ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
‘আমাকে বোকা বলবেন না, বরং একজন মেধাবী স্বৈরশাসক বলুন’: ট্রাম্প
ইসরাইলি হামলায় ধূলিসাৎ দক্ষিণ লেবাননের পুরো জনপদ
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গাজা যুদ্ধে ইসরাইলকে যেভাবে অস্ত্র জুগিয়েছে ভারতসহ ৫১ দেশ
মিনা-মুজদালিফায় বাড়ছে তাপমাত্রা, সতর্কবার্তা সৌদির
ইরানের হামলায় মার্কিন ‘রিপার’ ড্রোনের ২০ শতাংশ ধ্বংস
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইহুদিদের আল-আকসায় প্রবেশের চেষ্টা
যুদ্ধকালীন গোপনে আমিরাত সফরের তথ্য কেন ফাঁস করলেন নেতানিয়াহু?
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ: ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, শান্তি প্রচেষ্টায় তেহরানে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান
বেইজিংয়ে একের পর এক রাষ্ট্রপ্রধানদের আগমনে চীন নিজেকে নতুন বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরছে — তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার আসল প্রশ্নটি এত সহজ নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবে বেইজিং ছেড়েছেন, আর তার আগেই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পরবর্তী অতিথির জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছেন — রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য।
পরপর এই দুটি উচ্চপর্যায়ের সফর কাকতালীয় হোক বা না হোক, বিশ্বমঞ্চে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: বেইজিং এখন এমন একটি জায়গা হয়ে উঠেছে যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতারা আসছেন। শি জিনপিং যেন দরবার বসাচ্ছেন, আর বাকিরা তাঁর কাছে আসছেন।
চীন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে যে বিশ্ব এখন “এক শতাব্দীতে একবার দেখা যায়” এমন
পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগাতে বেইজিং সক্রিয়ভাবে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন — চীনের এই ভূমিকা কতটা আসল নেতৃত্বের এবং কতটা কেবল ছবি ও প্রতীকের রাজনীতি? নেতৃত্ব মানে শুধু শক্তি দেখানো নয়, দায়িত্ব নেওয়াও। আর সেই দায়িত্ব নেওয়ার প্রশ্নে বেইজিং এখনও অনিচ্ছুক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চীন চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমকক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতে, চায় আরও বেশি ভূরাজনৈতিক প্রভাব — কিন্তু একটি জটিল বিশ্বব্যবস্থা পরিচালনার সামগ্রিক বোঝা কাঁধে তুলে নিতে রাজি নয়। দুই নেতার সফরের ধরন এবং সঙ্গে আনা প্রতিনিধিদলের গঠন এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করে তোলে। ট্রাম্প বেইজিংয়ে এসেছিলেন সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ
প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধানদের নিয়ে — যেসব কোম্পানির চীনের বাজারে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে এবং যারা চীন থেকে পুরোপুরি সরে যেতে পারছে না। পুতিন এলেন জ্বালানি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে, কারণ রাশিয়ার অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি এখন চীনে জ্বালানি রপ্তানি। এই দুটি প্রতিনিধিদল একই কথা বলছে — বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পুতিনের সফরটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে গিয়ে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রথমত, রাশিয়া আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয় — এই বার্তাটি দেওয়া জরুরি ছিল, কারণ পুতিন সম্প্রতি একের পর এক মিত্র হারাচ্ছেন। হাঙ্গেরি, যেটি দীর্ঘদিন রাশিয়ার ইউরোপীয় মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত
ছিল, ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আর্মেনিয়া রাশিয়ার কক্ষপথ ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। এই প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্বের ছবি তৈরি করা পুতিনের জন্য অপরিহার্য ছিল। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইনের চুক্তি চূড়ান্ত করা। সাইবেরিয়ার গ্যাস উত্তোলন এলাকা থেকে চীনের ভেতর পর্যন্ত এই পাইপলাইনটি রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — কারণ এটি চীনকে রুশ জ্বালানির উপর আরও নির্ভরশীল করে তুলত এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা ভারসাম্য আনত। কিন্তু সেই চুক্তি এবারও হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এটিকে সফরের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তৃতীয় লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধে কৌশলগত আশ্বাস পাওয়া। যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত
হয়, চীন রাশিয়াকে ছেড়ে দেবে না — এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন পুতিন। রাশিয়া-চীন যৌথ ঘোষণায় বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে, যদিও চীন সরাসরি রাশিয়াকে ইউক্রেনে সমর্থন দেওয়ার কথা বলেনি। রাশিয়া ও চীনের মধ্যে এই সম্পর্কের গভীরতা এবং সীমাবদ্ধতা দুটোই বোঝা দরকার। অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়া এখন চীনের উপর এতটাই নির্ভরশীল যে একে একটি অসম সম্পর্ক বলাই যায়। রাশিয়ার মোট রপ্তানির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি যায় চীনে — মূলত অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা। অন্যদিকে রাশিয়া চীন থেকে আমদানি করে ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রপাতি, গাড়ি এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য — যেগুলো সামরিক কাজেও ব্যবহার করা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ মহলে এই নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল, কৌশল
তৈরির চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সেই উদ্বেগ পিছনে পড়ে গেছে এবং রাশিয়া ক্রমশ গভীরভাবে চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন আসলে শি জিনপিংয়ের ‘দরকারী হাতিয়ার’ হিসেবে কাজ করছেন। রাশিয়া পশ্চিমকে চাপে রাখছে, ইউক্রেনে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পরীক্ষা করছে — আর চীন দূর থেকে সেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিজের কৌশলগত শিক্ষা নিচ্ছে, বিশেষত তাইওয়ান প্রশ্নে। চীন ও রাশিয়ার এই সম্পর্ককে পশ্চিমা দেশগুলো ভাঙার চেষ্টা করেছে বারবার। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল — মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো এই দুই দেশকে একে অপরের বিরুদ্ধে খেলিয়ে আলাদা করতে পারবেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আশা অবাস্তব। কারণ চীন ও রাশিয়া উভয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে। এই ব্যবস্থাটি তারা উভয়েই অন্যায্য মনে করে এবং পাল্টাতে চায়। যতদিন এই মূলগত দৃষ্টিভঙ্গির মিল থাকবে, ততদিন দুটো দেশকে আলাদা করা কঠিন — দুই দেশের মধ্যে যত সমস্যাই থাকুক না কেন। ট্রাম্পের চীন সফর এবং শি জিনপিংয়ের প্রতি তাঁর উষ্ণ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন ট্রাম্পকে ভালোভাবেই বুঝেছে এবং তাঁকে ব্যবহার করার সুযোগ নিচ্ছে। গত বছর শুরুতে ট্রাম্প চীনকে চাপ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চীন পাল্টা চাপ দিয়েছে — বিরল খনিজের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে। এতে ট্রাম্প সতর্ক হয়েছেন এবং এখন চীনের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইছেন। চীনের দৃষ্টিতে এটি একটি বড় কূটনৈতিক জয়। তারা প্রমাণ করেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সাথে সমান মর্যাদায় কথা বলতে বাধ্য। এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান প্রশ্নটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের নরম অবস্থান চীনকে তাইওয়ানের উপর আরও চাপ বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে — সরাসরি সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে নয়, বরং নানা ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট আফ্রিকায় যাওয়ার চেষ্টা করলে তৃতীয় দেশের আকাশসীমা ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাইওয়ানকে একঘরে করা — এভাবেই চীন তাইওয়ানকে ঘিরে ধরছে। এর পাশাপাশি আমেরিকা আইনত তাইওয়ানকে অস্ত্র দিতে বাধ্য হলেও ট্রাম্প সেই অস্ত্র প্যাকেজ আটকে রেখেছেন, যা চীনা চাপের কাছে নতি স্বীকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউরোপের অবস্থান এই পুরো পরিস্থিতিতে অত্যন্ত অস্বস্তিকর। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বস্ত নেতৃত্বের ভূমিকায় নেই, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন চ্যালেঞ্জ করছে। ইউরোপ এতদিন কূটনীতি ও বাণিজ্যের উপর নির্ভর করেছে, কিন্তু এই নতুন ভূরাজনৈতিক পরিবেশে শুধু নরম শক্তি যথেষ্ট নয়। জার্মানি ও স্পেনসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের নেতারাও সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন — এটি ইউরোপের দ্বিধার প্রতিফলন। চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারছে না, আবার চীনের কৌশলের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণও করতে পারছে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের হাতে লিভারেজ একেবারে নেই তা নয়। ইউরোপের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ইতিমধ্যে বিদ্যমান নীতি-হাতিয়ারগুলো — যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে — চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের বিরুদ্ধেই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো রাজনৈতিক একতার অভাব। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেবল ততটুকুই শক্তিশালী যতটুকু তার বড় সদস্যরাষ্ট্রগুলো তাকে শক্তি দেয়। আর সেই শক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো এখনও যথেষ্ট একমত নয়। এটি একটি সময়ের বিরুদ্ধে দৌড় — এবং অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইউরোপ এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। সবশেষে বিশ্ব আধিপত্যের এই লড়াইয়ে কোন ফ্যাক্টর নির্ধারক হবে? বিশেষজ্ঞদের উত্তর স্পষ্ট — অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। সামরিক শক্তি বা পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি নয়, বরং কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং সবুজ শক্তির প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে — সেটাই ঠিক করবে আগামীর বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে। আর সেই হিসেবে চীন এই মুহূর্তে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে — এবং পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগাতে বেইজিং সক্রিয়ভাবে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন — চীনের এই ভূমিকা কতটা আসল নেতৃত্বের এবং কতটা কেবল ছবি ও প্রতীকের রাজনীতি? নেতৃত্ব মানে শুধু শক্তি দেখানো নয়, দায়িত্ব নেওয়াও। আর সেই দায়িত্ব নেওয়ার প্রশ্নে বেইজিং এখনও অনিচ্ছুক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চীন চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমকক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতে, চায় আরও বেশি ভূরাজনৈতিক প্রভাব — কিন্তু একটি জটিল বিশ্বব্যবস্থা পরিচালনার সামগ্রিক বোঝা কাঁধে তুলে নিতে রাজি নয়। দুই নেতার সফরের ধরন এবং সঙ্গে আনা প্রতিনিধিদলের গঠন এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করে তোলে। ট্রাম্প বেইজিংয়ে এসেছিলেন সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ
প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধানদের নিয়ে — যেসব কোম্পানির চীনের বাজারে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে এবং যারা চীন থেকে পুরোপুরি সরে যেতে পারছে না। পুতিন এলেন জ্বালানি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে, কারণ রাশিয়ার অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি এখন চীনে জ্বালানি রপ্তানি। এই দুটি প্রতিনিধিদল একই কথা বলছে — বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পুতিনের সফরটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে গিয়ে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রথমত, রাশিয়া আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয় — এই বার্তাটি দেওয়া জরুরি ছিল, কারণ পুতিন সম্প্রতি একের পর এক মিত্র হারাচ্ছেন। হাঙ্গেরি, যেটি দীর্ঘদিন রাশিয়ার ইউরোপীয় মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত
ছিল, ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আর্মেনিয়া রাশিয়ার কক্ষপথ ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। এই প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্বের ছবি তৈরি করা পুতিনের জন্য অপরিহার্য ছিল। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইনের চুক্তি চূড়ান্ত করা। সাইবেরিয়ার গ্যাস উত্তোলন এলাকা থেকে চীনের ভেতর পর্যন্ত এই পাইপলাইনটি রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — কারণ এটি চীনকে রুশ জ্বালানির উপর আরও নির্ভরশীল করে তুলত এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা ভারসাম্য আনত। কিন্তু সেই চুক্তি এবারও হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এটিকে সফরের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তৃতীয় লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধে কৌশলগত আশ্বাস পাওয়া। যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত
হয়, চীন রাশিয়াকে ছেড়ে দেবে না — এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন পুতিন। রাশিয়া-চীন যৌথ ঘোষণায় বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে, যদিও চীন সরাসরি রাশিয়াকে ইউক্রেনে সমর্থন দেওয়ার কথা বলেনি। রাশিয়া ও চীনের মধ্যে এই সম্পর্কের গভীরতা এবং সীমাবদ্ধতা দুটোই বোঝা দরকার। অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়া এখন চীনের উপর এতটাই নির্ভরশীল যে একে একটি অসম সম্পর্ক বলাই যায়। রাশিয়ার মোট রপ্তানির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি যায় চীনে — মূলত অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা। অন্যদিকে রাশিয়া চীন থেকে আমদানি করে ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রপাতি, গাড়ি এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য — যেগুলো সামরিক কাজেও ব্যবহার করা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ মহলে এই নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল, কৌশল
তৈরির চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সেই উদ্বেগ পিছনে পড়ে গেছে এবং রাশিয়া ক্রমশ গভীরভাবে চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন আসলে শি জিনপিংয়ের ‘দরকারী হাতিয়ার’ হিসেবে কাজ করছেন। রাশিয়া পশ্চিমকে চাপে রাখছে, ইউক্রেনে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পরীক্ষা করছে — আর চীন দূর থেকে সেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিজের কৌশলগত শিক্ষা নিচ্ছে, বিশেষত তাইওয়ান প্রশ্নে। চীন ও রাশিয়ার এই সম্পর্ককে পশ্চিমা দেশগুলো ভাঙার চেষ্টা করেছে বারবার। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল — মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো এই দুই দেশকে একে অপরের বিরুদ্ধে খেলিয়ে আলাদা করতে পারবেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আশা অবাস্তব। কারণ চীন ও রাশিয়া উভয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে। এই ব্যবস্থাটি তারা উভয়েই অন্যায্য মনে করে এবং পাল্টাতে চায়। যতদিন এই মূলগত দৃষ্টিভঙ্গির মিল থাকবে, ততদিন দুটো দেশকে আলাদা করা কঠিন — দুই দেশের মধ্যে যত সমস্যাই থাকুক না কেন। ট্রাম্পের চীন সফর এবং শি জিনপিংয়ের প্রতি তাঁর উষ্ণ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন ট্রাম্পকে ভালোভাবেই বুঝেছে এবং তাঁকে ব্যবহার করার সুযোগ নিচ্ছে। গত বছর শুরুতে ট্রাম্প চীনকে চাপ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চীন পাল্টা চাপ দিয়েছে — বিরল খনিজের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে। এতে ট্রাম্প সতর্ক হয়েছেন এবং এখন চীনের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইছেন। চীনের দৃষ্টিতে এটি একটি বড় কূটনৈতিক জয়। তারা প্রমাণ করেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সাথে সমান মর্যাদায় কথা বলতে বাধ্য। এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান প্রশ্নটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের নরম অবস্থান চীনকে তাইওয়ানের উপর আরও চাপ বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে — সরাসরি সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে নয়, বরং নানা ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট আফ্রিকায় যাওয়ার চেষ্টা করলে তৃতীয় দেশের আকাশসীমা ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাইওয়ানকে একঘরে করা — এভাবেই চীন তাইওয়ানকে ঘিরে ধরছে। এর পাশাপাশি আমেরিকা আইনত তাইওয়ানকে অস্ত্র দিতে বাধ্য হলেও ট্রাম্প সেই অস্ত্র প্যাকেজ আটকে রেখেছেন, যা চীনা চাপের কাছে নতি স্বীকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউরোপের অবস্থান এই পুরো পরিস্থিতিতে অত্যন্ত অস্বস্তিকর। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বস্ত নেতৃত্বের ভূমিকায় নেই, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন চ্যালেঞ্জ করছে। ইউরোপ এতদিন কূটনীতি ও বাণিজ্যের উপর নির্ভর করেছে, কিন্তু এই নতুন ভূরাজনৈতিক পরিবেশে শুধু নরম শক্তি যথেষ্ট নয়। জার্মানি ও স্পেনসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের নেতারাও সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন — এটি ইউরোপের দ্বিধার প্রতিফলন। চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারছে না, আবার চীনের কৌশলের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণও করতে পারছে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের হাতে লিভারেজ একেবারে নেই তা নয়। ইউরোপের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ইতিমধ্যে বিদ্যমান নীতি-হাতিয়ারগুলো — যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে — চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের বিরুদ্ধেই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো রাজনৈতিক একতার অভাব। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেবল ততটুকুই শক্তিশালী যতটুকু তার বড় সদস্যরাষ্ট্রগুলো তাকে শক্তি দেয়। আর সেই শক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলো এখনও যথেষ্ট একমত নয়। এটি একটি সময়ের বিরুদ্ধে দৌড় — এবং অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইউরোপ এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। সবশেষে বিশ্ব আধিপত্যের এই লড়াইয়ে কোন ফ্যাক্টর নির্ধারক হবে? বিশেষজ্ঞদের উত্তর স্পষ্ট — অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। সামরিক শক্তি বা পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি নয়, বরং কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং সবুজ শক্তির প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে — সেটাই ঠিক করবে আগামীর বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে। আর সেই হিসেবে চীন এই মুহূর্তে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে — এবং পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।



