পলাশীর পতনের ঠিক ১৯২ বছর পরে বাংলার জেগে ওঠার উপখ্যান – ইউ এস বাংলা নিউজ




হাসান মোর্শেদ, লেখক ও ইতিহাস গবেষক।
আপডেটঃ ২৩ জুন, ২০২৬

পলাশীর পতনের ঠিক ১৯২ বছর পরে বাংলার জেগে ওঠার উপখ্যান

হাসান মোর্শেদ, লেখক ও ইতিহাস গবেষক।
আপডেটঃ ২৩ জুন, ২০২৬ |
নিও মুসলিমলীগার ও জামায়াতীদের একটা ন্যারেটিভ হচ্ছে- পাকিস্তান হওয়াতে জমিদারী বাতিল হয়ে কৃষকের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। ’৪৭ কে ’৭১-এর চেয়ে বৃহৎ দেখাতে গিয়ে এই ন্যারেটিভ ছড়ায়। আসল কাহিনী কী? তাদের নিজেদের ভূমিকা কী ছিলো? পড়ার আগ্রহ আছে যাদের, তাঁদের জন্যঃ ২৩ জুন ১৭৫৭। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটলো। শুরু হলো বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন। সেই সাথে শুরু হলো ভূমির উপর কৃষকের অধিকার খর্ব হওয়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস। সুলতানি আমল থেকে মুঘল আমল পর্যন্ত প্রচলিত ব্যবস্থায় সমস্ত ভূমির মালিক ছিলেন সুলতান বা সম্রাট। কৃষক জমির মালিক ছিলেন না। তবু রাষ্ট্রকে সরাসরি কর দেওয়ার বিনিময়ে তিনি পেতেন বংশানুক্রমিক চাষের অধিকার।

মাঝে ছিলেন কর আদায়ের মধ্যস্বত্বভোগীরা- সুবাদার থেকে জমিদার। এসময় জমিদার মানে জমির মালিক নন, দায়িত্বশীল। কৃষকের কাছ থেকে কর আদায়ের জন্য রাষ্ট্রের নিযুক্ত কর্মচারী। এই শ্রেণিতে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই ছিলেন। ব্রিটিশরা ক্ষমতা নেওয়ার পর এই সম্পর্ক ভেঙে দিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী জমিদারকেই চিরস্থায়ীভাবে জমির মালিক বানানো হলো। তিনি নির্দিষ্ট হারে রাষ্ট্র( ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী)কে কর দিতে থাকবেন, কিন্তু কার কাছ থেকে কী পরিমানে কর আদায় করবেন না উদ্বৃত্ত কর কিভাবে ব্যায় করবেন তাতে রাষ্ট্রের কিছু যায় আসেনা। কৃষক এতদিন ছিলেন সুলতান বা সম্রাটের প্রজা, সরাসরি রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত। এবার হয়ে গেলেন জমিদারের প্রজা,রাষ্ট্র তাঁকে আর চিনে না। বংশানুক্রমিক

চাষের অধিকার গেল। জমিদার চাইলে জমি চাষ করতে দিবেন, না চাইলে দেবেন না। কৃষক কতটুকু শোষিত হচ্ছেন সে প্রশ্নে বৃটিশের কোনো মাথাব্যথা রইল না। এর ফলে বাংলায় ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলো আশংকাজনকভাবে। বাংলায় নতুন জমিদার শ্রেণির অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু, কিছু মুসলমানও ছিলেন। আর তাদের প্রজা কৃষকদের অধিকাংশ মুসলমান, উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নিম্নবর্ণের হিন্দুও। ভূমি ও অর্থনীতির এই শ্রেণিসংঘাত বিশ শতকের গোড়ায় ধর্মীয় রূপ নিল। জন্ম হলো কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভার। তিনটি দলের নেতৃত্বেই জমিদার শ্রেণি। কৃষকের অধিকারের কথা প্রথম কমিউনিস্টরা বললেন তাঁদের পার্টি এজেন্ডা অনুযায়ী। কিন্তু বাংলায় এই বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে প্রথম কার্যকর ভূমিকা নিলেন ফজলুল হক। তাঁর কৃষক প্রজা

পার্টি জমিদারি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জিতল। কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন না, সরকার গঠনে কংগ্রেসের সমর্থন চাইলেন। ফজলুল হক সরকার গঠন করলে জমিদারী বাতিল করবে, এই আশংকায় কংগ্রেস সমর্থন দিল না। বাধ্য হয়ে মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করলেন। মুসলিম লীগ তাঁকে ব্যবহার করল ভিন্ন উদ্দেশ্যে। ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনে তাঁকে দিয়েই পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করাল। সেই প্রস্তাবে জমিদারি উচ্ছেদ বা কৃষকের ভূমির অধিকারের কোনো কথাই ছিল না।(খেয়াল করতে হবে) ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হলো। কেন্দ্রে ও পূর্ব বাংলায় ক্ষমতায় এলেন মুসলিম লীগের সামন্ত নেতারা। বিশাল বিশাল জমিদারির মালিক তারা নিজেরাই। মধ্যবিত্ত শ্রেণি কোণঠাসা। এই পরিস্থিতিতে দুই

বছর পরে জন্ম নিল নতুন একটি রাজনৈতিক দল। তাদের ঘোষণাপত্রে বলা হলো: জমিদারি প্রথা অবিলম্বে বিনা ক্ষতিপূরণে উচ্ছেদ করতে হবে; ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন করতে হবে; রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে সমবায় ও যৌথ খামার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলায় জমিদারি উচ্ছেদ আইন করল। কিন্তু সঙ্গে রাখল জমিদারদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা। উদ্দেশ্য স্পষ্ট। জমি গেলেও জমিদার যেন পুঁজির মালিক থাকেন, শ্রেণি যেন না বদলায়। যে কৃষকরা জমিদারীর জমিতে অনেকদিন থেকে চাষ করতেন তারা জমির মালিক হলেন কিন্তু অধিগ্রহনকৃত জমি বিশাল সংখ্যক ভূমিহীনের মধ্যে বন্টন হলো না। জমির মালিকানাপ্রাপ্ত কৃষক হয়ে উঠলেন আরেক ক্ষমতাশ্রেনী, তাদের নীচে বিশাল সংখ্যক ভূমিহীন মানুষ।

জমিদারীর ক্ষতিপূরন নিয়ে শুরু হলো সমালোচনা। এই সময় মাঠে নামলেন জামায়াতে ইসলামীর মওলানা মওদূদী। পশ্চিম পাকিস্তানের বড় জমিদাররা তাঁকে সামনে আনলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, পূর্ব বাংলার অভিজ্ঞতা পশ্চিমেও ছড়াবে। মওদূদী জনসভা করলেন, বক্তৃতা দিলেন, পত্রিকায় কলামের পাশাপাশি আস্ত একটি বই লিখলেন-মাসআলা-ই-মিলকিয়ত-ই-জমিন। তাঁর অবস্থানের দুটি পয়েন্ট দাঁড়ালো : ১। ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমিদারের সম্পত্তি অধিগ্রহণ ইসলামবিরোধী, কারণ ইসলাম ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার দেয়। ২। রাষ্ট্র ব্যক্তিগত সম্পত্তির উর্ধ্বসীমা(সিলিং) নির্ধারিত করতে পারেনা, এটা ইসলাম বিরোধী। ইসলাম ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার অবশ্যই দেয় কিন্তু জমিদাররা যে প্রক্রিয়ায় জমির মালিক হলো সেটি অন্যায্য- মওদূদী তা এড়িয়ে গেলেন। এড়িয়ে গেলেন ৭ম শতাব্দীতে উত্থাপিত হযরত আবু জর আল-গিফারির সেই

প্রশ্নও। কোরআন শরিফের আয়াতের ভিত্তিতে তিনি গভর্নর মুয়াবিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন: ইসলাম ঠিক কতটুকু সম্পদের মালিকানা অনুমোদন করে? মওদূদী এড়িয়ে গেলেন খলিফা উমর (রা.)-এর ভূমিনীতিও। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ইশতেহারে আবার এলো পুরনো দাবি। ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমিদারি উচ্ছেদ, পাটের জাতীয়করণ, ভূমি বন্টন,সমবায় কৃষি। এরপর এলো ১৯৫৬ সাল। পাকিস্তানের সংবিধান রচনা হচ্ছে। করাচীতে গণপরিষদের বিতর্কে পূর্ব বাংলা থেকে আসা এক তরুণ সদস্য মওদূদীর ফতোয়ার তীব্র সমালোচনা করলেন। বললেনঃ ফতোয়া কেনা কঠিন নয়। টাকা থাকলে ফতোয়া পাওয়া যায়। তারপর মূল প্রশ্নটা করলেন: এক মানুষের হাতে পঞ্চাশ হাজার একর জমি, পাশে মানুষ না খেয়ে মরছে। এটা কোন ইসলাম? ইসলামে সাম্যের কথা আছে, ভ্রাতৃত্বের কথা আছে। সীমাহীন সম্পদ কুক্ষিগত করার বৈধতা ইসলামে নেই। যারা সেই বৈধতা দিচ্ছেন, তারা ইসলামের কথা বলছেন না। একটি শ্রেণির স্বার্থের কথা বলছেন। কিন্তু গোটা পাকিস্তান আমল জুড়ে ভুমিহীনদের প্রাপ্তি হলো না। কিছু জায়গায় স্থানীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কিছু খাসজমি হয়তো বিতরন হলো কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভূমিহীন বিষয়ে রাষ্ট্রের কোন নীতি গৃহীত হলো না। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সাল। ১৯৫৬-এর সেই তরুন গণপরিষদ নেতা ততোদিনে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর নেতৃত্বে নতুন রাষ্ট্র- বাংলাদেশ- জন্ম নিলো। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শনে একটি নতুন বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসলো -ভূমিহীন মানুষের অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করা হলো। সংবিধানের ১৩, ১৪, ১৫ ও ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়ের ধারণা প্রতিফলিত হলো। ১৯৭৫ সালের আগষ্টে মাসের আগে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে সমবায় ও যৌথ খামার প্রতিষ্ঠারও কর্মসূচী নেয়া হলো যা ১৯৪৯ সালের প্রতিষ্ঠাকালীন ম্যানিফেস্টোতে ছিলো। ১৯৪৯ সালের তারিখটি ছিলো ২৩ জুন। পলাশীর পতনের ঠিক ১৯২ বছর পরে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
ওয়াইফাইয়ের গতি বাড়াতে যা করবেন টাকায় মেলে বিচারকের স্বাক্ষর তিনগুণ মূল্যে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব পেট্রোনাসের বনের নৈসর্গিক পরিবেশে বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির অনন্য মিলনমেলা: নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হলো চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬ ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে চীনের ১১টি জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন, বাড়ছে সামরিক চাপ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টকে ‘চোর’ বললেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট: রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহারের ঘোষণা ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ফাইনালের পরেই রেফারিং ছাড়লেন স্লাভকো ভিনচিচ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কাব্রালের বাঁকানো শট ‘বিশ্বকাপের সেরা গোল’ কোটা সংস্কারের পর বিসিএসে নারীদের নিয়োগে বড় পতন, প্রশ্নের মুখে সংস্কার ভারতের বাংলাদেশ সফর ঝুলে থাকার আবহেই মিরাজের সাক্ষাৎকার: বরফ গলবে কি? ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে মার খাননি দাবি করে আম্মার- ‘আমরা মাইর খাইনি, মাইর দিয়েছি’ ঢাকার উত্তরায় ১০ মিনিটের ব্যাবধানে দুটি বোমা বিস্ফোরণ, জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সড়কে ঝুলছিল নাহিদ-হাসনাতদের কুশপুতুল, স্থানীয়দের ভাষ্য- ‘লীগের ঘাড়ে দোষ চাপাতে নিজেরাই ঝুলিয়েছে’ আয়ালার ক্ষমা প্রত্যাখ্যান করে মিথ্যাচারের অভিযোগ ওলমোর জঙ্গল সলিমপুরে নাশকতা: যৌথ বাহিনীর পানির পাইপ কেটে ঢালা হয় বিষ, ঝুঁকিতে স্কুলশিশুরাও বরুড়ায় একের পর এক পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি, ছাত্রদল সভাপতিসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ঢাকায় বিদ্যুৎ বিলের ভয়াবহ বৃদ্ধি: একই ব্যবহারে আগের মাসের চেয়ে আসছে দ্বিগুণ-তিনগুণ বিল! মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করা যুক্তরাষ্ট্র এবার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ডাটাবেজ তৈরিতে আগ্রহী! যুবদল নেতাকে খুন করতে ২৫ লাখে খুনি ভাড়া করেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আমেরিকা ফার্স্ট নীতি? যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতেই ২৩৭ কোটি টাকা গচ্চায় গম কিনছে বিএনপি সরকার