সৈয়দ ইফতেখার হোসেন
আরও খবর
যুক্তরাষ্ট্রের তেল-গ্যাস লবির সফল কৌশলঃ ইউনুসের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল
উৎপাদনশীলতার সক্ষমতা, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সনদ
অটিজম, স্নায়ুবৈচিত্র্যতা আন্দোলন এবং অন্তর্ভুক্তির হিসেব-নিকেশ
স্কুলে এসে শিশুরা যেন পাঠ্যপুস্তকে বৈষম্য না দেখে—এই অবদান শেখ হাসিনার একান্ত
২৬ মার্চ-বাংলাদেশের জন্মদিন
শেখ মুজিব-বাঙালির একমাত্র মাহানায়ক
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন: ভুল কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ
যেভাবে ডিপ স্টেট-এর খপ্পরে বাংলাদেশ
ইদানিং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির সাথে নুতন করে পরিচিত হচ্ছে যদিও এই শব্দটির অর্থ অনেকের কাছে তেমন একটি পরিষ্কার নয়। ক’দিন আগে কথিত জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া প্রকাশ্যে বলেছেন ‘ডিপ স্টেট’ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বিদায়ি ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন (অসাংবিধানিক) সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে প্রস্তাব দিয়েছিলো। ২০২৪ এর জুলাইয়ের আগে অসিফ মাহুমুদ সজীব ভুঁইয়া, সারজিস আলম, ওসমান হামি বা নাহিদ ইসলামদেও মতো যে কোন ছাত্রনেতা আছে তা তেমন শোনা যায়নি, কারণ এরা প্রায় সকলেই ছাত্রলীগের মতো একটি বড় ছাত্র সংদঠনের ছায়া তলে লুকিয়ে ছিল।
আসিফ বলেছিল এই ডিপ স্টেট তাদের কাজে সব রকমের সহায়তা করবে। সজীব
ভুঁইয়া ইউনূস সরকারের উপেদেষ্টা পরিষদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। পরে সে তার পদ থেকে ইস্তফা নিয়ে ইউনূসের আশীর্বাদ নিয়ে ‘এনসিপি’ নামক একটি রাজনৈতিক দল খুলে তার মূখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০২৪ সালে এই আসিফ ভুঁইয়াদের নেতৃত্বে সৃষ্ট ‘কোটা বিরোধী’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অসাংবিধানিক একটি অন্তবর্তী সরকারের আবির্ভাব হয় যারা তাদের আঠারো মাসের স্বৈরতান্ত্রিক অপশাসনের ফলে বাংলাদেশকে কমপক্ষে একশত বছর পিছিয়ে দিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের আগে বাংলাদেশ যেমনটি ছিল সেটির এখন কঙ্কালটি পড়ে আছে। ১৯৪৭ পরবর্তী এই দেশে অনেক সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হয়েছে কিন্তু এই সব আন্দোলনের ফলে কোন সরকারের পতন হয়নি।
যখন হয়েছে তখন সব সময় তার পিছনে দেশের রাজনৈতিক দলসমূহের সরাসরি ও প্রকাশ্য সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৮-৬৯ সালের আইয়ূব বিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর বিপরীতে ২০২৪ সালের শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী আন্দোলনে কিছু বিভ্রান্ত ও দিকহারা বামপন্থি রাজনৈতিক দলছাড়া ছাত্রদের এই আন্দোলনে প্রকাশ্যে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কোন ভূমিকায় দেখা যায়নি। আসিফ ভুঁইয়া গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন তাদের এই আন্দোলন যদি রাজপথে সফল না হতো তা হলে তারা সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য প্রস্তত ছিল। তিনি এও বলেন একই সাথে তাদের আর এক সহকর্মী নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমে প্রচারের
জন্য একটি ভাষণও প্রস্তুত করে রেখেছিলো। এমন সব প্রস্তুতি এই দেশের অন্য কোন ছাত্র আন্দোলনে দেখা যায়নি। শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতাচূতির কয়েক মাস পর তাদের এক নেতা ওসমান হাদি আততায়ীর হাতে নিহত হয়। এই ঘটনার পর আসিফ ভুঁইয়ার সহকর্মীরা ঢাকাসহ সারা দেশে এক ভয়াবহ সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কিছুদিন আগে ভারতে ওসমান হাদি হত্যার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনার পর এসসিপি নেতা ও ইউনূস সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত ছিল ‘ডিপ স্টেট’। এখন দেখা যাক কারা এই ‘ডিপ স্টেট’, কী কাজের সাথে তারা জড়িত, তাদের উদ্দেশ্যই বা কী, তাদের সঙ্গি সাথীরাও বা কারা?
কোথা থেকে তাদের আগমন? অনেকের ধারণা হতে পারে এই ডিপ স্টেট বুঝি দেশের বাহির থেকে আসে একটি সরকারের ক্ষতি করার এজেন্ডা নিয়ে। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। একটি দেশে এই ডিপ স্টেট তৈরি হয় তার অভ্যন্তরে যার কুশিলব থাকে সেই দেশের আমলাতন্ত্র, সুশিল সমাজের একটি বড় অংশ, বড় বড় এনজিও, সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর ভিতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ, দেশের গণমাধম্যের একটি বড় অংশ আর কিছু রাজনৈতিক নেতা। এদের কেউই দেশের বাইরের ব্যক্তি বা সংগঠন নয়। এদের প্রধান কাজ হচ্ছে দেশের নির্বাচিত একটি সরকারের নীতি নির্ধারকদের কার্যকলাপের উপর হস্তক্ষেপ করা, তাদের উপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করা, দেশের মিডিয়ার
মাধ্যমে অসত্য অর্ধ সত্য সংবাদ ও তথ্য দিয়ে সরকার ও জনগণকে বিভ্রান্ত্র ও প্রভাবিত করা। এরা সকলে সম্মিলিতভাবে একটি নির্বাচিত সরকারকে বেকায়দায় ফেলে নিজেদের মতো করে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সরকারকে পরিচালিত করে। সোজা কথায় এরা হচ্ছে একটি দেশের বৈধ সরকারের ভিতর আর একটি সরকার যা মূল সরকার বুঝতে পারে না বা দেরীতে বুঝে। বিগত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার তার একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ। সেই প্রসঙ্গে পরে আলোচনা করছি। দেশের ভিতর এই ডিপ স্টেটের কুশিলবরা যখন তাদের কাজে সফল হয় তখন তারা বাইরের সংস্থা, ব্যক্তি বা সরকারের সহযোগিতা বা সহায়তা পায়। সেই সহায়তা তখনই আসে যখন তারা দেখে একটি দেশের ভিতরের ডিপ স্টেটের কর্মসূচি
সফল হলে তাদের বা তাদের দেশের কোন নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। এই কর্মসূচির মধ্যে আছে একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, তার জন্য প্রয়োজন হলে সেই দেশের সরকার পরিবর্তন করে নিজস্ব পছন্দের সরকার প্রতিস্থাপন বা এমনও হতে পারে নির্বাচিত সরকারকে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে বাধ্য করা। এই সব কাজের জন্য তারা নিজেদের দেশে একাধিক সংস্থা সৃষ্টিতে সহায়তা করে এবং তাদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। এমন আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। এই বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যখন দেশের ডিপ স্টেটের প্রতিষ্ঠানগুলো হাত মেলায় তখন তাদের সম্মিলিত শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের কর্মকাণ্ডের কাছে অনেক সময় যে কোন নির্বাচিত সরকার আত্মসমর্পন করে এবং এক সময় তাদের পতন হয়। ক্ষমতায় আসে এই ডিপ স্টেটের পছন্দের একটি অবৈধ সরকার যারা অন্য পক্ষকে তাদের প্রত্যাশিত এজেন্ডা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহায়তা করে। সুতারাং দেখা যায় কথিত ডিপ স্টেটের জন্ম হয় একটি দেশের অভ্যন্তরে তার পর তারা অন্য দেশের মিত্ররা তাদের সাথে হাত মিলায় এবং তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করে। এই যে অন্য দেশের কথা বলা হচ্ছে সেই দেশ গুলো কারা? অবধারিতভাবে প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তারপরে যুক্তরাজ্য। ইউরোপিয় ইউনিয়নের কিছু দেশও আছে তবে তারা বর্তমানে তেমন সক্রিয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের ডিপ স্টেটকে সহায়তা করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে আর এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা করার জন্য বিগত দিনে সেই দেশের ধনকুবের জর্জ সরোস ‘ওপেন সোসাইটি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে। আগে আরো বেশ কিছু সংস্থা ছিল। বর্তমানে এই সংস্থার দায়িত্ব তিনি তার ছেলে আলেক্সজান্ডার সরোসের উপর ন্যস্ত করেছেন। আলেক্সজান্ডার সরোস বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের সাথে দেখো করার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। তাদের মধ্যে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশের বাহিরে একটি দেশের অভ্যন্তরে থাকা ডিপ স্টেটকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা করার জন্য থেকে এইসব প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আর একটি পরা শক্তির আবির্ভাব হয় যার নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) যারা যুদ্ধ পরবর্তিকালে তৃতীয় বিশ্ব ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ধারা প্রচার করার চেষ্টা করে। অনেক দেশে এই চিন্তা ধারা জনগণের কাছে প্রচার করার জন্য সৃষ্টি হয় কমিউনিষ্ট পার্টি। যেখানে আগে থেকেই এমন পার্টি ছিল, যেমন ভারত বা কিউবা। সেখানে এই পার্টিগুলোকে আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়। এই সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের এই কর্মসূচি লাগাম টেনে ধরার জন্য তাদেরও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথমে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য তারা তাদের কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে মাঠে নামায়। শুরুতে বিদেশে মার্কিন দূতাবাসসমূহে সিআইএর চৌকশ দুএকজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। তাদের সহায়তায় সেই দেশগুলোতে বাছাই করা একাধিক ব্যক্তিকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং তাদের নানা অজুহাতে বিপুল পরিমাণের অর্থ ব্যয় করে। এরা তখন হয়ে উঠে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ ডিপ স্টেটের অংশ। বাংলাদেশে এমন একজন ব্যক্তির পিছনে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার জন্য প্রায় নয় লক্ষ ডলার অনুদান দিয়েছিল। সেই ব্যক্তির একটি এনজিও আছে। তার বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের একজন রাষ্ট্রদূত একবার রাতের খাবার খেতে গেলে স্থানীয় জনগণের হাতে নাজেহাল হন। উল্লেখিত ব্যক্তি ড. ইউনূসের শাসনকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের সদস্য ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করার জন্য দেশে দেশে তাদের তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করার কাজটি শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর ইরানে। এই সময় ইরানের সকল তেল ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল যুক্তরাজ্যের কয়েকটি তেল কোম্পানি। তেলের সকল আয় তারা ইরানের তৎকালীন শাহ রেজা পাহলভির সাথে ভাগ বাটোয়ারা করে নিতো। দেশের মানুষ ছিল একেবারেই হতদরিদ্র। ষাটের দশকে তাদের অনেকেই বর্তমান বাংলাদেশেও সপরিবারে এসেছে কাজের সন্ধানে। ঢাকা চট্টগ্রামে রেল স্টেশন বা জাহাজ ঘাটে তাদের অনেকেই কুলির কাজ করতো। মহিলারা শহরের সড়কে টেবিল পেতে টুকটাক জিনিস বিক্রি করতো। ১৯৫১ সালে ইরানে একটি নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইরানের বাম ঘেঁষা ‘তুদেহ পাটি‘। এই দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ। তিনি তার নির্বাচনি ইস্তেহারে ঘোষণা করেন নির্বাচিত হলে তিনি দেশের সকল তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয়করণ করবেন। জনগণ এতে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং তাকে ইরানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী তিনি ইরানের সকল তেল ক্ষেত্রকে জাতীয়করণ করেন এবং এই তেল ক্ষেত্রগুলো যে সকল বিদেশী কোম্পানির (মূলত বৃটিশ) নিয়ন্ত্রণে ছিল তাদের ইরান হতে বহিষ্কার করেন। বৃটিশ সরকার এই পরিস্থিতি হতে উত্তরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনে শরাণাপন্ন হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রে ডিপ স্টেটের শাখা প্রশাখা বর্তমানের মতো এতো সংগঠিত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার দেশটির কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে কাজে লাগায়। সিআইএ তাদের বাছাই করা ব্যক্তি ও কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানে জনরোষ সৃষ্টি করে মোসাদ্দেগ সরকারের বিরুদ্ধে সারা দেশে জন বিক্ষোভের সৃষ্টির কর্মসূচি হাতে নেয় এবং তা সফল করে। ১৯৫৩ সালে ড. মোসাদ্দেগ পদত্যাগ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশে তাদের একটি তাঁবেদার সরকারকে ক্ষমতায় বসায়। আবার নূতন করে শুরু হয় ইরানের তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের এক নবযাত্রা যা নব্বইয়ের ইসলামী বিপ্লব পর্যন্ত চলে। ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি টেস্ট কেস। এর পর দেশে দেশে তাদের নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্টি হয় একাধি’ক সংস্থা। এদের মধ্যে যাদের নাম উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে আছে ইউএসএআইডি, এনডিআই, আইআরআই, এনইডি, আরটিক্যাল-১৯ প্রভৃতি। এরা সকলেই বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল এবং শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। এদের কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনস, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, চিলি, হন্ডুরাস, হাইতি, ভেনিজুয়েলা, মিশর, ভিয়েতনাম, র্জডান, সিরিয়া, সিয়েরা লিওন, কঙ্গো, এঙ্গোলা প্রমুখ দেশে নিজেদের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে ডিপ স্টেটের সহায়তায় ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেদের তাঁবেদার সরকার বসিয়েছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য বিরাট ভূমিকা রেখেছে কয়েকটা গণমাধ্যম। এক গণমাধ্যম কর্মী একটি টিভি চ্যানেলে একটি জনপ্রিয় আলোচনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। অনুষ্ঠানে বেশির ভাগ সময় থাকতো সরকারের বিরুদ্ধে সত্য মিথ্যা মিশ্রিত আলোচনা। এক সময় টিভি কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দিলে সে ব্যক্তি অনুষ্ঠানটির নাম ঠিক রেখে নিজ উদ্যোগে ইউটিউব চ্যানেলে অনুষ্ঠানটি চালু রাখেন। একই ব্যক্তি বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার নাম করে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান খুলেন একুশটি বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে। এই সংস্থা গুলোর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ইএসএআইডি, বৃটিশ ফরেন অফিস, এনইডি, ইউএনডিপি, এশিয়া ফাউন্ডেশন, অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসসহ আরো অনেক বিদেশী যারা এই ডিপ স্টেটের অংশ। এই সব প্রতিষ্ঠান দেশের একাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করার নামে অঢেল অর্থ ব্যয় করেছে যাতে প্রয়োজনে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে পেয়েছিল প্রায় একশত মিলিয়ন ডলার। উদ্দেশ্য সময় হলে তারা শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধ অবস্থান নেবে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছাত্রদের স্কুল পাঠ্য বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে জামায়াতের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিলেন। চব্বিশের জুলাই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় বিটিভিতে অগ্নিসংযোগ করে বিটিভির প্রভূত ক্ষতি করেছিল। দুটি পত্রিকার কথা না বললেই নয়। এই দুই পত্রিকার সম্পাদক মার্কিন ডিপ স্টেট থেকে কম পক্ষে একশত কোটি টাকা করে পেয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ শুধু জুলাই আন্দোলনে সমর্থন যোগানোর জন্য। আর একজন মিডিয়া মালিক পেয়েছিলেন ঊনত্রিশ হাজার ডলার। সজীব ভুঁইয়া, মাহফুজ আলমরা সেই ব্যক্তির মালিকানাধীন টিভি স্টুডিওর কারিগরি সহায়তায় নিয়মিত লন্ডনের সাথে কথা বলতেন ও পরামর্শ নিতেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত হতো ‘সাউথ এশিয়ান পার্সপেক্টিভ’ নামের একটি অনলাইন জার্নাল। এই জার্নাল প্রকাশনার সাথে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম ডি মাইলাম, জন ডানলোউচ (এক এগারোর সময় ঢাকায় কর্মরত) আর বেগম জিয়ার প্রেস কোরের সাবেক সদস্য মুশফিক ফজল আনসারি, আলি রিয়াজসহ আরো অনেকে যাদের কয়েকজন ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আনসারি হয়েছিলেন রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য নবরূপে ডিপ স্টেটের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। এই সময় ড. ইউনূস ও একজন পত্রিকা সম্পাদকের প্রচেষ্টায় গুলশানের একটি কনভেনশন সেন্টারে ‘যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন’ নামে একটি সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই আয়োজন আরো কয়েকটি এনজিও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। একজন এনজিও প্রতিনিধি যিনি দেশের দারিদ্র ও ক্ষুদা নিরসনের নামে বিদেশে অর্থায়নে দীর্ঘদিন এই দেশে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন এই আয়োজনে বড় ধরণের অর্থায়ন করেন। উপরের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না একটি দেশের একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে এই কথিত ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে। শেখ হাসিনা এই ডিপ স্টেট কীভাবে তাকে উৎখাত করার জন্য কাজ করেছে তা হয় বুঝতে পারেননি যার অন্যতম কারণ তাঁকে যেসব ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও আমলারা সব সময় ঘিরে রেখেছিল তাদের অনেকেই এই কথিত ডিপ স্টেটের সাথে জড়িত ছিলেন। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার মতো একটি গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন নিজের অসতর্কতার কারণে। আশা করি তিনি পুরো পরিস্থিতি গভীরভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন করবেন। লেখক : একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ভুঁইয়া ইউনূস সরকারের উপেদেষ্টা পরিষদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। পরে সে তার পদ থেকে ইস্তফা নিয়ে ইউনূসের আশীর্বাদ নিয়ে ‘এনসিপি’ নামক একটি রাজনৈতিক দল খুলে তার মূখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০২৪ সালে এই আসিফ ভুঁইয়াদের নেতৃত্বে সৃষ্ট ‘কোটা বিরোধী’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় এবং ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অসাংবিধানিক একটি অন্তবর্তী সরকারের আবির্ভাব হয় যারা তাদের আঠারো মাসের স্বৈরতান্ত্রিক অপশাসনের ফলে বাংলাদেশকে কমপক্ষে একশত বছর পিছিয়ে দিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের আগে বাংলাদেশ যেমনটি ছিল সেটির এখন কঙ্কালটি পড়ে আছে। ১৯৪৭ পরবর্তী এই দেশে অনেক সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হয়েছে কিন্তু এই সব আন্দোলনের ফলে কোন সরকারের পতন হয়নি।
যখন হয়েছে তখন সব সময় তার পিছনে দেশের রাজনৈতিক দলসমূহের সরাসরি ও প্রকাশ্য সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৮-৬৯ সালের আইয়ূব বিরোধী আন্দোলন, নব্বইয়ের দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর বিপরীতে ২০২৪ সালের শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী আন্দোলনে কিছু বিভ্রান্ত ও দিকহারা বামপন্থি রাজনৈতিক দলছাড়া ছাত্রদের এই আন্দোলনে প্রকাশ্যে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কোন ভূমিকায় দেখা যায়নি। আসিফ ভুঁইয়া গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন তাদের এই আন্দোলন যদি রাজপথে সফল না হতো তা হলে তারা সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য প্রস্তত ছিল। তিনি এও বলেন একই সাথে তাদের আর এক সহকর্মী নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমে প্রচারের
জন্য একটি ভাষণও প্রস্তুত করে রেখেছিলো। এমন সব প্রস্তুতি এই দেশের অন্য কোন ছাত্র আন্দোলনে দেখা যায়নি। শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতাচূতির কয়েক মাস পর তাদের এক নেতা ওসমান হাদি আততায়ীর হাতে নিহত হয়। এই ঘটনার পর আসিফ ভুঁইয়ার সহকর্মীরা ঢাকাসহ সারা দেশে এক ভয়াবহ সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কিছুদিন আগে ভারতে ওসমান হাদি হত্যার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনার পর এসসিপি নেতা ও ইউনূস সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত ছিল ‘ডিপ স্টেট’। এখন দেখা যাক কারা এই ‘ডিপ স্টেট’, কী কাজের সাথে তারা জড়িত, তাদের উদ্দেশ্যই বা কী, তাদের সঙ্গি সাথীরাও বা কারা?
কোথা থেকে তাদের আগমন? অনেকের ধারণা হতে পারে এই ডিপ স্টেট বুঝি দেশের বাহির থেকে আসে একটি সরকারের ক্ষতি করার এজেন্ডা নিয়ে। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। একটি দেশে এই ডিপ স্টেট তৈরি হয় তার অভ্যন্তরে যার কুশিলব থাকে সেই দেশের আমলাতন্ত্র, সুশিল সমাজের একটি বড় অংশ, বড় বড় এনজিও, সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর ভিতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ, দেশের গণমাধম্যের একটি বড় অংশ আর কিছু রাজনৈতিক নেতা। এদের কেউই দেশের বাইরের ব্যক্তি বা সংগঠন নয়। এদের প্রধান কাজ হচ্ছে দেশের নির্বাচিত একটি সরকারের নীতি নির্ধারকদের কার্যকলাপের উপর হস্তক্ষেপ করা, তাদের উপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করা, দেশের মিডিয়ার
মাধ্যমে অসত্য অর্ধ সত্য সংবাদ ও তথ্য দিয়ে সরকার ও জনগণকে বিভ্রান্ত্র ও প্রভাবিত করা। এরা সকলে সম্মিলিতভাবে একটি নির্বাচিত সরকারকে বেকায়দায় ফেলে নিজেদের মতো করে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সরকারকে পরিচালিত করে। সোজা কথায় এরা হচ্ছে একটি দেশের বৈধ সরকারের ভিতর আর একটি সরকার যা মূল সরকার বুঝতে পারে না বা দেরীতে বুঝে। বিগত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার তার একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ। সেই প্রসঙ্গে পরে আলোচনা করছি। দেশের ভিতর এই ডিপ স্টেটের কুশিলবরা যখন তাদের কাজে সফল হয় তখন তারা বাইরের সংস্থা, ব্যক্তি বা সরকারের সহযোগিতা বা সহায়তা পায়। সেই সহায়তা তখনই আসে যখন তারা দেখে একটি দেশের ভিতরের ডিপ স্টেটের কর্মসূচি
সফল হলে তাদের বা তাদের দেশের কোন নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। এই কর্মসূচির মধ্যে আছে একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, তার জন্য প্রয়োজন হলে সেই দেশের সরকার পরিবর্তন করে নিজস্ব পছন্দের সরকার প্রতিস্থাপন বা এমনও হতে পারে নির্বাচিত সরকারকে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করতে বাধ্য করা। এই সব কাজের জন্য তারা নিজেদের দেশে একাধিক সংস্থা সৃষ্টিতে সহায়তা করে এবং তাদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। এমন আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। এই বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যখন দেশের ডিপ স্টেটের প্রতিষ্ঠানগুলো হাত মেলায় তখন তাদের সম্মিলিত শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের কর্মকাণ্ডের কাছে অনেক সময় যে কোন নির্বাচিত সরকার আত্মসমর্পন করে এবং এক সময় তাদের পতন হয়। ক্ষমতায় আসে এই ডিপ স্টেটের পছন্দের একটি অবৈধ সরকার যারা অন্য পক্ষকে তাদের প্রত্যাশিত এজেন্ডা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহায়তা করে। সুতারাং দেখা যায় কথিত ডিপ স্টেটের জন্ম হয় একটি দেশের অভ্যন্তরে তার পর তারা অন্য দেশের মিত্ররা তাদের সাথে হাত মিলায় এবং তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করে। এই যে অন্য দেশের কথা বলা হচ্ছে সেই দেশ গুলো কারা? অবধারিতভাবে প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তারপরে যুক্তরাজ্য। ইউরোপিয় ইউনিয়নের কিছু দেশও আছে তবে তারা বর্তমানে তেমন সক্রিয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের ডিপ স্টেটকে সহায়তা করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে আর এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা করার জন্য বিগত দিনে সেই দেশের ধনকুবের জর্জ সরোস ‘ওপেন সোসাইটি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে। আগে আরো বেশ কিছু সংস্থা ছিল। বর্তমানে এই সংস্থার দায়িত্ব তিনি তার ছেলে আলেক্সজান্ডার সরোসের উপর ন্যস্ত করেছেন। আলেক্সজান্ডার সরোস বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের সাথে দেখো করার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। তাদের মধ্যে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশের বাহিরে একটি দেশের অভ্যন্তরে থাকা ডিপ স্টেটকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা করার জন্য থেকে এইসব প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আর একটি পরা শক্তির আবির্ভাব হয় যার নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) যারা যুদ্ধ পরবর্তিকালে তৃতীয় বিশ্ব ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ধারা প্রচার করার চেষ্টা করে। অনেক দেশে এই চিন্তা ধারা জনগণের কাছে প্রচার করার জন্য সৃষ্টি হয় কমিউনিষ্ট পার্টি। যেখানে আগে থেকেই এমন পার্টি ছিল, যেমন ভারত বা কিউবা। সেখানে এই পার্টিগুলোকে আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়। এই সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের এই কর্মসূচি লাগাম টেনে ধরার জন্য তাদেরও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথমে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য তারা তাদের কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে মাঠে নামায়। শুরুতে বিদেশে মার্কিন দূতাবাসসমূহে সিআইএর চৌকশ দুএকজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। তাদের সহায়তায় সেই দেশগুলোতে বাছাই করা একাধিক ব্যক্তিকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং তাদের নানা অজুহাতে বিপুল পরিমাণের অর্থ ব্যয় করে। এরা তখন হয়ে উঠে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ ডিপ স্টেটের অংশ। বাংলাদেশে এমন একজন ব্যক্তির পিছনে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার জন্য প্রায় নয় লক্ষ ডলার অনুদান দিয়েছিল। সেই ব্যক্তির একটি এনজিও আছে। তার বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের একজন রাষ্ট্রদূত একবার রাতের খাবার খেতে গেলে স্থানীয় জনগণের হাতে নাজেহাল হন। উল্লেখিত ব্যক্তি ড. ইউনূসের শাসনকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের সদস্য ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করার জন্য দেশে দেশে তাদের তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করার কাজটি শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর ইরানে। এই সময় ইরানের সকল তেল ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল যুক্তরাজ্যের কয়েকটি তেল কোম্পানি। তেলের সকল আয় তারা ইরানের তৎকালীন শাহ রেজা পাহলভির সাথে ভাগ বাটোয়ারা করে নিতো। দেশের মানুষ ছিল একেবারেই হতদরিদ্র। ষাটের দশকে তাদের অনেকেই বর্তমান বাংলাদেশেও সপরিবারে এসেছে কাজের সন্ধানে। ঢাকা চট্টগ্রামে রেল স্টেশন বা জাহাজ ঘাটে তাদের অনেকেই কুলির কাজ করতো। মহিলারা শহরের সড়কে টেবিল পেতে টুকটাক জিনিস বিক্রি করতো। ১৯৫১ সালে ইরানে একটি নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইরানের বাম ঘেঁষা ‘তুদেহ পাটি‘। এই দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেগ। তিনি তার নির্বাচনি ইস্তেহারে ঘোষণা করেন নির্বাচিত হলে তিনি দেশের সকল তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয়করণ করবেন। জনগণ এতে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং তাকে ইরানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী তিনি ইরানের সকল তেল ক্ষেত্রকে জাতীয়করণ করেন এবং এই তেল ক্ষেত্রগুলো যে সকল বিদেশী কোম্পানির (মূলত বৃটিশ) নিয়ন্ত্রণে ছিল তাদের ইরান হতে বহিষ্কার করেন। বৃটিশ সরকার এই পরিস্থিতি হতে উত্তরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনে শরাণাপন্ন হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রে ডিপ স্টেটের শাখা প্রশাখা বর্তমানের মতো এতো সংগঠিত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার দেশটির কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে কাজে লাগায়। সিআইএ তাদের বাছাই করা ব্যক্তি ও কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানে জনরোষ সৃষ্টি করে মোসাদ্দেগ সরকারের বিরুদ্ধে সারা দেশে জন বিক্ষোভের সৃষ্টির কর্মসূচি হাতে নেয় এবং তা সফল করে। ১৯৫৩ সালে ড. মোসাদ্দেগ পদত্যাগ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশে তাদের একটি তাঁবেদার সরকারকে ক্ষমতায় বসায়। আবার নূতন করে শুরু হয় ইরানের তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের এক নবযাত্রা যা নব্বইয়ের ইসলামী বিপ্লব পর্যন্ত চলে। ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি টেস্ট কেস। এর পর দেশে দেশে তাদের নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্টি হয় একাধি’ক সংস্থা। এদের মধ্যে যাদের নাম উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে আছে ইউএসএআইডি, এনডিআই, আইআরআই, এনইডি, আরটিক্যাল-১৯ প্রভৃতি। এরা সকলেই বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল এবং শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। এদের কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনস, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, চিলি, হন্ডুরাস, হাইতি, ভেনিজুয়েলা, মিশর, ভিয়েতনাম, র্জডান, সিরিয়া, সিয়েরা লিওন, কঙ্গো, এঙ্গোলা প্রমুখ দেশে নিজেদের স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে ডিপ স্টেটের সহায়তায় ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেদের তাঁবেদার সরকার বসিয়েছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য বিরাট ভূমিকা রেখেছে কয়েকটা গণমাধ্যম। এক গণমাধ্যম কর্মী একটি টিভি চ্যানেলে একটি জনপ্রিয় আলোচনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। অনুষ্ঠানে বেশির ভাগ সময় থাকতো সরকারের বিরুদ্ধে সত্য মিথ্যা মিশ্রিত আলোচনা। এক সময় টিভি কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দিলে সে ব্যক্তি অনুষ্ঠানটির নাম ঠিক রেখে নিজ উদ্যোগে ইউটিউব চ্যানেলে অনুষ্ঠানটি চালু রাখেন। একই ব্যক্তি বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার নাম করে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান খুলেন একুশটি বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে। এই সংস্থা গুলোর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ইএসএআইডি, বৃটিশ ফরেন অফিস, এনইডি, ইউএনডিপি, এশিয়া ফাউন্ডেশন, অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসসহ আরো অনেক বিদেশী যারা এই ডিপ স্টেটের অংশ। এই সব প্রতিষ্ঠান দেশের একাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করার নামে অঢেল অর্থ ব্যয় করেছে যাতে প্রয়োজনে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে পেয়েছিল প্রায় একশত মিলিয়ন ডলার। উদ্দেশ্য সময় হলে তারা শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধ অবস্থান নেবে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছাত্রদের স্কুল পাঠ্য বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে জামায়াতের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিলেন। চব্বিশের জুলাই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় বিটিভিতে অগ্নিসংযোগ করে বিটিভির প্রভূত ক্ষতি করেছিল। দুটি পত্রিকার কথা না বললেই নয়। এই দুই পত্রিকার সম্পাদক মার্কিন ডিপ স্টেট থেকে কম পক্ষে একশত কোটি টাকা করে পেয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ শুধু জুলাই আন্দোলনে সমর্থন যোগানোর জন্য। আর একজন মিডিয়া মালিক পেয়েছিলেন ঊনত্রিশ হাজার ডলার। সজীব ভুঁইয়া, মাহফুজ আলমরা সেই ব্যক্তির মালিকানাধীন টিভি স্টুডিওর কারিগরি সহায়তায় নিয়মিত লন্ডনের সাথে কথা বলতেন ও পরামর্শ নিতেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত হতো ‘সাউথ এশিয়ান পার্সপেক্টিভ’ নামের একটি অনলাইন জার্নাল। এই জার্নাল প্রকাশনার সাথে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম ডি মাইলাম, জন ডানলোউচ (এক এগারোর সময় ঢাকায় কর্মরত) আর বেগম জিয়ার প্রেস কোরের সাবেক সদস্য মুশফিক ফজল আনসারি, আলি রিয়াজসহ আরো অনেকে যাদের কয়েকজন ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আনসারি হয়েছিলেন রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য নবরূপে ডিপ স্টেটের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। এই সময় ড. ইউনূস ও একজন পত্রিকা সম্পাদকের প্রচেষ্টায় গুলশানের একটি কনভেনশন সেন্টারে ‘যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন’ নামে একটি সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই আয়োজন আরো কয়েকটি এনজিও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। একজন এনজিও প্রতিনিধি যিনি দেশের দারিদ্র ও ক্ষুদা নিরসনের নামে বিদেশে অর্থায়নে দীর্ঘদিন এই দেশে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন এই আয়োজনে বড় ধরণের অর্থায়ন করেন। উপরের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না একটি দেশের একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে এই কথিত ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে। শেখ হাসিনা এই ডিপ স্টেট কীভাবে তাকে উৎখাত করার জন্য কাজ করেছে তা হয় বুঝতে পারেননি যার অন্যতম কারণ তাঁকে যেসব ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও আমলারা সব সময় ঘিরে রেখেছিল তাদের অনেকেই এই কথিত ডিপ স্টেটের সাথে জড়িত ছিলেন। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার মতো একটি গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন নিজের অসতর্কতার কারণে। আশা করি তিনি পুরো পরিস্থিতি গভীরভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন করবেন। লেখক : একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক



