রাজনৈতিক প্রচারকেন্দ্র ছিল নভোথিয়েটার – ইউ এস বাংলা নিউজ




ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ৬ জুলাই, ২০২৫

রাজনৈতিক প্রচারকেন্দ্র ছিল নভোথিয়েটার

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ৬ জুলাই, ২০২৫ |
বিজ্ঞান দেখতে গিয়ে শেখ হাসিনার ভাষণ, মহাকাশ শিখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবনী, এটাই ছিল গত ১৫ বছরে ঢাকার নভোথিয়েটারের বাস্তবতা। কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পে বিজ্ঞানের নামে চলেছে রাজনৈতিক প্রচারণা, অনিয়ম আর অদূরদর্শী ব্যবস্থাপনা। তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও মহাকাশে আগ্রহী করার লক্ষ্যে নির্মিত প্রতিষ্ঠানটি পরিণত করা হয়েছে একপক্ষীয় প্রচারের আধুনিক মিলনায়তনে। শুধু থ্রিডি সিনেমা হলই নয়, পুরো নভোথিয়েটার রূপ নেয় এক ধরনের ‘রাজনৈতিক প্রদর্শনীকেন্দ্রে।’ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নেয় সরকার, যার ব্যয় ধরা হয় ৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৩০ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র, যা

২০১৬ সাল থেকে প্রতিটি শোয়ের শুরুতেই দেখানো হয়। নির্মাণ করে জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘গোটো ইনক, জাপান’। রচনা, ধারাবর্ণনা, সম্পাদনা ও পরিচালনায় ছিলেন সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। প্রামাণ্যচিত্রটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর বেশির ভাগ অংশে রয়েছে পুরোনো ফুটেজ, স্থিরচিত্র এবং বক্তৃতার সংকলন, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এবং শেখ হাসিনার বক্তব্য। ভিডিওটির কিছু অংশে টুঙ্গিপাড়া, ধানমন্ডি ৩২, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ইত্যাদির দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ফুটেজে ভরপুর এ নিুমানের ভিডিওতে ২০ কোটি টাকার ব্যয়কে অস্বাভাবিক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একে তারা বৈজ্ঞানিক চেতনার পরিপন্থি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হিসাবে দেখছেন। সরেজমিন দেখা যায়, নভোথিয়েটারের প্লানেটারিয়ামে প্রতিদিন গড়ে ৪-৫টি শো হয়, টিকিট মূল্য

১০০ টাকা। কিন্তু দর্শক উপস্থিতি অত্যন্ত কম। এক কর্মকর্তা জানান, ২৬০ আসনের মধ্যে অনেকদিন এক-তৃতীয়াংশও পূর্ণ হয় না। দর্শকদের প্রধান অভিযোগ-নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য, সাম্প্রতিক মহাকাশ মিশন কিংবা ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট নেই বললেই চলে। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রতিটি শোর শুরুতে রাজনৈতিক প্রামাণ্যচিত্র দেখানোটাও দর্শকবিমুখতার অন্যতম কারণ। নভোথিয়েটারে আবাসনের অনুমতি না থাকলেও গ্রাউন্ড ফ্লোর ও থিয়েটার রুম দখল করে সেখানে পরিবারসহ বসবাস করছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। ফলে বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ বিপর্যস্ত হচ্ছে। দর্শনার্থীরা বলছেন, শিক্ষাবিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠান এখন যেন ‘কোয়ার্টার’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হলেও নেই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ-যেন এক রকম নীরব সম্মতিই রয়েছে এর পেছনে। মিরপুরের গৃহিণী তানিয়া হক বলেন, ২০২৩

সালে ছেলেকে বিজ্ঞানের নানা বিষয় দেখাতে নভোথিয়েটারে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি, বিজ্ঞানের বদলে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের ভাষণের ভিডিও। বিজ্ঞানের নামে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রচারণা। টাকা খরচ করে এসব দেখতে পরে আর যাইনি। একজন স্কুল শিক্ষিকা জানান, শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাই, কিন্তু পুরোনো ফিল্ম ও ইন্টারঅ্যাকশনের অভাবে তারা বিরক্ত হয়। বিশেষ কিছু যদি না-ই শিখতে বা দেখতে পারে তাহলে অহেতুক শিশুদের নিয়ে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। এছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশের গল্প প্রচার হলেও নভোথিয়েটারের অনলাইন টিকিটিং সিস্টেম একেবারেই অকার্যকর। ওয়েবসাইটে ঢুকলে দেখা যায়, কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। নাম পরিবর্তনের পরও ভার্চুয়াল গ্যালারিতে এখনো লেখা রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার’। থ্রিডি গ্যালারিতেও রয়েছে

‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’ এবং ‘শেখ রাসেল এক্সিবিশন’। প্রযুক্তির দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি স্থবির। ঝাপসা প্রজেকশন, পুরোনো থ্রিডি ইফেক্ট আর বছর দশেক আগের কনটেন্টেই চলছে। কুড়িগ্রাম থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, দেশ নাকি ডিজিটাল করে ফেলেছে, দীর্ঘদিন থেকে শুনে এসেছি। কিন্তু একটা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের টিকিট অনলাইনে কাটা যায় না! ভেতরে গিয়ে দেখি ২ বছর আগে যা দেখে গেছি সেই একই ফিল্ম, নতুন কিছুই নেই। এদিকে ২০০৪ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠিত ভাসানী নভোথিয়েটারের নাম রাজনীতির পালাবদলে বদলেছে পাঁচবার। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা বিজয় সরণির নামফলক থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অংশ মুছে ফেলে। এরপর আইন সংশোধন করে সরকারিভাবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার’

নাম থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়। নাসার স্পেস ক্যাম্প অ্যাম্বাসেডর আফরোজ মামুন বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসব পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ হয় না। আধুনিক প্লানেটারিয়ামের জন্য ‘হাইব্রিড’ প্রযুক্তি জরুরি, যেখানে ডিজিটাল ও অপটিক্যাল প্রজেকশনের সমন্বয়ে দর্শকদের ৩৬০ ডিগ্রি ‘ফুলডোম’ অভিজ্ঞতা দেওয়া যায়। কিন্তু ঢাকার নভোথিয়েটারে সেই কাঠামোই অনুপস্থিত। তিনি বলেন, নভোথিয়েটার কেবল অ্যাস্ট্রোনমি নয়, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন, স্টার গেজিং, গবেষণা ও ইন্টারডিসিপ্লিনারি ওয়ার্কশপের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারত। বিদেশে এসব কেন্দ্রে শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও করপোরেট ইভেন্ট আয়োজিত হয়। আমাদের দেশ শুধু ফিল্ম প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ। অদক্ষদের দিয়ে প্লানেটারিয়াম চলবে না। দায়িত্বে এমন পেশাদারদের রাখতে

হবে, যারা বিষয়টি বোঝেন। প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ সংগঠন বেসিস-এর সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে যখন রাজনৈতিক ভাষণ, পারিবারিক ইতিহাসই প্রধান কনটেন্ট হয়ে ওঠে, তখন তা বৈজ্ঞানিক চেতনার প্রতি এক ভয়াবহ অবমাননা। রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে একতরফা প্রচারের হাতিয়ার হয়ে পড়ে, নভোথিয়েটার তার একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে নভোথিয়েটারকে কাঠামোগতভাবে সংস্কার এবং এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পুনরুদ্ধারের। নভোথিয়েটারের মহাপরিচালকের দপ্তরে গিয়ে অতীতের অনিয়ম ও দর্শকবিমুখতার বিষয়ে জানতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ মেলেনি। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জানান, ‘স্যার কথা বলবেন না।’ পরে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন পরিচালক নায়মা ইয়াসমীন। তিনি বলেন, ‘স্যার নতুন এসেছেন তো, তাই...।’ এক প্রশ্নের জবাবে নায়মা ইয়াসমীন বলেন, দর্শকরা বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করতেন, প্রতিটি শোর আগে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে এক ধরনের প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো, যা তাদের বিরক্ত করত। কিন্তু আমাদের করণীয় কিছু ছিল না, মন্ত্রণালয় ও মহাপরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করতে হতো। বর্তমানে এসব প্রামাণ্যচিত্র আর দেখানো হয় না। আমরা এখন চেষ্টা করছি নভোথিয়েটারকে তার মূল উদ্দেশ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার। বিজ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের আগ্রহ ফেরাতে কাজ করছি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
১৩ লাখ টাকা দিলে পরীক্ষা ও পাস করা ছাড়াই জাতীয় জাদুঘরে চাকরির নিশ্চয়তা! খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ থেকে এখন বিশ্বের তীব্র খাদ্য সংকটের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ টিটিপির নিশানায় বাংলাদেশ: সারাদেশে ‘রেড অ্যালার্ট সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীর সম্ভাব্য সমন্বিত হামলার সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ড: জামিল লিমনের লাশ উদ্ধার, নাহিদা বৃষ্টির মৃত্যু নিশ্চিত বহুমুখী সংকটে শিল্পখাত, টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে সিমেন্টসহ উৎপাদন খাত ইউএন টর্চার এক্সপার্ট এখনো জুলাই’২০২৪-এ আটকেঃ অ্যালিস এডওয়ার্ডস অ্যাকটিভিস্টদের মতামত প্রকাশে বাধা দিলেন ইসলামাবাদে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার: ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফর খুলনায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ২ চকরিয়ায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বন ও নদীখেকোদের মহোৎসব: অসহায় বনবিভাগ নড়াইলে প্রাচীর তুলে ২৫ হিন্দু পরিবারের রাস্তা অবরুদ্ধ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে উত্তেজনা: টিটিপির সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগে একাধিক কর্মী আটক, অনেকে পালিয়েছে বিদেশে উগ্রবাদী হামলার শঙ্কা: সতর্কবার্তার বিষয়টি স্বীকার করল সিটিটিসি গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরানে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অনস্ক্রিন চুম্বন দৃশ্য, ৩০ বছরের ‘কিসিং নীতি’ ভাঙা নিয়ে মুখ খুললেন কাজল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার শঙ্কা, নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ পুলিশ সদরের যুদ্ধবিরতি বাড়লেও থামেনি হিজবুল্লাহ-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার কে এই হিশাম ম্যালেরিয়ার জীবাণুতে জিনগত পরিবর্তন চালের দামের ওপর বাড়তি ভাড়ার প্রভাব