ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
বিটিভির মহাপরিচালক হলেন কাজী জেসিন, ছাড়তে হবে অন্য পেশা
“নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি সত্ত্বেও অনড় অবস্থান” – সিএনএন ও এপি
রয়টার্স এক্সক্লুসিভ: শেখ হাসিনার মিত্র বাংলাদেশি ক্রিকেট তারকা সাকিব বলেছেন তিনি নিরাপত্তা পেলে দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত
পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বাসায় আগুন, দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ডিপ্লোমেটিক বিভাগের ডিসি-কে সদরদপ্তরে স্থানান্তর
ফের পিছিয়ে গেল রূপপুরের উৎপাদনের যাত্রা: আগস্টে জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে না পরমাণু বিদ্যুৎ
বিনা আমন্ত্রণেই বিদেশে যাবার পথে দিল্লি থেকে ঘুরে যেতে চেয়েছিলেন ড. ইউনূস
প্রকল্প ব্যয় ১৬৫ কোটি থেকে ঠেকলো ৩২৬ কোটিতে, ২০০ কোটির অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়ের তোড়জোড়
কেন শেখ হাসিনা মামলা আইনিভাবে ভঙ্গুর এবং তাঁর প্রত্যাবর্তনে কি কি সম্ভাব্য আইনি এভিনিউ খোলা আছে?
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তিনি সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সকল প্রকার আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। অবশ্যই যদি আপনি আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করেন। আর যদি মনে করেন, “শেখ হাসিনা” নামটির কারণেই তাঁর ক্ষেত্রে আইন-কানুন প্রযোজ্য নয় এবং তাঁকে আগেই দোষী ধরে নিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাই যথেষ্ট—তাহলে এই আলোচনা আর এগিয়ে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।
আমার মতে, তাঁর ন্যূনতম আইনি অধিকারগুলো হলো—
এক. তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ বিস্তারিতভাবে জানার অধিকার, কার্যকর আইনগত প্রতিনিধিত্ব লাভের অধিকার এবং আইন অনুযায়ী জামিনের আবেদন করার অধিকার।
দুই. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান গঠন আইনসম্মত কি না এবং এটি আইনগত কর্তৃত্বের সীমা অতিক্রম
করেছে কি না—সে প্রশ্নে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করার অধিকার। তিন. ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন যেভাবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছে, সেই সংশোধনের সাংবিধানিক ও আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার অধিকার। চার. ফেয়ার ট্রায়াল, ডিউ প্রসেস এবং বিচারিক নিরপেক্ষতার মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়েছে—এই ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করার অধিকার। পাঁচ. আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন সাধারণত অনুপস্থিতিতে বিচার অনুমোদন করে না। আমাদের ১৯৭৩-এর আইনটিতে অনুপস্থিতিতে বিচার করার যে অনুমোদন আছে তা আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিশেষ করে ICCPR, জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের বিচারিক অনুশীলনের আলোকে, ট্রায়াল ইন অ্যাবসেনশিয়াকে বৈধ বলে গণ্য করতে হলে কার্যকর নোটিশ, অভিযুক্তের সচেতন
ও স্বেচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি এবং পরবর্তীতে পূর্ণ পুনর্বিচারের সুযোগের মতো মৌলিক রক্ষাকবচ নিশ্চিত করতে হয়। লেবাননের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালকে মূল্যায়ন করতে গিয়েও এই মানদণ্ডগুলোই গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন। সুতরাং, যুক্তি দেওয়া যায় যে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারে এসব মৌলিক রক্ষাকবচ অনুসরণ করা হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের আলোকে তাঁর মামলাটি পুনর্বিচারের উপযুক্ত কি না—সে প্রশ্ন উত্থাপন করা সম্পূর্ণ বৈধ। ছয়. রায় ঘোষণার পর আপিলের জন্য নির্ধারিত ৩০ দিনের সময় অতিবাহিত হলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ, মৃত্যুদণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর বিষয়ে আদালত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারেন এমন যুক্তি উপস্থাপন করা সম্ভব। বিশেষ করে যদি দেখানো যায় যে,
বিচারটি অনুপস্থিতিতে বিচারের মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে সম্পন্ন হয়েছে, তাহলে ৩০ দিনের সীমাবদ্ধতা তাঁর ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে না—এমন একটি শক্তিশালী আইনি যুক্তি অন্তত উত্থাপনযোগ্য। অবশ্য আপিলের পথেও দুটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, আপিল করা হলে বিদ্যমান রায়টিকে একটি পর্যায়ে বিচারিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে—এমন যুক্তি তোলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত আপিল বিভাগের সামনে তিনি কতখানি নিরপেক্ষ বিচার পাবেন, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে একই আপিল বিভাগ নজিরবিহীনভাবে এক দণ্ডিত জামায়াত নেতার রিভিউ গ্রহণ করে তাঁকে খালাস দিয়েছে। ফলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সত্ত্বেও, আপিল করার আইনি সম্ভাবনা যে বিদ্যমান, আমার
বক্তব্য মূলত সেটিই। আমার মূল্যায়নে, উপরোক্ত প্রতিটি আইনি ভিত্তিই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। এর কোনো একটাও যদি হয়, তাহলে আমি চাই প্রত্যেক পক্ষ নিজের পছন্দমতো দেশ বিদেশের সেরা সেরা আইনজীবী ও আইনবেত্তা সেখানে নিয়োগ দেবার সুযোগ পাক। মিডিয়া দুই পক্ষের খবর সমভাবে পরিবেশন করার সুযোগ পাক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলির একটি বস্তুনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচারক, স্বাধীন প্রসিকিউশন এবং কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে বিচার অনুষ্ঠিত হলে তবেই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এটি শুধু শেখ হাসিনার জন্য নয়; জুলাই সহিংসতার সকল ভুক্তভোগীর বৃহত্তর ন্যায়বিচারের স্বার্থেও অপরিহার্য।জুলাইয়ের সহিংসতা ছিল বহুমাত্রিক। সেখানে রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয়—উভয় ধরনের বিভিন্ন পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
রয়েছে। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং প্রত্যেকের দায় যথাযথভাবে নির্ধারণ না করলে ন্যায়বিচার কখনোই পূর্ণতা পায় না। সত্য অনুসন্ধান ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেটি ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও অনুরূপ সংকটের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বহন করবে। বর্তমানে সরকারের কিছু প্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্যে মনে হচ্ছে যেন আদালতের রায় কার্যকর করা মানেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। অথচ ন্যায়বিচার কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি আইনসম্মত ও ন্যায্য বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফল। কোনো অভিযুক্তের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত শাস্তি ধরে নিয়ে বিচার পরিচালিত হলে সেটি আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। বলা যায় যে, বর্তমানে ক্ষমতার দখলে থাকা গোষ্ঠী পেছনে নিজেরাই অভিযুক্ত হয়ে বসেন, সে ভীতি থেকে আইনি পথ
অনুষঙ্গ করার উপর তেমন জোর দিতে চান না। আইনের একজন একাডেমিক হিসেবে আমার মূল্যায়ন হলো, শেখ হাসিনার মামলায় অনুসৃত আইন, নির্ভর করা সাক্ষ্য-প্রমাণ, প্রয়োগকৃত আইনি মতবাদ এবং ফেয়ার ট্রায়াল ও ডিউ প্রসেসের মৌলিক রক্ষাকবচসমূহ গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের আইনজগতের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো এ বিষয়গুলো নিয়ে পর্যাপ্ত নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ এবং গভীর আইনি বিশ্লেষণ করেননি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন এবং দেশীয় ফৌজদারি আইনের নীতিমালা বহু ক্ষেত্রে একসঙ্গে মিশে গেছে, এবং তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের আগে একটি রায় দেওয়া হয়েছে। আমার মূল্যায়নে, রায়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকতে পারে; কিন্তু এর আইনগত ভিত্তি অত্যন্ত বিতর্কিত ও ভঙ্গুর। ফলে সেই রায়ের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুতর আইনি প্রশ্ন থেকে যায়। রায় ঘোষণার পর আমি কার্ডিফ ভার্সিটির গবেষক ও ইউকে কাউন্সিলর ড. ববলিনের সঙ্গে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এই রায়ের বিভিন্ন আইনগত ত্রুটি বিশদভাবে আলোচনা করেছি। সেখানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য পাওলো কাসাকাও উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি আন্তর্জাতিক দর্শকদের উদ্দেশ্যে ইংরেজিতে ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের আইনজীবী, গবেষক ও বিদগ্ধজন যদি এ বিষয়ে যুক্তিনির্ভর, অর্থবহ ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় অংশ নিতে চান, আমি সেই আলোচনাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। সবশেষে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বিচার এক বিষয়; কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার জন্য একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা আরেক বিষয়। আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ তদন্তের জন্য যে মানের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাগত তদন্ত প্রয়োজন, জুলাইয়ের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত সে ধরনের তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে আমি মনে করি না। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) যে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, সেটি নিয়েও ইতোমধ্যে একাধিক গবেষণামূলক সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে, যার সন্তোষজনক জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, প্রতিবেদনটি নিজেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আরও তদন্ত প্রয়োজন। সেই তদন্ত আজও সম্পন্ন হয়নি। রাজনৈতিক বিজয়কে সুসংহত করা, ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা কিংবা সামাজিক বিভাজনকে স্থায়ী করা—এসব উদ্দেশ্যে পরিচালিত তদন্ত এক জিনিস; আর প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান ও সামগ্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য পরিচালিত তদন্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।
করেছে কি না—সে প্রশ্নে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করার অধিকার। তিন. ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন যেভাবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছে, সেই সংশোধনের সাংবিধানিক ও আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার অধিকার। চার. ফেয়ার ট্রায়াল, ডিউ প্রসেস এবং বিচারিক নিরপেক্ষতার মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়েছে—এই ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করার অধিকার। পাঁচ. আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন সাধারণত অনুপস্থিতিতে বিচার অনুমোদন করে না। আমাদের ১৯৭৩-এর আইনটিতে অনুপস্থিতিতে বিচার করার যে অনুমোদন আছে তা আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিশেষ করে ICCPR, জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের বিচারিক অনুশীলনের আলোকে, ট্রায়াল ইন অ্যাবসেনশিয়াকে বৈধ বলে গণ্য করতে হলে কার্যকর নোটিশ, অভিযুক্তের সচেতন
ও স্বেচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি এবং পরবর্তীতে পূর্ণ পুনর্বিচারের সুযোগের মতো মৌলিক রক্ষাকবচ নিশ্চিত করতে হয়। লেবাননের স্পেশাল ট্রাইব্যুনালকে মূল্যায়ন করতে গিয়েও এই মানদণ্ডগুলোই গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন। সুতরাং, যুক্তি দেওয়া যায় যে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারে এসব মৌলিক রক্ষাকবচ অনুসরণ করা হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের আলোকে তাঁর মামলাটি পুনর্বিচারের উপযুক্ত কি না—সে প্রশ্ন উত্থাপন করা সম্পূর্ণ বৈধ। ছয়. রায় ঘোষণার পর আপিলের জন্য নির্ধারিত ৩০ দিনের সময় অতিবাহিত হলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ, মৃত্যুদণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর বিষয়ে আদালত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারেন এমন যুক্তি উপস্থাপন করা সম্ভব। বিশেষ করে যদি দেখানো যায় যে,
বিচারটি অনুপস্থিতিতে বিচারের মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে সম্পন্ন হয়েছে, তাহলে ৩০ দিনের সীমাবদ্ধতা তাঁর ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে না—এমন একটি শক্তিশালী আইনি যুক্তি অন্তত উত্থাপনযোগ্য। অবশ্য আপিলের পথেও দুটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, আপিল করা হলে বিদ্যমান রায়টিকে একটি পর্যায়ে বিচারিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে—এমন যুক্তি তোলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত আপিল বিভাগের সামনে তিনি কতখানি নিরপেক্ষ বিচার পাবেন, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে একই আপিল বিভাগ নজিরবিহীনভাবে এক দণ্ডিত জামায়াত নেতার রিভিউ গ্রহণ করে তাঁকে খালাস দিয়েছে। ফলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সত্ত্বেও, আপিল করার আইনি সম্ভাবনা যে বিদ্যমান, আমার
বক্তব্য মূলত সেটিই। আমার মূল্যায়নে, উপরোক্ত প্রতিটি আইনি ভিত্তিই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। এর কোনো একটাও যদি হয়, তাহলে আমি চাই প্রত্যেক পক্ষ নিজের পছন্দমতো দেশ বিদেশের সেরা সেরা আইনজীবী ও আইনবেত্তা সেখানে নিয়োগ দেবার সুযোগ পাক। মিডিয়া দুই পক্ষের খবর সমভাবে পরিবেশন করার সুযোগ পাক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলির একটি বস্তুনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচারক, স্বাধীন প্রসিকিউশন এবং কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে বিচার অনুষ্ঠিত হলে তবেই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এটি শুধু শেখ হাসিনার জন্য নয়; জুলাই সহিংসতার সকল ভুক্তভোগীর বৃহত্তর ন্যায়বিচারের স্বার্থেও অপরিহার্য।জুলাইয়ের সহিংসতা ছিল বহুমাত্রিক। সেখানে রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয়—উভয় ধরনের বিভিন্ন পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
রয়েছে। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং প্রত্যেকের দায় যথাযথভাবে নির্ধারণ না করলে ন্যায়বিচার কখনোই পূর্ণতা পায় না। সত্য অনুসন্ধান ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেটি ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও অনুরূপ সংকটের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বহন করবে। বর্তমানে সরকারের কিছু প্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির বক্তব্যে মনে হচ্ছে যেন আদালতের রায় কার্যকর করা মানেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। অথচ ন্যায়বিচার কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি আইনসম্মত ও ন্যায্য বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফল। কোনো অভিযুক্তের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত শাস্তি ধরে নিয়ে বিচার পরিচালিত হলে সেটি আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। বলা যায় যে, বর্তমানে ক্ষমতার দখলে থাকা গোষ্ঠী পেছনে নিজেরাই অভিযুক্ত হয়ে বসেন, সে ভীতি থেকে আইনি পথ
অনুষঙ্গ করার উপর তেমন জোর দিতে চান না। আইনের একজন একাডেমিক হিসেবে আমার মূল্যায়ন হলো, শেখ হাসিনার মামলায় অনুসৃত আইন, নির্ভর করা সাক্ষ্য-প্রমাণ, প্রয়োগকৃত আইনি মতবাদ এবং ফেয়ার ট্রায়াল ও ডিউ প্রসেসের মৌলিক রক্ষাকবচসমূহ গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের আইনজগতের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো এ বিষয়গুলো নিয়ে পর্যাপ্ত নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ এবং গভীর আইনি বিশ্লেষণ করেননি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন এবং দেশীয় ফৌজদারি আইনের নীতিমালা বহু ক্ষেত্রে একসঙ্গে মিশে গেছে, এবং তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের আগে একটি রায় দেওয়া হয়েছে। আমার মূল্যায়নে, রায়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকতে পারে; কিন্তু এর আইনগত ভিত্তি অত্যন্ত বিতর্কিত ও ভঙ্গুর। ফলে সেই রায়ের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুতর আইনি প্রশ্ন থেকে যায়। রায় ঘোষণার পর আমি কার্ডিফ ভার্সিটির গবেষক ও ইউকে কাউন্সিলর ড. ববলিনের সঙ্গে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এই রায়ের বিভিন্ন আইনগত ত্রুটি বিশদভাবে আলোচনা করেছি। সেখানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য পাওলো কাসাকাও উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি আন্তর্জাতিক দর্শকদের উদ্দেশ্যে ইংরেজিতে ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের আইনজীবী, গবেষক ও বিদগ্ধজন যদি এ বিষয়ে যুক্তিনির্ভর, অর্থবহ ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় অংশ নিতে চান, আমি সেই আলোচনাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। সবশেষে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বিচার এক বিষয়; কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার জন্য একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা আরেক বিষয়। আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ তদন্তের জন্য যে মানের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাগত তদন্ত প্রয়োজন, জুলাইয়ের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত সে ধরনের তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে আমি মনে করি না। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) যে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, সেটি নিয়েও ইতোমধ্যে একাধিক গবেষণামূলক সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে, যার সন্তোষজনক জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, প্রতিবেদনটি নিজেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আরও তদন্ত প্রয়োজন। সেই তদন্ত আজও সম্পন্ন হয়নি। রাজনৈতিক বিজয়কে সুসংহত করা, ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা কিংবা সামাজিক বিভাজনকে স্থায়ী করা—এসব উদ্দেশ্যে পরিচালিত তদন্ত এক জিনিস; আর প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান ও সামগ্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য পরিচালিত তদন্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।



