-জামিল আক্তার (সাবেক গবেষণা সহযোগী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়)
আরও খবর
বেতন দ্বিগুণ সেবা অনিশ্চিত
২০২৪-এর আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের মানবিক বিপর্যয়সমূহ
উগ্রবাদের সতর্কবার্তা যাচাই ছাড়া প্রত্যাখ্যান করার সামর্থ্য কি রাখে বাংলাদেশ?
মানবিক ও বিবেকবান বাঙালিদের উচিত একে অপরের পাশে দাঁড়ানো ও ঐক্যবদ্ধভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা
শেখ মুজিব ঠিক যতোটা “ফ্যাসিস্ট”: ভেদ না জেনে গোল বাধানো
জহির রায়হানের অন্তর্ধান রহস্য
শেখ হাসিনার কলাম || গণতন্ত্র নাকি উগ্রবাদ? বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ
একটি বৈঠক, একটি অনুরোধ—আর বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ১৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দরজা
জ্বালানি কূটনীতি কখনো শুধু কাগজে-কলমে হয় না। কখনো কখনো একটি বৈঠকের টেবিলে বসে করা একটি অনুরোধই হয়ে ওঠে একটি দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় অর্জনের সূচনা।
সময়টা ২০২৩ সালের মে মাস। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে তখন অস্থির পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার। ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার জ্বালানি থেকে মুখ ফিরিয়ে বিকল্প উৎসের সন্ধানে ছুটছে। ফলে কাতারের গ্যাসের ওপর আন্তর্জাতিক চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। স্পট মার্কেটে যে LNG একসময় প্রায় ৫ ডলার প্রতি MMBtu-তে পাওয়া যেত, যুদ্ধের অভিঘাতে সেটিই পৌঁছে যায় ৬৭ ডলারে।
এমন এক সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—আগামী দিনের জ্বালানি চাহিদা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
ঠিক তখনই সামনে আসে শেখ
হাসিনার জ্বালানি কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৩ সালের ২৪ মে কাতারের দোহায় কাতার ইকোনমিক ফোরামে যোগ দিতে গিয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি সরাসরি তুলে ধরেন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি। বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত এগোচ্ছে। বাড়ছে শিল্পায়ন। বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্যাসের চাহিদা। অথচ বিশ্ববাজারে তখন LNG-এর জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের সঙ্গে কাতারের একটি দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তি আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শেখ হাসিনা সেখানেই কাতারের আমিরের কাছে আরও LNG সরবরাহের অনুরোধ করেন। প্রথম চুক্তি: এই চুক্তি স্বাক্ষরিত ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। সরকারি পর্যায়ে (G2G) ১৫ বছর
মেয়াদী এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রতি বছর কাতার থেকে ১.৫ থেকে ২.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন (MTPA) এলএনজি আমদানি করে আসছিল, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০৩২ সালে। দ্বিতীয় চুক্তিঃ ১৫ বছর মেয়াদি প্রথম চুক্তি চলমান থাকা অবস্থাতেই মাত্র ৬ বছরের ব্যাবধানে দ্বিতীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০২৩ সালের জুনে। ১৫ বছর মেয়াদী এই নতুন চুক্তি’র কার্যকারিতা শুরু হোয়ার সময় ধার্য করা হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। পূর্বের প্রথম চুক্তির বাদেও, নতুন এই চুক্তির অধীনে জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে প্রতি বছর কাতারের রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ১.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন এলএনজি সরবরাহ করবে বলে ধার্য্য করা হয়। কাতার এনার্জির সাথে ২য় দীর্ঘ মেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি
স্বাক্ষর, ১লা জুন, ২০২৩ এটাই ছিল শেখ হাসিনার জ্বালানি কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। প্রথম চুক্তি শেষ হবার ৬ বছর আগেই আরও একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাব অনুমোদন করিয়ে নেন কাতারের আমিরের সাথে পারিবারিক সুসম্পর্কের অধিকার বলে, যার পুরো সুবিধা পায় বাংলাদেশের জ্বালানী খাত। যেখানে সংকট শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে তিনি সংকটের আগেই ভবিষ্যতের হিসাব কষেছেন। বাংলাদেশের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি অতিরিক্ত LNG সরবরাহে সম্মতি দেন এবং কাতার এনার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে বলেন। এরপর আর বেশি সময় লাগেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধের ৭ দিনের মাথায় কাতার এনার্জি চুক্তির প্রস্তুত করে। তারপর ২০২৩ সালের
১ জুন দোহায় বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ১৫ বছর মেয়াদি নতুন LNG Sale and Purchase Agreement—যা ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে কাতারের দ্বিতীয় দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তি। চুক্তির আওতায় ২০২৬ সাল থেকে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১.৮ মিলিয়ন টন অতিরিক্ত LNG পাওয়ার কথা। যে সময়ে পুরো বিশ্ব LNG-এর জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে, ইউরোপের দেশগুলো কাতারের দিকে ঝুঁকছে, আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ ভবিষ্যতের জন্য আরও ১৫ বছরের LNG সরবরাহ নিশ্চিত করছে। এটা কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না। এটা ছিল কূটনৈতিক সক্ষমতার ফল। এটা ছিল দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ফল। আর এর পেছনে ছিল শেখ হাসিনার সরাসরি উদ্যোগ। চুক্তি
স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশের তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও জানিয়েছিলেন, দ্রুত এই দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ, দোহায় সেই বৈঠকটি শুধু একটি বৈঠক ছিল না। সেটি ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি কূটনৈতিক বিনিয়োগ। আজ যখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে নানা আলোচনা, সংকট কিংবা প্রশ্ন সামনে আসে, তখন শুধু আজকের সরবরাহের হিসাব করলেই হবে না। দেখতে হবে—একটি সরকার আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কী প্রস্তুতি রেখে গেছে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু আজকের গ্যাসের ব্যবস্থা করা নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে—আগামী ১০ বছর, ১৫ বছর পর দেশের শিল্পকারখানায় কি
পরিমাণ বিদ্যুতে চাহিদা হতে পারে, সেই চাহিদা পুরনে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি পাবে কোথা থেকে, অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো হবে কীভাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর আজই খুঁজে রাখা। শেখ হাসিনার জ্বালানি কূটনীতির বড় সাফল্য এখানেই। তিনি শুধু বর্তমানের সংকট মোকাবিলার কথা ভাবেননি; ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদাকেও কূটনীতির টেবিলে নিয়ে গেছেন। একটি বৈঠক হয়েছিল কয়েক ঘণ্টার। একটি অনুরোধ করা হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু সেই বৈঠকের ফল গড়িয়েছে ১৫ বছরের একটি LNG চুক্তিতে। রাষ্ট্রনায়কের কূটনীতি কখনো কখনো এমনই হয়— একটি বৈঠক শেষ হয় কয়েক ঘণ্টায়, একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কয়েক পাতায়, কিন্তু তার সুফল ছড়িয়ে যেতে পারে একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বছরের পর বছর। দোহায় শেখ হাসিনার সেই বৈঠক তাই নিছক একটি কূটনৈতিক সাক্ষাৎ ছিল না। ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শী উদ্যোগের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে স্বাগত জানান। ঢাকা, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে স্বাগত জানান। ঢাকা, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ এই সফরের বদলি সফরে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির ঢাকা সফরের সময় ব্যবসা ও বিনিয়োগের প্রসারে বেশ কিছু বড় চুক্তি সই হয় বাংলাদেশের সাথে। যার মধ্যে ছিলঃ পারস্পরিক বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা: দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে এই চুক্তি করা হয়। দ্বৈত কর পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে উভয় দেশে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর যাতে দুইবার কর দিতে না হয় এবং কর ফাঁকি রোধ করা যায়, সেই লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যৌথ ব্যবসায়িক পরিষদ (Joint Business Council) প্রতিষ্ঠা: দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক সংযোগ স্থাপনের জন্য এটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ও নৌ-বাণিজ্য সহজ করতে এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সই হয়। দুই দেশের সরকারের মধ্যে আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে এই চুক্তি করা হয়েছে। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU)চুক্তিগুলোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে কাতার ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমবাজার উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) কার্যকর রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে কাতার বর্তমানে দেশের দীর্ঘমেয়াদী সার (ইউরিয়া) সরবরাহ বৃদ্ধি এবং মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণে কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
হাসিনার জ্বালানি কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৩ সালের ২৪ মে কাতারের দোহায় কাতার ইকোনমিক ফোরামে যোগ দিতে গিয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি সরাসরি তুলে ধরেন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি। বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত এগোচ্ছে। বাড়ছে শিল্পায়ন। বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্যাসের চাহিদা। অথচ বিশ্ববাজারে তখন LNG-এর জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের সঙ্গে কাতারের একটি দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তি আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শেখ হাসিনা সেখানেই কাতারের আমিরের কাছে আরও LNG সরবরাহের অনুরোধ করেন। প্রথম চুক্তি: এই চুক্তি স্বাক্ষরিত ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। সরকারি পর্যায়ে (G2G) ১৫ বছর
মেয়াদী এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রতি বছর কাতার থেকে ১.৫ থেকে ২.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন (MTPA) এলএনজি আমদানি করে আসছিল, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০৩২ সালে। দ্বিতীয় চুক্তিঃ ১৫ বছর মেয়াদি প্রথম চুক্তি চলমান থাকা অবস্থাতেই মাত্র ৬ বছরের ব্যাবধানে দ্বিতীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০২৩ সালের জুনে। ১৫ বছর মেয়াদী এই নতুন চুক্তি’র কার্যকারিতা শুরু হোয়ার সময় ধার্য করা হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। পূর্বের প্রথম চুক্তির বাদেও, নতুন এই চুক্তির অধীনে জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে প্রতি বছর কাতারের রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ১.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন এলএনজি সরবরাহ করবে বলে ধার্য্য করা হয়। কাতার এনার্জির সাথে ২য় দীর্ঘ মেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি
স্বাক্ষর, ১লা জুন, ২০২৩ এটাই ছিল শেখ হাসিনার জ্বালানি কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। প্রথম চুক্তি শেষ হবার ৬ বছর আগেই আরও একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাব অনুমোদন করিয়ে নেন কাতারের আমিরের সাথে পারিবারিক সুসম্পর্কের অধিকার বলে, যার পুরো সুবিধা পায় বাংলাদেশের জ্বালানী খাত। যেখানে সংকট শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে তিনি সংকটের আগেই ভবিষ্যতের হিসাব কষেছেন। বাংলাদেশের প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি অতিরিক্ত LNG সরবরাহে সম্মতি দেন এবং কাতার এনার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার উদ্যোগ নিতে বলেন। এরপর আর বেশি সময় লাগেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধের ৭ দিনের মাথায় কাতার এনার্জি চুক্তির প্রস্তুত করে। তারপর ২০২৩ সালের
১ জুন দোহায় বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ১৫ বছর মেয়াদি নতুন LNG Sale and Purchase Agreement—যা ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে কাতারের দ্বিতীয় দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তি। চুক্তির আওতায় ২০২৬ সাল থেকে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১.৮ মিলিয়ন টন অতিরিক্ত LNG পাওয়ার কথা। যে সময়ে পুরো বিশ্ব LNG-এর জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে, ইউরোপের দেশগুলো কাতারের দিকে ঝুঁকছে, আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ ভবিষ্যতের জন্য আরও ১৫ বছরের LNG সরবরাহ নিশ্চিত করছে। এটা কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না। এটা ছিল কূটনৈতিক সক্ষমতার ফল। এটা ছিল দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ফল। আর এর পেছনে ছিল শেখ হাসিনার সরাসরি উদ্যোগ। চুক্তি
স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশের তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও জানিয়েছিলেন, দ্রুত এই দীর্ঘমেয়াদি LNG চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ, দোহায় সেই বৈঠকটি শুধু একটি বৈঠক ছিল না। সেটি ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি কূটনৈতিক বিনিয়োগ। আজ যখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে নানা আলোচনা, সংকট কিংবা প্রশ্ন সামনে আসে, তখন শুধু আজকের সরবরাহের হিসাব করলেই হবে না। দেখতে হবে—একটি সরকার আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কী প্রস্তুতি রেখে গেছে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু আজকের গ্যাসের ব্যবস্থা করা নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে—আগামী ১০ বছর, ১৫ বছর পর দেশের শিল্পকারখানায় কি
পরিমাণ বিদ্যুতে চাহিদা হতে পারে, সেই চাহিদা পুরনে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি পাবে কোথা থেকে, অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো হবে কীভাবে—সেই প্রশ্নের উত্তর আজই খুঁজে রাখা। শেখ হাসিনার জ্বালানি কূটনীতির বড় সাফল্য এখানেই। তিনি শুধু বর্তমানের সংকট মোকাবিলার কথা ভাবেননি; ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদাকেও কূটনীতির টেবিলে নিয়ে গেছেন। একটি বৈঠক হয়েছিল কয়েক ঘণ্টার। একটি অনুরোধ করা হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু সেই বৈঠকের ফল গড়িয়েছে ১৫ বছরের একটি LNG চুক্তিতে। রাষ্ট্রনায়কের কূটনীতি কখনো কখনো এমনই হয়— একটি বৈঠক শেষ হয় কয়েক ঘণ্টায়, একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কয়েক পাতায়, কিন্তু তার সুফল ছড়িয়ে যেতে পারে একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বছরের পর বছর। দোহায় শেখ হাসিনার সেই বৈঠক তাই নিছক একটি কূটনৈতিক সাক্ষাৎ ছিল না। ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শী উদ্যোগের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে স্বাগত জানান। ঢাকা, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে স্বাগত জানান। ঢাকা, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ এই সফরের বদলি সফরে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির ঢাকা সফরের সময় ব্যবসা ও বিনিয়োগের প্রসারে বেশ কিছু বড় চুক্তি সই হয় বাংলাদেশের সাথে। যার মধ্যে ছিলঃ পারস্পরিক বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা: দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে এই চুক্তি করা হয়। দ্বৈত কর পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে উভয় দেশে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর যাতে দুইবার কর দিতে না হয় এবং কর ফাঁকি রোধ করা যায়, সেই লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যৌথ ব্যবসায়িক পরিষদ (Joint Business Council) প্রতিষ্ঠা: দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক সংযোগ স্থাপনের জন্য এটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ও নৌ-বাণিজ্য সহজ করতে এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সই হয়। দুই দেশের সরকারের মধ্যে আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে এই চুক্তি করা হয়েছে। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU)চুক্তিগুলোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে কাতার ও বাংলাদেশের মধ্যে শ্রমবাজার উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (MoU) কার্যকর রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে কাতার বর্তমানে দেশের দীর্ঘমেয়াদী সার (ইউরিয়া) সরবরাহ বৃদ্ধি এবং মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণে কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।



