ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
বাজেটে তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রে ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
দুই পুত্রের নামে ইউনিয়নের নামকরণের পর প্রতিমন্ত্রীর হাস্যকর ব্যাখ্যা ও কাকতালীয় দাবি সংসদে
ভারত, বাংলাদেশ এবং একটি অভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যতের উদয়
নিজের বংশনাম ও সন্তানদের নামে ইউনিয়ন — ইতিহাসে নজিরবিহীন কাণ্ড ঘটালেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়ায়: অভিবাসী শ্রমিক ইস্যুতে আসিফ নজরুলের ব্যর্থতা পুষিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ
সাধারণ পাসপোর্ট বহন করে, ডিপ্লোমেটিক প্রটোকলের আবদার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ এর
১ আগস্ট থেকে দেশের সব গণপরিবহনে জিপিএস বাধ্যতামূলক, বিআরটিএ’র নির্দেশ
থ্রি জিরো বাস্তবায়নের নামে দেশে গণতন্ত্রসহ সব সূচকই ‘জিরো’ করে দিয়ে গেছেন ইউনূস
চব্বিশের জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল ভীষণ চাপের মুখে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত, আর জনমনে প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া। এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে দেশকে নির্বাচনমুখী করা এবং স্থিতিশীলতা ধরে রাখাই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিলম্বে হলেও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার উপলব্ধি করে যে নির্বাচনের পথে ফেরা ছাড়া গত্যন্তর নেই, কারণ স্বাভাবিক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একমাত্র টেকসই পথ হলো নির্বাচন। উত্তাল সেই সময়ে জনশৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রক্ষা করা ছিল জরুরি, কেননা বিভাজিত সমাজে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কখনোই সহজ কাজ নয়।
অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে মেনে নিতে হবে যে দেশকে নির্বাচনের পথে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের মূল দায়িত্ব। জনগণ তাদের
কিছু বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারের বৈধতা দিয়েছিল বটে, তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় যত দীর্ঘ সময় থাকে, নির্বাচন তত পিছিয়ে যায় এবং সেই বিলম্বকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টাও ততই জোরালো হয়। ইউনূস সরকারের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আর এটাই ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা। অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত সময়ের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ভিত্তি তাদের নেই। অস্থায়ী এই চরিত্রের কারণেই জনগণ তাদের বিশেষ কিছু ক্ষমতা মেনে নিয়েছিল, কারণ তারা জানত এসব ক্ষমতা সীমিত উদ্দেশ্যেই প্রয়োগ হবে। কিন্তু যখনই সরকার স্থায়ী বা নির্বাচিত সরকারের মতো আচরণ শুরু করল, তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে লাগল। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে
বাংলাদেশে নতুন তিনটি শূন্যের জন্ম হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমটি হলো শূন্য জবাবদিহি, দ্বিতীয়টি শূন্য জনআস্থা এবং তৃতীয়টি শূন্য গণতান্ত্রিক সহনশীলতা। ভবিষ্যতে ইতিহাস যখন এই সরকারকে মূল্যায়ন করবে, তখন এই তিন দিক অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারের মূল কাজ ছিল পরিষ্কার ও সুদূরপ্রসারী: শৃঙ্খলা ফেরানো, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া। কিন্তু ধীরে ধীরে সরকারের কর্মসূচির পরিধি বাড়তে থাকে, যা জনগণ মেনে নিতে পারেনি। কারণ এই বিস্তার দ্রুত নির্বাচনের বিপরীত দিকেই যাচ্ছিল। ফলে মাস গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকার তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা থেকে সরে এসে সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে শুরু করে। সাংবিধানিক বিষয় পর্যালোচনায় কমিশন
গঠন করা হয়, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব আসে, নতুন শাসনব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নগুলো গণআলোচনায় উঠে আসে। এতে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রশ্ন সামনে আসে: নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনের আগে একটি অনির্বাচিত সরকার কতটুকু সংস্কার করার অধিকার রাখে? প্রশ্নটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, যেকোনো অন্তর্বর্তী সরকারই এই উভয়সংকটে পড়ে। সংস্কার কর্মসূচি যত প্রসারিত হয়, সরকার মূল দায়িত্ব থেকে তত দূরে সরে যায়। আর সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যত বাড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে জনযুক্তিও তত জোরালো হয়ে ওঠে। ইউনূস সরকারের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সংস্কার আর গণতন্ত্র পরস্পরের শত্রু নয়, তবে একটি অপরটির বিকল্পও হতে পারে না। অন্তর্বর্তী
সরকার দক্ষ হতে পারে, সদিচ্ছাও রাখতে পারে, এমনকি জনগণের সমর্থনও পেতে পারে। কিন্তু এর কোনোটিই নির্বাচনি বৈধতার পরিপূর্ণ বিকল্প নয়। নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হতেই এই টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। দেশের মানুষ চেয়েছিল স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক দলগুলো চেয়েছিল নিশ্চয়তা, আর ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলেন স্থিতিশীলতা। কিন্তু নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় জল্পনা-কল্পনা বাড়তে থাকে, বদলে যায় অগ্রাধিকার এবং জনমনে উদ্বেগ ঘনীভূত হয়। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মূল্য দিতে হয় বটে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব অধৈর্য হয়ে পড়ে, জনআস্থা কমে যায়, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। যা প্রশাসনিক সতর্কতা হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা কারও কারও কাছে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে
দেখা দিতে শুরু করে। গণতন্ত্র শুধু ভোটাধিকারের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে এমন একটি নাগরিক সংস্কৃতির ওপরও, যেখানে ভিন্নমত, সমালোচনা ও বিতর্ক অবাধে চলতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের ঘিরে ঘটে নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা দেশে-বিদেশে পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করে। সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা এবং গণমাধ্যম সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাগুলো ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছিল। দায়ীদের পরিচয় বা উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক পরিবেশের মৌলিক ভিত্তিতে আঘাত হেনেছিল। এটা কেবল কিছু প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান ক্ষতি ছিল না, ছিল সমাজের জন্য গভীর এক বার্তা। গণতন্ত্র বাঁচে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে। ভয়ভীতিহীন পরিবেশ না থাকলে সরকার, রাজনৈতিক দল বা
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমালোচনার স্বাধীনতা থাকে না। আর যখন সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে না। এই দায়িত্ব বর্তায় সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালকদের কাঁধে। একই রকম উদ্বেগজনক ছিল রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে নীতিগত বৈরিতায় রূপ দেওয়ার প্রবণতা। ফ্যাসিস্টের মতো শব্দ সাধারণ জনপরিসরেও যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। যাকে-তাকে এই তকমা দিয়ে ঘায়েল করার রেওয়াজ চালু হয়। গণতন্ত্র মানে নাগরিকরা রাজনীতিতে তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করবে, কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সহনাগরিক হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তখনই গণতন্ত্র ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকারের কাজ হলো বহুত্ববাদ রক্ষা করা, ভীতির পরিবেশ দূর করা এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে দেখানো যে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতাই গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার শর্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংকেতগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছিল। আর সমাজে অনিশ্চয়তা মানেই গণতন্ত্রের জন্য বিপদ। এসব ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে গভীরতর প্রশ্ন। দেশ কি গণতন্ত্রের পথে হাঁটছে, নাকি গণতন্ত্র অন্য লক্ষ্যের কাছে গৌণ হয়ে পড়ছে? প্রশ্নটি হয়তো অন্যায্য মনে হতে পারে, কারণ সরকার বারবার নির্বাচনের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কিন্তু নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ না দেওয়ায় সেই অঙ্গীকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। জনগণ সরকারকে কেবল প্রতিশ্রুতির মাপকাঠিতে বিচার করে না, বিচার করে কোন বিষয়কে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে তার নিরিখেও। ফলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর যত দীর্ঘ হতে লাগল, মানুষের মনে ততই সন্দেহ জমাট বাঁধতে লাগল: নির্বাচন সরিয়ে সংস্কারই কি এই সরকারের আসল গন্তব্য? গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো ব্যবস্থা নয়, আবার শুধু নীতি বাস্তবায়নের হাতিয়ারও নয়। এটি জনসম্মতি ও সহনশীলতার চর্চার একটি ব্যবস্থা, একটি প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক শাসনকাঠামো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। অনির্বাচিত সরকার যতই দক্ষ হোক, জনসম্মতিকে সম্মান না দিলে তার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। অনির্বাচিত সরকার জনকল্যাণে অবদান রাখতে পারে, সংস্কারের পরিকল্পনা করতে পারে, প্রতিষ্ঠানের উন্নতি করতে পারে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে তারা কোনোভাবেই নির্বাচিত সরকারের স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না। বিশেষজ্ঞজ্ঞান শাসনকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে, কিন্তু অনুমোদনের একমাত্র উৎস হলো জনগণ। ড. ইউনূসের সরকার গণতন্ত্রের এই মৌলিক সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত এই বিতর্ক সরকারের যোগ্যতা বা ড. ইউনূসের উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। এটি ছিল একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে। সেই সীমাবদ্ধতা কারও অক্ষমতার কারণে নয়, কারণটা গণতন্ত্রের নিজস্ব চরিত্র। কারণ গণতন্ত্রে জনসম্মতি অপরিহার্য, আর সেই জনসম্মতির জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচনের বিকল্প নেই। ড. ইউনূস দারিদ্র্যশূন্য, বেকারত্বশূন্য এবং কার্বন নিঃসরণশূন্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখান। কিন্তু ইতিহাস হয়তো বাংলাদেশে তার শাসনকালকে ভিন্ন তিনটি শূন্যের মাধ্যমে মনে রাখবে: শূন্য জবাবদিহি, শূন্য জনআস্থা এবং শূন্য গণতান্ত্রিক সহনশীলতা।
কিছু বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারের বৈধতা দিয়েছিল বটে, তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় যত দীর্ঘ সময় থাকে, নির্বাচন তত পিছিয়ে যায় এবং সেই বিলম্বকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টাও ততই জোরালো হয়। ইউনূস সরকারের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আর এটাই ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা। অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত সময়ের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার নৈতিক ভিত্তি তাদের নেই। অস্থায়ী এই চরিত্রের কারণেই জনগণ তাদের বিশেষ কিছু ক্ষমতা মেনে নিয়েছিল, কারণ তারা জানত এসব ক্ষমতা সীমিত উদ্দেশ্যেই প্রয়োগ হবে। কিন্তু যখনই সরকার স্থায়ী বা নির্বাচিত সরকারের মতো আচরণ শুরু করল, তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে লাগল। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে
বাংলাদেশে নতুন তিনটি শূন্যের জন্ম হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমটি হলো শূন্য জবাবদিহি, দ্বিতীয়টি শূন্য জনআস্থা এবং তৃতীয়টি শূন্য গণতান্ত্রিক সহনশীলতা। ভবিষ্যতে ইতিহাস যখন এই সরকারকে মূল্যায়ন করবে, তখন এই তিন দিক অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারের মূল কাজ ছিল পরিষ্কার ও সুদূরপ্রসারী: শৃঙ্খলা ফেরানো, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া। কিন্তু ধীরে ধীরে সরকারের কর্মসূচির পরিধি বাড়তে থাকে, যা জনগণ মেনে নিতে পারেনি। কারণ এই বিস্তার দ্রুত নির্বাচনের বিপরীত দিকেই যাচ্ছিল। ফলে মাস গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকার তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা থেকে সরে এসে সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে শুরু করে। সাংবিধানিক বিষয় পর্যালোচনায় কমিশন
গঠন করা হয়, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব আসে, নতুন শাসনব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নগুলো গণআলোচনায় উঠে আসে। এতে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রশ্ন সামনে আসে: নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনের আগে একটি অনির্বাচিত সরকার কতটুকু সংস্কার করার অধিকার রাখে? প্রশ্নটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, যেকোনো অন্তর্বর্তী সরকারই এই উভয়সংকটে পড়ে। সংস্কার কর্মসূচি যত প্রসারিত হয়, সরকার মূল দায়িত্ব থেকে তত দূরে সরে যায়। আর সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যত বাড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে জনযুক্তিও তত জোরালো হয়ে ওঠে। ইউনূস সরকারের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সংস্কার আর গণতন্ত্র পরস্পরের শত্রু নয়, তবে একটি অপরটির বিকল্পও হতে পারে না। অন্তর্বর্তী
সরকার দক্ষ হতে পারে, সদিচ্ছাও রাখতে পারে, এমনকি জনগণের সমর্থনও পেতে পারে। কিন্তু এর কোনোটিই নির্বাচনি বৈধতার পরিপূর্ণ বিকল্প নয়। নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হতেই এই টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। দেশের মানুষ চেয়েছিল স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক দলগুলো চেয়েছিল নিশ্চয়তা, আর ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলেন স্থিতিশীলতা। কিন্তু নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় জল্পনা-কল্পনা বাড়তে থাকে, বদলে যায় অগ্রাধিকার এবং জনমনে উদ্বেগ ঘনীভূত হয়। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মূল্য দিতে হয় বটে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব অধৈর্য হয়ে পড়ে, জনআস্থা কমে যায়, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। যা প্রশাসনিক সতর্কতা হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা কারও কারও কাছে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে
দেখা দিতে শুরু করে। গণতন্ত্র শুধু ভোটাধিকারের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে এমন একটি নাগরিক সংস্কৃতির ওপরও, যেখানে ভিন্নমত, সমালোচনা ও বিতর্ক অবাধে চলতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের ঘিরে ঘটে নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা দেশে-বিদেশে পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করে। সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা এবং গণমাধ্যম সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাগুলো ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছিল। দায়ীদের পরিচয় বা উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক পরিবেশের মৌলিক ভিত্তিতে আঘাত হেনেছিল। এটা কেবল কিছু প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান ক্ষতি ছিল না, ছিল সমাজের জন্য গভীর এক বার্তা। গণতন্ত্র বাঁচে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে। ভয়ভীতিহীন পরিবেশ না থাকলে সরকার, রাজনৈতিক দল বা
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমালোচনার স্বাধীনতা থাকে না। আর যখন সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে না। এই দায়িত্ব বর্তায় সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালকদের কাঁধে। একই রকম উদ্বেগজনক ছিল রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে নীতিগত বৈরিতায় রূপ দেওয়ার প্রবণতা। ফ্যাসিস্টের মতো শব্দ সাধারণ জনপরিসরেও যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। যাকে-তাকে এই তকমা দিয়ে ঘায়েল করার রেওয়াজ চালু হয়। গণতন্ত্র মানে নাগরিকরা রাজনীতিতে তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করবে, কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সহনাগরিক হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তখনই গণতন্ত্র ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকারের কাজ হলো বহুত্ববাদ রক্ষা করা, ভীতির পরিবেশ দূর করা এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে দেখানো যে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতাই গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার শর্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই সংকেতগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছিল। আর সমাজে অনিশ্চয়তা মানেই গণতন্ত্রের জন্য বিপদ। এসব ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে গভীরতর প্রশ্ন। দেশ কি গণতন্ত্রের পথে হাঁটছে, নাকি গণতন্ত্র অন্য লক্ষ্যের কাছে গৌণ হয়ে পড়ছে? প্রশ্নটি হয়তো অন্যায্য মনে হতে পারে, কারণ সরকার বারবার নির্বাচনের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কিন্তু নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ না দেওয়ায় সেই অঙ্গীকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। জনগণ সরকারকে কেবল প্রতিশ্রুতির মাপকাঠিতে বিচার করে না, বিচার করে কোন বিষয়কে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে তার নিরিখেও। ফলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর যত দীর্ঘ হতে লাগল, মানুষের মনে ততই সন্দেহ জমাট বাঁধতে লাগল: নির্বাচন সরিয়ে সংস্কারই কি এই সরকারের আসল গন্তব্য? গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো ব্যবস্থা নয়, আবার শুধু নীতি বাস্তবায়নের হাতিয়ারও নয়। এটি জনসম্মতি ও সহনশীলতার চর্চার একটি ব্যবস্থা, একটি প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক শাসনকাঠামো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। অনির্বাচিত সরকার যতই দক্ষ হোক, জনসম্মতিকে সম্মান না দিলে তার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। অনির্বাচিত সরকার জনকল্যাণে অবদান রাখতে পারে, সংস্কারের পরিকল্পনা করতে পারে, প্রতিষ্ঠানের উন্নতি করতে পারে। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে তারা কোনোভাবেই নির্বাচিত সরকারের স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না। বিশেষজ্ঞজ্ঞান শাসনকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে, কিন্তু অনুমোদনের একমাত্র উৎস হলো জনগণ। ড. ইউনূসের সরকার গণতন্ত্রের এই মৌলিক সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত এই বিতর্ক সরকারের যোগ্যতা বা ড. ইউনূসের উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। এটি ছিল একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে। সেই সীমাবদ্ধতা কারও অক্ষমতার কারণে নয়, কারণটা গণতন্ত্রের নিজস্ব চরিত্র। কারণ গণতন্ত্রে জনসম্মতি অপরিহার্য, আর সেই জনসম্মতির জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচনের বিকল্প নেই। ড. ইউনূস দারিদ্র্যশূন্য, বেকারত্বশূন্য এবং কার্বন নিঃসরণশূন্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখান। কিন্তু ইতিহাস হয়তো বাংলাদেশে তার শাসনকালকে ভিন্ন তিনটি শূন্যের মাধ্যমে মনে রাখবে: শূন্য জবাবদিহি, শূন্য জনআস্থা এবং শূন্য গণতান্ত্রিক সহনশীলতা।



