
ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর

মুরাদনগরে ট্রিপল মার্ডারের ৩৯ ঘন্টা পর মামলা, গ্রেপ্তার ৮

করোনায় একজনের মৃত্যু, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ২৯৪

এসআই পরিচয়ে থানায় তরুণী, কনস্টেবলকে ‘স্যার’ ডেকে ধরা

ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, রানওয়ে দুই ঘণ্টা পর সচল

বিয়ের আসরে বরের মাদক সেবনের অভিযোগ, বন্ধ হয়ে গেলো বিয়ে

চুয়াডাঙ্গায় তেলবাহী ট্রাক-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ৫

জারিন তাসনিমার একক চিত্র প্রদর্শনী ‘মাটি, মূর্তি ও মানস’
টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত সিলেটের নিম্নাঞ্চল, প্রস্তুত আশ্রয় কেন্দ্র

টানা বৃষ্টি ও ভারতের পাহাড়ি ঢলে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে ও চার উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরের বাসিন্দারা। আর জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তাঘাট-বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঢুকেছে পানি। সুরমা-কুশিয়ারার পানি ফুঁস ফুস করছে। বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও যেকোনো সময় ভয়াবহ বন্যা হতে পারে পুরো সিলেট বিভাগে।
ইতোমধ্যে নিম্নাঞ্চলের মানুষ খোঁজ নিচ্ছেন নিরাপদ আশ্রয়ের। বন্যা কবলিত এলাকায় মানুষদের মাঝে ফের ফের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জরুরি যোগাযোগের জন্য কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫৮২টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শনিবার (৩১ মে) টানা
বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন নীচু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক, আবাসিক এলাকা, বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন ও কলেজ ভবনের নিচতলার অফিস ও ক্লাস রুম ডুবে গেছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান। ভোগান্তিতে পড়েছেন ডাক্তার-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিপাকে পড়ছেন অফিসগামী মানুষ, সাধারণ পথচারীরা। শনিবার বিকেল পর্যন্ত গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের কয়েক নীচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এদিকে গোয়াইনঘাট উপজেলার রাধানগর-গোয়াইনঘাট সড়কের কিছু স্থানে পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। ওপরদিকে সারি গোয়াইনঘাট, গোয়াইনঘাট টু সালুটিকর সড়কে যান চলাচলে স্বাভাবিক
রয়েছে। নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাটে পানি উঠায় যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্নাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলের মানুষজন। হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ওসমানী কলেজ ভবন। একইসঙ্গে হাসপাতালের ২৬, ২৭নং ওয়ার্ড রয়েছে ঝুঁকিতে। ছুঁই ছুঁই করছে পানি। যেকোনো সময় পানিতে ভেসে যেতে পারে নিচতলার ওয়ার্ডগুলো। হাসপাতালের ২৬-২৭নং ওয়ার্ডের কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা আতঙ্কে আছেন। যেকোনো সময় তাদের এই ওয়ার্ডে পানি উঠে ব্যাহত হতে পারে চিকিৎসা সেবা। টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত সিলেটের নিম্নাঞ্চল, প্রস্তুত আশ্রয় কেন্দ্র তখনও পানি ঢুকে পড়ে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কলেজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়ও। ডুবে গেছে কয়েকটি প্রধান সড়ক। সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, হাওয়া পাড়া,
রেল স্টেশন, আখালিয়া, সুবিদবাজার, কাজলশাহ, চৌকৌদেখী, যতরপুর, চারাদিঘীরপাড়, সুবিদবাজার, সাগরদিঘীরপাড়, বাগবাড়ী, চৌকিদেখি,পাঠানঠুলা, মেজরটিলা, ইসলামপুর, শাহপরান, দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা, বঙ্গবীর রোড, রিকাবিবাজার, আম্বরখানা, ইলেক্ট্রিসাপ্লাই, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়ক, বাগবাড়ী, উত্তর বাগবাড়ী এলাকা, মিরাবাজার, সুরমাতীরের মহাজনপট্টি, কালিঘাট, কাষ্টঘর, উপশহর-সুবহানীঘাট সংলগ্ন এলাকা, বিমানবন্দর, চৌকীদেখী, শাহপরাণ, কদমতলী ও সংলগ্ন এলাকায়, কাজিরবাজার, তালতলা, জামতলা, মাছিমপুর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। থেমে-থেমে বৃষ্টি থাকার কারণে ভিজে চলাচল করছেন লোকজন। কেউ-কেউ জমে থাকা ময়লাযুক্ত পানি মাড়িয়ে নিজের গন্তব্যে যাচ্ছেন। এসব এলাকার বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের ভেতরে পানিও রয়েছে। নগরের নাইওরপুল ও সোবাহানীঘাট এলাকার বিভিন্ন পণ্যের দোকানে জমে থাকা পানি বালতি দিয়ে সরাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন দোকানিরা। তবে রাস্তাঘাটে
জমে থাকা পানি ও ময়লা সরাতে সিলেট সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের দেখা যায়নি। রাস্তায় কোথাও-কোথাও ময়লার স্তূপ জমে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা ড্রেনের মুখের ময়লা সরিয়ে পানি চলাচল স্বাভাবিক করছেন। এছাড়াও নগরের আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, দাড়িয়াপাড়া, চৌহাট্টা, শিবগঞ্জ, শাহপারণ গেইট, বঙ্গবীর রোড় এলাকায় জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার কানাইঘাটে সুরমার পানি বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৫৬ সেন্টিমিটার, বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেমি। সিলেটে পয়েন্টে ৮ দশমিক ৯৮ সেমি, বিপৎসীমা ১০.৮ সেমি। কুশিয়ারা জকিগঞ্জের অমলসিদে ১২ দশমিক ৯৩ সেন্টিমিটার, বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৪০ সেমি। শেওলা পয়েন্টে ১০ দশমিক ১৮ সেমি, বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ০৫ সেমি। ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ৮ দশমিক ২৪ সেমি,
বিপৎসীমা ৯ দশমিক ৪৫ সেমি। শেরপুর পয়েন্টে ৭ দশমিক ১৯ সেন্টিমিটার, বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৫৫ সেমি। এছাড়া পাহাড়ি নদী কানাইঘাটের লোভাছড়ার পানি বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ০৩ সেমি, বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৫৫ সেমি। জৈন্তাপুরের সারি নদী ১১ দশমিক ২৮ সেমি, বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৩৫ সেমি। জাফলং ডাউকি ১০ দশমিক ৫৮ সেমি, বিপৎসীমা ১৩ সেমি। গোয়াইনঘাট সারি গোয়াইন ১১ দশমিক ২৮ সেমি, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮২ সেমি এবং একই বিপৎসীমায় জেলার কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর ধলাই নদীর পানি বেড়ে ৯ দশমিক ১০ সেন্টিমিটারে পৌঁছেছে। সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আর শনিবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৩টা
পর্যন্ত ১৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।’ সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজীব হোসাইন বলেন, ‘আরও বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ সিলেট অঞ্চলের আকাশে মেঘ রয়েছে এবং বৃষ্টি হচ্ছে।’ গোয়াইনঘাটের দমদমীয়া গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, এখন হাওরে কোন ধান নেই, ধান কাটা শেষ। তাই বন্যা হলেও ধানের ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই।তবে সীমান্তবর্তী অনেক উঁচু জায়গায় সবজি চাষ করা হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সেগুলো ক্ষতি হচ্ছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় গ্রামীণ অনেক রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে যাতায়াতের দুর্ভোগে পড়েছে। গো-চারণ ভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে ভোগান্তি বেড়েছে। অন্যদিকে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গবাদিপশু পালন করেন তারাই বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। গোয়াইনঘাট উপজেলার ঝারিখাল কান্দি গ্রামের আবু তাহের জানান, গত দুই দিনের মুষলধারে বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি বাড়ির চারপাশে বন্যার পানি। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে কিছু সময়ের মধ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাবে। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, টানা কয়েকদিন ধরে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে পানি নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানি দ্রুত নামিয়ে দিতে ড্রেনের ছিদ্র বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস বলেন, ‘সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা সহ সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। তবে কোনো নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ৪১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুইদিন আরও বৃষ্টি হবে; এতে সিলেটের নদ-নদীর পানি বাড়বে। এটাই সতর্কবার্তা।’ নগরীর সাগদিঘীরপাড়ের সিদ্দেক আহমদবলেন, টানা বৃষ্টি কারণে আমার ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। আমরা সকাল থেকে খুবই ভোগান্তিতে পড়েছি। সিসিক যদি সময় মত ছড়া-খাল পরিষ্কার করতো তাহলে মানুষ ভোগান্তিতে পড়তো না। যতরপুরের রুবেল আহমদের সাথে কথা হয় । তিনি বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে আমাদের এলাকা। জলাবদ্ধতার কারণে আমার ঘরে ঢুকে গেছে পানি। ভোগান্তিতে পড়েছি আমরা। সিসিক যদি ছড়া-খাল ও নদী পরিষ্কার না করে তাহলে আমাদের ভোগান্তি কমবে না। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সোমা নামের এক নার্স বলেন, টানা বৃষ্টি কারণে আমাদের হাসপাতাল, কলেজ ভবন ও প্রবেশপথ থেকে ক্যাম্পাসজুড়ে কমর সমান জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পানির কারণে আমরা হাসপাতালে ঢুকতে খুব কষ্ট হয়েছে। এ জলাবদ্ধতা থেকে আমরা মুক্তি চাই। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, বৃষ্টির পানিতে আমাদের হাসপাতাল ও কলেজ ভবনে দুখে পড়েছে। কলেজের ক্লাস রুম ও অফিসে পানি দুখে পড়ায় কর্মকর্তা, কর্মচারী ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। এছাড়া ডাক্তার-নার্স ও তাদের স্বজনরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, উপজেলার গোয়াইনঘাট-রাধানগর সড়কের নীচু কিছু অংশে পানি আছে। তবে উপজেলার কোথাও যান চলাচল বন্ধ হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে প্রশাসনের। পাহাড়ি ঢল এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় হাওরে পানি বাড়ছে। ইতোমধ্যে ৫৮টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত শুকনো খাবার রয়েছে। কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া আক্তার বলেন, উপজেলার দুটি বড় নদী সুরমা ও লোভাছড়ার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে পাহাড়ি ঢলে প্রস্তুতি হিসেবে ৩৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। অবশ্য লোভাছড়ার আশপাশ এলাকার বেশিরভাগ লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে তাদের স্বজনদের বাড়িতে চলে। ইতোমধ্যে ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে, এনজিও ও রেড ক্রিসেন্টের দুর্যোগকালীন উদ্ধার তৎপরতার জন্য ইউনিয়নভিত্তিক ৩০/৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদ বলেন, দুদিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এ পানিতে আমাদের নদ-নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। তবে কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি ও কোনো বসতবাড়িতে প্রবেশ করেনি। বন্যা যদি হয় তার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এছাড়া শুকনো খাবার ও ত্রাণ সামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৫৮২টা আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন নীচু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক, আবাসিক এলাকা, বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন ও কলেজ ভবনের নিচতলার অফিস ও ক্লাস রুম ডুবে গেছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান। ভোগান্তিতে পড়েছেন ডাক্তার-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিপাকে পড়ছেন অফিসগামী মানুষ, সাধারণ পথচারীরা। শনিবার বিকেল পর্যন্ত গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের কয়েক নীচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এদিকে গোয়াইনঘাট উপজেলার রাধানগর-গোয়াইনঘাট সড়কের কিছু স্থানে পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। ওপরদিকে সারি গোয়াইনঘাট, গোয়াইনঘাট টু সালুটিকর সড়কে যান চলাচলে স্বাভাবিক
রয়েছে। নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাটে পানি উঠায় যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্নাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলের মানুষজন। হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ওসমানী কলেজ ভবন। একইসঙ্গে হাসপাতালের ২৬, ২৭নং ওয়ার্ড রয়েছে ঝুঁকিতে। ছুঁই ছুঁই করছে পানি। যেকোনো সময় পানিতে ভেসে যেতে পারে নিচতলার ওয়ার্ডগুলো। হাসপাতালের ২৬-২৭নং ওয়ার্ডের কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা আতঙ্কে আছেন। যেকোনো সময় তাদের এই ওয়ার্ডে পানি উঠে ব্যাহত হতে পারে চিকিৎসা সেবা। টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত সিলেটের নিম্নাঞ্চল, প্রস্তুত আশ্রয় কেন্দ্র তখনও পানি ঢুকে পড়ে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কলেজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়ও। ডুবে গেছে কয়েকটি প্রধান সড়ক। সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, হাওয়া পাড়া,
রেল স্টেশন, আখালিয়া, সুবিদবাজার, কাজলশাহ, চৌকৌদেখী, যতরপুর, চারাদিঘীরপাড়, সুবিদবাজার, সাগরদিঘীরপাড়, বাগবাড়ী, চৌকিদেখি,পাঠানঠুলা, মেজরটিলা, ইসলামপুর, শাহপরান, দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা, বঙ্গবীর রোড, রিকাবিবাজার, আম্বরখানা, ইলেক্ট্রিসাপ্লাই, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়ক, বাগবাড়ী, উত্তর বাগবাড়ী এলাকা, মিরাবাজার, সুরমাতীরের মহাজনপট্টি, কালিঘাট, কাষ্টঘর, উপশহর-সুবহানীঘাট সংলগ্ন এলাকা, বিমানবন্দর, চৌকীদেখী, শাহপরাণ, কদমতলী ও সংলগ্ন এলাকায়, কাজিরবাজার, তালতলা, জামতলা, মাছিমপুর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। থেমে-থেমে বৃষ্টি থাকার কারণে ভিজে চলাচল করছেন লোকজন। কেউ-কেউ জমে থাকা ময়লাযুক্ত পানি মাড়িয়ে নিজের গন্তব্যে যাচ্ছেন। এসব এলাকার বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের ভেতরে পানিও রয়েছে। নগরের নাইওরপুল ও সোবাহানীঘাট এলাকার বিভিন্ন পণ্যের দোকানে জমে থাকা পানি বালতি দিয়ে সরাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন দোকানিরা। তবে রাস্তাঘাটে
জমে থাকা পানি ও ময়লা সরাতে সিলেট সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের দেখা যায়নি। রাস্তায় কোথাও-কোথাও ময়লার স্তূপ জমে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা ড্রেনের মুখের ময়লা সরিয়ে পানি চলাচল স্বাভাবিক করছেন। এছাড়াও নগরের আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, দাড়িয়াপাড়া, চৌহাট্টা, শিবগঞ্জ, শাহপারণ গেইট, বঙ্গবীর রোড় এলাকায় জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার কানাইঘাটে সুরমার পানি বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৫৬ সেন্টিমিটার, বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেমি। সিলেটে পয়েন্টে ৮ দশমিক ৯৮ সেমি, বিপৎসীমা ১০.৮ সেমি। কুশিয়ারা জকিগঞ্জের অমলসিদে ১২ দশমিক ৯৩ সেন্টিমিটার, বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৪০ সেমি। শেওলা পয়েন্টে ১০ দশমিক ১৮ সেমি, বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ০৫ সেমি। ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ৮ দশমিক ২৪ সেমি,
বিপৎসীমা ৯ দশমিক ৪৫ সেমি। শেরপুর পয়েন্টে ৭ দশমিক ১৯ সেন্টিমিটার, বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৫৫ সেমি। এছাড়া পাহাড়ি নদী কানাইঘাটের লোভাছড়ার পানি বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ০৩ সেমি, বিপৎসীমা ৮ দশমিক ৫৫ সেমি। জৈন্তাপুরের সারি নদী ১১ দশমিক ২৮ সেমি, বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৩৫ সেমি। জাফলং ডাউকি ১০ দশমিক ৫৮ সেমি, বিপৎসীমা ১৩ সেমি। গোয়াইনঘাট সারি গোয়াইন ১১ দশমিক ২৮ সেমি, বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৮২ সেমি এবং একই বিপৎসীমায় জেলার কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর ধলাই নদীর পানি বেড়ে ৯ দশমিক ১০ সেন্টিমিটারে পৌঁছেছে। সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আর শনিবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৩টা
পর্যন্ত ১৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।’ সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজীব হোসাইন বলেন, ‘আরও বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ সিলেট অঞ্চলের আকাশে মেঘ রয়েছে এবং বৃষ্টি হচ্ছে।’ গোয়াইনঘাটের দমদমীয়া গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, এখন হাওরে কোন ধান নেই, ধান কাটা শেষ। তাই বন্যা হলেও ধানের ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই।তবে সীমান্তবর্তী অনেক উঁচু জায়গায় সবজি চাষ করা হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সেগুলো ক্ষতি হচ্ছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় গ্রামীণ অনেক রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে যাতায়াতের দুর্ভোগে পড়েছে। গো-চারণ ভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে ভোগান্তি বেড়েছে। অন্যদিকে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গবাদিপশু পালন করেন তারাই বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। গোয়াইনঘাট উপজেলার ঝারিখাল কান্দি গ্রামের আবু তাহের জানান, গত দুই দিনের মুষলধারে বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি বাড়ির চারপাশে বন্যার পানি। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে কিছু সময়ের মধ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাবে। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, টানা কয়েকদিন ধরে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে পানি নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানি দ্রুত নামিয়ে দিতে ড্রেনের ছিদ্র বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস বলেন, ‘সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা সহ সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে। তবে কোনো নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ৪১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুইদিন আরও বৃষ্টি হবে; এতে সিলেটের নদ-নদীর পানি বাড়বে। এটাই সতর্কবার্তা।’ নগরীর সাগদিঘীরপাড়ের সিদ্দেক আহমদবলেন, টানা বৃষ্টি কারণে আমার ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। আমরা সকাল থেকে খুবই ভোগান্তিতে পড়েছি। সিসিক যদি সময় মত ছড়া-খাল পরিষ্কার করতো তাহলে মানুষ ভোগান্তিতে পড়তো না। যতরপুরের রুবেল আহমদের সাথে কথা হয় । তিনি বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে আমাদের এলাকা। জলাবদ্ধতার কারণে আমার ঘরে ঢুকে গেছে পানি। ভোগান্তিতে পড়েছি আমরা। সিসিক যদি ছড়া-খাল ও নদী পরিষ্কার না করে তাহলে আমাদের ভোগান্তি কমবে না। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সোমা নামের এক নার্স বলেন, টানা বৃষ্টি কারণে আমাদের হাসপাতাল, কলেজ ভবন ও প্রবেশপথ থেকে ক্যাম্পাসজুড়ে কমর সমান জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পানির কারণে আমরা হাসপাতালে ঢুকতে খুব কষ্ট হয়েছে। এ জলাবদ্ধতা থেকে আমরা মুক্তি চাই। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, বৃষ্টির পানিতে আমাদের হাসপাতাল ও কলেজ ভবনে দুখে পড়েছে। কলেজের ক্লাস রুম ও অফিসে পানি দুখে পড়ায় কর্মকর্তা, কর্মচারী ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। এছাড়া ডাক্তার-নার্স ও তাদের স্বজনরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, উপজেলার গোয়াইনঘাট-রাধানগর সড়কের নীচু কিছু অংশে পানি আছে। তবে উপজেলার কোথাও যান চলাচল বন্ধ হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে প্রশাসনের। পাহাড়ি ঢল এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় হাওরে পানি বাড়ছে। ইতোমধ্যে ৫৮টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত শুকনো খাবার রয়েছে। কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া আক্তার বলেন, উপজেলার দুটি বড় নদী সুরমা ও লোভাছড়ার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে পাহাড়ি ঢলে প্রস্তুতি হিসেবে ৩৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। অবশ্য লোভাছড়ার আশপাশ এলাকার বেশিরভাগ লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে তাদের স্বজনদের বাড়িতে চলে। ইতোমধ্যে ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে, এনজিও ও রেড ক্রিসেন্টের দুর্যোগকালীন উদ্ধার তৎপরতার জন্য ইউনিয়নভিত্তিক ৩০/৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মোহাম্মদ মাহবুব মুরাদ বলেন, দুদিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এ পানিতে আমাদের নদ-নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। তবে কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি ও কোনো বসতবাড়িতে প্রবেশ করেনি। বন্যা যদি হয় তার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এছাড়া শুকনো খাবার ও ত্রাণ সামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৫৮২টা আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।