ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
চেক জালিয়াতি: আত্মসমর্পণের পর কারাগারে প্রেস মালিক
গরুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধে খুন?
বিশ্ববাজারে বেড়েছে স্বর্ণ-রুপার দাম
তেলের দাম ১৪০ ডলার ছুঁতে পারে
আবারও বাড়ল ভোজ্যতেলের দাম
জ্বালানি আমদানি কমায় তীব্র ঝুঁকিতে অর্থনীতি, রপ্তানি খাতে বহুমুখী চাপ
মাত্র ৯ মাসে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াল
আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে বাজারের তালিকা কাটছাঁট
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মাহমুদ হাসান। ছোট চাকরি, ২৮ হাজার টাকা মাইনে। এই বেতনে বনেদি হাতিরপুল বাজারে ঢুঁ মারার সাহস নেই তাঁর। তারপরও অফিস শেষে গেলেন! ভাবলেন, প্যাকেটজাত গুঁড়ো দুধই তো কিনবেন। মোড়কে লেখা দামেই কেনা যাবে। দোকানি ডিপ্লোমা ব্র্যান্ডের এক কেজি গুঁড়ো দুধের দাম চাইলেন ৯০০ টাকা। দাম শুনেই মাহমুদ হাসান চটে বললেন, ‘যে হারে দাম বাড়তাছে, বাচ্চার জন্য দুধ কেনাও মুশকিল হইয়া যাইতাছে। চার বছর ধইরা একই বেতন। খরচ তো থাইম্যা নাই।’
নিত্যপণ্যের দামের তাপে মাহমুদ হাসানের মতো সাধারণ মানুষের এখন ত্রিশঙ্কু দশা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অনেকেই সামর্থ্যের সঙ্গে আপস করছেন। কম কিনছেন, কম খাচ্ছেন। বাজারের ফর্দ ছোট থেকে
হচ্ছে আরও ছোট। খাবার তালিকা থেকে কেউ বাদ দিচ্ছেন প্রিয় সন্তানের দুধ, কারও কারও পাতে ওঠছে না পুষ্টিকর খাবার। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচকে নাড়া দিয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সব পণ্যের দামে। সম্প্রতি জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের দাম লিটারে বাড়ানো হয়েছে ১৫ টাকা। এতে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়লেও পণ্যবাহী পরিবহনে তা হয়েছে কয়েক গুণ। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জ্বালানির সংকট ও দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে ট্রাক মালিকরা ১৫ হাজার টাকার ভাড়া নিচ্ছেন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যে। বিশ্লেষকরা মনে করেন,
ডিজেলের দর লিটারে বেড়েছে ১৫ টাকা। এখানে ১৫ শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এটি ১৫ রকমের চিন্তার রেখা। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লেই লাফ দেয় পরিবহন ভাড়া। বাজারে অস্থিরতার পেছনে এটিই বড় অনুঘটক। চাল-ডাল-তেল, মাছ-মাংস, সবজি– এমন কোনো নিত্যপণ্য নেই যেটির দাম বাড়ে না। এই বাড়তি খরচের ঝাপটা উচ্চবিত্তকে স্পর্শ না করলেও খরচের সঙ্গে দৌড়াতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন সীমিত আয়ের মানুষ। এ পরিস্থিতিতে বাজারে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের কথা বলেছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্য আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর সমন্বয় করার ব্যাপারেও তাগিদ দিয়েছেন তারা। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি এভাবে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ার কারণে ফুঁসে
উঠছে মূল্যস্ফীতি। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরছে। মূল্যস্ফীতি বাড়া মানে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্য কিনতে ভোক্তাকে অতিরিক্ত ৮-৯ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এতে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার জেরে বাংলাদেশে নতুন করে ১২ লাখ মানুষ দরিদ্র হতে পারে। অর্থাৎ যারা এতদিন দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থেকে কোনো রকম মাথা গোঁজার স্বপ্ন দেখতেন; জ্বালানি তেলের এই ধাক্কায় তারা নিস্তেজ হয়ে যাবেন। বৈশ্বিক সংস্থাগুলোও সতর্ক করছে। গত শুক্রবার খাদ্য সংকট মোকাবিলা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত
বছর দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ মাত্র ১০টি দেশের। সে তালিকায় বাংলাদেশও আছে। চলতি বছরেও এসব দেশে খাদ্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। দর বাড়ল কেমন গত সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও, সেগুনবাগিচা, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাল-ডাল, ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিমসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দর বেড়েছে। গতকাল বুধবার দাম বাড়ানোর ঘোষণার আগে থেকেই খোলা ভোজ্যতেল লিটারে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ২০ টাকা। মাঠ থেকে বোরো ধান উঠছে; এখন চালের দাম কম থাকার কথা। তবে বাজারের চিত্র ভিন্ন। এক সপ্তাহে মাঝারি চাল (বিআর-২৮ ও পাইজাম) কেজিতে তিন টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০
এবং মোটা চাল (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজিতে দুই টাকা বেড়ে ৫২ থেকে ৫৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে সরু চাল (মিনিকেট) বিক্রি হচ্ছে ৭৩ থেকে ৮০ টাকা দরে। একইভাবে খোলা ময়দা কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৬২ টাকা। ডিমের ডজন ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, যা রমজানে ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। সোনালি মুরগির দরও চড়া। কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকায়। কাঁচাবাজারেও স্বস্তি কম। বেশির ভাগ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকার ঘরে। এর মধ্যে চিচিঙ্গা, করলা, শসার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। দাম বাড়ার প্রমাণ মেলে সরকারি সংস্থা
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, এক মাসের ব্যবধানে মোটা ও মাঝারি চালের দর গড়ে ৭ ও আটার ৪ শতাংশ দর বেড়েছে। চিনি ও মসুর ডালের দর বেড়েছে ২ শতাংশ। গুঁড়ো দুধের দাম গড়ে বেড়েছে ৬ শতাংশ। ৬০০ টাকা বাড়ল এলপিজি সিলিন্ডারে বাড়তি দরে বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে রান্নাঘরে গেলে আরেক রকম দুশ্চিন্তা। মার্চে যে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা; এপ্রিলের শুরুতে তা বেড়ে হয় এক হাজার ৭২৮ টাকায়। সব শেষ গত সপ্তাহে আরও বেড়ে হয় এক হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে একটি পরিবারের রান্নার খরচ বেড়েছে ৬০০ টাকা। অস্বস্তির ভিড়ে কিছু স্বস্তির পণ্য রমজানে দামের রেকর্ড দেখিয়েছিল লেবু। মাঝারি আকারের একটা লেবু কিনতে খরচ করতে হয়েছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। সেই হিসাবে এক হালির দাম পড়েছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। গতকাল সেই লেবুর ডজনই বিক্রি হতে দেখা গেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কাঁচামরিচের দামও বেশ কম। বাজারভেদে প্রতি কেজি কেনা যাচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকায়। রমজানের সময় বেগুনের কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হলেও মানভেদে এখন কেনা যাচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। আলু-পেঁয়াজের দামও কম। পণ্য দুটির কেজি বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ২০ থেকে ২৫ এবং ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে। ‘গোস্ত খাওয়াইতে পারি না, তেলাপিয়া মাছ দিয়ে বুঝ দেই’ তেজগাঁওয়ের শাহীনবাগের গৃহিণী সালেহা বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। নিজে সকাল-বিকেল দুটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। দুজনের মাসে আয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এসব তথ্য দিয়ে তিনি বলছেন, ‘ছোড পোলাডা গরুর গোস্ত খাইতে পছন্দ করে। ক্যামনে কিনমু? কেজি ৮০০ ট্যাহা। মাঝেমধ্যে মুরগি আনি। এহন তো ব্রয়লারের দামও ২০০ ট্যাহা। তেলাপিয়া মাছ দিয়ে বুঝ দেই।’ চল্লিশোর্ধ্ব সালেহা বেগমের প্রথম সন্তান মেয়ে। ফার্মগেটে একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। বললেন, ‘মাইয়াডা সব সময় রিকশায় যাওয়ার জন্য জেদ ধরে। এতদিন একা রিকশায় যাইত; ভাড়া লাগত ৪০ ট্যাহা। এহন ১০ ট্যাহা দিয়া অটোরিকশায় পাডাই। টানাটানি না করে চললে মাস শেষে কূল পাই না।’ নিম্নবিত্তরা কষ্টের কথা অবলীলায় বলতে পারলেও লোক-লজ্জায় মুখ বুজে থাকতে হয় মধ্যবিত্তের। তেমনি একজন তেজকুনিপাড়ার বাসিন্দা নাইমুর রহমান। চাকরি করেন কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বেতন পান ৪৮ হাজার টাকার কিছু বেশি। তাঁর বাসা থেকে কারওয়ান বাজারের রিকশা ভাড়া ৫০ টাকা। রিকশা না চড়ে এক সপ্তাহ ধরে অফিসে হেঁটে যাচ্ছেন। গত সোমবার সকালে কারওয়ান বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। একথা-ওকথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বললেন, ‘বয়স ৫০ পেরোলো। হেঁটে আসাটা আমার জন্য কষ্টের না। কষ্টটা হয় তখনই, যখন বাসা ভাড়া, বাজার সদাই করার পর হাত খালি হয়ে যায়। ধারদেনা করতে লজ্জা লাগে। মাঝেমধ্যে গ্রাম থেকে চাল-ডাল এনে চলি। ছেলেমেয়েকে ভালো জামাকাপড় কিনে দেওয়া বা ঘুরতে নিয়ে যাওয়া; এসব আমার কাছে বিলাসিতা।’ বিশ্লেষকদের ভাষ্য বাজার নিয়ন্ত্রণে কিছু সময়ের জন্য নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ। তিনি বলেছেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ওএমএস, টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা জরুরি। সরবরাহ ব্যবস্থা যেন বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে কৃষকদের সেচের জন্য নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ, সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেছেন, সরকার এখনই পদক্ষেপ না নিলে সংকট তীব্র হতে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা বড় চাপে পড়বে। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়শন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেছেন, মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন আর টেবিলে বসে আলোচনা করলে বাজারের চিত্র বদলাবে না। তদারকিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি রোধ করে কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা উৎপাদনবিমুখ না হন। একই সঙ্গে পণ্যের আমদানি খরচ ও বিক্রয় মূল্যের ফারাক খতিয়ে দেখতে হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, নিয়মিত বাজার তদারকি চলছে। তবে আমদানি কিংবা করপোরেট পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করার মতো ক্ষমতা অধিদপ্তরের সীমিত। বাজারে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি কিংবা মজুত করা হচ্ছে কিনা, সেসব বিষয়ে অধিদপ্তর হস্তক্ষেপ করতে পারে।
হচ্ছে আরও ছোট। খাবার তালিকা থেকে কেউ বাদ দিচ্ছেন প্রিয় সন্তানের দুধ, কারও কারও পাতে ওঠছে না পুষ্টিকর খাবার। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচকে নাড়া দিয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সব পণ্যের দামে। সম্প্রতি জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের দাম লিটারে বাড়ানো হয়েছে ১৫ টাকা। এতে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়লেও পণ্যবাহী পরিবহনে তা হয়েছে কয়েক গুণ। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জ্বালানির সংকট ও দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে ট্রাক মালিকরা ১৫ হাজার টাকার ভাড়া নিচ্ছেন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যে। বিশ্লেষকরা মনে করেন,
ডিজেলের দর লিটারে বেড়েছে ১৫ টাকা। এখানে ১৫ শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এটি ১৫ রকমের চিন্তার রেখা। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লেই লাফ দেয় পরিবহন ভাড়া। বাজারে অস্থিরতার পেছনে এটিই বড় অনুঘটক। চাল-ডাল-তেল, মাছ-মাংস, সবজি– এমন কোনো নিত্যপণ্য নেই যেটির দাম বাড়ে না। এই বাড়তি খরচের ঝাপটা উচ্চবিত্তকে স্পর্শ না করলেও খরচের সঙ্গে দৌড়াতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন সীমিত আয়ের মানুষ। এ পরিস্থিতিতে বাজারে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের কথা বলেছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্য আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর সমন্বয় করার ব্যাপারেও তাগিদ দিয়েছেন তারা। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি এভাবে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ার কারণে ফুঁসে
উঠছে মূল্যস্ফীতি। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরছে। মূল্যস্ফীতি বাড়া মানে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্য কিনতে ভোক্তাকে অতিরিক্ত ৮-৯ টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এতে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার জেরে বাংলাদেশে নতুন করে ১২ লাখ মানুষ দরিদ্র হতে পারে। অর্থাৎ যারা এতদিন দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থেকে কোনো রকম মাথা গোঁজার স্বপ্ন দেখতেন; জ্বালানি তেলের এই ধাক্কায় তারা নিস্তেজ হয়ে যাবেন। বৈশ্বিক সংস্থাগুলোও সতর্ক করছে। গত শুক্রবার খাদ্য সংকট মোকাবিলা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত
বছর দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ মাত্র ১০টি দেশের। সে তালিকায় বাংলাদেশও আছে। চলতি বছরেও এসব দেশে খাদ্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। দর বাড়ল কেমন গত সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও, সেগুনবাগিচা, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাল-ডাল, ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিমসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দর বেড়েছে। গতকাল বুধবার দাম বাড়ানোর ঘোষণার আগে থেকেই খোলা ভোজ্যতেল লিটারে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ২০ টাকা। মাঠ থেকে বোরো ধান উঠছে; এখন চালের দাম কম থাকার কথা। তবে বাজারের চিত্র ভিন্ন। এক সপ্তাহে মাঝারি চাল (বিআর-২৮ ও পাইজাম) কেজিতে তিন টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০
এবং মোটা চাল (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজিতে দুই টাকা বেড়ে ৫২ থেকে ৫৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে সরু চাল (মিনিকেট) বিক্রি হচ্ছে ৭৩ থেকে ৮০ টাকা দরে। একইভাবে খোলা ময়দা কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৬২ টাকা। ডিমের ডজন ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, যা রমজানে ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। সোনালি মুরগির দরও চড়া। কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকায়। কাঁচাবাজারেও স্বস্তি কম। বেশির ভাগ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকার ঘরে। এর মধ্যে চিচিঙ্গা, করলা, শসার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। দাম বাড়ার প্রমাণ মেলে সরকারি সংস্থা
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, এক মাসের ব্যবধানে মোটা ও মাঝারি চালের দর গড়ে ৭ ও আটার ৪ শতাংশ দর বেড়েছে। চিনি ও মসুর ডালের দর বেড়েছে ২ শতাংশ। গুঁড়ো দুধের দাম গড়ে বেড়েছে ৬ শতাংশ। ৬০০ টাকা বাড়ল এলপিজি সিলিন্ডারে বাড়তি দরে বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে রান্নাঘরে গেলে আরেক রকম দুশ্চিন্তা। মার্চে যে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা; এপ্রিলের শুরুতে তা বেড়ে হয় এক হাজার ৭২৮ টাকায়। সব শেষ গত সপ্তাহে আরও বেড়ে হয় এক হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে একটি পরিবারের রান্নার খরচ বেড়েছে ৬০০ টাকা। অস্বস্তির ভিড়ে কিছু স্বস্তির পণ্য রমজানে দামের রেকর্ড দেখিয়েছিল লেবু। মাঝারি আকারের একটা লেবু কিনতে খরচ করতে হয়েছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। সেই হিসাবে এক হালির দাম পড়েছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। গতকাল সেই লেবুর ডজনই বিক্রি হতে দেখা গেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কাঁচামরিচের দামও বেশ কম। বাজারভেদে প্রতি কেজি কেনা যাচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ টাকায়। রমজানের সময় বেগুনের কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হলেও মানভেদে এখন কেনা যাচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। আলু-পেঁয়াজের দামও কম। পণ্য দুটির কেজি বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ২০ থেকে ২৫ এবং ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে। ‘গোস্ত খাওয়াইতে পারি না, তেলাপিয়া মাছ দিয়ে বুঝ দেই’ তেজগাঁওয়ের শাহীনবাগের গৃহিণী সালেহা বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। নিজে সকাল-বিকেল দুটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। দুজনের মাসে আয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এসব তথ্য দিয়ে তিনি বলছেন, ‘ছোড পোলাডা গরুর গোস্ত খাইতে পছন্দ করে। ক্যামনে কিনমু? কেজি ৮০০ ট্যাহা। মাঝেমধ্যে মুরগি আনি। এহন তো ব্রয়লারের দামও ২০০ ট্যাহা। তেলাপিয়া মাছ দিয়ে বুঝ দেই।’ চল্লিশোর্ধ্ব সালেহা বেগমের প্রথম সন্তান মেয়ে। ফার্মগেটে একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। বললেন, ‘মাইয়াডা সব সময় রিকশায় যাওয়ার জন্য জেদ ধরে। এতদিন একা রিকশায় যাইত; ভাড়া লাগত ৪০ ট্যাহা। এহন ১০ ট্যাহা দিয়া অটোরিকশায় পাডাই। টানাটানি না করে চললে মাস শেষে কূল পাই না।’ নিম্নবিত্তরা কষ্টের কথা অবলীলায় বলতে পারলেও লোক-লজ্জায় মুখ বুজে থাকতে হয় মধ্যবিত্তের। তেমনি একজন তেজকুনিপাড়ার বাসিন্দা নাইমুর রহমান। চাকরি করেন কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বেতন পান ৪৮ হাজার টাকার কিছু বেশি। তাঁর বাসা থেকে কারওয়ান বাজারের রিকশা ভাড়া ৫০ টাকা। রিকশা না চড়ে এক সপ্তাহ ধরে অফিসে হেঁটে যাচ্ছেন। গত সোমবার সকালে কারওয়ান বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। একথা-ওকথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বললেন, ‘বয়স ৫০ পেরোলো। হেঁটে আসাটা আমার জন্য কষ্টের না। কষ্টটা হয় তখনই, যখন বাসা ভাড়া, বাজার সদাই করার পর হাত খালি হয়ে যায়। ধারদেনা করতে লজ্জা লাগে। মাঝেমধ্যে গ্রাম থেকে চাল-ডাল এনে চলি। ছেলেমেয়েকে ভালো জামাকাপড় কিনে দেওয়া বা ঘুরতে নিয়ে যাওয়া; এসব আমার কাছে বিলাসিতা।’ বিশ্লেষকদের ভাষ্য বাজার নিয়ন্ত্রণে কিছু সময়ের জন্য নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ। তিনি বলেছেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ওএমএস, টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা জরুরি। সরবরাহ ব্যবস্থা যেন বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে কৃষকদের সেচের জন্য নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ, সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেছেন, সরকার এখনই পদক্ষেপ না নিলে সংকট তীব্র হতে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা বড় চাপে পড়বে। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়শন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেছেন, মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন আর টেবিলে বসে আলোচনা করলে বাজারের চিত্র বদলাবে না। তদারকিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি রোধ করে কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা উৎপাদনবিমুখ না হন। একই সঙ্গে পণ্যের আমদানি খরচ ও বিক্রয় মূল্যের ফারাক খতিয়ে দেখতে হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, নিয়মিত বাজার তদারকি চলছে। তবে আমদানি কিংবা করপোরেট পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করার মতো ক্ষমতা অধিদপ্তরের সীমিত। বাজারে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি কিংবা মজুত করা হচ্ছে কিনা, সেসব বিষয়ে অধিদপ্তর হস্তক্ষেপ করতে পারে।



