সৈয়দ ইফতেখার হোসেন
আরও খবর
স্কুলে এসে শিশুরা যেন পাঠ্যপুস্তকে বৈষম্য না দেখে—এই অবদান শেখ হাসিনার একান্ত
শেখ মুজিব-বাঙালির একমাত্র মাহানায়ক
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন: ভুল কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ
শেখ হাসিনার ‘চক্ষু রাঙানি উপেক্ষা’ বনাম বর্তমানের ‘অনুমতি ভিক্ষা’: কোন পথে বাংলাদেশ?
এন্টিবায়োটিক ঔষধকে বাঁচান
দ্যা প্রজেক্ট ওসমান হাদি (হাদিমাদি) ও এর ভবিষ্যত
‘ইরানে হামলা প্রমাণ করে চীন ও ভারত এখনো মার্কিন প্রশাসনের আক্রমনের লক্ষ্যবস্তু’
২৬ মার্চ-বাংলাদেশের জন্মদিন
‘প্রাদেশিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান অঞ্চলটিকে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করার পর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং স্বয়ং মুজিবকে একজন দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, তার অপরাধের জন্য তাকে “উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে’ । ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ সন্ধ্যায় ইসলামাবাদ থেকে রেডিও ও টিভিতে সম্প্রচারে ইয়াহিয়া খান দেশবাসীর উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে এই কথা বলেন। তখন তার গলায় ছিল কয়েক পেগ স্কচ হুইস্কি। (দ্য টাইমস, ২৭শে মার্চ, ১৯৭১) । ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ লন্ডনের ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ সাইমন ড্রিং লিখেছিলেন, “শেখ মুজিবুর রহমানের ২৫ দিন
ব্যাপী স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন বিপুল শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে তখন থেকে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বন্দুকের মুখে আটক থাকা সমস্ত বিদেশী সাংবাদিকদের করাচিতে স্থানান্তারিত করা হয়।” ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কয়েক ডজন বিদেশী সাংবাদিকের ভিড় জমে গিয়েছিল। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এক বছর আগে ঘোষিত সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের অধীনে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তার সংবাদ সংগ্রহ করতে এই বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকায় অবস্থান । এই ঘূর্ণিঝড়ে কতজন মারা গিয়েছিল তা অনুমান করতে
পারা কঠিন, তবে স্বাধীন হিসাব মতে এই সংখ্যাটি প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এই সংখ্যাটি দশ লক্ষ বলে দাবি করেছিলেন। ঘূর্ণিঝড়ে-বিধ্বস্ত এলাকাগুলো ছাড়া নির্দিষ্ট দিনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দিয়ে তিনি জল্পনাকারীদের অন্য কিছু চিন্তা করার কোনো সুযোগই দেননি। এই সময়ের মধ্যে মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে, যা বর্তমান বাংলাদেশ, এক কিংবদন্তি নেতায় পরিণত হয়ে পরেন যা বর্তমান প্রজন্ম চিন্ত্ওা করতে পারবেনা । এই সময় বঙ্গবন্ধু যা বলতেন, জনগণ ও সরকার তা শুনতো এবং বহির্বিশ্ব তা অবাক হয়ে দেখতো । এক কথায় দেশের পুরো বেসমারিক প্রশাসন তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল । ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ দুর্গতদের প্রতি
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা এতটাই প্রকট ছিল যে তা কারো পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। জেনারেল ইয়াহিয়া খান এই সময় ঢাকা হয়ে বেইজিং গিয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলো পরিদর্শন করার প্রয়োজনীয় মনে করেননি। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ রেখেছিলেন এবং পরের বছর ৭ জুন তিনি ঘোষণা করেন যে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে তাঁর পূর্বে ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির ওপর একটি গণভোট হিসেবে দেখা হবে। ১৯৬৬ সালে মুজিব কর্তৃক ঘোষিত ছয় দফা দাবি যা পাঞ্জাবে বসে থাকা কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা প্রদেশগুলোর শোষণের চিরতরে অবসান ঘটাবে বলে মনে করা হতো। মুজিব, যিনি ততদিনে বঙ্গবন্ধু নামে
পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, তিনি ইতিহাসের আগে আগে চলছিলেন। বস্তুত, তিনি এই সময় শুধু একটি নূতন ইতিহাসের জন্মই দিচ্ছিলেন না তিনি নিজে ইতিহাসের অংশ হয়ে পরছিলেন । ১৯৭০ সালের ৩০শে মার্চ ইয়াহিয়া খান এক তরফা ভাবে একটি আইনি কাঠামো আদেশ (এলএফও) জারি করেন, যাতে বলা হয় নবগঠিত পরিষদ হবে একটি গণপরিষদ আর তাকে ১২০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রনয়ন সম্পন্ন করতে হবে। তিনি বলেন এই সংবিধানে পাকিস্তানের আদর্শকে ধারণ করতে হবে, যার অর্থ ছিল পাকিস্তানের ধর্মতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা এবং জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমুন্নত রাখা। এলএফও-তে এও জোর দেওয়া হয় যে, নির্বাচনের সময় অর্থনৈতিক বৈষম্যকে রাজনৈতিক শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা
যাবে না এবং ইয়াহিয়া নতুন সংবিধান অনুমোদন না দিলে সংসদ স্বয়ংক্রিয় ভাবে ভেঙে যাবে। মুজিব ঘোষণা করেন যে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার হবে তাঁর পূর্ব ঘেষিত ছয় দফা ভিত্তিক । আর তাঁর দল আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হলে পাকিস্তানের সংবিধান হবে ছয় দফা ভিত্তিক । তখন অনেকেই এমন একটি কঠোর নিয়মের নির্বাচনে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং শেখ মুজিবকে নির্বাচন বর্জন করতে বলেন। কেউ কেউ শ্লোগান তোলেন ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো । কিন্তু ততদিনে মুজিব নিজেকে একজন রাজনৈতিক নেতা থেকে রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরিত করেছিলেন। এক অর্থে, মুজিবই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম ও শেষ রাষ্ট্রনায়ক
যিনি দেশ ও জনগণের ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন। ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চের রাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে মুজিব আদৌ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে কিছু নাদান মাঝে মাঝে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করে । অথচ, আর্জেন্টিনা, কানাডা বা নরওয়ের মতো দূর-দূরান্ত থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোও তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, “৩২ নম্বর সড়কে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার হওয়ার আগে মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।” তিনটি বিদেশী টিভি নেটওয়ার্ক, বিবিসি, সিবিএস এবং এনবিসি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তাদের সান্ধ্য সংবাদে বিশ্বকে এই খবর প্রচার করেছিল, যাতে বলা হয়েছিল মুজিব পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পূর্বে ‘তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন । পাকিস্তানের একাধিক সেনা অফিসার যারা তখন বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন তারাও পরবর্তি কালে তাদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে এমন তথ্য দিয়েছেন । যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের নথিতেও তা উল্লেখ আছে । বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর মুজিব তৎকালিন ইপিআরের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠান, যেখানে তিনি বলেন, “এটিই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন এবং আপনাদের যা কিছু আছে তা দিয়েই, শেষ পর্যন্ত দখলদার সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করুন। আপনাদের এই সংগ্রাম ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে, যতক্ষণ না পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর শেষ সৈন্যকেও বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করা হয় এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।” ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এটি ধারণা করা হয়েছিল পাকিস্তানের উভয় অংশকে সমান মর্যাদা দেয়া হবে যা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী কখনো মানতে চায় নি । পাকিস্তানের থেকে রপ্তানিযোগ্য একমাত্র পণ্য পাট ও চা তার পূর্ব অংশে উৎপাদিত হতো, কিন্তু রপ্তানি আয়ের ৮০% পশ্চিমের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী করাচিকে প্রথমে রাওয়ালপিন্ডিতে স্থানান্তর করা হয় । এরপর রাওয়ালপিন্ডির কাছে জনমানবহীন এক জায়গায় ইসলামাবাদ নামে একটি নতুন রাজধানী গড়ে তোলা হয়, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি আয় এবং রাজস্ব তহবিল থেকে। ১৯৫৬ সালের ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান গৃহীত হয় এবং আশা করা হয়েছিল যে পরের বছরের মধ্যেই নতুন সংবিধানের অধীনে দেশের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু পাঞ্জাবের বেসামরিক-সামরিক চক্র কখনোই চায়নি যে সংবিধানটি কার্যকর হোক, কারণ এটি তাদের ক্ষমতাকে খর্ব করবে এবং তাদের বেসামরিক শাসনের অধীনে কাজ করতে হবে। এভাবেই পাকিস্তানের সুপরিচিত বেসামরিক-সামরিক ষড়যন্ত্রের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এ সময় সকালে একটি সরকার গঠন করা হতো এবং পরের দিনই তা ভেঙে দেওয়া হতো। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত বিরতি দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়ে উঠেছিল রেওয়াজ । ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অনেকটা প্রত্যাশিতভাবেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে, যা রাজনৈতিক পন্ডিতদের সমস্ত জল্পনা এবং বেসামরিক-সামরিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। জনগণের বঙ্গবন্ধু মুজিব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ভুট্টো ৮৮টি আসন পেতে সক্ষম হন এবং এই অযৌক্তিক প্রস্তাব নিয়ে আসেন যে, এখন থেকে পাকিস্তানের সংসদে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকবে। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠুকে ছিলেন। মুজিব ও তার দলের ক্রমাগত দাবির মুখে, ইয়াহিয়া নানা টালবাহানার পর ১৯৭১ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে, ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ ঢাকায় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। মুজিব ১৩ই ফেব্রুয়ারি পুনরায় দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের সংবিধান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হবে, এর চেয়ে কম কিছুতেই নয় । ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদের অধিবেশন অর্থহীন। মাসের শেষ নাগাদ, ভুট্টোর পিপলস পার্টি ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে ঢাকায় চলে আসেন । ঢাকায় তখন টান টান উত্তেজনা । এ’সময় হঠাৎ ১লা মার্চ, রেডিও ও টিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে, ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চের নির্ধারিত সংসদ অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে । এই ঘোষণায় পাকিস্তানের সম্পূর্ণ বিভাজন চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল । ইয়াহিয়া ও ভুট্টো উভয়েই মুজিব ও বাংলাদেশের জনগণের চিন্তাধারাকে শোচনীয়ভাবে ভুল বুঝেছিলেন। সংসদ অধিবেশন স্থগিতের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের বেসামরিক শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক ছাত্র সমাবেশ থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রমনা রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) থেকে তিনি সমস্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন। ৭ মার্চ ছিল কার্যত পাকিস্তানের সমাপ্তি। ৭ মার্চ দুপুরের মধ্যেই বিশাল রেসকোর্সটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় । কেউ বলেন সমাবেশে বিশ লক্ষ মানুষ ছিল; কেউ বলেন পঞ্চাশ লক্ষ। সকালে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড মুজিবের বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং মৃদুভাবে তাঁকে সতর্ক করে দেন যে, তিনি যদি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করবে না। এরপর ছাত্র নেতারা এসে দাবি জানান যে স্বাধীনতা ছাড়া জনগণ আর কিছুই গ্রহণ করবে না। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা তাঁর স্মৃতিকথা ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’-তে লিখেছেন, “দূতদের মাধ্যমে আমি শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলাম যে, তাঁর ভাষণের সময় আমি সেনানিবাসে কামান ও ট্যাঙ্ক সজ্জিত সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখব, যাতে তারা অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমি রেসকোর্স থেকে সরাসরি শেখ মুজিবের ভাষণ শোনার ব্যবস্থাও করে রাখব। যদি শেখ মুজিব দেশের অখন্ডতার ওপর আঘাত হানেন এবং স্বাধীনতার সার্বজনীন ঘোষণাপত্র পাঠ করেন, তবে আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই এবং আমার ক্ষমতার সবটুকু দিয়ে আমার কর্তব্য পালন করব। আমি অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে সভাটি বানচাল করার এবং প্রয়োজনে ঢাকাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেব।” ৭ই মার্চের পড়ন্ত বিকেল রমনা রেসকোর্স ময়দানে রচিত হয় বাঙালি জাতির মহকাব্য যখন বঙ্গবন্ধু লক্ষ জনতার সামনে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২৬শে মার্চের ঘোষণাকে বিশ্বকে একটি নতুন জাতির জন্মের কথা জানানোর নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখা যেতে পারে। বাকি নয় মাসের প্রথম দিন থেকেই কেটেছে আমাদের স্বাধীনতা, যা আমাদের ছিল, তা পুনরুদ্ধারে যার জন্য ত্রিশ লক্ষ বাঙালি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন । আসুন এই দিনে আমরা স্মরণ করি মহান রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুজিবনগর সরকারের সদস্যবৃন্দ, ত্রিশ লক্ষ শহীদ এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব উৎসর্গকারী অন্য সকলকে। কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি সে সকল দেশ ও দেশের মানুষকে যারা আমাদের সেই কঠিন সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল । বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। জয় বাংলা । জয় বঙ্গবন্ধু । লেখক সৈয়দ ইফতেখার হোসেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক । ২৩ মার্চ,২০২৬ ।
ব্যাপী স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন বিপুল শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে তখন থেকে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বন্দুকের মুখে আটক থাকা সমস্ত বিদেশী সাংবাদিকদের করাচিতে স্থানান্তারিত করা হয়।” ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কয়েক ডজন বিদেশী সাংবাদিকের ভিড় জমে গিয়েছিল। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এক বছর আগে ঘোষিত সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের অধীনে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তার সংবাদ সংগ্রহ করতে এই বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকায় অবস্থান । এই ঘূর্ণিঝড়ে কতজন মারা গিয়েছিল তা অনুমান করতে
পারা কঠিন, তবে স্বাধীন হিসাব মতে এই সংখ্যাটি প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এই সংখ্যাটি দশ লক্ষ বলে দাবি করেছিলেন। ঘূর্ণিঝড়ে-বিধ্বস্ত এলাকাগুলো ছাড়া নির্দিষ্ট দিনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দিয়ে তিনি জল্পনাকারীদের অন্য কিছু চিন্তা করার কোনো সুযোগই দেননি। এই সময়ের মধ্যে মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে, যা বর্তমান বাংলাদেশ, এক কিংবদন্তি নেতায় পরিণত হয়ে পরেন যা বর্তমান প্রজন্ম চিন্ত্ওা করতে পারবেনা । এই সময় বঙ্গবন্ধু যা বলতেন, জনগণ ও সরকার তা শুনতো এবং বহির্বিশ্ব তা অবাক হয়ে দেখতো । এক কথায় দেশের পুরো বেসমারিক প্রশাসন তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল । ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ দুর্গতদের প্রতি
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা এতটাই প্রকট ছিল যে তা কারো পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। জেনারেল ইয়াহিয়া খান এই সময় ঢাকা হয়ে বেইজিং গিয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলো পরিদর্শন করার প্রয়োজনীয় মনে করেননি। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ রেখেছিলেন এবং পরের বছর ৭ জুন তিনি ঘোষণা করেন যে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে তাঁর পূর্বে ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির ওপর একটি গণভোট হিসেবে দেখা হবে। ১৯৬৬ সালে মুজিব কর্তৃক ঘোষিত ছয় দফা দাবি যা পাঞ্জাবে বসে থাকা কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা প্রদেশগুলোর শোষণের চিরতরে অবসান ঘটাবে বলে মনে করা হতো। মুজিব, যিনি ততদিনে বঙ্গবন্ধু নামে
পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, তিনি ইতিহাসের আগে আগে চলছিলেন। বস্তুত, তিনি এই সময় শুধু একটি নূতন ইতিহাসের জন্মই দিচ্ছিলেন না তিনি নিজে ইতিহাসের অংশ হয়ে পরছিলেন । ১৯৭০ সালের ৩০শে মার্চ ইয়াহিয়া খান এক তরফা ভাবে একটি আইনি কাঠামো আদেশ (এলএফও) জারি করেন, যাতে বলা হয় নবগঠিত পরিষদ হবে একটি গণপরিষদ আর তাকে ১২০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রনয়ন সম্পন্ন করতে হবে। তিনি বলেন এই সংবিধানে পাকিস্তানের আদর্শকে ধারণ করতে হবে, যার অর্থ ছিল পাকিস্তানের ধর্মতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা এবং জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমুন্নত রাখা। এলএফও-তে এও জোর দেওয়া হয় যে, নির্বাচনের সময় অর্থনৈতিক বৈষম্যকে রাজনৈতিক শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা
যাবে না এবং ইয়াহিয়া নতুন সংবিধান অনুমোদন না দিলে সংসদ স্বয়ংক্রিয় ভাবে ভেঙে যাবে। মুজিব ঘোষণা করেন যে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার হবে তাঁর পূর্ব ঘেষিত ছয় দফা ভিত্তিক । আর তাঁর দল আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হলে পাকিস্তানের সংবিধান হবে ছয় দফা ভিত্তিক । তখন অনেকেই এমন একটি কঠোর নিয়মের নির্বাচনে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং শেখ মুজিবকে নির্বাচন বর্জন করতে বলেন। কেউ কেউ শ্লোগান তোলেন ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো । কিন্তু ততদিনে মুজিব নিজেকে একজন রাজনৈতিক নেতা থেকে রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরিত করেছিলেন। এক অর্থে, মুজিবই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম ও শেষ রাষ্ট্রনায়ক
যিনি দেশ ও জনগণের ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন। ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চের রাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে মুজিব আদৌ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন কি না, তা নিয়ে কিছু নাদান মাঝে মাঝে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করে । অথচ, আর্জেন্টিনা, কানাডা বা নরওয়ের মতো দূর-দূরান্ত থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোও তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, “৩২ নম্বর সড়কে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার হওয়ার আগে মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।” তিনটি বিদেশী টিভি নেটওয়ার্ক, বিবিসি, সিবিএস এবং এনবিসি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তাদের সান্ধ্য সংবাদে বিশ্বকে এই খবর প্রচার করেছিল, যাতে বলা হয়েছিল মুজিব পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পূর্বে ‘তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন । পাকিস্তানের একাধিক সেনা অফিসার যারা তখন বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন তারাও পরবর্তি কালে তাদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে এমন তথ্য দিয়েছেন । যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের নথিতেও তা উল্লেখ আছে । বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর মুজিব তৎকালিন ইপিআরের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠান, যেখানে তিনি বলেন, “এটিই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন এবং আপনাদের যা কিছু আছে তা দিয়েই, শেষ পর্যন্ত দখলদার সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করুন। আপনাদের এই সংগ্রাম ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে, যতক্ষণ না পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর শেষ সৈন্যকেও বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করা হয় এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।” ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এটি ধারণা করা হয়েছিল পাকিস্তানের উভয় অংশকে সমান মর্যাদা দেয়া হবে যা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী কখনো মানতে চায় নি । পাকিস্তানের থেকে রপ্তানিযোগ্য একমাত্র পণ্য পাট ও চা তার পূর্ব অংশে উৎপাদিত হতো, কিন্তু রপ্তানি আয়ের ৮০% পশ্চিমের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী করাচিকে প্রথমে রাওয়ালপিন্ডিতে স্থানান্তর করা হয় । এরপর রাওয়ালপিন্ডির কাছে জনমানবহীন এক জায়গায় ইসলামাবাদ নামে একটি নতুন রাজধানী গড়ে তোলা হয়, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি আয় এবং রাজস্ব তহবিল থেকে। ১৯৫৬ সালের ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান গৃহীত হয় এবং আশা করা হয়েছিল যে পরের বছরের মধ্যেই নতুন সংবিধানের অধীনে দেশের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু পাঞ্জাবের বেসামরিক-সামরিক চক্র কখনোই চায়নি যে সংবিধানটি কার্যকর হোক, কারণ এটি তাদের ক্ষমতাকে খর্ব করবে এবং তাদের বেসামরিক শাসনের অধীনে কাজ করতে হবে। এভাবেই পাকিস্তানের সুপরিচিত বেসামরিক-সামরিক ষড়যন্ত্রের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এ সময় সকালে একটি সরকার গঠন করা হতো এবং পরের দিনই তা ভেঙে দেওয়া হতো। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত বিরতি দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়ে উঠেছিল রেওয়াজ । ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অনেকটা প্রত্যাশিতভাবেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে, যা রাজনৈতিক পন্ডিতদের সমস্ত জল্পনা এবং বেসামরিক-সামরিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। জনগণের বঙ্গবন্ধু মুজিব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ভুট্টো ৮৮টি আসন পেতে সক্ষম হন এবং এই অযৌক্তিক প্রস্তাব নিয়ে আসেন যে, এখন থেকে পাকিস্তানের সংসদে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকবে। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠুকে ছিলেন। মুজিব ও তার দলের ক্রমাগত দাবির মুখে, ইয়াহিয়া নানা টালবাহানার পর ১৯৭১ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে, ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ ঢাকায় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। মুজিব ১৩ই ফেব্রুয়ারি পুনরায় দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের সংবিধান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হবে, এর চেয়ে কম কিছুতেই নয় । ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদের অধিবেশন অর্থহীন। মাসের শেষ নাগাদ, ভুট্টোর পিপলস পার্টি ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে ঢাকায় চলে আসেন । ঢাকায় তখন টান টান উত্তেজনা । এ’সময় হঠাৎ ১লা মার্চ, রেডিও ও টিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে, ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চের নির্ধারিত সংসদ অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে । এই ঘোষণায় পাকিস্তানের সম্পূর্ণ বিভাজন চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল । ইয়াহিয়া ও ভুট্টো উভয়েই মুজিব ও বাংলাদেশের জনগণের চিন্তাধারাকে শোচনীয়ভাবে ভুল বুঝেছিলেন। সংসদ অধিবেশন স্থগিতের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের বেসামরিক শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক ছাত্র সমাবেশ থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রমনা রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) থেকে তিনি সমস্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন। ৭ মার্চ ছিল কার্যত পাকিস্তানের সমাপ্তি। ৭ মার্চ দুপুরের মধ্যেই বিশাল রেসকোর্সটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় । কেউ বলেন সমাবেশে বিশ লক্ষ মানুষ ছিল; কেউ বলেন পঞ্চাশ লক্ষ। সকালে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ড মুজিবের বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং মৃদুভাবে তাঁকে সতর্ক করে দেন যে, তিনি যদি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করবে না। এরপর ছাত্র নেতারা এসে দাবি জানান যে স্বাধীনতা ছাড়া জনগণ আর কিছুই গ্রহণ করবে না। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা তাঁর স্মৃতিকথা ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’-তে লিখেছেন, “দূতদের মাধ্যমে আমি শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলাম যে, তাঁর ভাষণের সময় আমি সেনানিবাসে কামান ও ট্যাঙ্ক সজ্জিত সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখব, যাতে তারা অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে পারে। আমি রেসকোর্স থেকে সরাসরি শেখ মুজিবের ভাষণ শোনার ব্যবস্থাও করে রাখব। যদি শেখ মুজিব দেশের অখন্ডতার ওপর আঘাত হানেন এবং স্বাধীনতার সার্বজনীন ঘোষণাপত্র পাঠ করেন, তবে আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই এবং আমার ক্ষমতার সবটুকু দিয়ে আমার কর্তব্য পালন করব। আমি অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে সভাটি বানচাল করার এবং প্রয়োজনে ঢাকাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেব।” ৭ই মার্চের পড়ন্ত বিকেল রমনা রেসকোর্স ময়দানে রচিত হয় বাঙালি জাতির মহকাব্য যখন বঙ্গবন্ধু লক্ষ জনতার সামনে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২৬শে মার্চের ঘোষণাকে বিশ্বকে একটি নতুন জাতির জন্মের কথা জানানোর নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখা যেতে পারে। বাকি নয় মাসের প্রথম দিন থেকেই কেটেছে আমাদের স্বাধীনতা, যা আমাদের ছিল, তা পুনরুদ্ধারে যার জন্য ত্রিশ লক্ষ বাঙালি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন । আসুন এই দিনে আমরা স্মরণ করি মহান রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুজিবনগর সরকারের সদস্যবৃন্দ, ত্রিশ লক্ষ শহীদ এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব উৎসর্গকারী অন্য সকলকে। কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি সে সকল দেশ ও দেশের মানুষকে যারা আমাদের সেই কঠিন সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল । বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। জয় বাংলা । জয় বঙ্গবন্ধু । লেখক সৈয়দ ইফতেখার হোসেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক । ২৩ মার্চ,২০২৬ ।



