নিঃসঙ্গ এক সন্তের বিদায় – ইউ এস বাংলা নিউজ




ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ৬ জুলাই, ২০২৬

নিঃসঙ্গ এক সন্তের বিদায়

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ৬ জুলাই, ২০২৬ |
তিনি চলে গেলেন আজ, ২০২৬ সালের ৫ জুলাই। তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম ১৯৭০-এর দিকে বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে এক সভায়। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কুসুমিত ইস্পাত-এর কবি হুমায়ুন কবির আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে দেখে ও তাঁর বক্তব্য শুনে আমার একটি শব্দই মনে হয়েছিল– ছিমছাম। মনে হয়েছিল, দেখতে শুনতে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক যেমনি ছিমছাম, তাঁর কথাও তেমনি ছিমছাম– পুরোপুরি বাহুল্যহীন। আর একটি ব্যাপারে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আমার হৃদয় আকর্ষণ করলেন। তাঁর পোশাকের ধরনটি ঠিক আমার বাবার মতো। সেই ফুলপ্যান্টের ওপরে পুরো হাতা জামা– ও রকমের পোশাকেই তাঁকে আমি সর্বদা দেখেছি। ওই রকম জামাকে আমার বাবা ‘বুশশার্ট’ বলতেন। প্রথম জীবনে প্যান্টের

ভেতরে শার্ট গুঁজে দিয়ে পরলেও বাবা পরের দিকে প্যান্টের ওপরেই সেই পুরো হাতা শার্ট পরতেন– শুধু শীতের সময়ে স্যুট না পরলে। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের পোশাকটিও ছিল এই রকম। আর একজন মানুষকে ও রকম পোশাকে আমি দেখেছি– তিনি প্রয়াত অধ্যাপক আহমদ শরীফ। ১৯৭৫ সালে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। ততদিনে তাঁর তিনটি বই পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল– ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ ও ‘একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন’। সে সময়ে তাঁর লেখা পড়ে ও তাঁর বলা শুনে মনে হয়েছে, নিরপেক্ষ চিন্তা ও তত্ত্ব

তাঁর চিন্তা-চেতনার মূল খুঁটি। স্বদেশ ভাবনা ও প্রগতিচিন্তাই তাঁর মানস। মানুষটি ‘মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার’ ধারক ও বাহক। সেখানেও ছিমছাম নির্মেদ তাঁর মন ও মানস। ১৯৮৪ সালে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে এলে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে নানান জায়গায় দেখা হয়েছে। কখনওবা শিক্ষকদের বিশ্রামাগারে, কখনও-সখনও রাস্তা পার হতে নীলক্ষেত এলাকায়। শিক্ষকদের বিশ্রামাগারে নানান আলোচনায় অনেকের মধ্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে অনন্য বলে মনে হতো তাঁর চিন্তার গভীরতা, জ্ঞানের ব্যাপ্তি, আলোচনার নির্মোহতার কারণে। কারও প্রবন্ধের আলোচক হলে তিনি কখনও ভাসা ভাসা আলোচনা করেননি। বিষয়বস্তুর গভীরে গিয়ে পুরো লেখার নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করতেন অনেকটা একজন দক্ষ শল্যচিকিৎসকের মতো। লেখকের যুক্তির অস্বচ্ছতা, রচনার মধ্যে

যুক্তির দুর্বলতা থেকে শুরু করে বানান বিভ্রাট, গ্রন্থপঞ্জির অপ্রতুলতা কিছুই তাঁর মনোযোগ এড়াত না। সেই সঙ্গে মিশত তাঁর নিজস্ব মতামত, চিন্তা-চেতনা এবং প্রবন্ধটিকে পরিশীলিত করার জন্য তাঁর সুপরামর্শ। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কখনও পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত না হয়ে ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না পড়ে আলোচনা সভায় আসতেন না এবং তাঁর তীক্ষ্ণ শানিত বক্তব্যে আমাদের ঋদ্ধ করতেন। এমন অনন্য সাধারণ আলোচক আর সমালোচক আমি বড় একটা দেখিনি। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের পুত্র দীপন (ফয়সাল আরেফিন দীপন) সম্ভবত আশি বা নব্বইয়ের দশকে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। আমার শিক্ষক ও সহকর্মীদের অনেকেই আমার বিভাগের বা আমার শিক্ষার্থী ছিল। তাদের কাউকে কাউকে জানতাম– যেমন

শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পুত্রদ্বয় শোভন ও প্রয়াত সুমন, শহীদ ডা. মোহাম্মদ মোর্তজার কন্যা মিতি, কিংবা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কন্যা রুচিরা। কিন্তু আমি জানতাম না যে, দীপন আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও কখনও বলেননি। সত্যিই, এমনটা জানানোর চল ছিল না আমাদের কালে। আমি বাইরে চলে আসি নব্বই দশকের প্রথম দিকে। কিন্তু জনান্তিকে খবর পেয়েছি যে, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি রচনা করেছিলেন ‘বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি আটাশ দফা’ সম্ভবত ২০০৫ বা ২০০৬ সাল নাগাদ। পরবর্তী সময়ের বহু ঘটনাই জানা ছিল না আমার।

জানতাম না, জলি আর দীপন ঘর বেঁধেছে। জানতাম না, দুটো ফুটফুটে শিশুর জনক-জননী হয়েছে তারা। জানতাম না, জলি ডাক্তার হয়েছে আর দীপন আত্মপ্রকাশ করেছে ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রকাশক হিসেবে। জানতাম না বহুকিছুই। জানতাম না দীপনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ছুরি শানাচ্ছে জল্লাদেরা। তার পরের ইতিহাস বড় কষ্টের আখ্যান। দীপনকে হত্য করা হলো– নিহত হলো একটি শুভ বুদ্ধি, একটি সৃষ্টিশীল মন, একজন সৃজনশীল মানুষ। জলির কষ্টের কথা ভেবে পাই না। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কী কষ্ট, কী অসহায়তা যে তিনি বুকে ধারণ করেছেন তখন, তা যেন তাঁর কথায় বেরিয়ে এসেছে। সে সব পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি হয়তো

কোনো সাধারণ মানুষ নন, এক অনন্য সাধারণ মানুষ! আহাজারি করেননি তিনি, ‘বিচার চাননি তিনি তাঁর পুত্রের হত্যাকাণ্ডের’! হয়তো ভেবেছেন, কী হবে এ পোড়ার বিচারহীন দেশে দীপন হত্যার বিচার দাবি করে! ২০১৮-এর আগে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন আমার বই ‘বেলা-অবেলার কথা’র প্রকাশনা উৎসবে। ২০১৭ সালের বইমেলার সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান (প্রয়াত)। বহুদিন পরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে দেখলাম। সান্ত্বনার কোনো ভাষা আমার মুখে জোগায়নি। কিন্তু তাঁর অবয়বের এক ধূসর বিষণ্নতা আমার চোখ এড়ায়নি। মনে হচ্ছিল, তিনি তাঁর মধ্যে নেই এবং তিনি এখানে নেই। বড় কষ্ট হলো অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হককে দেখে। সে অনুষ্ঠানে তিনি কথা বললেন ভারি সুন্দর– সেই ছিমছামভাবে। তাঁর বক্তব্যের মায়াময়তা, বড় নরমভাবে গাঁথা বাক্যমালার মমত্ব, পর্যবেক্ষণের তীক্ষ্ণত্ব আমাকে মুগ্ধ করল। তিনি যে আমার পুস্তক প্রকাশনা উৎসবে এসেছেন, আমার বইয়ের কথা বললেন, তাতেই আমার মন ভরে থাকল সারাক্ষণ। ২০২৫ সালে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমরা দুজন একত্রে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তাঁর সঙ্গে আমার সেই শেষ দেখা। এ বছর বইমেলায় দেখা হতে হতেও দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে। না, আর কোনোদিনই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। আজ এই সব ভাবনা ছাড়িয়ে হৃদয়ে ভেসে ওঠে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মুখ। আমার মনে হয়, সে মুখ একজন সাধারণ মানুষের নয়, সে এক নিঃসঙ্গ সন্তের মুখ। লেখক : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
ঢাকায় তিন মার্কিন এপিডেমিওলজিস্টের নীরব সফর: যার একজন ইউএস আর্মির সদস্য, উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আমলাদের চাপে পিছু হটল সরকার, গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা মিলবে ৫০ হাজার ফিফার সবচেয়ে বড় স্পন্সর অ্যাডিডাসের দুই দলই ফাইনালে, কোণঠাসা নাইকি মেসির ফাইনাল দেখতে ৫ লাখি টিকিটও নিমেষে সাবাড়! ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙার ধারাবাহিকতা: এবার ভাঙল বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের ভাস্কর্য, জানে না প্রশাসন পৌরসভার ২ কোটি টাকা মূল্যের ৫টি গাড়ি উধাও তিন সংসদ সদস্যসহ মঞ্চ ভেঙে নিচে পড়লেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু ‘স্বাধীন বেলুচিস্তানে’ ব্যর্থ অভিযান, স্বাধীনতাকামীদের হাতে ৪৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত বিশ্বকাপে মাঠের বাইরের তারকা ইয়ামালের ছোট ভাই ফাইনালে কার পক্ষে আছেন গার্দিওলা বিশ্বকাপ ফাইনালে ১১ রেকর্ডের সামনে লিওনেল মেসি বিশ্বকাপের শিরোপা যার হাতে দেখছেন ইংলিশ কিংবদন্তি আগামী সপ্তাহে ৭ জেলায় বন্যার আভাস দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে ফের বিতর্ক, উত্তপ্ত ভূরাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে পাকিস্তান ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনীতির সুযোগ আপাতত স্থগিত’ ভারতে চালু হলো হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন শাহজালাল (রহ.) মাজার ঘিরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য, দানবাক্স খুলতেই বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য ৬ সপ্তাহের মধ্যে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধস কোচ টুখেলের বাজে কৌশলে ইংল্যান্ডের হার, তবু ‘অনুশোচনা’ নেই তার