ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
‘পুর্ব শত্রুতার জেরে’ পুলিশের এসবি কর্মকর্তার ওপর হামলা, পিঠে ৪৩টি সেলাই
পদত্যাগপত্র জমা দিলেন রাষ্ট্রপতি, অন্তর্বর্তী দায়িত্বে থাকছেন স্পিকার
পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
পদত্যাগপত্রে যা লিখলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি সরকার: ভারতের পদাঙ্ক অনুসরণে উত্তরণের চিন্তা
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন: সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি দেশে ফিরছেন স্পিকার
আওয়ামী লীগের ‘১.৫ ট্রিলিয়ন অর্থনীতি’র লক্ষ্যমাত্রা বিএনপি আমলে নামল ১ ট্রিলিয়নে, সময়ও বাড়ল ১০ বছর
মেট্রো স্টেশন থেকে উদ্ধার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাইপবোমার ছাতা খুললেই ঘটাত বিস্ফোরণ
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের সড়কে একটি পাইপবোমা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খবর পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বস্তুটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে।
একটি ছাতার ভেতরে সুকৌশলে বোমাটি পাতা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ছাতার ভেতরে পাতা বোমা আর দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এমন ভয়াবহ ঘটনার প্রেক্ষিতে মেট্রোরেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় সময়মতো বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা।
আজ ২৪শে জুলাই, শুক্রবার রাতে শাপলা চত্বরের কাছে মেট্রো স্টেশনের নিচের অংশে পথচারীরা সন্দেহজনক ছাতাটি দেখতে পান। প্রথমে স্থানীয়ভাবে খবর ছড়ায় যে দুষ্কৃতকারীরা সড়ক লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা
নিক্ষেপ করেছে। তবে পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্পষ্ট করেন যে এটি সাধারণ কোনো পেট্রোল বোমা ছিল না। পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া বস্তুটি মূলত ছাতার ভেতরে কৌশলে সেট করা একটি পাইপবোমা। কেউ ছাতাটি খোলার চেষ্টা করলেই সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটার মতো ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়ে এটি সেখানে রাখা হয়েছিল। ডিএমপির বিশেষায়িত দল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাইপবোমাটি নিষ্ক্রিয় করায় সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার পেছনের অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত জোরদার করেছে। বাংলাদেশে পাইপবোমার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে মুফতি হারুন ইজহার ও তার বাবার নাম সারাদেশে আইএস জঙ্গিদের আদলে উগ্রবাদী পতাকা টাঙানোর ঘটনায় নেপথ্যের
কুশীলবের নাম জানা গেছে ইতিমধ্যে। রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে কাজ করা ভয়ঙ্কর জঙ্গি এবং ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার। আসুন তার ইতিহাস ও অতীত সম্পর্কে জানা যাক। সময়কাল ৭ই অক্টোবর, ২০১৩। গণজাগরণ মঞ্চ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, হেফাজতের শাপলা চত্বর তাণ্ডব মিলে উত্তাল দেশ। এসময় চট্টগ্রামের লালখান বাজারস্থ জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ অন্তত ৮-৯ আহত হন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। শুরুতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কম্পিউটারের ‘ইউপিএস’ বিস্ফোরণের হাস্যকর দাবি তুলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে গোয়েন্দা সংস্থা এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা সেখানে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস তথা আইইডি বা
হাতে তৈরি বোমা উৎপাদনের হদিস পান। উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু অবিস্ফোরিত ‘পাইপবোমা’ এবং বোমা তৈরির যন্ত্রাংশ। এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে পরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হারকাতুল জিহাদের চার জঙ্গিকে ঢাকায় আটক করেছিল। তাদের মধ্যে ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার এক পলাতক আসামী ছিলেন। অস্ত্র এবং বিস্ফোরকসহ দু’জনকে ঢাকার উত্তরা থেকে এবং অন্য দু’জনকে ধরা হয় আশুলিয়া থেকে। সেসময় আটক ৪ জনের কাছ থেকে এসএমজির ১,১০০ রাউন্ড গুলি, পিস্তলের ৩২টি গুলি এবং এক কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। হেফাজতে ইসলামের নিয়ন্ত্রণাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকৃত বোমাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘হাতে তৈরি গ্রেনেড’ উল্লেখ করেছিল পুলিশ। তখন এ
ঘটনাকে মাদ্রাসা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্র দাবি করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে। তবে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরে ‘পাইপবোমা’ শনাক্ত করেন। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসেও একই ধরনের ১১টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকা থেকে। তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বাধিক নাশকতা চালানোর অভিযোগ আছে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার বিরুদ্ধে। সেসময়কার গোয়েন্দা তথ্য থেকে আরও উঠে আসে, লস্করের সাথে জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার পরিচালক- হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুফতি ইজহারুল ইসলাম এবং তার ছেলে মুফতি হারুন ইজহারের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
২০১১ সালে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হারুন নিজে এই তথ্য দেন পুলিশকে। এর আগে ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তার বাবা মুফতি ইজহারুল ইসলাম- যিনি উপমহাদেশের একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা হিসেবে কুখ্যাত। হারুন ইজহার (ডানে), বিএনপির প্রতিমন্ত্রী টুকুর সাথে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার মধ্যে আইইডি তৈরির কারিগর হিসেবে যার নাম বেশি প্রচারিত তিনি হলেন ভারতের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আবদুল করিম ওরফে টুণ্ডা। লস্কর ও উগ্র জঙ্গিবাদের সমর্থক এই সন্ত্রাসী টুন্ডা ২০১৩ সালের আগস্টে নেপালে গ্রেপ্তার হন। টুণ্ডা গোপনে ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশে এসেছিলে এবং জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন- এমন তথ্যও পেয়েছিল
সেসময় দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সেসময় দায়িত্বরত গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বোমা বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, লালখান বাজারের মাদ্রাসাটির ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমাগুলো পাইপবোমা প্রযুক্তির। যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এসব বোমা বিমানবন্দরের স্ক্যানার এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কুকুরও শনাক্ত করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদককে জানান, এই বোমার উপকরণের সঙ্গে কফি মিশিয়ে রঙ এবং ঘ্রাণ পরিবর্তন করে জঙ্গিরা একে শনাক্তের অযোগ্য করে তোলে। মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে অসংখ্যবার এমন বোমা হামলার শিকার হয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এসব বোমা তাদের বেশ ভুগিয়েছে। পরে আফগানিস্তানে এ ধরনের বোমা নিষ্ক্রিয় করতে ‘ওয়াটার ব্লেড স্টিংরে’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমেরিকানরা। সেসময় দায়িত্বরত দেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাইপবোমা স্ক্যানারে ধরা পড়ে না। প্রশিক্ষিত কুকুরও গন্ধে বিভ্রান্ত হয় বলে তারাও ব্যর্থ হয়। দেশের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার দোকানে এই বোমা তৈরির মূল সরঞ্জাম পাইপ ও সকেট (স্যানিটারি কাজে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম) পাওয়া যায়। অন্য উপকরণ যেমন- ইউরিয়া, নাইট্রিক এসিড, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, নাইট্রোবেঞ্জিন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড এবং চিনির মতো সহজলভ্য জিনিস দিয়ে এই শক্তিশালী বোমা তৈরি করা সম্ভব। স্ক্যানার ও প্রশিক্ষিত কুকুর এই বোমার অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থ হলে তা হবে ভয়ঙ্কর। ২০১৩ সালের সেই বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) তাদের প্রতিবেদনে লেখে: ‘বিস্ফোরণের পর মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে ৪টি অবিস্ফোরিত হ্যান্ড গ্রেনেডসদৃশ বোমা, ২৫০টি জিআই পাইপের টুকরো, ১০০টি মার্বেল, একটি তার প্যাঁচানো মোবাইল সেট, ২০০ গ্রাম জিআই তার, প্যাঁচানো স্প্রিং এবং দুটি স্লাইডরেঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে।’ পুলিশ প্রথমে উদ্ধারকৃত বোমাকে পুরনো ভার্সনের হাতে তৈরি গ্রেনেডসদৃশ বললেও হাতে তৈরি গ্রেনেডের সঙ্গে জিআই তার ও মোবাইল ফোন সংযুক্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত পাইপবোমা হিসেবে শনাক্ত করতে সমর্থ হন। তৎকালীন সিএমপির গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য সন্তোষ চাকমা ২০১১ সালে হাটহাজারী থেকে উদ্ধারকৃত বোমার সঙ্গে মুফতি হারুন ইজহারের মালিকানাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমার মিল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। বোমা বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইইডি তৈরি করছে। মোটা লোহার পাইপের ভেতর বিস্ফোরক রেখে এই বোমা তৈরি হয়। বিস্ফোরণ ঘটাতে বোমার বাইরে রাখা হয় গ্রেনেডের মতো পিনের বিশেষ আংটা। এ ধরনের বোমাকে প্রেসার রিলিজ বোমাও বলা হয়। এই বোমার বাইরে থাকা বিশেষ আংটা ছুড়ে মারার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বাইরে শক্ত লোহার আবরণ থাকায় এর ধ্বংস ক্ষমতা বাড়ে। আর বোমার ভেতরে বিস্ফোরক ও ধারালো বস্তু থাকায় সেসব স্প্লিন্টার ছুটে গিয়ে মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক বোমা বিশেষজ্ঞ বলেন, এ ধরনের বোমায় ইনিশিয়েটরের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় ব্যাটারি। আবার ব্যাটারির পরিবর্তে সরাসরি মোবাইল ফোনও ব্যবহৃত হয়। বিস্ফোরককে অ্যাক্টিভেট করতে ব্যাটারি বা মোবাইল ফোন যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জঙ্গিরা হাতবোমা তৈরির জন্য এ রকম প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বাংলাদেশে জেএমবির কুখ্যাত জঙ্গি জাহেদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান প্রথম এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি করেছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য আছে। এরপর মাসুম নামের আরেক জেএমবি জঙ্গি বোমা তৈরিতে হাত পাকায়। হেফাজত নিয়ন্ত্রিত লালখান বাজারস্থ মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত নূরুন্নবীও তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। আবদুল করিম টুণ্ডার প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এই আইইডি প্রযুক্তির বোমা তৈরির ক্ষেত্রে ভারতে নব্বইয়ের দশকে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল করিম। বোমা বানাতে গিয়ে বাঁ-হাতের খানিকটা উড়ে গেলে তিনি নামের পাশে টুণ্ডা বিশেষণ যোগ করেন। দিল্লি পুলিশের বরাতে জানা যায়, দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন টুণ্ডা। ৪৩টি বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত টুণ্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আশির দশকে তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কাছে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। এই টুণ্ডা বাংলাদেশে এসেও জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। আর এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় গ্রেপ্তারের পর আটক মুফতি হারুনের দেওয়া তথ্যে। ২০১১ সালের ৫ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেন, লস্করের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। ২০১৩ সালের বিস্ফোরণের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দুই আর দুই-এ চার মেলান। লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে তাদের শেখানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের সেই হেফাজতি মাদ্রাসায় বোমা তৈরি করা হচ্ছিল। বিশ্ব গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশ ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের হাব হয়ে উঠেছে লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকায় ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইজহারপুত্র মুফতি হারুনকে গ্রেপ্তার হন। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি হারুনের বিরুদ্ধে খোদ হেফাজতে্ ইসলামের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার পিতা মুফতি ইজহারও পরে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তিনিও দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দারা তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে এলে তিনি দুই আঙুল তুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, আমি মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা। লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরপরই পালিয়ে যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী। ২ বছর পলাতক থাকার পর পুনরায় লালখান বাজার মাদ্রাসায় ফেরেন। গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা তিন মামলায় মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। বিস্ফোরক, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ও একটি হত্যাসহ তিনটি মামলায় জামিন না নেয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয় মুফতি ইজহারের বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুফতি ইজাহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন লালখান বাজারে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় গড়ে উঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গিদের ঘাঁটি। যেখান থেকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার ছক তৈরি হয়েছিল। এ হামলা পরকিল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর ই-তৈয়বা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইজহারুল ইসলামের ছেলে হারুন ইজহার। ফের সেখান থেকেই বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ছক কষা হয়েছিল বলে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানান। ২০০৯ সালের শেষ দিকে খবর পাওয়া যায়, যে কোনো সময় ঢাকাস্থ দুটি দূতাবাসে জঙ্গি হামলা হতে পারে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ও একটি টেলিফোন কলের সূত্র ধরে জানা গেছে, হামলার ছক মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায় বসেই করা হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত আন্তঃদেশীয় কয়েকজন জঙ্গি মুফতি ইজহারুলের মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন। এ তথ্য পেয়েই গোয়েন্দা পুলিশ ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালায়, গ্রেপ্তার করা হয় ইজহারপুত্র হারুন ইজহার এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সালাম, সুজন ও আল আমিন ওরফে মইফুলকে। সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ওই অভিযানকালে গোয়েন্দা পুলিশ হারুন ইজহারের কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ জব্দ করে। ওই ল্যাপটপে মার্কিন ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। পুলিশের অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে পালিয়ে যান লস্কর-ই-তৈয়বার অন্যতম শীর্ষনেতা টি নাসির ও সরফরাজ। ওই বছরের ৬ই নভেম্বর কুমিরা সীমান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দুই ভারতীয় জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। তারা ভারতের বেঙ্গালুরু কম্পিউটার সিটিতে বোমা হামলাসহ বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত। তারা ছিলেন ভারতে মোস্ট ওয়ান্টেড। গ্রেপ্তার এড়াতে দুই জঙ্গি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায়। এর আগে রাউজান রাবার বাগান গোদারপাড় এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় হুজির প্রশিক্ষণকালে অভিযান চালিয়ে জিহাদি বই ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে র্যাব। এ ঘটনায় বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনকে আসামি করা হয়। ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগের র্যাব-৭ এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বর্দ্দা (৪৬) এবং তার দুই সহযোগী মো. বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদকে (৫০) গ্রেপ্তার করে র্যাব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াহিয়া জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজির আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় সাংগঠনিক অফিস খোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে আটক হওয়া কয়েকজন জঙ্গি জানায়- তারা মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসাতেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
নিক্ষেপ করেছে। তবে পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্পষ্ট করেন যে এটি সাধারণ কোনো পেট্রোল বোমা ছিল না। পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া বস্তুটি মূলত ছাতার ভেতরে কৌশলে সেট করা একটি পাইপবোমা। কেউ ছাতাটি খোলার চেষ্টা করলেই সরাসরি বিস্ফোরণ ঘটার মতো ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়ে এটি সেখানে রাখা হয়েছিল। ডিএমপির বিশেষায়িত দল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাইপবোমাটি নিষ্ক্রিয় করায় সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার পেছনের অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত জোরদার করেছে। বাংলাদেশে পাইপবোমার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে মুফতি হারুন ইজহার ও তার বাবার নাম সারাদেশে আইএস জঙ্গিদের আদলে উগ্রবাদী পতাকা টাঙানোর ঘটনায় নেপথ্যের
কুশীলবের নাম জানা গেছে ইতিমধ্যে। রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে কাজ করা ভয়ঙ্কর জঙ্গি এবং ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার। আসুন তার ইতিহাস ও অতীত সম্পর্কে জানা যাক। সময়কাল ৭ই অক্টোবর, ২০১৩। গণজাগরণ মঞ্চ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, হেফাজতের শাপলা চত্বর তাণ্ডব মিলে উত্তাল দেশ। এসময় চট্টগ্রামের লালখান বাজারস্থ জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ অন্তত ৮-৯ আহত হন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। শুরুতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কম্পিউটারের ‘ইউপিএস’ বিস্ফোরণের হাস্যকর দাবি তুলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে গোয়েন্দা সংস্থা এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা সেখানে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস তথা আইইডি বা
হাতে তৈরি বোমা উৎপাদনের হদিস পান। উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু অবিস্ফোরিত ‘পাইপবোমা’ এবং বোমা তৈরির যন্ত্রাংশ। এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে পরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হারকাতুল জিহাদের চার জঙ্গিকে ঢাকায় আটক করেছিল। তাদের মধ্যে ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার এক পলাতক আসামী ছিলেন। অস্ত্র এবং বিস্ফোরকসহ দু’জনকে ঢাকার উত্তরা থেকে এবং অন্য দু’জনকে ধরা হয় আশুলিয়া থেকে। সেসময় আটক ৪ জনের কাছ থেকে এসএমজির ১,১০০ রাউন্ড গুলি, পিস্তলের ৩২টি গুলি এবং এক কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। হেফাজতে ইসলামের নিয়ন্ত্রণাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকৃত বোমাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘হাতে তৈরি গ্রেনেড’ উল্লেখ করেছিল পুলিশ। তখন এ
ঘটনাকে মাদ্রাসা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্র দাবি করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে। তবে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরে ‘পাইপবোমা’ শনাক্ত করেন। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসেও একই ধরনের ১১টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকা থেকে। তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বাধিক নাশকতা চালানোর অভিযোগ আছে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার বিরুদ্ধে। সেসময়কার গোয়েন্দা তথ্য থেকে আরও উঠে আসে, লস্করের সাথে জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার পরিচালক- হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুফতি ইজহারুল ইসলাম এবং তার ছেলে মুফতি হারুন ইজহারের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।
২০১১ সালে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হারুন নিজে এই তথ্য দেন পুলিশকে। এর আগে ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তার বাবা মুফতি ইজহারুল ইসলাম- যিনি উপমহাদেশের একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা হিসেবে কুখ্যাত। হারুন ইজহার (ডানে), বিএনপির প্রতিমন্ত্রী টুকুর সাথে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার মধ্যে আইইডি তৈরির কারিগর হিসেবে যার নাম বেশি প্রচারিত তিনি হলেন ভারতের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আবদুল করিম ওরফে টুণ্ডা। লস্কর ও উগ্র জঙ্গিবাদের সমর্থক এই সন্ত্রাসী টুন্ডা ২০১৩ সালের আগস্টে নেপালে গ্রেপ্তার হন। টুণ্ডা গোপনে ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশে এসেছিলে এবং জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন- এমন তথ্যও পেয়েছিল
সেসময় দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সেসময় দায়িত্বরত গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বোমা বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, লালখান বাজারের মাদ্রাসাটির ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমাগুলো পাইপবোমা প্রযুক্তির। যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এসব বোমা বিমানবন্দরের স্ক্যানার এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কুকুরও শনাক্ত করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদককে জানান, এই বোমার উপকরণের সঙ্গে কফি মিশিয়ে রঙ এবং ঘ্রাণ পরিবর্তন করে জঙ্গিরা একে শনাক্তের অযোগ্য করে তোলে। মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে অসংখ্যবার এমন বোমা হামলার শিকার হয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এসব বোমা তাদের বেশ ভুগিয়েছে। পরে আফগানিস্তানে এ ধরনের বোমা নিষ্ক্রিয় করতে ‘ওয়াটার ব্লেড স্টিংরে’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমেরিকানরা। সেসময় দায়িত্বরত দেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাইপবোমা স্ক্যানারে ধরা পড়ে না। প্রশিক্ষিত কুকুরও গন্ধে বিভ্রান্ত হয় বলে তারাও ব্যর্থ হয়। দেশের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার দোকানে এই বোমা তৈরির মূল সরঞ্জাম পাইপ ও সকেট (স্যানিটারি কাজে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম) পাওয়া যায়। অন্য উপকরণ যেমন- ইউরিয়া, নাইট্রিক এসিড, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, নাইট্রোবেঞ্জিন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড এবং চিনির মতো সহজলভ্য জিনিস দিয়ে এই শক্তিশালী বোমা তৈরি করা সম্ভব। স্ক্যানার ও প্রশিক্ষিত কুকুর এই বোমার অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থ হলে তা হবে ভয়ঙ্কর। ২০১৩ সালের সেই বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) তাদের প্রতিবেদনে লেখে: ‘বিস্ফোরণের পর মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে ৪টি অবিস্ফোরিত হ্যান্ড গ্রেনেডসদৃশ বোমা, ২৫০টি জিআই পাইপের টুকরো, ১০০টি মার্বেল, একটি তার প্যাঁচানো মোবাইল সেট, ২০০ গ্রাম জিআই তার, প্যাঁচানো স্প্রিং এবং দুটি স্লাইডরেঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে।’ পুলিশ প্রথমে উদ্ধারকৃত বোমাকে পুরনো ভার্সনের হাতে তৈরি গ্রেনেডসদৃশ বললেও হাতে তৈরি গ্রেনেডের সঙ্গে জিআই তার ও মোবাইল ফোন সংযুক্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত পাইপবোমা হিসেবে শনাক্ত করতে সমর্থ হন। তৎকালীন সিএমপির গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য সন্তোষ চাকমা ২০১১ সালে হাটহাজারী থেকে উদ্ধারকৃত বোমার সঙ্গে মুফতি হারুন ইজহারের মালিকানাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমার মিল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। বোমা বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইইডি তৈরি করছে। মোটা লোহার পাইপের ভেতর বিস্ফোরক রেখে এই বোমা তৈরি হয়। বিস্ফোরণ ঘটাতে বোমার বাইরে রাখা হয় গ্রেনেডের মতো পিনের বিশেষ আংটা। এ ধরনের বোমাকে প্রেসার রিলিজ বোমাও বলা হয়। এই বোমার বাইরে থাকা বিশেষ আংটা ছুড়ে মারার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বাইরে শক্ত লোহার আবরণ থাকায় এর ধ্বংস ক্ষমতা বাড়ে। আর বোমার ভেতরে বিস্ফোরক ও ধারালো বস্তু থাকায় সেসব স্প্লিন্টার ছুটে গিয়ে মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক বোমা বিশেষজ্ঞ বলেন, এ ধরনের বোমায় ইনিশিয়েটরের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় ব্যাটারি। আবার ব্যাটারির পরিবর্তে সরাসরি মোবাইল ফোনও ব্যবহৃত হয়। বিস্ফোরককে অ্যাক্টিভেট করতে ব্যাটারি বা মোবাইল ফোন যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জঙ্গিরা হাতবোমা তৈরির জন্য এ রকম প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বাংলাদেশে জেএমবির কুখ্যাত জঙ্গি জাহেদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান প্রথম এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি করেছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য আছে। এরপর মাসুম নামের আরেক জেএমবি জঙ্গি বোমা তৈরিতে হাত পাকায়। হেফাজত নিয়ন্ত্রিত লালখান বাজারস্থ মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত নূরুন্নবীও তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। আবদুল করিম টুণ্ডার প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এই আইইডি প্রযুক্তির বোমা তৈরির ক্ষেত্রে ভারতে নব্বইয়ের দশকে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল করিম। বোমা বানাতে গিয়ে বাঁ-হাতের খানিকটা উড়ে গেলে তিনি নামের পাশে টুণ্ডা বিশেষণ যোগ করেন। দিল্লি পুলিশের বরাতে জানা যায়, দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন টুণ্ডা। ৪৩টি বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত টুণ্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আশির দশকে তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কাছে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। এই টুণ্ডা বাংলাদেশে এসেও জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। আর এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় গ্রেপ্তারের পর আটক মুফতি হারুনের দেওয়া তথ্যে। ২০১১ সালের ৫ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেন, লস্করের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। ২০১৩ সালের বিস্ফোরণের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দুই আর দুই-এ চার মেলান। লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে তাদের শেখানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের সেই হেফাজতি মাদ্রাসায় বোমা তৈরি করা হচ্ছিল। বিশ্ব গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশ ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের হাব হয়ে উঠেছে লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকায় ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইজহারপুত্র মুফতি হারুনকে গ্রেপ্তার হন। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি হারুনের বিরুদ্ধে খোদ হেফাজতে্ ইসলামের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার পিতা মুফতি ইজহারও পরে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তিনিও দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দারা তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে এলে তিনি দুই আঙুল তুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, আমি মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা। লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরপরই পালিয়ে যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী। ২ বছর পলাতক থাকার পর পুনরায় লালখান বাজার মাদ্রাসায় ফেরেন। গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা তিন মামলায় মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। বিস্ফোরক, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ও একটি হত্যাসহ তিনটি মামলায় জামিন না নেয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয় মুফতি ইজহারের বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুফতি ইজাহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন লালখান বাজারে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় গড়ে উঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গিদের ঘাঁটি। যেখান থেকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার ছক তৈরি হয়েছিল। এ হামলা পরকিল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর ই-তৈয়বা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইজহারুল ইসলামের ছেলে হারুন ইজহার। ফের সেখান থেকেই বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ছক কষা হয়েছিল বলে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানান। ২০০৯ সালের শেষ দিকে খবর পাওয়া যায়, যে কোনো সময় ঢাকাস্থ দুটি দূতাবাসে জঙ্গি হামলা হতে পারে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ও একটি টেলিফোন কলের সূত্র ধরে জানা গেছে, হামলার ছক মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায় বসেই করা হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত আন্তঃদেশীয় কয়েকজন জঙ্গি মুফতি ইজহারুলের মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন। এ তথ্য পেয়েই গোয়েন্দা পুলিশ ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালায়, গ্রেপ্তার করা হয় ইজহারপুত্র হারুন ইজহার এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সালাম, সুজন ও আল আমিন ওরফে মইফুলকে। সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ওই অভিযানকালে গোয়েন্দা পুলিশ হারুন ইজহারের কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ জব্দ করে। ওই ল্যাপটপে মার্কিন ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। পুলিশের অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে পালিয়ে যান লস্কর-ই-তৈয়বার অন্যতম শীর্ষনেতা টি নাসির ও সরফরাজ। ওই বছরের ৬ই নভেম্বর কুমিরা সীমান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দুই ভারতীয় জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। তারা ভারতের বেঙ্গালুরু কম্পিউটার সিটিতে বোমা হামলাসহ বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত। তারা ছিলেন ভারতে মোস্ট ওয়ান্টেড। গ্রেপ্তার এড়াতে দুই জঙ্গি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায়। এর আগে রাউজান রাবার বাগান গোদারপাড় এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় হুজির প্রশিক্ষণকালে অভিযান চালিয়ে জিহাদি বই ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে র্যাব। এ ঘটনায় বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনকে আসামি করা হয়। ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগের র্যাব-৭ এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বর্দ্দা (৪৬) এবং তার দুই সহযোগী মো. বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদকে (৫০) গ্রেপ্তার করে র্যাব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াহিয়া জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজির আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় সাংগঠনিক অফিস খোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে আটক হওয়া কয়েকজন জঙ্গি জানায়- তারা মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসাতেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।



