়পক্ষ আলোচনা করতে রাজি। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলতি বছরের শুরুতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার ৯৯.৯ শতাংশ লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা ঠেকানো। যুক্তরাষ্ট্রকে এই দফায় এগিয়ে রাখার কারণ, ইরানের ছাড় পাওয়ার কিছু বিষয় এই শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল। যেমন- সপ্তম দফায় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে কথা আছে, সেটি ৮ নম্বর দফার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করলেই কেবল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মধ্যস্থতায় পারমাণবিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরানের কাছে অস্ত্র তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকাকে নিজেদের ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করে তেল আবিব। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছিল, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইন্ধনেই ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে জড়িয়েছেন। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়াই ছিল যৌথ হামলার অন্যতম লক্ষ্য। যেসব দফা দোদুল্যমান সমঝোতা স্মারকের ১, ৩, ৯, ১০, ১২ ও ১৩ নম্বর দফাগুলো পারস্পরিক ও তৃতীয় পক্ষের পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল। যেমন- ১ নম্বর দফায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। যা লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সংঘাতকে ইঙ্গিত করছে। নথিতে মাসুদ পেজেশকিয়ান, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শেহবাজ শরিফ স্বাক্ষর করলেও ইসরায়েলের কাউকে রাখা হয়নি। ফলে দেশটি হামলা অব্যাহত রেখেছে। তৃতীয় দফাটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনার সময়সীমা ও মেয়াদ বাড়ানো সংক্রান্ত। স্বাক্ষরের পরপরই এই আলোচনা শুরুর কথা থাকলেও তা এখনো (শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত) হয়নি। সম্ভাব্য ভেন্যু সুইজারল্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আলোচনা শুক্রবার হচ্ছে না। নবম ও দশম দফা উভয়পক্ষের পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্থিতাবস্থা এবং ইরানের তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্যসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবায় নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া সংক্রান্ত। তবে এটি নির্ভর করবে ৮ নম্বর দফায় থাকা ইউরেনিয়ামের মজুত ব্যবস্থাপনার ওপর। ১২ নম্বর দফায় ‘চুক্তির শর্ত মানার বিষয়টি পর্যবেক্ষণের জন্য যৌথ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার কথা আছে। আর ১৩ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর দফা মেনে চলার ভিত্তিতে উভয়পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেবে। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শুরু না হওয়ার পেছনে ১৩ নম্বর দফাটি কারণ হতে পারে। কারণ, ১ নম্বর দফা (লেবাননে হামলা বন্ধ) এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্বাক্ষরের আগেই নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি লেবানন থেকে সেনা সরাবেন না। ফলে শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে পুনরায় সংঘাত বাধলে তাতে যুক্তরাষ্ট্র নাও জড়াতে পারে। কারণ, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়ার দফাগুলো দেখাচ্ছে- এই সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে শুধু যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজেছে।



