ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
ঋণ খেলাপিদের ১ লাখ কোটি টাকা সুদ মওকুফ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের সমালোচনা
আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম, আজ থেকেই কার্যকর
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ দাঁড়াল ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায়
শেখ হাসিনা সরকারের স্থাপিত ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় প্রথম বছরেই মুনাফা ২৩৩ কোটি টাকা
সরকারের দাবি ‘ছাড় দেওয়া হয়েছে’, কিন্তু বাজারে কমেনি নিত্যপণ্যের দাম: ওষ্ঠাগত সাধারণ মানুষের প্রাণ
লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার পিছিয়ে শেষ হলো রপ্তানির বছর
গ্যাসের অভাবে বন্ধ ৫৫০ কারখানা, ঝুলে আছে নতুন ১৮০০ আবেদন
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা-অব্যবস্থাপনায় বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ শতাংশ, উদ্বেগে অর্থনীতিবিদরা
দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের অবনতির কারণে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) অন্যতম প্রধান উপাদান ইক্যুইটি বিনিয়োগে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে নতুন আসা বিদেশি মূলধন বা নেট ইক্যুইটি ইনফ্লো আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০.৩৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলারে।
গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত চার প্রান্তিকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন নেট ইক্যুইটি প্রবাহ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইক্যুইটি বিনিয়োগই বিদেশ থেকে দেশে আসা প্রকৃত নতুন পুঁজির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই খাতে এমন তীব্র
পতন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে নতুন শিল্প বা ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ, সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা মিলিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় সব দেশেই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, নতুন সরকারের নীতিমালা কী হবে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে—এসব বিষয় পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে। বাংলাদেশেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে একই প্রবণতা দেখা গেছে বলে তারা মনে করেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রেটিং
সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান (সোভরেন ক্রেডিট রেটিং) একাধিকবার অবনমনও বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেই দেশের ঋণমানকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। একই সঙ্গে তারা মূল্যায়ন করেন, বিনিয়োগের পর অর্জিত মুনাফা ও মূলধন সহজে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের হারও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে। এতে আর্থিক খাতের সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, যা নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন
ডলার। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে কমে জুন প্রান্তিকে ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ১০ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং ডিসেম্বর প্রান্তিকে ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারে নেমে আসে। সেই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থেকে ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে তা আরও কমে ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ—এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে মোট এফডিআই প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মোট এফডিআই এসেছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। তবে এ সময়ে একটি ইতিবাচক
দিকও রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অর্জিত মুনাফার বড় অংশ পুনরায় বিনিয়োগ করেছে। ফলে পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বেড়ে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ১৯ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ডলার। এই পুনঃবিনিয়োগের কারণে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি (এফডিআই স্টক) এক বছরের ব্যবধানে ১৮.৯৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২১.৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ ইতিবাচক হলেও এটি নতুন বিনিয়োগের বিকল্প নয়। একটি অর্থনীতিতে প্রকৃত বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে নতুন বিদেশি মূলধন বা ফ্রেশ ইক্যুইটি কতটা প্রবেশ করছে তার ওপর। নীতিগত
বাধা ও কাঠামোগত সংকট বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের ধারাবাহিক পতন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ কমে যাওয়া একটি উদ্বেগজনক সংকেত, যা প্রমাণ করে যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী নন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্তৃক ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দেওয়া বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত হেনেছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী হার বিদেশে নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে, যা দূর করতে জরুরি সংস্কার ও আর্থিক স্বচ্ছতা প্রয়োজন।” বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। তার ভাষায়, “বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ১.৫ শতাংশ
নগদ প্রণোদনা একটি ইতিবাচক নীতিগত পদক্ষেপ, যা বজায় রাখা উচিত।” তবে তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের বে টার্মিনাল প্রকল্পের মতো বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজি আকর্ষণ করার মতো পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও পাঁচ থেকে সাত বছরের প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।” সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো কাঠামোগত দুর্বলতা। তার মতে, “ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সিস্টেমকে পুরোপুরি কার্যকর ও স্বয়ংক্রিয় করতে না পারা এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় বিদেশি বিনিয়োগে প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের চেয়ে বিনিয়োগকারীরা অবকাঠামোর মান এবং নীতির ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর না করা পর্যন্ত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মন্দাভাব কাটার সম্ভাবনা কম।” বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শুধু বিদেশি নয়, দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও বর্তমানে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, বেসরকারি খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ কমে যাওয়াও একই ধরনের আস্থাহীনতার প্রতিফলন। বিশ্ব বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। ইউনক্টাডের ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আফ্রিকার কয়েকটি ছোট অর্থনীতির চেয়েও পিছিয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘানা, উগান্ডা ও কঙ্গো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনগত, প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে শত শত কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সফল হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘানা ২০২৫ সালের শুরুতে সরকার পরিবর্তনের পর কয়েকটি নির্দিষ্ট কর বাতিল করে, মূল্যস্ফীতি ২১ শতাংশ থেকে ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে আনে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। পাশাপাশি ‘ঘানা ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অথরিটি অ্যাক্ট ২০২৬’ পাস করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন মূলধনের শর্ত বাতিল করা হয়। একইভাবে উগান্ডা বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবা একটি কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেন্টারের আওতায় এনে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করেছে। অন্যদিকে কঙ্গো জ্বালানি খাত বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ যদি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, তাহলে শুধু প্রণোদনা ঘোষণা করলেই হবে না। বিনিয়োগবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতা, আর্থিক খাতে সুশাসন, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, দ্রুত ও কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পতন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে নতুন শিল্প বা ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তাদের মতে, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ, সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা মিলিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় সব দেশেই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, নতুন সরকারের নীতিমালা কী হবে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে—এসব বিষয় পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে। বাংলাদেশেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে একই প্রবণতা দেখা গেছে বলে তারা মনে করেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রেটিং
সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান (সোভরেন ক্রেডিট রেটিং) একাধিকবার অবনমনও বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেই দেশের ঋণমানকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। একই সঙ্গে তারা মূল্যায়ন করেন, বিনিয়োগের পর অর্জিত মুনাফা ও মূলধন সহজে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের হারও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে। এতে আর্থিক খাতের সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, যা নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন
ডলার। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে কমে জুন প্রান্তিকে ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ১০ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং ডিসেম্বর প্রান্তিকে ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারে নেমে আসে। সেই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থেকে ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে তা আরও কমে ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ—এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে মোট এফডিআই প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মোট এফডিআই এসেছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। তবে এ সময়ে একটি ইতিবাচক
দিকও রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অর্জিত মুনাফার বড় অংশ পুনরায় বিনিয়োগ করেছে। ফলে পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বেড়ে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ১৯ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ডলার। এই পুনঃবিনিয়োগের কারণে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি (এফডিআই স্টক) এক বছরের ব্যবধানে ১৮.৯৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২১.৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ ইতিবাচক হলেও এটি নতুন বিনিয়োগের বিকল্প নয়। একটি অর্থনীতিতে প্রকৃত বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে নতুন বিদেশি মূলধন বা ফ্রেশ ইক্যুইটি কতটা প্রবেশ করছে তার ওপর। নীতিগত
বাধা ও কাঠামোগত সংকট বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের ধারাবাহিক পতন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ কমে যাওয়া একটি উদ্বেগজনক সংকেত, যা প্রমাণ করে যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী নন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্তৃক ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দেওয়া বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত হেনেছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী হার বিদেশে নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে, যা দূর করতে জরুরি সংস্কার ও আর্থিক স্বচ্ছতা প্রয়োজন।” বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। তার ভাষায়, “বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ১.৫ শতাংশ
নগদ প্রণোদনা একটি ইতিবাচক নীতিগত পদক্ষেপ, যা বজায় রাখা উচিত।” তবে তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের বে টার্মিনাল প্রকল্পের মতো বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজি আকর্ষণ করার মতো পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও পাঁচ থেকে সাত বছরের প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।” সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো কাঠামোগত দুর্বলতা। তার মতে, “ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সিস্টেমকে পুরোপুরি কার্যকর ও স্বয়ংক্রিয় করতে না পারা এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় বিদেশি বিনিয়োগে প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের চেয়ে বিনিয়োগকারীরা অবকাঠামোর মান এবং নীতির ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর না করা পর্যন্ত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মন্দাভাব কাটার সম্ভাবনা কম।” বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শুধু বিদেশি নয়, দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও বর্তমানে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তার মতে, বেসরকারি খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ কমে যাওয়াও একই ধরনের আস্থাহীনতার প্রতিফলন। বিশ্ব বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। ইউনক্টাডের ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আফ্রিকার কয়েকটি ছোট অর্থনীতির চেয়েও পিছিয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘানা, উগান্ডা ও কঙ্গো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনগত, প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে শত শত কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সফল হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘানা ২০২৫ সালের শুরুতে সরকার পরিবর্তনের পর কয়েকটি নির্দিষ্ট কর বাতিল করে, মূল্যস্ফীতি ২১ শতাংশ থেকে ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে আনে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। পাশাপাশি ‘ঘানা ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অথরিটি অ্যাক্ট ২০২৬’ পাস করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন মূলধনের শর্ত বাতিল করা হয়। একইভাবে উগান্ডা বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবা একটি কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেন্টারের আওতায় এনে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করেছে। অন্যদিকে কঙ্গো জ্বালানি খাত বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ যদি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, তাহলে শুধু প্রণোদনা ঘোষণা করলেই হবে না। বিনিয়োগবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতা, আর্থিক খাতে সুশাসন, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, দ্রুত ও কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



