ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে সংসদের বিরোধীদল এনসিপির অপতথ্য ও মিথ্যার ফ্লাডিং: জুলাই এর মতো গুজব ছড়িয়ে জনমানুষকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা
মরুর বুকে বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা কি ভেস্তে যেতে বসেছে?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্নীতি কতো, আর ঋণ পরিশোধের দায়ভার কার?
ইউনূসের ‘মার্কিন চুক্তি’ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুতের ভবিষ্যতের পথে
গুলিতে নিহত টিটন ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, সাজা মাফ করে মুক্তি দেন আসিফ নজরুল
‘ভুয়া বিল দেখিয়ে ৬৪ লাখ টাকা নিয়েছেন উপদেষ্টা ফারুকী’
সিন্ডিকেটে বিপর্যস্ত শ্রমরপ্তানি বাজার: দুই মাসে বিদেশগামী কর্মী কমেছে ৪২%
এআই যুগে বাংলাদেশে শিল্পের রূপান্তর ও শ্রমের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন তার যাত্রালগ্ন থেকেই প্রধানত শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি), অন্যান্য উৎপাদন খাত, নির্মাণ, কৃষি এবং বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই মডেল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এবং বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও অর্থনীতিকে একটি মাত্রার স্থিতিশীলতা দিয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কর্মরত; জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। জিডিপিতে এর প্রত্যক্ষ অবদান প্রায় ১১–১২ শতাংশ; বাণিজ্য ও সেবা খাতের সঙ্গে সংযোগের কারণে পরোক্ষ অবদান আরও বেশি। একদিকে এই খাত বাংলাদেশের শিল্পসাফল্যের মেরুদণ্ড, অন্যদিকে বৈদেশিক বাজারের ওঠানামার
প্রতি এটি একটি অন্তর্নিহিত কাঠামোগত ঝুঁকিও তৈরি করে। আরএমজির বাইরে অন্যান্য উৎপাদন কার্যক্রম—যার বড় অংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তানির্ভর—ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে, যদিও উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার মান সর্বত্র সমান নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো একটি ‘প্রথাগত উন্নয়ন পর্যায়’-এর বৈশিষ্ট্য বহন করে, যেখানে শ্রমশক্তির বড় অংশ কম উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষিখাতে এখনো মোট শ্রমশক্তির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ কাজ করলেও জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র ১১–১৪ শতাংশ। মানুষ কোথায় কাজ করছে আর কোথায় মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে—এই দীর্ঘস্থায়ী অমিল একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে তুলনামূলকভাবে সফল হলেও, খাতজুড়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ততটা সফল হয়নি। অন্যদিকে বৈশ্বিক
শিল্পচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং বিশ্বজুড়ে পণ্য উৎপাদন ও সেবা প্রদানের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। এসব প্রযুক্তি যখন বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত না করে কীভাবে শিল্পখাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম প্রযুক্তি গ্রহণ করা যাবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলতে এমন কম্পিউটার ব্যবস্থা বোঝায়, যা সাধারণত মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন হয়—এমন কাজ করতে পারে; যেমন প্যাটার্ন শনাক্ত করা, ভাষা বোঝা, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা জটিল সমস্যা সমাধান। সেন্সর, ডেটা বিশ্লেষণ এবং সংযুক্ত মেশিনের সঙ্গে মিলিত হয়ে এআই যে উৎপাদন পদ্ধতির জন্ম দিচ্ছে, তাকে বলা হয়
‘স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং’। প্রচলিত কারখানায় মেশিনে কেবল উৎপাদন করে; স্বয়ংক্রিয় কারখানায় মেশিন নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চালায়; আর স্মার্ট কারখানায় মেশিন একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, ডেটা থেকে শেখে এবং তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা যন্ত্রকেন্দ্রিকতা থেকে ডেটাকেন্দ্রিকতায় রূপ নিচ্ছে। এতে সন্দেহ নেই যে স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং একঘেয়ে কাজ কমায় এবং দক্ষতা বাড়ায়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি কাঠামোগত দুর্বলতাও উন্মোচিত করে। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ২০–২৫ শতাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বা খুব সীমিত শিক্ষা রয়েছে, আর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত শ্রমিকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের বড় অংশই নিয়মভিত্তিক, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে যুক্ত—যেগুলো স্বয়ংক্রিয়তার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির
মুখে। বিপরীতে, উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত শ্রমশক্তির অংশ—প্রায় ১০–১৫ শতাংশ—প্রকৌশল, উন্নত উৎপাদন, অর্থনীতি বা আইটির মতো জ্ঞাননির্ভর খাতে কাজ করছে। পরিকল্পিত হস্তক্ষেপ না থাকলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির আগেই শ্রমবাজারের একটি বড় অংশকে স্থানচ্যুত বা চাকরিচ্যুত করতে পারে। তবে এই রূপান্তরের আরেকটি দিক প্রায়ই অনালোচিত থাকে। স্বয়ংক্রিয়তা শ্রমকে পুরোপুরি বাদ দেয় না; বরং কাজের ধরন বদলে দেয়। লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক রুটিন কাজ রূপ নিতে পারে যন্ত্র তদারকি, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিকস সমন্বয় কিংবা ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকায়। সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেও শিল্পসংযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীরা কার্যকর ডিজিটাল ও এআই সাক্ষরতা অর্জন করতে পারে। আর যাঁরা প্রযুক্তিনির্ভর ভূমিকায় যেতে
পারবেন না, তাঁদের জন্য এমন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষের উপস্থিতি, দক্ষ হাত ও আন্তঃব্যক্তিক সক্ষমতা অপরিহার্য। সে যাই হোক, এই রূপান্তরের জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনই প্রয়োজনীয় সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সব শিক্ষার্থীর জন্য মৌলিক এআই ও ডেটা সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত; পাশাপাশি প্রকৌশল ও কারিগরি ধারায় আরও বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স চালু করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল ও কলেজ স্তরেও এআই–সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণাভিত্তিক পাঠক্রম ধীরে ধীরে সংযোজন করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থাও এখনো মানুষের বিচারবোধনির্ভর বহু সক্ষমতায় পিছিয়ে—যেমন সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যাকে নতুনভাবে গঠন করার দক্ষতা, নৈতিক
বিবেচনা, নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতাভিত্তিক অন্তর্নিহিত জ্ঞান, আন্তঃবিষয়ক চিন্তা এবং দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতা। তাই ভবিষ্যতের কর্মজগৎ কেবল প্রযুক্তিনির্ভর হবে না; বরং তা হবে গভীরভাবে মানব–প্রযুক্তি সমন্বয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষা মডেলের জন্য এক গভীর সতর্কসংকেত। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মূলত মুখস্থনির্ভরতা ও বিষয়বস্তুর পরিমাণগত বিস্তারে আটকে আছে, যেখানে শেখার প্রক্রিয়া ও দক্ষতা গঠনের দিকে মনোযোগ সীমিত। অথচ দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান, দলগত কাজ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং আজীবন শিক্ষার গুরুত্ব দিয়ে সাজাতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষা সংস্কার এখন আর কেবল শিক্ষাগত পছন্দের বিষয় নয়—এটি ক্রমেই একটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতায় পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। এআই ও স্বয়ংক্রিয়তা ধীরে ধীরে কারখানা, খামার ও সেবা খাতে প্রবেশ করছে, কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ পথচলা নির্ধারণ করবে শুধু প্রযুক্তি নয়। প্রকৃত অগ্রগতি আসবে তখনই, যখন প্রযুক্তি গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হবে সুস্পষ্ট নীতি, শ্রমশক্তির পুনর্দক্ষতা অর্জন এবং উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার পক্ষে একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। প্রশ্নটি আর এই নয় যে স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং আসবে কি না—তা ইতোমধ্যেই এসেছে। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি নিশ্চিত করতে পারবে যে যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে তার মানুষও এগিয়ে যাবে? এম এম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও প্রাক্তন উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
প্রতি এটি একটি অন্তর্নিহিত কাঠামোগত ঝুঁকিও তৈরি করে। আরএমজির বাইরে অন্যান্য উৎপাদন কার্যক্রম—যার বড় অংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তানির্ভর—ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে, যদিও উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার মান সর্বত্র সমান নয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো একটি ‘প্রথাগত উন্নয়ন পর্যায়’-এর বৈশিষ্ট্য বহন করে, যেখানে শ্রমশক্তির বড় অংশ কম উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষিখাতে এখনো মোট শ্রমশক্তির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ কাজ করলেও জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র ১১–১৪ শতাংশ। মানুষ কোথায় কাজ করছে আর কোথায় মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে—এই দীর্ঘস্থায়ী অমিল একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে তুলনামূলকভাবে সফল হলেও, খাতজুড়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ততটা সফল হয়নি। অন্যদিকে বৈশ্বিক
শিল্পচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং বিশ্বজুড়ে পণ্য উৎপাদন ও সেবা প্রদানের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। এসব প্রযুক্তি যখন বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত না করে কীভাবে শিল্পখাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম প্রযুক্তি গ্রহণ করা যাবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলতে এমন কম্পিউটার ব্যবস্থা বোঝায়, যা সাধারণত মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন হয়—এমন কাজ করতে পারে; যেমন প্যাটার্ন শনাক্ত করা, ভাষা বোঝা, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা জটিল সমস্যা সমাধান। সেন্সর, ডেটা বিশ্লেষণ এবং সংযুক্ত মেশিনের সঙ্গে মিলিত হয়ে এআই যে উৎপাদন পদ্ধতির জন্ম দিচ্ছে, তাকে বলা হয়
‘স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং’। প্রচলিত কারখানায় মেশিনে কেবল উৎপাদন করে; স্বয়ংক্রিয় কারখানায় মেশিন নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চালায়; আর স্মার্ট কারখানায় মেশিন একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, ডেটা থেকে শেখে এবং তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা যন্ত্রকেন্দ্রিকতা থেকে ডেটাকেন্দ্রিকতায় রূপ নিচ্ছে। এতে সন্দেহ নেই যে স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং একঘেয়ে কাজ কমায় এবং দক্ষতা বাড়ায়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি কাঠামোগত দুর্বলতাও উন্মোচিত করে। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ২০–২৫ শতাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বা খুব সীমিত শিক্ষা রয়েছে, আর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত শ্রমিকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের বড় অংশই নিয়মভিত্তিক, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে যুক্ত—যেগুলো স্বয়ংক্রিয়তার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির
মুখে। বিপরীতে, উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত শ্রমশক্তির অংশ—প্রায় ১০–১৫ শতাংশ—প্রকৌশল, উন্নত উৎপাদন, অর্থনীতি বা আইটির মতো জ্ঞাননির্ভর খাতে কাজ করছে। পরিকল্পিত হস্তক্ষেপ না থাকলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির আগেই শ্রমবাজারের একটি বড় অংশকে স্থানচ্যুত বা চাকরিচ্যুত করতে পারে। তবে এই রূপান্তরের আরেকটি দিক প্রায়ই অনালোচিত থাকে। স্বয়ংক্রিয়তা শ্রমকে পুরোপুরি বাদ দেয় না; বরং কাজের ধরন বদলে দেয়। লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক রুটিন কাজ রূপ নিতে পারে যন্ত্র তদারকি, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিকস সমন্বয় কিংবা ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকায়। সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেও শিল্পসংযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীরা কার্যকর ডিজিটাল ও এআই সাক্ষরতা অর্জন করতে পারে। আর যাঁরা প্রযুক্তিনির্ভর ভূমিকায় যেতে
পারবেন না, তাঁদের জন্য এমন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষের উপস্থিতি, দক্ষ হাত ও আন্তঃব্যক্তিক সক্ষমতা অপরিহার্য। সে যাই হোক, এই রূপান্তরের জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনই প্রয়োজনীয় সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সব শিক্ষার্থীর জন্য মৌলিক এআই ও ডেটা সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত; পাশাপাশি প্রকৌশল ও কারিগরি ধারায় আরও বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স চালু করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল ও কলেজ স্তরেও এআই–সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণাভিত্তিক পাঠক্রম ধীরে ধীরে সংযোজন করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থাও এখনো মানুষের বিচারবোধনির্ভর বহু সক্ষমতায় পিছিয়ে—যেমন সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যাকে নতুনভাবে গঠন করার দক্ষতা, নৈতিক
বিবেচনা, নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতাভিত্তিক অন্তর্নিহিত জ্ঞান, আন্তঃবিষয়ক চিন্তা এবং দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতা। তাই ভবিষ্যতের কর্মজগৎ কেবল প্রযুক্তিনির্ভর হবে না; বরং তা হবে গভীরভাবে মানব–প্রযুক্তি সমন্বয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষা মডেলের জন্য এক গভীর সতর্কসংকেত। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মূলত মুখস্থনির্ভরতা ও বিষয়বস্তুর পরিমাণগত বিস্তারে আটকে আছে, যেখানে শেখার প্রক্রিয়া ও দক্ষতা গঠনের দিকে মনোযোগ সীমিত। অথচ দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান, দলগত কাজ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং আজীবন শিক্ষার গুরুত্ব দিয়ে সাজাতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষা সংস্কার এখন আর কেবল শিক্ষাগত পছন্দের বিষয় নয়—এটি ক্রমেই একটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতায় পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। এআই ও স্বয়ংক্রিয়তা ধীরে ধীরে কারখানা, খামার ও সেবা খাতে প্রবেশ করছে, কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ পথচলা নির্ধারণ করবে শুধু প্রযুক্তি নয়। প্রকৃত অগ্রগতি আসবে তখনই, যখন প্রযুক্তি গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হবে সুস্পষ্ট নীতি, শ্রমশক্তির পুনর্দক্ষতা অর্জন এবং উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার পক্ষে একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। প্রশ্নটি আর এই নয় যে স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং আসবে কি না—তা ইতোমধ্যেই এসেছে। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি নিশ্চিত করতে পারবে যে যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে তার মানুষও এগিয়ে যাবে? এম এম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও প্রাক্তন উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ



