ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
হ্যাঁ কিংবা না কোনো শব্দেই আমরা আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি যেন কথা না বলি।কারণ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ফাঁদটাই হলো আমাদের মুখ খুলিয়ে দেওয়া।
পিতার নামে শপথ নেওয়ার দিন আজ
নৈতিকতা, মানবিকতা ও রাজপথ: আওয়ামী লীগের অবিনাশী চেতনার তিন স্তম্ভ
মুজিব একটি জাতির নাম, হাসিনা সে জাতির অগ্রগতির কাণ্ডারি, বঙ্গবন্ধু ফিরেছিলেন, ফিরবেন দেশরত্নও
যমুনায় বসে গবেষণার বিলাসিতা ও সার্বভৌমত্ব বিক্রির নীল নকশা: কার স্বার্থে এই মহাপরিকল্পনা?
ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশনা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান ও সংগ্রামের ডাক। বিশেষ কলাম
প্রক্সি যুদ্ধ: বিএনপি–জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত
ইউনুস থেকে মাচাদো: নোবেল শান্তি পুরস্কার কি সরকার পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে?
ডঃ আনজুমান আরা ইসলাম : এক সময় নোবেল শান্তি পুরস্কার মানবতা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ছিল। এটি ছিল নৈতিক বৈধতার সর্বোচ্চ সিলমোহর। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই পুরস্কারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এটি কি এখনো মানবকল্যাণমূলক অবদানের স্বীকৃতি, নাকি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার একটি কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তির বিতর্কিত ভূমিকাকে ঘিরে, যাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে নৈতিকতা গৌণ হয়ে পড়েছে। এই লেখায় সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হবে। আলোচনায় দেখানো হবে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তরা
কখনো কখনো “পুতুল” বা অনুগত নেতৃত্ব তৈরির বিকল্প কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, ভেনেজুয়েলা ও মিয়ানমারের উদাহরণ তুলে ধরা হবে। অনেকে ভেনেজুয়েলার ঘটনাবলির সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতার তুলনা করছেন। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশি শক্তির, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবিত সরকার পরিবর্তনের শিকার। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাত করে একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নোবেল শান্তি পুরস্কারের মুখোশ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের অত্যন্ত বিতর্কিত ও অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসের মতো, যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত, ভেনেজুয়েলাতেও একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী রয়েছেন,
যিনি এখনো নিজ দেশে জনগণের ম্যান্ডেট অর্জনে ব্যর্থ। তাঁর নাম মারিয়া কোরিনা মাচাদো। সমালোচকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে পুরস্কার পেতে সহায়তা করছে, যাতে ভেনেজুয়েলায় একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এসব দাবি সত্য না মিথ্যা, সেটিই মূল বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কীভাবে এই পুরস্কার তার নৈতিক মর্যাদা হারিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বারা জনমত প্রভাবিত করার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ইউনুস একটি পরীক্ষামূলক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। গত সতেরো মাসে তাঁর শাসন ব্যাপক সমালোচনা, বিদ্রূপ ও উপহাসের মুখে পড়েছে। তাঁকে প্রায়ই “পশ্চিমাদের প্রিয়পাত্র” বলা হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, ইউনুসের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকরা কি এতটাই সরল? অনেক বাংলাদেশি তাঁকে কঠোর ভাষায় পুতুল বলে আখ্যা
দিয়েছেন। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের আগে ইউনুস কখনোই জনসমর্থন অর্জন করতে পারেননি। অথচ হঠাৎ করেই তিনি সরকারপ্রধান হয়ে ওঠেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর উষ্ণ সমর্থন পান। এটি গোপন নয় যে জো বাইডেন প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নেপথ্য সহায়তা দিয়েছে বলে বেশ কয়েকজন মার্কিন গবেষক ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছেন। ইউনুসের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি জনসাধারণের প্রত্যাখ্যান সুপ্রতিষ্ঠিত। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার এক দশক আগে, ২০০৭ সালে তিনি একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্দেশ্যে জনসমর্থন চেয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু ব্যাপক ব্যর্থতার মুখে তিনি সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন তাঁর বিদেশি
শক্তির প্রতি আনুগত্যকে উন্মোচিত করে। ইউনুসের শাসনামলের একটি ন্যায্য মূল্যায়ন করা যাক। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “আমরা বিদেশিদের কাছে যাব না, বিদেশিরাই আমাদের কাছে আসবে।” বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। বিদেশি বিনিয়োগ, জনকল্যাণ, বন্যা-পরবর্তী সহায়তা তহবিল—এসব বিষয়ে দেওয়া বহু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে সুস্পষ্ট ফারাক রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, জাতিসংঘ মহাসচিবের সফরের সময় কিছু প্রতীকী প্রদর্শন ছাড়া কোনো উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়নি। সফরের পরেও রোহিঙ্গারা কোনো দৃশ্যমান সুবিধা পায়নি, বাংলাদেশও পায়নি। ইউনুস ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ওঠে। গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দ্রুত সরকারি সুবিধা
অনুমোদন দেওয়া হয়। শত শত কোটি টাকার কর মওকুফ, দীর্ঘমেয়াদি করছাড়, সরকারি শেয়ার হ্রাস এবং বিভিন্ন লাইসেন্স অনুমোদন দ্রুত দেওয়া হয়, যা পক্ষপাতিত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ধারণা সৃষ্টি করে। এছাড়া বহু আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলাগুলো বিচার শেষ না করেই খারিজ করা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং অধ্যাদেশ জারি করে চেয়ারম্যান নিয়োগে রাষ্ট্রের ভূমিকা বাতিল করাকেও সময়োপযোগী নয় বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ইউনুসের মূল দায়িত্ব ছিল একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই লক্ষ্য থেকে সরে এসে তিনি বিদেশি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে
আপস করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো লাভজনক সমুদ্রবন্দর বিদেশি নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার উদ্যোগ বা তথাকথিত মানবিক করিডরের নামে ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা পর্যবেক্ষকদের কাছে তাঁকে বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত এক পুতুল শাসক হিসেবে তুলে ধরেছে। মাচাদোর ক্ষেত্রে, মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর তাঁর নোবেল পুরস্কার ভাগাভাগির প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনায় অনেক বাংলাদেশি ইউনুসের সঙ্গে তাঁর তুলনা করছেন। উভয় ক্ষেত্রেই অভিযোগ একটাই—নির্বাচন এড়িয়ে বিদেশি শক্তিকে তুষ্ট করে দেশ শাসনের চেষ্টা। এই সম্পর্ক শুধু বাংলাদেশ বা ভেনেজুয়েলায় সীমাবদ্ধ নয়। মিয়ানমারের অং সান সু চির উদাহরণও বহুল আলোচিত। একসময় তিনি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গণতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁকে আন্তর্জাতিক নৈতিক বৈধতা দিয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটের পর সেই নৈতিক আভা দ্রুত ম্লান হয়ে যায়। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যখন মিয়ানমারের বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করে, তখন তাঁর নীরবতা স্পষ্ট করে দেয় যে নোবেল পুরস্কার কোনো স্থায়ী নৈতিক ঢাল নয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—নোবেল শান্তি পুরস্কার কি সত্যিই শান্তির প্রতীক, নাকি এটি একটি সফট পাওয়ার কৌশল? সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে নৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও জনমত গঠন করে সরকার পরিবর্তনের পরিবেশ সৃষ্টি করাই কি আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপ? বহু বিশ্লেষকের মতে, উত্তর হ্যাঁ। এখানে নোবেল পুরস্কার হার্ড পাওয়ারের বিকল্প হলেও লক্ষ্য একই—প্রভাব বিস্তার। ১৯৭১ সালের ইতিহাস টেনে কেউ কেউ দাবি করেন, নোবেল কমিটির কিছু সদস্য গোপনে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছিলেন। এই তুলনা টেনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশে নোবেল পুরস্কার পেলেও ইউনুস নাকি নীরবে দেশের স্বার্থ রক্ষা করছেন। এই বয়ান কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা পাঠকের বিচার্য। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নোবেল শান্তি পুরস্কার আর রাজনীতির বাইরে কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়। ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলার খবর শুনে যে ভয় ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটিই এই আলোচনার কেন্দ্রে। “দয়া করে কেউ এই মানুষটিকে থামান”—এই আহ্বান শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; এটি এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, যেখানে শান্তির নামে পুরস্কার দেওয়া হয়, আর আড়ালে চলে যুদ্ধ, হস্তক্ষেপ ও পুতুল সরকার তৈরির পরিকল্পনা। সবশেষে বলা যায়, নোবেল শান্তি পুরস্কার নিজে ভালো বা মন্দ নয়। কিন্তু কে এই পুরস্কার পাচ্ছেন, কোন প্রেক্ষাপটে পাচ্ছেন এবং কীভাবে তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এগুলো উপেক্ষা করা যায় না। ইউনুস, মাচাদো বা অং সান সু চির ব্যক্তিগত চরিত্র ইতিহাস বিচার করবে, যেমনটি করেছে মাদার তেরেসার ক্ষেত্রে। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে জনমনে ক্রমবর্ধমানভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পরাশক্তির একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। আজকের রাজনীতিতে এই বাস্তবতা বোঝাই সবচেয়ে বড় সচেতনতা।
কখনো কখনো “পুতুল” বা অনুগত নেতৃত্ব তৈরির বিকল্প কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, ভেনেজুয়েলা ও মিয়ানমারের উদাহরণ তুলে ধরা হবে। অনেকে ভেনেজুয়েলার ঘটনাবলির সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতার তুলনা করছেন। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশি শক্তির, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবিত সরকার পরিবর্তনের শিকার। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাত করে একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নোবেল শান্তি পুরস্কারের মুখোশ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের অত্যন্ত বিতর্কিত ও অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসের মতো, যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত, ভেনেজুয়েলাতেও একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী রয়েছেন,
যিনি এখনো নিজ দেশে জনগণের ম্যান্ডেট অর্জনে ব্যর্থ। তাঁর নাম মারিয়া কোরিনা মাচাদো। সমালোচকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে পুরস্কার পেতে সহায়তা করছে, যাতে ভেনেজুয়েলায় একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এসব দাবি সত্য না মিথ্যা, সেটিই মূল বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কীভাবে এই পুরস্কার তার নৈতিক মর্যাদা হারিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বারা জনমত প্রভাবিত করার অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ইউনুস একটি পরীক্ষামূলক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। গত সতেরো মাসে তাঁর শাসন ব্যাপক সমালোচনা, বিদ্রূপ ও উপহাসের মুখে পড়েছে। তাঁকে প্রায়ই “পশ্চিমাদের প্রিয়পাত্র” বলা হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, ইউনুসের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকরা কি এতটাই সরল? অনেক বাংলাদেশি তাঁকে কঠোর ভাষায় পুতুল বলে আখ্যা
দিয়েছেন। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের আগে ইউনুস কখনোই জনসমর্থন অর্জন করতে পারেননি। অথচ হঠাৎ করেই তিনি সরকারপ্রধান হয়ে ওঠেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর উষ্ণ সমর্থন পান। এটি গোপন নয় যে জো বাইডেন প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নেপথ্য সহায়তা দিয়েছে বলে বেশ কয়েকজন মার্কিন গবেষক ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছেন। ইউনুসের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি জনসাধারণের প্রত্যাখ্যান সুপ্রতিষ্ঠিত। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার এক দশক আগে, ২০০৭ সালে তিনি একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্দেশ্যে জনসমর্থন চেয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু ব্যাপক ব্যর্থতার মুখে তিনি সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন তাঁর বিদেশি
শক্তির প্রতি আনুগত্যকে উন্মোচিত করে। ইউনুসের শাসনামলের একটি ন্যায্য মূল্যায়ন করা যাক। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “আমরা বিদেশিদের কাছে যাব না, বিদেশিরাই আমাদের কাছে আসবে।” বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। বিদেশি বিনিয়োগ, জনকল্যাণ, বন্যা-পরবর্তী সহায়তা তহবিল—এসব বিষয়ে দেওয়া বহু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে সুস্পষ্ট ফারাক রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, জাতিসংঘ মহাসচিবের সফরের সময় কিছু প্রতীকী প্রদর্শন ছাড়া কোনো উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়নি। সফরের পরেও রোহিঙ্গারা কোনো দৃশ্যমান সুবিধা পায়নি, বাংলাদেশও পায়নি। ইউনুস ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ ওঠে। গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দ্রুত সরকারি সুবিধা
অনুমোদন দেওয়া হয়। শত শত কোটি টাকার কর মওকুফ, দীর্ঘমেয়াদি করছাড়, সরকারি শেয়ার হ্রাস এবং বিভিন্ন লাইসেন্স অনুমোদন দ্রুত দেওয়া হয়, যা পক্ষপাতিত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ধারণা সৃষ্টি করে। এছাড়া বহু আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলাগুলো বিচার শেষ না করেই খারিজ করা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং অধ্যাদেশ জারি করে চেয়ারম্যান নিয়োগে রাষ্ট্রের ভূমিকা বাতিল করাকেও সময়োপযোগী নয় বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ইউনুসের মূল দায়িত্ব ছিল একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই লক্ষ্য থেকে সরে এসে তিনি বিদেশি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে
আপস করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো লাভজনক সমুদ্রবন্দর বিদেশি নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার উদ্যোগ বা তথাকথিত মানবিক করিডরের নামে ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা পর্যবেক্ষকদের কাছে তাঁকে বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত এক পুতুল শাসক হিসেবে তুলে ধরেছে। মাচাদোর ক্ষেত্রে, মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর তাঁর নোবেল পুরস্কার ভাগাভাগির প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনায় অনেক বাংলাদেশি ইউনুসের সঙ্গে তাঁর তুলনা করছেন। উভয় ক্ষেত্রেই অভিযোগ একটাই—নির্বাচন এড়িয়ে বিদেশি শক্তিকে তুষ্ট করে দেশ শাসনের চেষ্টা। এই সম্পর্ক শুধু বাংলাদেশ বা ভেনেজুয়েলায় সীমাবদ্ধ নয়। মিয়ানমারের অং সান সু চির উদাহরণও বহুল আলোচিত। একসময় তিনি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গণতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁকে আন্তর্জাতিক নৈতিক বৈধতা দিয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটের পর সেই নৈতিক আভা দ্রুত ম্লান হয়ে যায়। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যখন মিয়ানমারের বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করে, তখন তাঁর নীরবতা স্পষ্ট করে দেয় যে নোবেল পুরস্কার কোনো স্থায়ী নৈতিক ঢাল নয়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—নোবেল শান্তি পুরস্কার কি সত্যিই শান্তির প্রতীক, নাকি এটি একটি সফট পাওয়ার কৌশল? সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে নৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও জনমত গঠন করে সরকার পরিবর্তনের পরিবেশ সৃষ্টি করাই কি আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপ? বহু বিশ্লেষকের মতে, উত্তর হ্যাঁ। এখানে নোবেল পুরস্কার হার্ড পাওয়ারের বিকল্প হলেও লক্ষ্য একই—প্রভাব বিস্তার। ১৯৭১ সালের ইতিহাস টেনে কেউ কেউ দাবি করেন, নোবেল কমিটির কিছু সদস্য গোপনে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছিলেন। এই তুলনা টেনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশে নোবেল পুরস্কার পেলেও ইউনুস নাকি নীরবে দেশের স্বার্থ রক্ষা করছেন। এই বয়ান কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা পাঠকের বিচার্য। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নোবেল শান্তি পুরস্কার আর রাজনীতির বাইরে কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়। ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলার খবর শুনে যে ভয় ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটিই এই আলোচনার কেন্দ্রে। “দয়া করে কেউ এই মানুষটিকে থামান”—এই আহ্বান শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; এটি এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, যেখানে শান্তির নামে পুরস্কার দেওয়া হয়, আর আড়ালে চলে যুদ্ধ, হস্তক্ষেপ ও পুতুল সরকার তৈরির পরিকল্পনা। সবশেষে বলা যায়, নোবেল শান্তি পুরস্কার নিজে ভালো বা মন্দ নয়। কিন্তু কে এই পুরস্কার পাচ্ছেন, কোন প্রেক্ষাপটে পাচ্ছেন এবং কীভাবে তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এগুলো উপেক্ষা করা যায় না। ইউনুস, মাচাদো বা অং সান সু চির ব্যক্তিগত চরিত্র ইতিহাস বিচার করবে, যেমনটি করেছে মাদার তেরেসার ক্ষেত্রে। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে জনমনে ক্রমবর্ধমানভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পরাশক্তির একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। আজকের রাজনীতিতে এই বাস্তবতা বোঝাই সবচেয়ে বড় সচেতনতা।



