ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় উচ্ছ্বসিত জারদারি, পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ
১০-১২ বার লোডশেডিং: অন্ধকারে ডুবছে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ যাত্রীরা
শেখ হাসিনার সময় বিরোধিতা করা হলেও এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির নির্দেশ তারেক সরকারের
কৃষিমন্ত্রীর ‘উদ্বৃত্ত মজুদ’ দাবি অথচ সারের বাজার সিন্ডিকেটের দখলে, বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত গুণতে হচ্ছে ৬০০ টাকা
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে নতুন রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো
৫ আগস্টের পর পঙ্গু শিল্পখাত: ২ বছরে মোট কত কারখানা বন্ধ ও কত শ্রমিক হলেন বেকার?
মন্ত্রিসভায় বড় রদবদলের আভাস, বিএনপি ও জোটের যেসব নেতাকে ঘিরে জোরালো আলোচনা
২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড: তারেক যদি মাস্টারমাইন্ড না হন, প্রকৃত হামলাকারী কারা?
২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন। ২০১৮ সালে তারেক রহমানসহ ৪৯ জন দণ্ডিত হলেও সেই রায় ২০২৪ সালে বাতিল করে সবাইকে খালাস দেন হাইকোর্ট। ২০২৫ সালে আপিল বিভাগও খালাস বহাল রাখেন। এখন তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাহলে ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারী কারা?
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ। লক্ষ্য ছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে ঘিরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতা-কর্মী নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ কয়েকশ মানুষ। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমান।
দুই দশকের বেশি সময় পরও
সেই হত্যাকাণ্ডের একটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। হামলা হয়েছিল, মানুষ মারা গেছেন, হামলার পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে, একসময় ৪৯ জনকে দণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালতে সেই দণ্ড টেকেনি। তাহলে যারা হামলা চালিয়েছিল, তারা কারা? প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২১ আগস্ট মামলার অন্যতম আলোচিত আসামি তারেক রহমান, যাকে ২০১৮ সালের বিচারিক আদালত হামলার ষড়যন্ত্রের দায়ে যাবজ্জীবন দিয়েছিল, এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আর তাকে সেই মামলায় খালাস দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ২০১৮ সালের রায়ে ‘মাস্টারমাইন্ড’ তারেক ২১ আগস্টের মামলার তদন্তের ইতিহাস একরৈখিক নয়। বরং এই মামলায় অন্তত দুটি বড় তদন্ত-পর্ব রয়েছে, যেগুলো থেকে হামলার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান সামনে আসে। হামলার পর প্রথম দিকের
তদন্তে নোয়াখালীর যুবক জালাল আহমেদ ওরফে জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে হামলার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। পরে অধিকতর তদন্তে সেই বয়ান ভেঙে পড়ে এবং জজ মিয়া প্রকৃত হামলাকারী নন বলে স্পষ্ট হয়। তদন্তের এই পর্ব পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলাটির তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। ২০০৮ সালে ২২ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে অধিকতর তদন্তের পর ২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এই তদন্তের ভিত্তিতে মামলার অভিযোগের পরিধি বিস্তৃত হয়। হামলায়
সরাসরি জঙ্গিদের অংশগ্রহণের অভিযোগের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের ব্যক্তিদের পরিকল্পনা ও সহযোগিতার অভিযোগও যুক্ত হয়। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়েই তারেক রহমানকে ২১ আগস্টের হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে এরপর একটি শক্তিশালী বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমান। কিন্তু আদালতের ইতিহাস সেখানেই শেষ হয়নি। যে রায় ৬ বছরও টিকল না ২০১৮ সালের রায়ের পর মামলাটি হাইকোর্টে যায়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক
আদালতের রায় বাতিল করে দেন। শুধু কয়েকজন নয়, তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ দণ্ডিত সব আসামিকেই খালাস দেওয়া হয়। হাইকোর্ট একই সঙ্গে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাইকোর্ট শুধু সাজা কমিয়ে দেয়নি বা কয়েকজনকে বাদ দেয়নি। বরং বিচারিক আদালতের পুরো দণ্ডাদেশের ভিত্তি নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। মামলার তদন্ত, সম্পূরক অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ আসে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়: যে প্রমাণের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছিল, সেই একই প্রমাণের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে তাকে কেন খালাস দেওয়া হলো? এর উত্তর খুঁজতে হলে মামলার তদন্তের ওপর ফিরে তাকাতে হয়। জজ মিয়া থেকে তারেক
রহমান: তদন্তের দুই বিপরীত বয়ান ২১ আগস্টের তদন্তের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিক হলো, তদন্তের গতিপথ বারবার বদলেছে। প্রথম দিকে জজ মিয়াকে কেন্দ্র করে একটি বয়ান তৈরি হয়েছিল। পরে অধিকতর তদন্তে সেই বয়ান অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। এরপর সামনে আসে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। মুফতি আবদুল হান্নানসহ জঙ্গিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়। এরপর আরও এক ধাপ এগিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। অর্থাৎ একই হামলার ক্ষেত্রে তদন্তের ধারাবাহিকতায় তিনটি বড় বয়ান দেখা যায়: প্রথমত, জজ মিয়া ও একটি কথিত ছোট সন্ত্রাসী চক্র। দ্বিতীয়ত, হুজি-বি ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক। তৃতীয়ত, জঙ্গিদের সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক ও
প্রশাসনিক পর্যায়ের একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। ২০১৮ সালের রায়ে তৃতীয় বয়ানটি বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের হাইকোর্টের রায়ে সেই ভিত্তিই ভেঙে পড়ে। তাহলে কি হুজি-বিই হামলা করেছিল? এখানেও সরল উত্তর দেওয়া যায় না। মামলার তদন্তে হুজি-বির সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। মুফতি আবদুল হান্নানের বক্তব্যও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কোনো ব্যক্তির স্বীকারোক্তি বা তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ প্রমাণ করে না। আদালতে সেটিকে আইনসম্মত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। ২১ আগস্ট মামলার ক্ষেত্রে সেই জায়গাতেই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পরবর্তী বিচারিক পর্যায়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির স্বেচ্ছাস্বীকৃতি, সাক্ষ্য এবং তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ফলে এখন হুজি-বির সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগকে ঐতিহাসিক তদন্ত-তত্ত্ব হিসেবে উল্লেখ করা যায়, কিন্তু বর্তমান বিচারিক অবস্থায় তাদেরই ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত দায়ী বলে ঘোষণা করা যায় না। তারেকের বিরুদ্ধে প্রমাণের কী হলো? এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের রায়ে তারেক রহমানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের হাইকোর্ট সেই বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। হাইকোর্টের রায়ের ফলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট মামলায় কোনো দণ্ড বহাল থাকেনি। এরপর রাষ্ট্র হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। কিন্তু ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগও হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন। অর্থাৎ এখন আইনি অবস্থানটি পরিষ্কার: তারেক রহমান ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় খালাসপ্রাপ্ত। তাকে এই মামলায় অপরাধী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করার মতো কোনো বহাল বিচারিক রায় নেই। এই বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। কেউ রাজনৈতিকভাবে তাকে দায়ী করতে পারেন। আবার কেউ তাকে নির্দোষ বলতে পারেন। কিন্তু আদালতের বর্তমান অবস্থান হলো, এই মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ড বহাল নেই। আপিল বিভাগ কেন খালাস বহাল রাখল? ২০২৫ সালের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের পর মামলার অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি আর শুধু হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত নয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও খালাস বহাল রেখেছে। ফলে ২০১৮ সালের রায়ের ওপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে ২১ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ আর নেই। এখানে সাংবাদিকতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ‘তারেক রহমানকে ২০১৮ সালে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল’ বলা তথ্যগতভাবে সঠিক। কিন্তু ‘তারেক রহমান ২১ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড’ বলা বর্তমান বিচারিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ সেই দণ্ড বাতিল হয়েছে এবং খালাস সর্বোচ্চ আদালতে বহাল রয়েছে। ২০২৪ সালের পর নতুন তদন্তের প্রশ্ন হাইকোর্টের রায়ে ২১ আগস্টের ঘটনা নিয়ে নতুন করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ পরবর্তী সময়ে সেই পর্যবেক্ষণ বাদ দেয়। ফলে এখন একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে পুরোনো তদন্তের ভিত্তিতে দেওয়া দণ্ড বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে হাইকোর্টের নতুন তদন্তের পর্যবেক্ষণও আপিল বিভাগ বহাল রাখেনি। ফলে পুরোনো মামলার দণ্ড নেই, আবার নতুন করে প্রকৃত হামলাকারী শনাক্ত করার কোনো বিচারিক নির্দেশও নেই। এই জায়গাটিই ২১ আগস্টের বিচারিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। তাহলে প্রকৃত হামলাকারী কারা? এখন পর্যন্ত আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে এর উত্তর পাওয়া যায় না। তবে তদন্তের ইতিহাস বলছে, হামলার সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল। আবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছিল। ২০১৮ সালের বিচারিক আদালত সেই বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ গ্রহণ করে দণ্ড দিয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। অতএব এখন তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। হামলা কে চালিয়েছিল? হামলার পরিকল্পনা কে করেছিল? হামলার পর তদন্তকে কে প্রভাবিত বা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল? এই তিন প্রশ্নের উত্তর একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠী হবে, এমন কোনো প্রমাণিত সিদ্ধান্তও এখন নেই। একটি সুষ্ঠু তদন্তে তাই শুধু হামলাকারীকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। হামলার প্রস্তুতি, অর্থায়ন, অস্ত্র বা বিস্ফোরক সংগ্রহ, যোগাযোগ, আশ্রয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং হামলার পর তদন্তের গতিপথও পরীক্ষা করতে হবে। সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়: জজ মিয়া ২১ আগস্টের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট বোঝার জন্য জজ মিয়া অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ। একজন যুবককে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে এমন একটি ভয়াবহ হামলার দায় চাপানো হয়েছিল, যা পরে অধিকতর তদন্তে টেকেনি। এখানে প্রশ্ন শুধু জজ মিয়া নির্দোষ ছিলেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো: কেন একজন নিরপরাধ বা প্রকৃত হামলার সঙ্গে যুক্ত নন এমন ব্যক্তিকে তদন্তের কেন্দ্রে আনা হয়েছিল? কে তাকে শনাক্ত করেছিল? কীভাবে তার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল? তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত তথ্য কোথা থেকে এসেছিল? তদন্তের কোন পর্যায়ে পুলিশ বুঝেছিল যে এই বয়ান সত্য নয়? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যারা এই ভুল তদন্ত পরিচালনা করেছিলেন, তাদের ভূমিকা কি পুরোপুরি অনুসন্ধান করা হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ২১ আগস্টের তদন্তের পূর্ণ ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আজকের বাস্তবতায় প্রশ্নটি আরও কঠিন ২০০৪ সালে শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। ২০১৮ সালে তারেক রহমানকে ওই হামলার ষড়যন্ত্রের দায়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে তিনি খালাস পান। ২০২৫ সালে সেই খালাস বহাল থাকে। আর ২০২৬ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ইতিহাসের একটি অস্বাভাবিক রাজনৈতিক বাঁক তৈরি হয়েছে। একসময় যে ব্যক্তি ২১ আগস্ট মামলার অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন, আজ তিনিই রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান। এতে একটি নতুন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে: রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী নিজেই যদি ওই মামলায় খালাসপ্রাপ্ত হন, তাহলে তার সরকারের অধীনে ২১ আগস্টের প্রকৃত সত্য উদঘাটনের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় কার? এই প্রশ্নটি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ নয়। বরং রাষ্ট্রের কাছে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন। কারণ নিহত ২৪ জনের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা এবং সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত আদালতে সত্যিকার অপরাধীরা শনাক্ত হয়েছিল কি না। বিচার শেষ, নাকি শুধু একটি মামলা শেষ? এখানে ‘বিচার হয়নি’ বলাটাও পুরোপুরি সঠিক হবে না। বিচার হয়েছে। দীর্ঘ বিচার হয়েছে। সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তদন্ত হয়েছে। নিম্ন আদালত দণ্ড দিয়েছে। উচ্চ আদালত সেই দণ্ড বাতিল করেছে। সর্বোচ্চ আদালত খালাস বহাল রেখেছে। অর্থাৎ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বলা যায়, ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দায় কার, সেই প্রশ্নের একটি চূড়ান্ত উত্তর সেই বিচারিক প্রক্রিয়া দিতে পারেনি। এই দুটি বিষয়কে আলাদা করা জরুরি। কারও খালাস পাওয়া মানে এই নয় যে হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। আবার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধী বলা যায় না, যতক্ষণ না তার বিরুদ্ধে আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকে। ২১ আগস্ট মামলার বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। তাহলে এখন কী বাকি? ২১ আগস্টের সত্য উদঘাটন করতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে নতুন করে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। গ্রেনেডগুলো কোথা থেকে এসেছিল? কারা সেগুলো সংগ্রহ ও সরবরাহ করেছিল? হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা কারা ছিল? তাদের মধ্যে কতজনকে স্বাধীন প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা হয়েছিল? হামলার আগে কোনো পরিকল্পনা বা বৈঠক হয়েছিল কি না? হামলার দিন নিরাপত্তাব্যবস্থায় অস্বাভাবিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল কি না? হামলার পর তদন্ত কেন জজ মিয়ার দিকে ঘুরে গিয়েছিল? তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল? পরবর্তী তদন্তে যে রাজনৈতিক ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছিল, তার কোন কোন অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়? এবং সর্বশেষ প্রশ্ন: ২০১৮ সালের রায়ে ব্যবহৃত প্রমাণের কোন অংশ আজও আদালতে পুনরায় উপস্থাপনযোগ্য? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ২১ আগস্ট নিয়ে নতুন কোনো দায় নির্ধারণ করাও কঠিন। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তারেককে ঘিরে নয় ২১ আগস্টের রাজনীতিতে তারেক রহমানের নাম বহু বছর ধরে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে আছে। ২০১৮ সালের রায় তাকে ষড়যন্ত্রের দায়ে দণ্ডিত করেছিল। ২০২৪ সালের হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করেছে। ২০২৫ সালে আপিল বিভাগ খালাস বহাল রেখেছে। আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই এখন প্রশ্নটি নতুন করে করতে হয়। তারেক রহমান যদি ২১ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড না হন, তাহলে প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড কে? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন: যারা ২১ আগস্টে গ্রেনেড ছুড়েছিল, যারা তাদের অস্ত্র ও আশ্রয় দিয়েছিল, যারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল এবং যারা পরে তদন্তকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদের প্রত্যেককে কি কখনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা হয়েছিল? ২২ বছর পরও এই প্রশ্নগুলোর কোনো পূর্ণাঙ্গ, আদালতে টেকসই উত্তর নেই। ২৪ জন মানুষের মৃত্যু তাই শুধু একটি পুরোনো রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা হয়ে নেই। এটি বাংলাদেশের বিচার ও তদন্তব্যবস্থার জন্যও একটি অসমাপ্ত অধ্যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি মামলায় আসামিদের খালাস পাওয়া আর একটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক জিনিস নয়। ২১ আগস্টের ক্ষেত্রে প্রথমটি ঘটেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি এখনো বাকি।
সেই হত্যাকাণ্ডের একটি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। হামলা হয়েছিল, মানুষ মারা গেছেন, হামলার পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে, একসময় ৪৯ জনকে দণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালতে সেই দণ্ড টেকেনি। তাহলে যারা হামলা চালিয়েছিল, তারা কারা? প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২১ আগস্ট মামলার অন্যতম আলোচিত আসামি তারেক রহমান, যাকে ২০১৮ সালের বিচারিক আদালত হামলার ষড়যন্ত্রের দায়ে যাবজ্জীবন দিয়েছিল, এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। আর তাকে সেই মামলায় খালাস দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ২০১৮ সালের রায়ে ‘মাস্টারমাইন্ড’ তারেক ২১ আগস্টের মামলার তদন্তের ইতিহাস একরৈখিক নয়। বরং এই মামলায় অন্তত দুটি বড় তদন্ত-পর্ব রয়েছে, যেগুলো থেকে হামলার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান সামনে আসে। হামলার পর প্রথম দিকের
তদন্তে নোয়াখালীর যুবক জালাল আহমেদ ওরফে জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে হামলার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। পরে অধিকতর তদন্তে সেই বয়ান ভেঙে পড়ে এবং জজ মিয়া প্রকৃত হামলাকারী নন বলে স্পষ্ট হয়। তদন্তের এই পর্ব পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলাটির তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। ২০০৮ সালে ২২ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে অধিকতর তদন্তের পর ২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এই তদন্তের ভিত্তিতে মামলার অভিযোগের পরিধি বিস্তৃত হয়। হামলায়
সরাসরি জঙ্গিদের অংশগ্রহণের অভিযোগের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের ব্যক্তিদের পরিকল্পনা ও সহযোগিতার অভিযোগও যুক্ত হয়। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়েই তারেক রহমানকে ২১ আগস্টের হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে এরপর একটি শক্তিশালী বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমান। কিন্তু আদালতের ইতিহাস সেখানেই শেষ হয়নি। যে রায় ৬ বছরও টিকল না ২০১৮ সালের রায়ের পর মামলাটি হাইকোর্টে যায়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক
আদালতের রায় বাতিল করে দেন। শুধু কয়েকজন নয়, তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ দণ্ডিত সব আসামিকেই খালাস দেওয়া হয়। হাইকোর্ট একই সঙ্গে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাইকোর্ট শুধু সাজা কমিয়ে দেয়নি বা কয়েকজনকে বাদ দেয়নি। বরং বিচারিক আদালতের পুরো দণ্ডাদেশের ভিত্তি নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। মামলার তদন্ত, সম্পূরক অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ আসে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়: যে প্রমাণের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছিল, সেই একই প্রমাণের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে তাকে কেন খালাস দেওয়া হলো? এর উত্তর খুঁজতে হলে মামলার তদন্তের ওপর ফিরে তাকাতে হয়। জজ মিয়া থেকে তারেক
রহমান: তদন্তের দুই বিপরীত বয়ান ২১ আগস্টের তদন্তের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিক হলো, তদন্তের গতিপথ বারবার বদলেছে। প্রথম দিকে জজ মিয়াকে কেন্দ্র করে একটি বয়ান তৈরি হয়েছিল। পরে অধিকতর তদন্তে সেই বয়ান অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। এরপর সামনে আসে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজি-বি) সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। মুফতি আবদুল হান্নানসহ জঙ্গিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়। এরপর আরও এক ধাপ এগিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। অর্থাৎ একই হামলার ক্ষেত্রে তদন্তের ধারাবাহিকতায় তিনটি বড় বয়ান দেখা যায়: প্রথমত, জজ মিয়া ও একটি কথিত ছোট সন্ত্রাসী চক্র। দ্বিতীয়ত, হুজি-বি ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক। তৃতীয়ত, জঙ্গিদের সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক ও
প্রশাসনিক পর্যায়ের একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। ২০১৮ সালের রায়ে তৃতীয় বয়ানটি বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের হাইকোর্টের রায়ে সেই ভিত্তিই ভেঙে পড়ে। তাহলে কি হুজি-বিই হামলা করেছিল? এখানেও সরল উত্তর দেওয়া যায় না। মামলার তদন্তে হুজি-বির সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। মুফতি আবদুল হান্নানের বক্তব্যও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কোনো ব্যক্তির স্বীকারোক্তি বা তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ প্রমাণ করে না। আদালতে সেটিকে আইনসম্মত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। ২১ আগস্ট মামলার ক্ষেত্রে সেই জায়গাতেই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পরবর্তী বিচারিক পর্যায়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির স্বেচ্ছাস্বীকৃতি, সাক্ষ্য এবং তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ফলে এখন হুজি-বির সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগকে ঐতিহাসিক তদন্ত-তত্ত্ব হিসেবে উল্লেখ করা যায়, কিন্তু বর্তমান বিচারিক অবস্থায় তাদেরই ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত দায়ী বলে ঘোষণা করা যায় না। তারেকের বিরুদ্ধে প্রমাণের কী হলো? এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের রায়ে তারেক রহমানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের হাইকোর্ট সেই বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। হাইকোর্টের রায়ের ফলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট মামলায় কোনো দণ্ড বহাল থাকেনি। এরপর রাষ্ট্র হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। কিন্তু ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগও হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন। অর্থাৎ এখন আইনি অবস্থানটি পরিষ্কার: তারেক রহমান ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় খালাসপ্রাপ্ত। তাকে এই মামলায় অপরাধী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করার মতো কোনো বহাল বিচারিক রায় নেই। এই বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। কেউ রাজনৈতিকভাবে তাকে দায়ী করতে পারেন। আবার কেউ তাকে নির্দোষ বলতে পারেন। কিন্তু আদালতের বর্তমান অবস্থান হলো, এই মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ড বহাল নেই। আপিল বিভাগ কেন খালাস বহাল রাখল? ২০২৫ সালের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের পর মামলার অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি আর শুধু হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত নয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও খালাস বহাল রেখেছে। ফলে ২০১৮ সালের রায়ের ওপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে ২১ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ আর নেই। এখানে সাংবাদিকতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ‘তারেক রহমানকে ২০১৮ সালে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল’ বলা তথ্যগতভাবে সঠিক। কিন্তু ‘তারেক রহমান ২১ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড’ বলা বর্তমান বিচারিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ সেই দণ্ড বাতিল হয়েছে এবং খালাস সর্বোচ্চ আদালতে বহাল রয়েছে। ২০২৪ সালের পর নতুন তদন্তের প্রশ্ন হাইকোর্টের রায়ে ২১ আগস্টের ঘটনা নিয়ে নতুন করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ পরবর্তী সময়ে সেই পর্যবেক্ষণ বাদ দেয়। ফলে এখন একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে পুরোনো তদন্তের ভিত্তিতে দেওয়া দণ্ড বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে হাইকোর্টের নতুন তদন্তের পর্যবেক্ষণও আপিল বিভাগ বহাল রাখেনি। ফলে পুরোনো মামলার দণ্ড নেই, আবার নতুন করে প্রকৃত হামলাকারী শনাক্ত করার কোনো বিচারিক নির্দেশও নেই। এই জায়গাটিই ২১ আগস্টের বিচারিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। তাহলে প্রকৃত হামলাকারী কারা? এখন পর্যন্ত আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে এর উত্তর পাওয়া যায় না। তবে তদন্তের ইতিহাস বলছে, হামলার সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল। আবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছিল। ২০১৮ সালের বিচারিক আদালত সেই বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ গ্রহণ করে দণ্ড দিয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। অতএব এখন তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। হামলা কে চালিয়েছিল? হামলার পরিকল্পনা কে করেছিল? হামলার পর তদন্তকে কে প্রভাবিত বা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল? এই তিন প্রশ্নের উত্তর একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠী হবে, এমন কোনো প্রমাণিত সিদ্ধান্তও এখন নেই। একটি সুষ্ঠু তদন্তে তাই শুধু হামলাকারীকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। হামলার প্রস্তুতি, অর্থায়ন, অস্ত্র বা বিস্ফোরক সংগ্রহ, যোগাযোগ, আশ্রয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং হামলার পর তদন্তের গতিপথও পরীক্ষা করতে হবে। সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়: জজ মিয়া ২১ আগস্টের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট বোঝার জন্য জজ মিয়া অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ। একজন যুবককে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে এমন একটি ভয়াবহ হামলার দায় চাপানো হয়েছিল, যা পরে অধিকতর তদন্তে টেকেনি। এখানে প্রশ্ন শুধু জজ মিয়া নির্দোষ ছিলেন কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো: কেন একজন নিরপরাধ বা প্রকৃত হামলার সঙ্গে যুক্ত নন এমন ব্যক্তিকে তদন্তের কেন্দ্রে আনা হয়েছিল? কে তাকে শনাক্ত করেছিল? কীভাবে তার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল? তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত তথ্য কোথা থেকে এসেছিল? তদন্তের কোন পর্যায়ে পুলিশ বুঝেছিল যে এই বয়ান সত্য নয়? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যারা এই ভুল তদন্ত পরিচালনা করেছিলেন, তাদের ভূমিকা কি পুরোপুরি অনুসন্ধান করা হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ২১ আগস্টের তদন্তের পূর্ণ ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আজকের বাস্তবতায় প্রশ্নটি আরও কঠিন ২০০৪ সালে শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। ২০১৮ সালে তারেক রহমানকে ওই হামলার ষড়যন্ত্রের দায়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে তিনি খালাস পান। ২০২৫ সালে সেই খালাস বহাল থাকে। আর ২০২৬ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ইতিহাসের একটি অস্বাভাবিক রাজনৈতিক বাঁক তৈরি হয়েছে। একসময় যে ব্যক্তি ২১ আগস্ট মামলার অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন, আজ তিনিই রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান। এতে একটি নতুন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে: রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী নিজেই যদি ওই মামলায় খালাসপ্রাপ্ত হন, তাহলে তার সরকারের অধীনে ২১ আগস্টের প্রকৃত সত্য উদঘাটনের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় কার? এই প্রশ্নটি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ নয়। বরং রাষ্ট্রের কাছে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন। কারণ নিহত ২৪ জনের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা এবং সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত আদালতে সত্যিকার অপরাধীরা শনাক্ত হয়েছিল কি না। বিচার শেষ, নাকি শুধু একটি মামলা শেষ? এখানে ‘বিচার হয়নি’ বলাটাও পুরোপুরি সঠিক হবে না। বিচার হয়েছে। দীর্ঘ বিচার হয়েছে। সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তদন্ত হয়েছে। নিম্ন আদালত দণ্ড দিয়েছে। উচ্চ আদালত সেই দণ্ড বাতিল করেছে। সর্বোচ্চ আদালত খালাস বহাল রেখেছে। অর্থাৎ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বলা যায়, ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দায় কার, সেই প্রশ্নের একটি চূড়ান্ত উত্তর সেই বিচারিক প্রক্রিয়া দিতে পারেনি। এই দুটি বিষয়কে আলাদা করা জরুরি। কারও খালাস পাওয়া মানে এই নয় যে হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। আবার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধী বলা যায় না, যতক্ষণ না তার বিরুদ্ধে আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকে। ২১ আগস্ট মামলার বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। তাহলে এখন কী বাকি? ২১ আগস্টের সত্য উদঘাটন করতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে নতুন করে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। গ্রেনেডগুলো কোথা থেকে এসেছিল? কারা সেগুলো সংগ্রহ ও সরবরাহ করেছিল? হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা কারা ছিল? তাদের মধ্যে কতজনকে স্বাধীন প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা হয়েছিল? হামলার আগে কোনো পরিকল্পনা বা বৈঠক হয়েছিল কি না? হামলার দিন নিরাপত্তাব্যবস্থায় অস্বাভাবিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল কি না? হামলার পর তদন্ত কেন জজ মিয়ার দিকে ঘুরে গিয়েছিল? তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল? পরবর্তী তদন্তে যে রাজনৈতিক ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছিল, তার কোন কোন অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়? এবং সর্বশেষ প্রশ্ন: ২০১৮ সালের রায়ে ব্যবহৃত প্রমাণের কোন অংশ আজও আদালতে পুনরায় উপস্থাপনযোগ্য? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ২১ আগস্ট নিয়ে নতুন কোনো দায় নির্ধারণ করাও কঠিন। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তারেককে ঘিরে নয় ২১ আগস্টের রাজনীতিতে তারেক রহমানের নাম বহু বছর ধরে একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে আছে। ২০১৮ সালের রায় তাকে ষড়যন্ত্রের দায়ে দণ্ডিত করেছিল। ২০২৪ সালের হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করেছে। ২০২৫ সালে আপিল বিভাগ খালাস বহাল রেখেছে। আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই এখন প্রশ্নটি নতুন করে করতে হয়। তারেক রহমান যদি ২১ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড না হন, তাহলে প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড কে? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন: যারা ২১ আগস্টে গ্রেনেড ছুড়েছিল, যারা তাদের অস্ত্র ও আশ্রয় দিয়েছিল, যারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল এবং যারা পরে তদন্তকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদের প্রত্যেককে কি কখনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা হয়েছিল? ২২ বছর পরও এই প্রশ্নগুলোর কোনো পূর্ণাঙ্গ, আদালতে টেকসই উত্তর নেই। ২৪ জন মানুষের মৃত্যু তাই শুধু একটি পুরোনো রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা হয়ে নেই। এটি বাংলাদেশের বিচার ও তদন্তব্যবস্থার জন্যও একটি অসমাপ্ত অধ্যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি মামলায় আসামিদের খালাস পাওয়া আর একটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া এক জিনিস নয়। ২১ আগস্টের ক্ষেত্রে প্রথমটি ঘটেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি এখনো বাকি।



