ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে হাসপাতালের ৫ তলা থেকে ফেলে তরুণীকে হত্যা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
চট্টগ্রামে মাদ্রাসার শিক্ষক-পরিচালক মিলে ছাত্রদের দিনের পর দিন ধর্ষণ: ‘হাদিয়া’ দিয়ে খবর ধামাচাপার চেষ্টা
সাড়ে চার মাসে ধর্ষণের শিকার ১১৮ শিশু
সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে গণতন্ত্র উদ্ধারে দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা
বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য মেট্রোরেলে ২৫% ছাড়
৫ ট্রেনের বিলম্ব, কমলাপুরে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়
ঈদের লম্বা ছুটিতে মহাখালী বাসটার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ঢল
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের প্রধান রুট হয়ে উঠেছে: দ্য অস্ট্রেলিয়ান টুডে
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একদল উগ্র মতাদর্শী পুনর্বার হামলে পড়ে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়িটির ধ্বংসস্তূপের ওপর। তারা হাতুড়ি, শাবল আর এক্সক্যাভেটর নিয়ে আসে। ২০২৪-এর ৫ই আগস্টে একবার পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার পর পুনর্বার তারা ভবনটিতে দ্বিতীয় দফা আগুন দেয় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। পরে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর জঙ্গিবাদী পতাকা উড়িয়ে দেয়।
অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকদের কাছে এটা ছিল দূরের কোনো এক দেশের অস্থিরতার খবর। কিন্তু এটা আসলে একটা বড় সতর্কবার্তা।
ভারত আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত ১৮-১৯ কোটি মানুষের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ এখন গভীর সংকটে। ইসলামপন্থী পুনরুত্থানের মধ্যে রয়েছে দেশটি। আর এর প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বাস্তব। যে
নেটওয়ার্ক এর পেছনে কাজ করছে, সেটা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, আমাদের শহরগুলোতে এবং আমাদের চোখের সামনেই সক্রিয়। জঙ্গি হামলার মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর চরম সংকটে বাংলাদেশ দীর্ঘ দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে ইসলামপন্থী চরমপন্থার বিরুদ্ধে একটা শক্ত প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সরকার নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির শীর্ষ নেতাদের সাজা দিয়েছে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গড়ে তুলেছে, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিচার করেছে এবং দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী, দাগি অপরাধীদের জেলে আটকে রেখেছিল। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের পর সেই প্রাচীর রাতারাতি ভেঙে পড়ে। এরপর শুরু হয় বড় বড় জেল ভাঙার ঘটনা। ৭০০-এর বেশি
দণ্ডিত আসামি পালিয়ে যায়, যাদের মধ্যে ৭০ জনেরও বেশি দুর্ধর্ষ জঙ্গি ছিল। তারা কারারক্ষীদের কাছ থেকে অস্ত্র লুট করে বেরিয়ে যায়। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার পরে ১৭৪ জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দেয়। সবচেয়ে খারাপ ঘটনা ছিল জসীমউদ্দিন রহমানীর ক্ষেত্রে। তিনি জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান এবং ২০১৩ সালে কয়েকজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার হত্যার দায়ে দণ্ডিত। জামিনে বের হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ভারতের বিরুদ্ধে খোলাখুলি হুমকি দেন এবং উপমহাদেশজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতার ডাক দেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এবিটি-সংশ্লিষ্ট ৮ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। জঙ্গিবাদের প্রসার ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছিল। ২০০৯ সাল থেকে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর
বাংলাদেশ আবার মাথাচাড়া দেয় এবং ইউনূস সরকারের কাছে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানায়। সরকার তার জবাবে হিযবুত তাহরীর নেতা নাসিমুল গণিকে স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়! ভেবে দেখুন তো— জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে যিনি বসলেন, তার সঙ্গে নিষিদ্ধ এক জঙ্গি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতার সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে, যে সংগঠন জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বিলোপ করে বিশ্বব্যাপী খিলাফত কায়েম করতে চায়। ২০২৫ সালের মার্চে হিযবুত তাহরীর ঢাকার প্রধান মসজিদ বায়তুল মোকাররমের কাছে “খিলাফত অভিযান” মিছিল করে। শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসআইএসের পতাকা নিয়ে মিছিল করে খিলাফতের দাবি জানায়। নিউ ইয়র্ক টাইমস যা লিখেছে, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা মাসের পর মাস ধরে তা দেখছিলেন— একটা দেশে, যা পশ্চিমা কাউন্টার টেররিজমের নির্ভরযোগ্য অংশীদার
ছিল, সেখানে খোলাখুলি, সংগঠিত উগ্রবাদীরা রাস্তায় প্রকাশ্যে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছে। ঢাকা থেকে কাবুল হয়ে কুয়ালালামপুর বাংলাদেশ এখন বিদেশি জঙ্গি তৈরির একটা প্রধান রুট হয়ে উঠেছে, যা আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে রাখা উচিত। যুবকরা শ্রমিক হিসেবে দুবাই বা সৌদি আরবে চলে যায়, দেশের বিশাল প্রবাসী শ্রমিক নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ে, তারপর আফগানিস্তান হয়ে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-তে যোগ দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনা অভিযানে ৫৪ জন টিটিপি জঙ্গির সঙ্গে একজন বাংলাদেশি নাগরিকও নিহত হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খাইবার পাখতুনখোয়ায় টিটিপি-সংশ্লিষ্ট আরেকজন বাংলাদেশি নিহত হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে টিটিপির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের একজন কয়েক মাস আগেই জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন
একাধিক সন্ত্রাসবাদী মামলা থাকা সত্ত্বেও। তার স্বীকারোক্তিতে একজন প্রধান রিক্রুটারের নাম উঠে আসে, যিনি আরও ২৫ জন যুবককে সৌদি আরব হয়ে পাকিস্তানে টিটিপির কাজে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২০২৫ সালের জুনে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ সেলাঙ্গর ও জোহরে আইএসআইএস-সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপের জন্য ৩৬ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে। এরা শুধু সমর্থক ছিল না। তারা সক্রিয় রিক্রুটমেন্ট সেল চালাচ্ছিল, আন্তর্জাতিক ওয়্যার ট্রান্সফার ও ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে টাকা তুলছিল এবং সিরিয়ায় আইএসআইএসের কাছে টাকা পাঠাচ্ছিল। সিঙ্গাপুরের আরএসআইএস গবেষকরা ২০১৫ সাল থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে এই একই প্যাটার্ন দেখে আসছেন। বাংলাদেশ প্রতি বছর লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে পাঠায়। যে মাইগ্রেশন নেটওয়ার্কগুলো এই ৩৬ জনকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সেগুলো সরাসরি
নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি ও মিশিগানের বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত। মালয়েশিয়ায় এবার ধরা পড়েছে। আমেরিকা হলো পরবর্তী যৌক্তিক গন্তব্য। আমাদের এটা ঘটার আগেই সতর্ক হওয়া উচিত। উগ্রবাদী জামায়াতের নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকার ভেতরে যা চলছে তা দেখলে বাইরের হুমকিটা আরও জরুরি মনে হয়। জামায়াতে ইসলামী—বাংলাদেশের চরমপন্থী পুনরুত্থানের কেন্দ্রবিন্দু—ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা (আইসিএনএ)-এর মাধ্যমে আমেরিকায় দীর্ঘদিন ধরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। তাদের সদর দপ্তর নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা, কুইন্সে। ২০১৮ সালের এক কংগ্রেসীয় শুনানিতে আইসিএনএকে জামায়াতে ইসলামী দ্বারা “তৈরি করা” বলা হয়েছে। আইসিএনএর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন আশরাফুজ্জামান খান ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ঘাতকদের সংগঠন- আলবদরের কিলিং স্কোয়াডের কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনুপস্থিতিতে দণ্ডিত হয়েছিলেন। নিউ ইয়র্কে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে করতে তিনি আইসিএনএর কুইন্স চ্যাপ্টার চালিয়েছেন বছরের পর বছর। ২০১৬ সালে আইসিএনএ আলবদর কিলিং স্কোয়াডের প্রতিষ্ঠাতাকে ইসলামে “অসাধারণ অবদান”-এর জন্য মরণোত্তর সম্মাননা দেয়। ২০১৯ সালের এক দ্বিদলীয় কংগ্রেসীয় প্রস্তাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ডিএইচএস ও ইউএসএইডকে আইসিএনএ, আইসিএনএ রিলিফ এবং তাদের বিদেশি দাতা-সহযোগী সংস্থার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়। জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে। কংগ্রেসীয় চিঠিতে আইসিএনএর সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সাথে সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবি ওঠে। জামায়াত নিজে “গো আমেরিকা গো” র্যালি করেছে, যেখানে “আমেরিকান সৈন্যদের মৃত্যু” স্লোগান দেওয়া হয় এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের প্রতিকৃতি পোড়ানো হয়। বাংলাদেশে জামায়াতের নিষেধাজ্ঞা ২০২৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট তুলে নেয় এবং দলটি ২০২৬ সালের নির্বাচনে ৭০টির বেশি আসন জয় করে। দেশে নিষিদ্ধ থাকার সময়েও তাদের আমেরিকান নেটওয়ার্ক অটুট ছিল। এখনো সেটা পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে। নিজের সংকট অস্বীকার করা বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২৪ সালের বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আইএসআইএস ও আল-কায়েদা বাংলাদেশে অস্ত্র মজুত করছে এবং হামলার পরিকল্পনা করছে। হাউজ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটিও বিদেশি জিহাদি নেটওয়ার্কের পুনরুত্থান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে র্যাডিক্যালাইজেশন ও রিক্রুটমেন্ট নিয়ে সতর্ক করেছে। বাংলাদেশ এখন দুটোরই জীবন্ত উদাহরণ। দেশটি নিজেও সংসদ, নিরাপত্তা স্থাপনা ও জনস্থানে সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে জাতীয় নিরাপত্তা সতর্কতায় রয়েছে। অথচ ইউনূসের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা- যিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন- দেশে জঙ্গি নেই। রাজনৈতিক নেতারা চরমপন্থা আদৌ আছে কি না তা নিয়েও বিভক্ত। যে সরকার হুমকির নামই নিতে চায় না, সে হুমকি মোকাবিলা করবে কীভাবে? ইতোমধ্যে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া (জেএএফএইচএস)—বাংলাদেশের সবচেয়ে বিপজ্জনক তিনটি জঙ্গি গোষ্ঠীর জোট—২০১৯ সালে গঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার এদের কঠোরভাবে দমন করে, তাদের নেতাদের কারাগারে পাঠায়। কিন্তু ক্ষমতার পালা বদলের পর তারা এখন জামিনে মুক্ত হয়ে কাজ করছেন। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য: বাংলাদেশে ইসলামি খিলাফত, প্রতিবেশী দেশগুলোতে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং দক্ষিণ এশিয়ার চূড়ান্ত বিজয়। এর প্রতিষ্ঠাতারা উপরে উল্লেখিত টিটিপি পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত। এটা শুধু স্থানীয় বিদ্রোহ নয়। এটা আঞ্চলিক জিহাদি প্রকল্প, যার আদর্শ আমরা দুই দশক ধরে লড়াই করে আসছি। শেখ হাসিনার সরকার নেই বাংলাদেশ, তাই দণ্ডিত জঙ্গিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খিলাফতের মিছিলকারীরা রাস্তার দখল নিয়েছে, জাতীয় স্মৃতিসৌধের ওপর জঙ্গিদের পতাকা উড়ছে, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সংগঠন কুইন্স থেকে অপারেশন চালাচ্ছে, আর তাদের মূল দল করাচিতে আমেরিকান পতাকা পোড়াচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি আইএস সেলগুলো সিরিয়ায় টাকা পাঠাচ্ছে। ওয়াশিংটনের এখনই ঢাকার সঙ্গে জরুরিভাবে জঙ্গিবাদ দমনে অংশীদারিত্ব দরকার—গোয়েন্দা সহযোগিতা, জঙ্গি জামিন মুক্তির ওপর চাপ এবং জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো আমেরিকায় কী করছে তার কড়া পর্যালোচনা। প্রতিরোধের জানালা এখনো খোলা আছে। এটা চিরকাল খোলা থাকবে না। মূল প্রতিবেদন: The Australia Today
নেটওয়ার্ক এর পেছনে কাজ করছে, সেটা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, আমাদের শহরগুলোতে এবং আমাদের চোখের সামনেই সক্রিয়। জঙ্গি হামলার মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর চরম সংকটে বাংলাদেশ দীর্ঘ দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে ইসলামপন্থী চরমপন্থার বিরুদ্ধে একটা শক্ত প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সরকার নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির শীর্ষ নেতাদের সাজা দিয়েছে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গড়ে তুলেছে, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিচার করেছে এবং দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী, দাগি অপরাধীদের জেলে আটকে রেখেছিল। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের পর সেই প্রাচীর রাতারাতি ভেঙে পড়ে। এরপর শুরু হয় বড় বড় জেল ভাঙার ঘটনা। ৭০০-এর বেশি
দণ্ডিত আসামি পালিয়ে যায়, যাদের মধ্যে ৭০ জনেরও বেশি দুর্ধর্ষ জঙ্গি ছিল। তারা কারারক্ষীদের কাছ থেকে অস্ত্র লুট করে বেরিয়ে যায়। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার পরে ১৭৪ জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দেয়। সবচেয়ে খারাপ ঘটনা ছিল জসীমউদ্দিন রহমানীর ক্ষেত্রে। তিনি জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান এবং ২০১৩ সালে কয়েকজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার হত্যার দায়ে দণ্ডিত। জামিনে বের হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ভারতের বিরুদ্ধে খোলাখুলি হুমকি দেন এবং উপমহাদেশজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতার ডাক দেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এবিটি-সংশ্লিষ্ট ৮ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। জঙ্গিবাদের প্রসার ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছিল। ২০০৯ সাল থেকে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর
বাংলাদেশ আবার মাথাচাড়া দেয় এবং ইউনূস সরকারের কাছে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানায়। সরকার তার জবাবে হিযবুত তাহরীর নেতা নাসিমুল গণিকে স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়! ভেবে দেখুন তো— জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে যিনি বসলেন, তার সঙ্গে নিষিদ্ধ এক জঙ্গি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতার সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে, যে সংগঠন জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বিলোপ করে বিশ্বব্যাপী খিলাফত কায়েম করতে চায়। ২০২৫ সালের মার্চে হিযবুত তাহরীর ঢাকার প্রধান মসজিদ বায়তুল মোকাররমের কাছে “খিলাফত অভিযান” মিছিল করে। শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসআইএসের পতাকা নিয়ে মিছিল করে খিলাফতের দাবি জানায়। নিউ ইয়র্ক টাইমস যা লিখেছে, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা মাসের পর মাস ধরে তা দেখছিলেন— একটা দেশে, যা পশ্চিমা কাউন্টার টেররিজমের নির্ভরযোগ্য অংশীদার
ছিল, সেখানে খোলাখুলি, সংগঠিত উগ্রবাদীরা রাস্তায় প্রকাশ্যে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছে। ঢাকা থেকে কাবুল হয়ে কুয়ালালামপুর বাংলাদেশ এখন বিদেশি জঙ্গি তৈরির একটা প্রধান রুট হয়ে উঠেছে, যা আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে রাখা উচিত। যুবকরা শ্রমিক হিসেবে দুবাই বা সৌদি আরবে চলে যায়, দেশের বিশাল প্রবাসী শ্রমিক নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ে, তারপর আফগানিস্তান হয়ে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-তে যোগ দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনা অভিযানে ৫৪ জন টিটিপি জঙ্গির সঙ্গে একজন বাংলাদেশি নাগরিকও নিহত হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খাইবার পাখতুনখোয়ায় টিটিপি-সংশ্লিষ্ট আরেকজন বাংলাদেশি নিহত হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে টিটিপির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের একজন কয়েক মাস আগেই জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন
একাধিক সন্ত্রাসবাদী মামলা থাকা সত্ত্বেও। তার স্বীকারোক্তিতে একজন প্রধান রিক্রুটারের নাম উঠে আসে, যিনি আরও ২৫ জন যুবককে সৌদি আরব হয়ে পাকিস্তানে টিটিপির কাজে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২০২৫ সালের জুনে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ সেলাঙ্গর ও জোহরে আইএসআইএস-সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপের জন্য ৩৬ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে। এরা শুধু সমর্থক ছিল না। তারা সক্রিয় রিক্রুটমেন্ট সেল চালাচ্ছিল, আন্তর্জাতিক ওয়্যার ট্রান্সফার ও ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে টাকা তুলছিল এবং সিরিয়ায় আইএসআইএসের কাছে টাকা পাঠাচ্ছিল। সিঙ্গাপুরের আরএসআইএস গবেষকরা ২০১৫ সাল থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে এই একই প্যাটার্ন দেখে আসছেন। বাংলাদেশ প্রতি বছর লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে পাঠায়। যে মাইগ্রেশন নেটওয়ার্কগুলো এই ৩৬ জনকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সেগুলো সরাসরি
নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি ও মিশিগানের বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত। মালয়েশিয়ায় এবার ধরা পড়েছে। আমেরিকা হলো পরবর্তী যৌক্তিক গন্তব্য। আমাদের এটা ঘটার আগেই সতর্ক হওয়া উচিত। উগ্রবাদী জামায়াতের নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকার ভেতরে যা চলছে তা দেখলে বাইরের হুমকিটা আরও জরুরি মনে হয়। জামায়াতে ইসলামী—বাংলাদেশের চরমপন্থী পুনরুত্থানের কেন্দ্রবিন্দু—ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা (আইসিএনএ)-এর মাধ্যমে আমেরিকায় দীর্ঘদিন ধরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। তাদের সদর দপ্তর নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা, কুইন্সে। ২০১৮ সালের এক কংগ্রেসীয় শুনানিতে আইসিএনএকে জামায়াতে ইসলামী দ্বারা “তৈরি করা” বলা হয়েছে। আইসিএনএর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন আশরাফুজ্জামান খান ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ঘাতকদের সংগঠন- আলবদরের কিলিং স্কোয়াডের কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনুপস্থিতিতে দণ্ডিত হয়েছিলেন। নিউ ইয়র্কে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে করতে তিনি আইসিএনএর কুইন্স চ্যাপ্টার চালিয়েছেন বছরের পর বছর। ২০১৬ সালে আইসিএনএ আলবদর কিলিং স্কোয়াডের প্রতিষ্ঠাতাকে ইসলামে “অসাধারণ অবদান”-এর জন্য মরণোত্তর সম্মাননা দেয়। ২০১৯ সালের এক দ্বিদলীয় কংগ্রেসীয় প্রস্তাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ডিএইচএস ও ইউএসএইডকে আইসিএনএ, আইসিএনএ রিলিফ এবং তাদের বিদেশি দাতা-সহযোগী সংস্থার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়। জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে। কংগ্রেসীয় চিঠিতে আইসিএনএর সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সাথে সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবি ওঠে। জামায়াত নিজে “গো আমেরিকা গো” র্যালি করেছে, যেখানে “আমেরিকান সৈন্যদের মৃত্যু” স্লোগান দেওয়া হয় এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের প্রতিকৃতি পোড়ানো হয়। বাংলাদেশে জামায়াতের নিষেধাজ্ঞা ২০২৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্ট তুলে নেয় এবং দলটি ২০২৬ সালের নির্বাচনে ৭০টির বেশি আসন জয় করে। দেশে নিষিদ্ধ থাকার সময়েও তাদের আমেরিকান নেটওয়ার্ক অটুট ছিল। এখনো সেটা পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছে। নিজের সংকট অস্বীকার করা বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২৪ সালের বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আইএসআইএস ও আল-কায়েদা বাংলাদেশে অস্ত্র মজুত করছে এবং হামলার পরিকল্পনা করছে। হাউজ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটিও বিদেশি জিহাদি নেটওয়ার্কের পুনরুত্থান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে র্যাডিক্যালাইজেশন ও রিক্রুটমেন্ট নিয়ে সতর্ক করেছে। বাংলাদেশ এখন দুটোরই জীবন্ত উদাহরণ। দেশটি নিজেও সংসদ, নিরাপত্তা স্থাপনা ও জনস্থানে সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে জাতীয় নিরাপত্তা সতর্কতায় রয়েছে। অথচ ইউনূসের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা- যিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন- দেশে জঙ্গি নেই। রাজনৈতিক নেতারা চরমপন্থা আদৌ আছে কি না তা নিয়েও বিভক্ত। যে সরকার হুমকির নামই নিতে চায় না, সে হুমকি মোকাবিলা করবে কীভাবে? ইতোমধ্যে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া (জেএএফএইচএস)—বাংলাদেশের সবচেয়ে বিপজ্জনক তিনটি জঙ্গি গোষ্ঠীর জোট—২০১৯ সালে গঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার এদের কঠোরভাবে দমন করে, তাদের নেতাদের কারাগারে পাঠায়। কিন্তু ক্ষমতার পালা বদলের পর তারা এখন জামিনে মুক্ত হয়ে কাজ করছেন। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য: বাংলাদেশে ইসলামি খিলাফত, প্রতিবেশী দেশগুলোতে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং দক্ষিণ এশিয়ার চূড়ান্ত বিজয়। এর প্রতিষ্ঠাতারা উপরে উল্লেখিত টিটিপি পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত। এটা শুধু স্থানীয় বিদ্রোহ নয়। এটা আঞ্চলিক জিহাদি প্রকল্প, যার আদর্শ আমরা দুই দশক ধরে লড়াই করে আসছি। শেখ হাসিনার সরকার নেই বাংলাদেশ, তাই দণ্ডিত জঙ্গিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খিলাফতের মিছিলকারীরা রাস্তার দখল নিয়েছে, জাতীয় স্মৃতিসৌধের ওপর জঙ্গিদের পতাকা উড়ছে, জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সংগঠন কুইন্স থেকে অপারেশন চালাচ্ছে, আর তাদের মূল দল করাচিতে আমেরিকান পতাকা পোড়াচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি আইএস সেলগুলো সিরিয়ায় টাকা পাঠাচ্ছে। ওয়াশিংটনের এখনই ঢাকার সঙ্গে জরুরিভাবে জঙ্গিবাদ দমনে অংশীদারিত্ব দরকার—গোয়েন্দা সহযোগিতা, জঙ্গি জামিন মুক্তির ওপর চাপ এবং জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো আমেরিকায় কী করছে তার কড়া পর্যালোচনা। প্রতিরোধের জানালা এখনো খোলা আছে। এটা চিরকাল খোলা থাকবে না। মূল প্রতিবেদন: The Australia Today



