ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
একটির খরচে ৫টি দূরে থাক, উল্টো মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমিক আমদানি ও ওয়ার্ক পারমিট স্থগিত করল লাওস
গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি ক্লোজড
তিস্তা প্রকল্পে নতুন মেরুকরণ, বেইজিংয়ের পর নজর ওয়াশিংটনেরও: কৌশলগত নতুন ক্ষেত্র উত্তরাঞ্চল?
পাকিস্তানের ফুললি ফান্ডেড স্কলারশিপের মুলা: উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের হাহাকার, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা চুরি করে ট্রান্সফরমার
৭ নেতার ফাঁসির রায়: সুপ্রিম কোর্টে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নীরব প্রতিবাদ
বিএনপি-জামায়াতপন্থি ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন দপ্তরে হুমকি-ধমকি: এমপি-মন্ত্রীদের চাপ
দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনসেবামূলক বিভিন্ন প্রকল্পের বড় একটি অংশ বাস্তবায়িত হয় সরকারি বিশেষায়িত প্রকৌশল সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট, প্রতিরক্ষা বাঁধ, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, সরকারি উন্নয়নকাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি, বিশেষ করে বর্তমান সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ ও তদবিরের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়
কাগজপত্র, অভিজ্ঞতা কিংবা নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রকৌশলীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামে বেনামে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বর্তমান বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা। এছাড়াও, তারা ঠিকাদারদের কাজ থেকে কাজ পাইয়ে দেবার বিনিময়ে কমিশনের চেষ্টাও করেন। সাধারণত বিভিন্ন উন্নয়নকাজের দরপত্র জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আহ্বান করা হয়। ফলে মাঠপর্যায়ের দপ্তরপ্রধান ও প্রকৌশলীরাই দরপত্র মূল্যায়ন ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ভাষ্য, সরকারি ক্রয়বিধি ও দরপত্রের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করলে কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া তাদের পক্ষে আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে সম্ভব নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক নির্বাহী
প্রকৌশলী বলেন, “ভাই, আমরা কীভাবে কাজ দেব? কাগজপত্র না থাকলে কাজ দেওয়া যায় কি? আর বর্তমান এসএলটি ব্যবস্থায় এভাবে কাজ দেওয়ার সুযোগও নেই।” কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতিতে অনেক সময় এই আইনি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতাগুলো রাজনৈতিক তদবিরকারীরা বিবেচনায় নিতে চান না। তাদের প্রত্যাশা থাকে, যেকোনোভাবে তাদের সুপারিশকৃত বা মনোনীত ঠিকাদার যেন কাজ পান। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, সরাসরি যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তাদের কাছে এসব বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। পছন্দ অনুযায়ী কাজ না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের হয়রানি কিংবা চাপ প্রয়োগের আশঙ্কাও তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই প্রবণতা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই এ ধরনের তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানান কয়েকজন প্রকৌশলী। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পক্ষ থেকে ‘দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়ার’ যুক্তি দেখিয়ে তাদের অনুসারী ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা যখন দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতা ও সরকারি ক্রয়বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে, তখন মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা এক ধরনের প্রশাসনিক সংকটে পড়েন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক নির্বাহী প্রকৌশলীও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একই কাজের জন্য একাধিকবার বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু
দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে প্রকৌশলীদের অনেক সময় চাপের মুখে পড়তে হয়। শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তর নয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতার বাইরে গিয়ে কোনো ঠিকাদারকে কাজ দিলে পরবর্তী সময়ে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেই বহন করতে হবে। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে নতুন বিতর্ক সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এর মধ্যে দরপত্রে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে
দর কম-বেশির প্রচলিত সুযোগের পরিবর্তে সিগনেফিকেন্টলি লোয়েস্ট টেন্ডার পদ্ধতিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সামাজিক ক্যাটাগরিতে পরিচালন বাজেটের একটি অংশ লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড-এর মাধ্যমে নতুন লাইসেন্সধারী ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান। উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় নতুন ও অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ পাওয়া ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু দলীয় লোকদের সুবিধা দিতে সরকার খোদ পিপিআর সংশোধনেরই ব্যবস্থা গ্রহন করছে। তবে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও বর্তমানে প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাংশের অভিযোগ, এসএলটি পদ্ধতিতেও দরপত্র মূল্যায়নের সময় বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে
কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে ‘রেসপন্সিভ’ এবং অন্য কাউকে ‘নন-রেসপন্সিভ’ হিসেবে বিবেচনার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কিছু দরপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বেশি অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ আছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঢাকা মেট্রোকে নিয়েও। বিভিন্ন দপ্তরের প্রকৌশলীদের তথ্যমতে সংসদে বর্তমান রাষ্ট্রপতি দলীয় ঠিকাদারদের কাজ না পাওয়ার বিষয়ে হতাশা এবং পিপিআর সংশোধন এর বিষয়ে মত প্রকাশের পরেই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন এমপি মন্ত্রীগন। পছন্দমতো দলীয় লোক কাজ না পেলেই বদলি করার হুমকি দেন রাজনৈতিক দলের লোকেরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রতিটি দরপত্রের নথি, কারিগরি মূল্যায়ন, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, সাম্প্রতিক কয়েক মাসের এসব প্রতিষ্ঠানের দরপত্র প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ এবং স্বাধীন প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দরপত্রের নমুনাভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হলে কোনো অনিয়ম, পক্ষপাত বা প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা রয়েছে কি না তা নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। প্রকৌশলীদের প্রশ্ন—দায় নেবে কে? সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, রাজনৈতিক চাপের কারণে যদি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করা কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে কাজের মান, আর্থিক অনিয়ম কিংবা প্রশাসনিক তদন্তের দায় শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর ওপরই বর্তাতে পারে। একজন প্রকৌশলীর ভাষায়, “রাজনৈতিকভাবে কে সুপারিশ করলেন, সেটা নথিতে থাকে না; কিন্তু আমরা নিয়মের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তের দায় আমাদেরই নিতে হয়।” এ কারণে প্রকৌশলী ও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, উন্নয়নকাজে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতা, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো ঠিকাদার বা রাজনৈতিক পক্ষ যদি মনে করে যে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সে ক্ষেত্রে তার সমাধানও হতে হবে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার কাঠামোর মধ্যেই। সরকার যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টি শুধু একটি ব্যক্তির সুবিধার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রকল্পের গুণগত মান এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থ সরাসরি জড়িত। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকৌশলীদের ওপর অযাচিত চাপ বন্ধ করা এবং দরপত্র মূল্যায়নকে নথি, যোগ্যতা ও বিধিমালার ভিত্তিতে পরিচালনা করা না গেলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা—উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কাগজপত্র, অভিজ্ঞতা কিংবা নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রকৌশলীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামে বেনামে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বর্তমান বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা। এছাড়াও, তারা ঠিকাদারদের কাজ থেকে কাজ পাইয়ে দেবার বিনিময়ে কমিশনের চেষ্টাও করেন। সাধারণত বিভিন্ন উন্নয়নকাজের দরপত্র জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আহ্বান করা হয়। ফলে মাঠপর্যায়ের দপ্তরপ্রধান ও প্রকৌশলীরাই দরপত্র মূল্যায়ন ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ভাষ্য, সরকারি ক্রয়বিধি ও দরপত্রের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করলে কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া তাদের পক্ষে আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে সম্ভব নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক নির্বাহী
প্রকৌশলী বলেন, “ভাই, আমরা কীভাবে কাজ দেব? কাগজপত্র না থাকলে কাজ দেওয়া যায় কি? আর বর্তমান এসএলটি ব্যবস্থায় এভাবে কাজ দেওয়ার সুযোগও নেই।” কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতিতে অনেক সময় এই আইনি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতাগুলো রাজনৈতিক তদবিরকারীরা বিবেচনায় নিতে চান না। তাদের প্রত্যাশা থাকে, যেকোনোভাবে তাদের সুপারিশকৃত বা মনোনীত ঠিকাদার যেন কাজ পান। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, সরাসরি যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে তাদের কাছে এসব বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। পছন্দ অনুযায়ী কাজ না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের হয়রানি কিংবা চাপ প্রয়োগের আশঙ্কাও তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই প্রবণতা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই এ ধরনের তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানান কয়েকজন প্রকৌশলী। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পক্ষ থেকে ‘দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়ার’ যুক্তি দেখিয়ে তাদের অনুসারী ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা যখন দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতা ও সরকারি ক্রয়বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে, তখন মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা এক ধরনের প্রশাসনিক সংকটে পড়েন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক নির্বাহী প্রকৌশলীও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একই কাজের জন্য একাধিকবার বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু
দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে প্রকৌশলীদের অনেক সময় চাপের মুখে পড়তে হয়। শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তর নয়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তাদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতার বাইরে গিয়ে কোনো ঠিকাদারকে কাজ দিলে পরবর্তী সময়ে তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেই বহন করতে হবে। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে নতুন বিতর্ক সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এর মধ্যে দরপত্রে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে
দর কম-বেশির প্রচলিত সুযোগের পরিবর্তে সিগনেফিকেন্টলি লোয়েস্ট টেন্ডার পদ্ধতিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সামাজিক ক্যাটাগরিতে পরিচালন বাজেটের একটি অংশ লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড-এর মাধ্যমে নতুন লাইসেন্সধারী ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান। উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় নতুন ও অপেক্ষাকৃত কম সুযোগ পাওয়া ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু দলীয় লোকদের সুবিধা দিতে সরকার খোদ পিপিআর সংশোধনেরই ব্যবস্থা গ্রহন করছে। তবে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও বর্তমানে প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাংশের অভিযোগ, এসএলটি পদ্ধতিতেও দরপত্র মূল্যায়নের সময় বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে
কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে ‘রেসপন্সিভ’ এবং অন্য কাউকে ‘নন-রেসপন্সিভ’ হিসেবে বিবেচনার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কিছু দরপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বেশি অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ আছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঢাকা মেট্রোকে নিয়েও। বিভিন্ন দপ্তরের প্রকৌশলীদের তথ্যমতে সংসদে বর্তমান রাষ্ট্রপতি দলীয় ঠিকাদারদের কাজ না পাওয়ার বিষয়ে হতাশা এবং পিপিআর সংশোধন এর বিষয়ে মত প্রকাশের পরেই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন এমপি মন্ত্রীগন। পছন্দমতো দলীয় লোক কাজ না পেলেই বদলি করার হুমকি দেন রাজনৈতিক দলের লোকেরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রতিটি দরপত্রের নথি, কারিগরি মূল্যায়ন, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, সাম্প্রতিক কয়েক মাসের এসব প্রতিষ্ঠানের দরপত্র প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ এবং স্বাধীন প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দরপত্রের নমুনাভিত্তিক বিশ্লেষণ করা হলে কোনো অনিয়ম, পক্ষপাত বা প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা রয়েছে কি না তা নিরপেক্ষভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। প্রকৌশলীদের প্রশ্ন—দায় নেবে কে? সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, রাজনৈতিক চাপের কারণে যদি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করা কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে কাজের মান, আর্থিক অনিয়ম কিংবা প্রশাসনিক তদন্তের দায় শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর ওপরই বর্তাতে পারে। একজন প্রকৌশলীর ভাষায়, “রাজনৈতিকভাবে কে সুপারিশ করলেন, সেটা নথিতে থাকে না; কিন্তু আমরা নিয়মের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তের দায় আমাদেরই নিতে হয়।” এ কারণে প্রকৌশলী ও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, উন্নয়নকাজে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতা, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো ঠিকাদার বা রাজনৈতিক পক্ষ যদি মনে করে যে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সে ক্ষেত্রে তার সমাধানও হতে হবে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার কাঠামোর মধ্যেই। সরকার যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টি শুধু একটি ব্যক্তির সুবিধার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রকল্পের গুণগত মান এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থ সরাসরি জড়িত। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকৌশলীদের ওপর অযাচিত চাপ বন্ধ করা এবং দরপত্র মূল্যায়নকে নথি, যোগ্যতা ও বিধিমালার ভিত্তিতে পরিচালনা করা না গেলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা—উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।



