ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
হুথিদের অগ্রযাত্রায় লোহিত সাগরে বাড়ছে সংকট, হুমকিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য
ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক স্থাপনা, কমেছে অস্ত্রের মজুত
ইসরায়েলের কাছে প্রতিরক্ষা সহায়তা চাইল সৌদি আরব
সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হুতিদের, জবাবে ব্যাপক বিমান হামলা
মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, সতর্ক করল চীন-রাশিয়া
ফলাফলে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কর্মকর্তারা
কাকে বিয়ে করলেন জেমিমা গোল্ডস্মিথ
ব্রিকসে ভারতের স্বার্থ কোথায়, কেন জোটটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নয়াদিল্লি
ব্রিকসকে ভারত কোনো পশ্চিমবিরোধী জোট বা প্রচলিত সামরিক-রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখে না। বরং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা, নতুন বাজার তৈরি এবং কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসকে ব্যবহার করতে চায় নয়াদিল্লি। ভারতের দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বাড়ানোর জন্য কোনো একটি জোটের ওপর নির্ভর না করে একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বেশি কার্যকর।
ভারত একই সময়ে কোয়াড, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ফোরাম এবং ব্রিকসের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছে। এর মাধ্যমে ভারত এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে চায়, যেখানে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা
নেওয়া সম্ভব হয়। ব্রিকসের অন্যতম বড় আকর্ষণ ভারতের জন্য এর বিশাল বাজার। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি জোটের সম্প্রসারণের ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এতে যুক্ত হয়েছে। ফলে বিশ্বের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন ব্রিকসের আওতায়। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য এটি নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে ব্রিকসের বিভিন্ন সদস্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য করে। তবে নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে, একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ভারত ব্রিকসের বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগেও সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বাজারে
ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক বাধা বা প্রবেশাধিকার সংকুচিত হলে বিকল্প বাজার হিসেবে ব্রিকসের দেশগুলো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এখানেও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ব্রিকসের অনেক দেশের বাজারে চীনের বাণিজ্যিক উপস্থিতি ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ব্রিকস ভারতের জন্য শুধু নতুন বাজারের সুযোগ নয়, একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্রও। ব্রিকসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করে। ভারতের বিভিন্ন সড়ক, নগর পরিবহন, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে এই ব্যাংক অর্থায়ন করেছে। ভারতে ব্যাংকটির অর্থায়নের পরিমাণও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে।
সড়ক যোগাযোগ থেকে শুরু করে সৌরবিদ্যুৎ, পানি ব্যবস্থাপনা ও নগর অবকাঠামো—বিভিন্ন খাতে ভারতের প্রকল্পগুলোতে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণ রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও ভারত জরুরি অর্থায়ন পেয়েছিল। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কাঠামো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে এর অংশীদারিত্ব। প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এখানে ভারতের অংশীদারিত্ব উল্লেখযোগ্য। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ভারত শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, প্রতিষ্ঠানটির নীতিগত আলোচনাতেও প্রভাব রাখার সুযোগ পায়। আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ব্রিকসকে ব্যবহার করতে চায় ভারত। এর অর্থ পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প ও পরিপূরক ব্যবস্থা তৈরি করা। ভারত এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রচলিত বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর
ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং দ্রুত ও কম খরচে আন্তঃসীমান্ত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী। ব্রিকসের আলোচনায় সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে। দ্রুত অর্থপ্রদানের অবকাঠামো এবং ভবিষ্যতে ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক লেনদেনে সময় ও ব্যয় কমতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারতীয় রুপির আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্য। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে রুপির ব্যবহার বাড়ানো দীর্ঘদিন ধরে ভারতের একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ব্রিকসের মতো বড় অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এ
ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়লে আন্তর্জাতিক লেনদেনে রুপির ব্যবহারও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ব্রিকস ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। জোটটিতে এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশ রয়েছে। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের সরাসরি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায্য বাণিজ্য, টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মতো ইস্যুতে ভারত উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরতে চায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিও ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার। এ ক্ষেত্রে ব্রিকসের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও
বিস্তৃত করতে পারে। ভারত একই সঙ্গে নিজেকে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, আবার একই সময়ে রাশিয়া, চীন, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গেও ভারত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ ভারতের জন্য বৈশ্বিক দক্ষিণের সঙ্গে এই যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ব্রিকসের ভেতরে ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ চীন। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং এশিয়ায় প্রভাব, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে ভারত ব্রিকসকে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করলেও এটিকে চীননির্ভর কোনো কাঠামোতে পরিণত করতে চায় না। ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রিকসের কার্যকারিতা অনেকাংশে ভারত ও চীনের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জোটের ভেতরে ভারতের একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে। সীমান্ত ও নিরাপত্তার মতো বিষয় ভারত চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মোকাবিলা করতে পারে, আর অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার মতো বিষয়ে ব্রিকসের কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা চালিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থান ভারতের বৃহত্তর ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারত ব্রিকসের সব সদস্যের সঙ্গে একমত নয়। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, ইরানের সঙ্গে নীতিগত পার্থক্য রয়েছে, আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারতের গভীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই ব্রিকসকে কোনো একক রাজনৈতিক বা আদর্শিক শিবিরে পরিণত করার পরিবর্তে ভারত এটিকে নমনীয় সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে রাখতে আগ্রহী। এই বহুমুখী সম্পর্ক ভারতের জন্য কূটনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষেত্রও বাড়ায়। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ভারতের বিকল্প অংশীদার রয়েছে; আবার চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার সময়ও ভারত পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে একটি ভারসাম্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একইভাবে, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ তার আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে ব্রিকসের মাধ্যমে ভারত রাতারাতি আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারবে—এমন প্রত্যাশার বাস্তব ভিত্তি সীমিত। ব্রিকস এখনো সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত নয়। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত বিরোধ বা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যাও ব্রিকসের মাধ্যমে সরাসরি সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। একইভাবে, মার্কিন ডলারকে দ্রুত সরিয়ে দিয়ে কোনো বিকল্প মুদ্রা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রধান মুদ্রায় পরিণত করাও সহজ নয়। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদান এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগোলেও বাস্তব ব্যবহারে এর পরিসর এখনো সীমিত। ভারতের জন্য ব্রিকসের মূল গুরুত্ব তাই কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন বাজার, উন্নয়ন অর্থায়ন, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহার, বৈশ্বিক দক্ষিণে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং চীনের সঙ্গে ভারসাম্য—সবগুলো ক্ষেত্রেই জোটটি নয়াদিল্লিকে অতিরিক্ত একটি প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে। ভারতের কৌশলটি মূলত একাধিক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে একই সঙ্গে সক্রিয় থাকার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কোনো একটি শিবির বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নেওয়াই এর কেন্দ্রবিন্দু। ব্রিকস সেই বৃহত্তর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নেওয়া সম্ভব হয়। ব্রিকসের অন্যতম বড় আকর্ষণ ভারতের জন্য এর বিশাল বাজার। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি জোটের সম্প্রসারণের ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এতে যুক্ত হয়েছে। ফলে বিশ্বের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন ব্রিকসের আওতায়। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য এটি নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে ব্রিকসের বিভিন্ন সদস্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য করে। তবে নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে, একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ভারত ব্রিকসের বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগেও সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বাজারে
ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক বাধা বা প্রবেশাধিকার সংকুচিত হলে বিকল্প বাজার হিসেবে ব্রিকসের দেশগুলো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এখানেও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ব্রিকসের অনেক দেশের বাজারে চীনের বাণিজ্যিক উপস্থিতি ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ব্রিকস ভারতের জন্য শুধু নতুন বাজারের সুযোগ নয়, একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্রও। ব্রিকসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করে। ভারতের বিভিন্ন সড়ক, নগর পরিবহন, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে এই ব্যাংক অর্থায়ন করেছে। ভারতে ব্যাংকটির অর্থায়নের পরিমাণও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে।
সড়ক যোগাযোগ থেকে শুরু করে সৌরবিদ্যুৎ, পানি ব্যবস্থাপনা ও নগর অবকাঠামো—বিভিন্ন খাতে ভারতের প্রকল্পগুলোতে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণ রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও ভারত জরুরি অর্থায়ন পেয়েছিল। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কাঠামো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে এর অংশীদারিত্ব। প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এখানে ভারতের অংশীদারিত্ব উল্লেখযোগ্য। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ভারত শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, প্রতিষ্ঠানটির নীতিগত আলোচনাতেও প্রভাব রাখার সুযোগ পায়। আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ব্রিকসকে ব্যবহার করতে চায় ভারত। এর অর্থ পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প ও পরিপূরক ব্যবস্থা তৈরি করা। ভারত এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রচলিত বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর
ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং দ্রুত ও কম খরচে আন্তঃসীমান্ত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহী। ব্রিকসের আলোচনায় সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে। দ্রুত অর্থপ্রদানের অবকাঠামো এবং ভবিষ্যতে ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক লেনদেনে সময় ও ব্যয় কমতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারতীয় রুপির আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্য। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে রুপির ব্যবহার বাড়ানো দীর্ঘদিন ধরে ভারতের একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য। ব্রিকসের মতো বড় অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এ
ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়লে আন্তর্জাতিক লেনদেনে রুপির ব্যবহারও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ব্রিকস ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। জোটটিতে এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশ রয়েছে। ফলে উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের সরাসরি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায্য বাণিজ্য, টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মতো ইস্যুতে ভারত উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরতে চায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিও ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার। এ ক্ষেত্রে ব্রিকসের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও
বিস্তৃত করতে পারে। ভারত একই সঙ্গে নিজেকে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, আবার একই সময়ে রাশিয়া, চীন, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গেও ভারত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ ভারতের জন্য বৈশ্বিক দক্ষিণের সঙ্গে এই যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ব্রিকসের ভেতরে ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ চীন। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং এশিয়ায় প্রভাব, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে ভারত ব্রিকসকে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করলেও এটিকে চীননির্ভর কোনো কাঠামোতে পরিণত করতে চায় না। ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রিকসের কার্যকারিতা অনেকাংশে ভারত ও চীনের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জোটের ভেতরে ভারতের একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে। সীমান্ত ও নিরাপত্তার মতো বিষয় ভারত চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মোকাবিলা করতে পারে, আর অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার মতো বিষয়ে ব্রিকসের কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা চালিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থান ভারতের বৃহত্তর ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারত ব্রিকসের সব সদস্যের সঙ্গে একমত নয়। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, ইরানের সঙ্গে নীতিগত পার্থক্য রয়েছে, আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারতের গভীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই ব্রিকসকে কোনো একক রাজনৈতিক বা আদর্শিক শিবিরে পরিণত করার পরিবর্তে ভারত এটিকে নমনীয় সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে রাখতে আগ্রহী। এই বহুমুখী সম্পর্ক ভারতের জন্য কূটনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষেত্রও বাড়ায়। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ভারতের বিকল্প অংশীদার রয়েছে; আবার চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার সময়ও ভারত পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে একটি ভারসাম্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। একইভাবে, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ তার আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে ব্রিকসের মাধ্যমে ভারত রাতারাতি আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারবে—এমন প্রত্যাশার বাস্তব ভিত্তি সীমিত। ব্রিকস এখনো সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং পারস্পরিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত নয়। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত বিরোধ বা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যাও ব্রিকসের মাধ্যমে সরাসরি সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। একইভাবে, মার্কিন ডলারকে দ্রুত সরিয়ে দিয়ে কোনো বিকল্প মুদ্রা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রধান মুদ্রায় পরিণত করাও সহজ নয়। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদান এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগোলেও বাস্তব ব্যবহারে এর পরিসর এখনো সীমিত। ভারতের জন্য ব্রিকসের মূল গুরুত্ব তাই কোনো একটি লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন বাজার, উন্নয়ন অর্থায়ন, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহার, বৈশ্বিক দক্ষিণে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং চীনের সঙ্গে ভারসাম্য—সবগুলো ক্ষেত্রেই জোটটি নয়াদিল্লিকে অতিরিক্ত একটি প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে। ভারতের কৌশলটি মূলত একাধিক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে একই সঙ্গে সক্রিয় থাকার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কোনো একটি শিবির বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নেওয়াই এর কেন্দ্রবিন্দু। ব্রিকস সেই বৃহত্তর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



