ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের ভাঙচুর ও নাশকতার দায় স্বীকার ছাত্রদলের
সারাদেশে আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস গুঁড়িয়ে দিয়েছিলাম, ছাত্রদল সভাপতি রাকিবের স্বীকারোক্তি
জুলাই সিডিআই বলায় শাওনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ, নাম আছে মাহিরও
তারেক রহমান: বিচারের নামে কারো প্রতি যেন ‘অবিচার’ করা না হয়
জুলাই চেতনা নিয়ে ব্যবসা, যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ভোটার হওয়ার সময় বাড়ল
‘বিবেক কাজ করেনি’, এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে বিদ্যালয়ে মদ্যপান-মাতলামির পর প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য
এক জোড়া স্যান্ডেল
রামিসার স্মৃতির উদ্দেশে
– এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) সাদে উদ্দিন আহমেদ
(বিএসপি, বিইউপি, এনডিসি, এনএসডব্লিউসি, পিএসসি)
সকালটা শুরু হয়েছিল আর দশটা সকালের মতোই। ঠিক যেমন শুরু হয় হাজার হাজার সাধারণ সকাল-যাদের কেউ মনে রাখে না, কারণ মনে রাখার মতো কিছুই থাকে না তাদের মধ্যে।
পল্লবীর সরু গলিটায় তখন রিকশার ঘণ্টি, চায়ের দোকানের চুলায় ফুঁ দেওয়ার শব্দ, আর স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের গলার আওয়াজ মিলে এক ধরনের পরিচিত কোলাহল। সেই কোলাহলের ভেতর রামিসার মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে টিফিন বাক্সে ভাত আর ডিম ভরছিলেন-একটু বেশি করেই, কারণ মেয়েটা টিফিনের অর্ধেক বন্ধুদের ভাগ করে দিত। মেয়ের সাদা স্কুল-জামাটা চেয়ারের পিঠে ঝোলানো, ইস্ত্রি করা, ভাঁজ এখনও টানটান। কলারের কোণে
একটা ছোট্ট দাগ-কাল আমের আচার খেতে গিয়ে লাগিয়েছিল, মা ঘষে তুলেছেন। “রামিসা! দেরি হয়ে যাচ্ছে তো, মা!” ভেতরের ঘর থেকে কোনো সাড়া এলো না। আট বছরের একটা মেয়ে সকালবেলা কোথায় যেতে পারে? এই ভাবনাটুকুও তখন মায়ের মনে আতঙ্ক হয়ে ওঠেনি। হয়তো নিচে নেমে গেছে, হয়তো পাশের ফ্ল্যাটের কারও সঙ্গে গল্প করছে। মেয়েটা এমনই-সবার সঙ্গে ভাব, সবার কোলে চড়া, সবাইকে “চাচা”, “খালা”, “আপু” ডাকা। যে পৃথিবীতে সে বড় হচ্ছিল, সেই পৃথিবীর প্রতিটা দরজাই তার কাছে খোলা মনে হতো। কোনো দরজার ওপাশে যে অন্ধকার থাকতে পারে, এই কথাটা তাকে কেউ শেখায়নি। কে-ই বা শেখায় আট বছরের মেয়েকে এমন কথা? মা চটি পায়ে বারান্দায় এলেন। আর তখনই
তাঁর চোখ আটকে গেল। মুখোমুখি ফ্ল্যাটটার দরজার সামনে পড়ে আছে এক জোড়া ছোট্ট স্যান্ডেল। গোলাপি রঙের, একপাশে একটা ফুলের স্টিকার আধখোলা হয়ে ঝুলছে। রামিসার স্যান্ডেল। কাল রাতেও মেয়েটা ওই স্যান্ডেল পরে ছাদে উঠেছিল, দুই বোন মিলে তারা গুনতে। স্যান্ডেল দু’টো পড়ে আছে এলোমেলো নয়-পাশাপাশি, একটু গোছানো। যেন কেউ ঢোকার আগে ভদ্রতা করে খুলে রেখেছে। যেন কেউ বলেছিল, “জুতা খুলে আসো, মা।” আর সে খুলে এসেছে-বিশ্বাস করে, নির্ভয়ে, যেভাবে শিশুরা সবকিছু বিশ্বাস করে। মা প্রথমে ভাবলেন-খেলতে গিয়ে খুলে রেখে এসেছে, এমনই করে ও। হেসে দরজায় টোকা দিলেন। “ভাবি? রামিসা আছে আপনার ওখানে? স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।” ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। আবার টোকা। এবার একটু জোরে। “ভাবি? দরজাটা
খুলুন তো একটু।” ভেতরে কারও পায়ের আওয়াজ, একটা চাপা গলা, তারপর আবার নীরবতা। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। সেই বন্ধ দরজার ওপাশে যে নীরবতা, সেটা মায়ের বুকের ভেতর প্রথমবারের মতো একটা শীতল হাত বুলিয়ে দিল। মায়েরা এই হাতটা চেনে। অনেক আগে থেকে চেনে, ব্যাখ্যা করতে পারার অনেক আগে থেকে। তিনি জানতেন না, দরজার ঠিক ওপাশে তখন কী ঘটে গেছে। জানতেন না, ওই দু’মাস আগে আসা নতুন প্রতিবেশীর ঘরে তাঁর মেয়ের গল্পটা শেষ হয়ে গেছে চিরতরে। তিনি শুধু জানতেন, একটা মা যা জানে-তাঁর সন্তান কাছে নেই, আর কোথাও একটা ভয়ংকর ভুল হয়ে গেছে। তাঁর হাত দু’টো তখনও ভাত-ডিমের গন্ধমাখা। তিনি চিৎকার করতে শুরু করলেন। সেই
চিৎকার গলির এ মাথা থেকে ও মাথা পৌঁছে গেল-কিন্তু যে দরজার ভেতরে পৌঁছানো দরকার ছিল, সেই দরজা ততক্ষণে চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। রামিসাকে আমি চিনতাম তার বাবার চোখ দিয়ে। বাবা-আবদুল হান্নান-রিকশায় বসে সবসময় মেয়ের গল্প করতেন। কারও কাছে নয়, নিজের মনে মনে, ঠোঁট নেড়ে। যেন মেয়েটা পাশে বসে আছে, যেন প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে তিনি তাকে দিনের গল্প শোনাচ্ছেন। “জানো, আমার বড় মেয়েটা একদিন ডাক্তার হবে,” বলতেন তিনি প্রতিবেশী চায়ের দোকানদারকে। “ছোটটা তো এখনও দুষ্টু, কিন্তু রামিসা-রামিসা বড় শান্ত। বইয়ের পোকা। রাতে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ে, আমি গিয়ে বই সরিয়ে আলো নিভিয়ে দিই।” মেয়ের হাতে একটা ছোট্ট ঘড়ি কিনে দিয়েছিলেন তিনি, গোলাপি
ফিতের। মাসের শেষে যখন হাতে টাকা থাকত না, পকেটে ভাঙতি গুনে গুনে ঘরে ফিরতেন, তখনও মেয়ের আবদার ফেলতে পারতেন না। রামিসা সেই ঘড়িটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বড় মানুষের মতো ভান করত-“আজ আমার অনেক কাজ, বুঝলে?”-আর ছোট বোনটা খিলখিল করে হাসত। ঘড়িটার কাঁটা ঠিকমতো ঘুরত না, একটু পিছিয়ে যেত রোজ। বাবা ভাবতেন, ঠিক করিয়ে দেবেন। সময় তো ছিল হাতে। সবাই ভাবে সময় হাতে আছে। মেয়েটার ফুল ভালো লাগত। গলির মোড়ের ফুলওয়ালার কাছ থেকে এক টাকা-দু’টাকার গাঁদা, রজনীগন্ধা-যা পেত, কিনে এনে চুলে গুঁজত। কোনো অনুষ্ঠান লাগত না, কারণ লাগত না। তার কাছে প্রতিটা দিনই উৎসব ছিল। বাবা বলতেন, “আমার মেয়েটা যেখানে যায়,
সেখানেই যেন একটু আলো জ্বলে ওঠে।” ছোট বোনটা ছিল তার ছায়া। যেদিকে রামিসা, সেদিকেই সে। বড় বোনের শাড়ি পরা দেখে নিজেও মায়ের ওড়না জড়িয়ে নিত। দুই বোন মিলে সন্ধেবেলা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনত, আর হেরে গিয়ে ঝগড়া করত কে আগে গুনতে শুরু করেছিল। সেই ছোট বোনটা আজও মাঝে মাঝে রাতে উঠে বসে, পাশে হাত বুলিয়ে খোঁজে-আপু কই? কেউ তাকে বুঝিয়ে বলতে পারে না, এমন এক জায়গায় সে গেছে যেখান থেকে কেউ ফেরে না। ছয় বছরের একটা শিশুকে “মৃত্যু” শব্দটা কীভাবে বোঝাবেন কেউ? এই ছিল রামিসা। আট বছরের একটা পৃথিবী-যেখানে সবচেয়ে বড় দুঃখ ছিল হোমওয়ার্ক, আর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল বড় হওয়া। আমরা তাকে চিনলাম যখন আর চেনার কিছু রইল না। মানুষ এসে জমে গিয়েছিল সেই সরু গলিতে। দরজা ভাঙা হলো। ভেতরে যা পাওয়া গেল, তা এই গল্পের অংশ নয়। কিছু দৃশ্য মানুষের লেখার অধিকার নেই। কিছু সত্য এত নির্মম যে তা শুধু নীরবতাতেই ধারণ করা যায়। আমি লিখব না, কারণ লিখলে সেই নীরবতাটুকুও আমরা তার কাছ থেকে কেড়ে নেব-আর ওই নীরবতাটুকুই এখন তার একমাত্র আবরণ। আমি শুধু এটুকু লিখতে পারি-যে দরজার বাইরে এক জোড়া ছোট্ট স্যান্ডেল গোছানো ছিল, সেই দরজার ভেতরে একটা শিশুর জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল তারই প্রতিবেশীর হাতে। যে লোকটা দু’মাস আগে এসেছিল মুখোমুখি ফ্ল্যাটে। যাকে রামিসা হয়তো “চাচা” বলে ডাকত। যার দরজায় টোকা দিতে তার ভয় ছিল না, কারণ ভয় থাকার কথাও না। ভয়টা আমাদের শেখানোর কথা ছিল। আমরা শেখাইনি। আমরা ভেবেছিলাম, পাশের দরজা নিরাপদ। আমরা ভাবি বিপদ বুঝি দূর থেকে আসে। অপরিচিত রাস্তা থেকে, অন্ধকার গলি থেকে, অচেনা মুখ থেকে। আমরা সন্তানকে শেখাই-অচেনা লোকের সঙ্গে যেও না, অচেনা কিছু খেও না। কিন্তু কখনও কখনও বিপদ অপেক্ষা করে ঠিক পাশের দরজার ওপাশে-যে দরজা আমরা প্রতিদিন নির্ভয়ে পার হই, যে দরজায় হাসিমুখে সালাম দিই, যার ভেতরের মানুষটাকে আমরা “ভালো লোক” বলে জানি। মা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তখনও টোকা দিচ্ছিলেন। আর ভেতরে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অপেক্ষা করছিল-ঠান্ডা মাথায়, যথেষ্ট সময় নিয়ে, যেন আরেকজন পালাতে পারে। একজন মা যখন তাঁর সন্তানের নাম ধরে দরজায় টোকা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখন ওই দরজার ওপাশে হিসেব কষা হচ্ছিল-কীভাবে আড়াল করা যায়, কীভাবে সময় কেনা যায়। এই বাক্যটা আমি লিখি, আর আমার হাত কাঁপে। রামিসাকে শুইয়ে দেওয়া হলো মুন্সিগঞ্জে, তার দাদা-দাদির পাশে। যে মাটিতে তার শেকড়, সেই মাটিতেই সে ফিরে গেল-কিন্তু এমন এক বয়সে, যে বয়সে শেকড়ের কথা ভাবার কথাই নয়। যে বয়সে মাটি মানে খেলার মাঠ, কবর নয়। ছোট্ট একটা কবর। এত ছোট যে তা দেখলে বুক ভেঙে আসে-কারণ কবরের মাপ বলে দেয়, এখানে একটা গোটা জীবন নয়, একটা সবে-শুরু-হওয়া জীবন শুয়ে আছে। যে জীবনের এখনও স্কুল শেষ হয়নি, প্রথম পরীক্ষার রেজাল্ট দেখা হয়নি, ডাক্তার হওয়া হয়নি। জানাজায় হাজার মানুষ। কান্না। স্লোগান। ক্যামেরা। মাইক। আর সবার মাঝখানে একজন বাবা, যিনি আর কাঁদতে পারছিলেন না। কান্নারও তো একটা শেষ আছে। তারপর যা থাকে, তা কান্নার চেয়েও ভয়ংকর-এক ধরনের শূন্যতা, যেখানে কোনো শব্দ পৌঁছায় না। যে শূন্যতায় মানুষ চোখ খোলা রেখেও কিছু দেখে না। সাংবাদিকরা তাঁর কাছে গেলেন। মাইক বাড়িয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি বিচার চান?” বাবা মুখ তুললেন। তাঁর চোখ দু’টো শুকনো, লাল, এবং ভয়ংকর রকমের শান্ত। “আমি বিচার চাই না,” তিনি বললেন। “কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। এটা বড়জোর পনেরো দিন চলবে। তারপর আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। আর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।” তিনি ভুল বলেননি। এক শোকার্ত বাবার মুখে এর চেয়ে নিষ্ঠুর সত্য আর কী হতে পারে-যে তিনি বিচার চান না, কারণ তিনি বিচারে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। সন্তান হারানোর শোকের চেয়েও বড় একটা জিনিস হারিয়েছেন তিনি: আশা। তাঁর এই অবিশ্বাস কোনো ব্যক্তিগত হতাশা নয়। এটা একটা গোটা সমাজের ব্যর্থতার দলিল। কারণ তিনি দেখেছেন। আমরা সবাই দেখেছি। আমরা দেখেছি একটার পর একটা শিশুর মুখ-খবরের কাগজে, টিভির পর্দায়, ফেসবুকের নিউজফিডে। কয়েকদিন উত্তাল হই আমরা। হ্যাশট্যাগ লিখি। প্রোফাইল পিকচার কালো করি। মোমবাতি জ্বালাই। তারপর- তারপর আরেকটা খবর আসে। আরেকটা মুখ। আগেরটা চাপা পড়ে যায় নতুনটার নিচে। বিচারের ফাইল ধুলো জমে জমে হারিয়ে যায় হাজার হাজার ঝুলে থাকা মামলার ভিড়ে। মোমবাতিগুলো গলে শেষ হয়ে যায়। আর শোকার্ত পরিবারটা পড়ে থাকে-একা, ক্যামেরা চলে যাওয়ার পর, একটা ছবি বুকে নিয়ে। বাবা সেটাই বলতে চেয়েছিলেন। তাঁর মেয়ের ভাগ্যেও কি তবে তাই লেখা? আমি বারবার রামিসার একটা ছবির দিকে তাকাই। ছবিটায় ও ফুল হাতে দাঁড়িয়ে। মুখটা একটু পাশ ফেরানো-যেন কেউ এইমাত্র ওর নাম ধরে ডেকেছে, আর ও ঘুরে তাকাতে যাচ্ছে। হয়তো এক্ষুনি হাসবে। ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে হয়তো কেউ বলেছিল, “এদিকে তাকাও, মা।” আর ও পুরোপুরি তাকায়নি। বাচ্চারা এমনই হয়-অর্ধেক ফ্রেমে, অর্ধেক অন্য কোথাও, অন্য কোনো ভাবনায়। হয়তো ভাবছিল, ছবি তোলা হয়ে গেলে আবার খেলতে যাবে। এই ছবিটা অপরিচিতদের জন্য তোলা হয়নি। এটা থাকার কথা ছিল কোনো এক স্বজনের মোবাইলে-সেইসব ছবির ভিড়ে, যেগুলো বাবা-মা তুলে রাখেন এবং পরে দেখেন, একলা বিকেলে। বিয়ের অ্যালবামে এই ছবিটা একদিন উঠত। নাতি-নাতনিরা একদিন এই ছবি দেখে বলত, “এটা ছোটবেলার দিদা।” একটা সাধারণ দিনের একটা সাধারণ মেয়ে। কাউকে “ভিকটিম” বলে ডাকার আগের একটা মেয়ে। এখন আমরা ছবিটা দেখি অনেক কিছু জেনে ফেলার পর। আর প্রতিবার দেখি, আর প্রতিবার মনে হয়-ও তো শুধু একটা পরিসংখ্যান নয়। ও কোনো প্রতিবেদনের নাম নয়, কোনো হ্যাশট্যাগ নয়, কোনো রাজনৈতিক বিবৃতির বিষয়বস্তু নয়। ও একটা মেয়ে। কারও বড় বোন। কারও মেয়ে। একজন স্কুলছাত্রী, যার সাদা জামাটা সেদিন সকালে আর পরা হয়নি-যে জামাটা আজও হয়তো কোনো আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা আছে, কারণ মা সেটা সরাতে পারেননি। পরিসংখ্যান বলে, এই দেশে শিশু নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়-এটা একটা জাতীয় সংকট। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ৩০৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে-আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। আর এই সংখ্যাগুলো যে বয়সের শিশুদের, তা শুনলে বুক হিম হয়ে আসে: এদের ৪৯ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে, ৯৪ জনের বয়স সাত থেকে বারো বছরের মধ্যে। ছয় বছর। যে বয়সে একটা শিশু সবে অক্ষর চিনতে শিখছে। পরিসংখ্যান বলে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার ধর্ষণের মামলা হয়েছে-অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন তেরোজন নারী ও শিশু। প্রতিদিন। আর এই হিসাব শুধু সেইসব ঘটনার, যেগুলো রিপোর্ট হয়েছে। লজ্জায়, ভয়ে, সামাজিক চাপে যেসব ঘটনা কোনোদিন আলোর মুখ দেখে না, সেগুলো এই সংখ্যার বাইরে-আর মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সেই সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। ২০২৬ সালের শুরুটাও আলাদা ছিল না। শুধু জানুয়ারি মাসেই ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা-যার মধ্যে তেরোজনের বয়স বারো বছর বা তার কম। কিন্তু পরিসংখ্যান কখনও বলে না, প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা স্যান্ডেল পড়ে ছিল দরজার বাইরে। একটা টিফিন বাক্স ভরা ছিল ভাত-ডিমে। একটা সাদা জামা ঝুলছিল চেয়ারের পিঠে, ইস্ত্রি করা, ভাঁজ টানটান-আর সেটা আর কখনও পরা হলো না। পরিসংখ্যান বলে না, প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একজন বাবা আছেন, যিনি একদিন রিকশায় বসে নিজের মনে মনে মেয়ের গল্প করতেন। আর আজ যিনি বলেন, “আমি বিচার চাই না।” প্রতিটা সংখ্যা একটা নাম। প্রতিটা নাম একটা পৃথিবী। আর সেই প্রতিটা পৃথিবী একটা পরিবারের কাছে গোটা আকাশের সমান। আমরা এই বাবাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারি কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। পনেরো দিন পর এই দেশ হয়তো এগিয়ে যাবে। নতুন একটা খবর আসবে। নতুন একটা ক্ষোভ পুরোনোটাকে ঢেকে দেবে। শিরোনাম বদলে যাবে। কিন্তু সেই পরিবারটা থেকে যাবে-একটা ছবি বুকে নিয়ে। থেকে যাবে ছোট বোনটা, যে আজও রাতে আপুকে খোঁজে। থেকে যাবে সেই গোলাপি ফিতের ঘড়ি, যার কাঁটা আর কোনোদিন ঠিক করানো হবে না। সেটা যেন রামিসার ভাগ্য না হয়। তদন্ত যেন নিখুঁত হয়। প্রমাণ যেন রক্ষা পায়। বিচার যেন দীর্ঘসূত্রতার সমুদ্রে ডুবে না যায়। ক্যামেরা চলে যাওয়ার পর সেই পরিবারটা যেন একা পড়ে না থাকে। যদিও বিচার-সে যত দ্রুতই হোক-একটা শিশুর জন্য বড্ড দেরিতে এসে পৌঁছায়। যে শিশুটার সেই সকালে স্কুলে পৌঁছানোর কথা ছিল। আমি আবার ছবিটার দিকে তাকাই। একটা মেয়ে, ফুল হাতে। মুখটা একটু পাশ ফেরানো। যেন কেউ তার নাম ধরে ডেকেছে। রামিসা। আমরা তোমার নাম ধরে ডাকছি। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? আমরা চাই-তোমার নামটা যেন পনেরো দিনে মুছে না যায়। আমরা চাই-তোমার বাবার কথাগুলো যেন সত্যি না হয়। আমরা চাই-এই দেশের আর কোনো দরজার বাইরে যেন আর কখনও কোনো শিশুর এক জোড়া ছোট্ট স্যান্ডেল এভাবে অপেক্ষায় পড়ে না থাকে। আমরা তোমার জন্য বিচার চাই, রামিসা। আর এবার-এবার যেন আমরা আমাদের কথা রাখতে পারি।
একটা ছোট্ট দাগ-কাল আমের আচার খেতে গিয়ে লাগিয়েছিল, মা ঘষে তুলেছেন। “রামিসা! দেরি হয়ে যাচ্ছে তো, মা!” ভেতরের ঘর থেকে কোনো সাড়া এলো না। আট বছরের একটা মেয়ে সকালবেলা কোথায় যেতে পারে? এই ভাবনাটুকুও তখন মায়ের মনে আতঙ্ক হয়ে ওঠেনি। হয়তো নিচে নেমে গেছে, হয়তো পাশের ফ্ল্যাটের কারও সঙ্গে গল্প করছে। মেয়েটা এমনই-সবার সঙ্গে ভাব, সবার কোলে চড়া, সবাইকে “চাচা”, “খালা”, “আপু” ডাকা। যে পৃথিবীতে সে বড় হচ্ছিল, সেই পৃথিবীর প্রতিটা দরজাই তার কাছে খোলা মনে হতো। কোনো দরজার ওপাশে যে অন্ধকার থাকতে পারে, এই কথাটা তাকে কেউ শেখায়নি। কে-ই বা শেখায় আট বছরের মেয়েকে এমন কথা? মা চটি পায়ে বারান্দায় এলেন। আর তখনই
তাঁর চোখ আটকে গেল। মুখোমুখি ফ্ল্যাটটার দরজার সামনে পড়ে আছে এক জোড়া ছোট্ট স্যান্ডেল। গোলাপি রঙের, একপাশে একটা ফুলের স্টিকার আধখোলা হয়ে ঝুলছে। রামিসার স্যান্ডেল। কাল রাতেও মেয়েটা ওই স্যান্ডেল পরে ছাদে উঠেছিল, দুই বোন মিলে তারা গুনতে। স্যান্ডেল দু’টো পড়ে আছে এলোমেলো নয়-পাশাপাশি, একটু গোছানো। যেন কেউ ঢোকার আগে ভদ্রতা করে খুলে রেখেছে। যেন কেউ বলেছিল, “জুতা খুলে আসো, মা।” আর সে খুলে এসেছে-বিশ্বাস করে, নির্ভয়ে, যেভাবে শিশুরা সবকিছু বিশ্বাস করে। মা প্রথমে ভাবলেন-খেলতে গিয়ে খুলে রেখে এসেছে, এমনই করে ও। হেসে দরজায় টোকা দিলেন। “ভাবি? রামিসা আছে আপনার ওখানে? স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।” ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। আবার টোকা। এবার একটু জোরে। “ভাবি? দরজাটা
খুলুন তো একটু।” ভেতরে কারও পায়ের আওয়াজ, একটা চাপা গলা, তারপর আবার নীরবতা। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। সেই বন্ধ দরজার ওপাশে যে নীরবতা, সেটা মায়ের বুকের ভেতর প্রথমবারের মতো একটা শীতল হাত বুলিয়ে দিল। মায়েরা এই হাতটা চেনে। অনেক আগে থেকে চেনে, ব্যাখ্যা করতে পারার অনেক আগে থেকে। তিনি জানতেন না, দরজার ঠিক ওপাশে তখন কী ঘটে গেছে। জানতেন না, ওই দু’মাস আগে আসা নতুন প্রতিবেশীর ঘরে তাঁর মেয়ের গল্পটা শেষ হয়ে গেছে চিরতরে। তিনি শুধু জানতেন, একটা মা যা জানে-তাঁর সন্তান কাছে নেই, আর কোথাও একটা ভয়ংকর ভুল হয়ে গেছে। তাঁর হাত দু’টো তখনও ভাত-ডিমের গন্ধমাখা। তিনি চিৎকার করতে শুরু করলেন। সেই
চিৎকার গলির এ মাথা থেকে ও মাথা পৌঁছে গেল-কিন্তু যে দরজার ভেতরে পৌঁছানো দরকার ছিল, সেই দরজা ততক্ষণে চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। রামিসাকে আমি চিনতাম তার বাবার চোখ দিয়ে। বাবা-আবদুল হান্নান-রিকশায় বসে সবসময় মেয়ের গল্প করতেন। কারও কাছে নয়, নিজের মনে মনে, ঠোঁট নেড়ে। যেন মেয়েটা পাশে বসে আছে, যেন প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে তিনি তাকে দিনের গল্প শোনাচ্ছেন। “জানো, আমার বড় মেয়েটা একদিন ডাক্তার হবে,” বলতেন তিনি প্রতিবেশী চায়ের দোকানদারকে। “ছোটটা তো এখনও দুষ্টু, কিন্তু রামিসা-রামিসা বড় শান্ত। বইয়ের পোকা। রাতে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ে, আমি গিয়ে বই সরিয়ে আলো নিভিয়ে দিই।” মেয়ের হাতে একটা ছোট্ট ঘড়ি কিনে দিয়েছিলেন তিনি, গোলাপি
ফিতের। মাসের শেষে যখন হাতে টাকা থাকত না, পকেটে ভাঙতি গুনে গুনে ঘরে ফিরতেন, তখনও মেয়ের আবদার ফেলতে পারতেন না। রামিসা সেই ঘড়িটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বড় মানুষের মতো ভান করত-“আজ আমার অনেক কাজ, বুঝলে?”-আর ছোট বোনটা খিলখিল করে হাসত। ঘড়িটার কাঁটা ঠিকমতো ঘুরত না, একটু পিছিয়ে যেত রোজ। বাবা ভাবতেন, ঠিক করিয়ে দেবেন। সময় তো ছিল হাতে। সবাই ভাবে সময় হাতে আছে। মেয়েটার ফুল ভালো লাগত। গলির মোড়ের ফুলওয়ালার কাছ থেকে এক টাকা-দু’টাকার গাঁদা, রজনীগন্ধা-যা পেত, কিনে এনে চুলে গুঁজত। কোনো অনুষ্ঠান লাগত না, কারণ লাগত না। তার কাছে প্রতিটা দিনই উৎসব ছিল। বাবা বলতেন, “আমার মেয়েটা যেখানে যায়,
সেখানেই যেন একটু আলো জ্বলে ওঠে।” ছোট বোনটা ছিল তার ছায়া। যেদিকে রামিসা, সেদিকেই সে। বড় বোনের শাড়ি পরা দেখে নিজেও মায়ের ওড়না জড়িয়ে নিত। দুই বোন মিলে সন্ধেবেলা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনত, আর হেরে গিয়ে ঝগড়া করত কে আগে গুনতে শুরু করেছিল। সেই ছোট বোনটা আজও মাঝে মাঝে রাতে উঠে বসে, পাশে হাত বুলিয়ে খোঁজে-আপু কই? কেউ তাকে বুঝিয়ে বলতে পারে না, এমন এক জায়গায় সে গেছে যেখান থেকে কেউ ফেরে না। ছয় বছরের একটা শিশুকে “মৃত্যু” শব্দটা কীভাবে বোঝাবেন কেউ? এই ছিল রামিসা। আট বছরের একটা পৃথিবী-যেখানে সবচেয়ে বড় দুঃখ ছিল হোমওয়ার্ক, আর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল বড় হওয়া। আমরা তাকে চিনলাম যখন আর চেনার কিছু রইল না। মানুষ এসে জমে গিয়েছিল সেই সরু গলিতে। দরজা ভাঙা হলো। ভেতরে যা পাওয়া গেল, তা এই গল্পের অংশ নয়। কিছু দৃশ্য মানুষের লেখার অধিকার নেই। কিছু সত্য এত নির্মম যে তা শুধু নীরবতাতেই ধারণ করা যায়। আমি লিখব না, কারণ লিখলে সেই নীরবতাটুকুও আমরা তার কাছ থেকে কেড়ে নেব-আর ওই নীরবতাটুকুই এখন তার একমাত্র আবরণ। আমি শুধু এটুকু লিখতে পারি-যে দরজার বাইরে এক জোড়া ছোট্ট স্যান্ডেল গোছানো ছিল, সেই দরজার ভেতরে একটা শিশুর জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল তারই প্রতিবেশীর হাতে। যে লোকটা দু’মাস আগে এসেছিল মুখোমুখি ফ্ল্যাটে। যাকে রামিসা হয়তো “চাচা” বলে ডাকত। যার দরজায় টোকা দিতে তার ভয় ছিল না, কারণ ভয় থাকার কথাও না। ভয়টা আমাদের শেখানোর কথা ছিল। আমরা শেখাইনি। আমরা ভেবেছিলাম, পাশের দরজা নিরাপদ। আমরা ভাবি বিপদ বুঝি দূর থেকে আসে। অপরিচিত রাস্তা থেকে, অন্ধকার গলি থেকে, অচেনা মুখ থেকে। আমরা সন্তানকে শেখাই-অচেনা লোকের সঙ্গে যেও না, অচেনা কিছু খেও না। কিন্তু কখনও কখনও বিপদ অপেক্ষা করে ঠিক পাশের দরজার ওপাশে-যে দরজা আমরা প্রতিদিন নির্ভয়ে পার হই, যে দরজায় হাসিমুখে সালাম দিই, যার ভেতরের মানুষটাকে আমরা “ভালো লোক” বলে জানি। মা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তখনও টোকা দিচ্ছিলেন। আর ভেতরে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অপেক্ষা করছিল-ঠান্ডা মাথায়, যথেষ্ট সময় নিয়ে, যেন আরেকজন পালাতে পারে। একজন মা যখন তাঁর সন্তানের নাম ধরে দরজায় টোকা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখন ওই দরজার ওপাশে হিসেব কষা হচ্ছিল-কীভাবে আড়াল করা যায়, কীভাবে সময় কেনা যায়। এই বাক্যটা আমি লিখি, আর আমার হাত কাঁপে। রামিসাকে শুইয়ে দেওয়া হলো মুন্সিগঞ্জে, তার দাদা-দাদির পাশে। যে মাটিতে তার শেকড়, সেই মাটিতেই সে ফিরে গেল-কিন্তু এমন এক বয়সে, যে বয়সে শেকড়ের কথা ভাবার কথাই নয়। যে বয়সে মাটি মানে খেলার মাঠ, কবর নয়। ছোট্ট একটা কবর। এত ছোট যে তা দেখলে বুক ভেঙে আসে-কারণ কবরের মাপ বলে দেয়, এখানে একটা গোটা জীবন নয়, একটা সবে-শুরু-হওয়া জীবন শুয়ে আছে। যে জীবনের এখনও স্কুল শেষ হয়নি, প্রথম পরীক্ষার রেজাল্ট দেখা হয়নি, ডাক্তার হওয়া হয়নি। জানাজায় হাজার মানুষ। কান্না। স্লোগান। ক্যামেরা। মাইক। আর সবার মাঝখানে একজন বাবা, যিনি আর কাঁদতে পারছিলেন না। কান্নারও তো একটা শেষ আছে। তারপর যা থাকে, তা কান্নার চেয়েও ভয়ংকর-এক ধরনের শূন্যতা, যেখানে কোনো শব্দ পৌঁছায় না। যে শূন্যতায় মানুষ চোখ খোলা রেখেও কিছু দেখে না। সাংবাদিকরা তাঁর কাছে গেলেন। মাইক বাড়িয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি বিচার চান?” বাবা মুখ তুললেন। তাঁর চোখ দু’টো শুকনো, লাল, এবং ভয়ংকর রকমের শান্ত। “আমি বিচার চাই না,” তিনি বললেন। “কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। এটা বড়জোর পনেরো দিন চলবে। তারপর আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। আর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।” তিনি ভুল বলেননি। এক শোকার্ত বাবার মুখে এর চেয়ে নিষ্ঠুর সত্য আর কী হতে পারে-যে তিনি বিচার চান না, কারণ তিনি বিচারে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। সন্তান হারানোর শোকের চেয়েও বড় একটা জিনিস হারিয়েছেন তিনি: আশা। তাঁর এই অবিশ্বাস কোনো ব্যক্তিগত হতাশা নয়। এটা একটা গোটা সমাজের ব্যর্থতার দলিল। কারণ তিনি দেখেছেন। আমরা সবাই দেখেছি। আমরা দেখেছি একটার পর একটা শিশুর মুখ-খবরের কাগজে, টিভির পর্দায়, ফেসবুকের নিউজফিডে। কয়েকদিন উত্তাল হই আমরা। হ্যাশট্যাগ লিখি। প্রোফাইল পিকচার কালো করি। মোমবাতি জ্বালাই। তারপর- তারপর আরেকটা খবর আসে। আরেকটা মুখ। আগেরটা চাপা পড়ে যায় নতুনটার নিচে। বিচারের ফাইল ধুলো জমে জমে হারিয়ে যায় হাজার হাজার ঝুলে থাকা মামলার ভিড়ে। মোমবাতিগুলো গলে শেষ হয়ে যায়। আর শোকার্ত পরিবারটা পড়ে থাকে-একা, ক্যামেরা চলে যাওয়ার পর, একটা ছবি বুকে নিয়ে। বাবা সেটাই বলতে চেয়েছিলেন। তাঁর মেয়ের ভাগ্যেও কি তবে তাই লেখা? আমি বারবার রামিসার একটা ছবির দিকে তাকাই। ছবিটায় ও ফুল হাতে দাঁড়িয়ে। মুখটা একটু পাশ ফেরানো-যেন কেউ এইমাত্র ওর নাম ধরে ডেকেছে, আর ও ঘুরে তাকাতে যাচ্ছে। হয়তো এক্ষুনি হাসবে। ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে হয়তো কেউ বলেছিল, “এদিকে তাকাও, মা।” আর ও পুরোপুরি তাকায়নি। বাচ্চারা এমনই হয়-অর্ধেক ফ্রেমে, অর্ধেক অন্য কোথাও, অন্য কোনো ভাবনায়। হয়তো ভাবছিল, ছবি তোলা হয়ে গেলে আবার খেলতে যাবে। এই ছবিটা অপরিচিতদের জন্য তোলা হয়নি। এটা থাকার কথা ছিল কোনো এক স্বজনের মোবাইলে-সেইসব ছবির ভিড়ে, যেগুলো বাবা-মা তুলে রাখেন এবং পরে দেখেন, একলা বিকেলে। বিয়ের অ্যালবামে এই ছবিটা একদিন উঠত। নাতি-নাতনিরা একদিন এই ছবি দেখে বলত, “এটা ছোটবেলার দিদা।” একটা সাধারণ দিনের একটা সাধারণ মেয়ে। কাউকে “ভিকটিম” বলে ডাকার আগের একটা মেয়ে। এখন আমরা ছবিটা দেখি অনেক কিছু জেনে ফেলার পর। আর প্রতিবার দেখি, আর প্রতিবার মনে হয়-ও তো শুধু একটা পরিসংখ্যান নয়। ও কোনো প্রতিবেদনের নাম নয়, কোনো হ্যাশট্যাগ নয়, কোনো রাজনৈতিক বিবৃতির বিষয়বস্তু নয়। ও একটা মেয়ে। কারও বড় বোন। কারও মেয়ে। একজন স্কুলছাত্রী, যার সাদা জামাটা সেদিন সকালে আর পরা হয়নি-যে জামাটা আজও হয়তো কোনো আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা আছে, কারণ মা সেটা সরাতে পারেননি। পরিসংখ্যান বলে, এই দেশে শিশু নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়-এটা একটা জাতীয় সংকট। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ৩০৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে-আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। আর এই সংখ্যাগুলো যে বয়সের শিশুদের, তা শুনলে বুক হিম হয়ে আসে: এদের ৪৯ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে, ৯৪ জনের বয়স সাত থেকে বারো বছরের মধ্যে। ছয় বছর। যে বয়সে একটা শিশু সবে অক্ষর চিনতে শিখছে। পরিসংখ্যান বলে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার ধর্ষণের মামলা হয়েছে-অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন তেরোজন নারী ও শিশু। প্রতিদিন। আর এই হিসাব শুধু সেইসব ঘটনার, যেগুলো রিপোর্ট হয়েছে। লজ্জায়, ভয়ে, সামাজিক চাপে যেসব ঘটনা কোনোদিন আলোর মুখ দেখে না, সেগুলো এই সংখ্যার বাইরে-আর মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সেই সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। ২০২৬ সালের শুরুটাও আলাদা ছিল না। শুধু জানুয়ারি মাসেই ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা-যার মধ্যে তেরোজনের বয়স বারো বছর বা তার কম। কিন্তু পরিসংখ্যান কখনও বলে না, প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা স্যান্ডেল পড়ে ছিল দরজার বাইরে। একটা টিফিন বাক্স ভরা ছিল ভাত-ডিমে। একটা সাদা জামা ঝুলছিল চেয়ারের পিঠে, ইস্ত্রি করা, ভাঁজ টানটান-আর সেটা আর কখনও পরা হলো না। পরিসংখ্যান বলে না, প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একজন বাবা আছেন, যিনি একদিন রিকশায় বসে নিজের মনে মনে মেয়ের গল্প করতেন। আর আজ যিনি বলেন, “আমি বিচার চাই না।” প্রতিটা সংখ্যা একটা নাম। প্রতিটা নাম একটা পৃথিবী। আর সেই প্রতিটা পৃথিবী একটা পরিবারের কাছে গোটা আকাশের সমান। আমরা এই বাবাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারি কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। পনেরো দিন পর এই দেশ হয়তো এগিয়ে যাবে। নতুন একটা খবর আসবে। নতুন একটা ক্ষোভ পুরোনোটাকে ঢেকে দেবে। শিরোনাম বদলে যাবে। কিন্তু সেই পরিবারটা থেকে যাবে-একটা ছবি বুকে নিয়ে। থেকে যাবে ছোট বোনটা, যে আজও রাতে আপুকে খোঁজে। থেকে যাবে সেই গোলাপি ফিতের ঘড়ি, যার কাঁটা আর কোনোদিন ঠিক করানো হবে না। সেটা যেন রামিসার ভাগ্য না হয়। তদন্ত যেন নিখুঁত হয়। প্রমাণ যেন রক্ষা পায়। বিচার যেন দীর্ঘসূত্রতার সমুদ্রে ডুবে না যায়। ক্যামেরা চলে যাওয়ার পর সেই পরিবারটা যেন একা পড়ে না থাকে। যদিও বিচার-সে যত দ্রুতই হোক-একটা শিশুর জন্য বড্ড দেরিতে এসে পৌঁছায়। যে শিশুটার সেই সকালে স্কুলে পৌঁছানোর কথা ছিল। আমি আবার ছবিটার দিকে তাকাই। একটা মেয়ে, ফুল হাতে। মুখটা একটু পাশ ফেরানো। যেন কেউ তার নাম ধরে ডেকেছে। রামিসা। আমরা তোমার নাম ধরে ডাকছি। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? আমরা চাই-তোমার নামটা যেন পনেরো দিনে মুছে না যায়। আমরা চাই-তোমার বাবার কথাগুলো যেন সত্যি না হয়। আমরা চাই-এই দেশের আর কোনো দরজার বাইরে যেন আর কখনও কোনো শিশুর এক জোড়া ছোট্ট স্যান্ডেল এভাবে অপেক্ষায় পড়ে না থাকে। আমরা তোমার জন্য বিচার চাই, রামিসা। আর এবার-এবার যেন আমরা আমাদের কথা রাখতে পারি।



