ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
সাভারে ৭ মাসে ৬ হত্যা, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তার মশিউর
সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক প্রস্তুতির বার্তা জেলা থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে
গণতন্ত্র নয়, নির্বাচনের নাটক: ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট নিয়ে গভীর সংকটে বাংলাদেশ
ঋণে ডুবে থাকা রাষ্ট্র: অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থ অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ বন্ধকের রাজনীতি
একপাক্ষিক বিচারে লজ্জিত’: বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরে দাঁড়ালেন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ উপদেষ্টা টোবি ক্যাডম্যান
জুলাই ষড়যন্ত্রের’ খেসারত: ২৬টি দেশে পোশাক বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ, গভীর সংকটে অর্থনীতি
“যে ব্যালটে নৌকা প্রতীক নাই, যেখানে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারবে না, সেখানে আমাদের ভোটাররা কেউ ভোট দিবে না” -দেশরত্ন শেখ হাসিনা
ভোটে আটকানো যায়নি ৪৫ ঋণখেলাপিকে
ঋণখেলাপি হয়েও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কমপক্ষে ৪৫ প্রার্থী। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশসহ (আরপিও) বিভিন্ন আইনে ঋণখেলাপিদের আটকানোর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ৪৫ ঋণখেলাপি বেরিয়ে গেলেও বাদ পড়েছেন ৬৮ জন। ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের বাছাই এবং নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। এর পরে রয়েছে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই। ঋণখেলাপির অভিযোগে বাদ পড়া অনেকেই উচ্চ আদালতে আইনের আশ্রয় নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) তালিকায় ঋণখেলাপি হিসেবে নাম উঠলেও মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই ৩১ জন উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রার্থী হন। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে এই ৩১ জনের মধ্যে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইসির আপিল শুনানিতে
বাদ পড়ে যান। কারণ, হাইকোর্টের আদেশে আপিলে আটকে যাওয়ার ফলে তিনি পুনরায় খেলাপির তালিকায় পড়ে যান। এদিকে, ইসির আপিল শুনানিতে ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নিজেই বলেছেন, মনে কষ্ট নিয়ে তারা ঋণখেলাপি প্রার্থীদের ছাড় দিয়েছেন। ‘আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।’ আবার ঋণখেলাপি হওয়ায় চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করেছে ইসি। কিন্তু চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিলের আবেদন করে ইসিতে আপিল করেছিল দুটি ব্যাংক।
এ বিষয়ে শুনানি শেষে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীকে অনুরোধ করে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’ শুধু বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা নন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি’তে এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে আসা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও রয়েছেন এ তালিকায়। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে ঋণখেলাপির কারণে বাতিল হওয়া ৮২ জনের মধ্যে ইসির আপিল শুনানিতে টিকছেন ১৫ জন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন, চরমোনাইর দল ইসলামী আন্দোলনের দুজন রয়েছেন। যদিও এবারের নির্বাচনে কোনো খেলাপি অংশ নিতে পারবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ
সরকারের পতনের দেড় বছর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বিদ্যমান আইনে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ অন্যের ঋণের গ্যারান্টর থাকলেও তিনি খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। বর্তমান সরকারের মেয়াদে সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী– সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরেও কোনো ব্যক্তির খেলাপির সত্যতা নিশ্চিত হলে তিনি পদ হারাতে পারেন। অবশ্য সরকারের দিক থেকে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সে অবস্থান দেখা যায়নি। এর আগে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, কেউ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিলেও যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা জাতীয় নাগরিক পার্টি ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোনো খেলাপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘কোন ত্রুটি বের করে কিংবা দুর্নীতির আশ্রয়; কোন উপায়ে ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে আমি নিশ্চিত না। তবে এটা ভালো লক্ষণ না। এ রকম অব্যাহত থাকলে ঋণখেলাপির সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে না। এভাবে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দেওয়া ভালো কিছু না।’ বিগত
কয়েকটি এক তরফা নির্বাচনে আদালতের স্থগিতাদেশ কিংবা ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করে অনেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ঘটে। ওই নির্বাচনের ঠিক আগে ঋণের তথ্য হালনাগাদের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়ে ওই সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এবার কোনো ঋণখেলাপি যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া এবার আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েও কোনো ঋণখেলাপি যেন নির্বাচন করতে না পরেন সে ব্যবস্থা করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর সফল হয়নি। জানতে চাইলে সম্প্রতি ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে
কেউ যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে আমরা সেটা চেয়েছিলাম। তবে এ জন্য আইন পরিবর্তন করা দরকার। সেই ক্ষমতা তো আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট থেকে কেউ আইনি প্রতিকার নিয়ে এলে সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু করার নেই। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গত আগস্টে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাংকের ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের উচিত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঋণখেলাপির কারণে কারও প্রার্থিতা আটকানোর সুযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই। কেবল ঋণখেলাপিদের বিষয়ে তথ্য দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবার প্রার্থীদের ঋণ থাকলে কার কী অবস্থা তা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়। ব্যাংক কোনো খেলাপির তথ্য গোপন করছে কিনা সেটিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকে যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে। এরপরও উচ্চ আদালত কিংবা নির্বাচন কমিশন কাউকে বৈধতা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করার কিছু থাকে না। ঋণখেলাপি হয়েও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে এবার ৩১ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ১৫ জনই বিএনপির। তাদের মধ্যে আপিল শুনানিতে কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তিনি ঋণখেলাপি হওয়ায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। তাঁর ঋণ খেলাপি না দেখাতে আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন আদালত। এই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তিনি নির্বাচনী হলফনামায় কোনো ঋণ নেই উল্লেখ করেন। এই আসনের এনসিপির আলোচিত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ এ বিষয়ে ইসিতে আপিল করেন। শুনানি শেষে গত ১৭ জানুয়ারি তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়। উচ্চ আদালতদের স্থগিতাদেশ নেওয়া অন্যদের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে। ঋণখেলাপির কারণে ৮২ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। তাদের মধ্য থেকে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ১৫ জন। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন হলেন– যশোর-২ আসনের মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। প্রাইম ব্যাংকে তাঁর ক্রেডিট কার্ডের ঋণখেলাপি। নির্ধারিত তারিখের পর গত ১ জানুয়ারি ব্যাংকের সব পাওনা পরিশোধ করে তিনি খেলাপিমুক্ত হন। নির্ধারিত তারিখের পর খেলাপিমুক্ত হওয়ায় তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন তিনি। দলটির আরেক প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল হক ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী। জনতা ব্যাংকের খেলাপি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তার প্রার্থিতা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। গত ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দুজন হলেন– যশোর-৩ থেকে মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন ও ময়মনসিংহ-৬ থেকে মো. নূরে আলম সিদ্দিকী। জাতীয় পার্টির নীলফামারী-৩ থেকে মো. রোহান চৌধুরী, গণঅধিকার পরিষদের খাগড়াছড়ির দীনময় রোয়াজা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চাঁদপুর-২ থেকে নাসিমা নাজনিন সরকার ও এনপিপির বরগুনা-২ থেকে মো. সোলায়মান। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাতজন হলেন– খুলনা-৩ আসনের এস এম আরিফুর রহমান মিঠু, ঝালকাঠি-১ আসনের মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ-১০ আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৩ একেএম আলমগীর, মানিকগঞ্জ-২ এস এম আব্দুল মান্নান, ঢাকা-১ থেকে সাবেক মন্ত্রী নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদা ও গোপালগঞ্জ-২ থেকে উৎপল বিশ্বাস। ঋণখেলাপি হিসেবে বাতিল হওয়া অন্য ৬৭ জনের বাতিলই রয়েছে। কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়ার ঋণখেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। এই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ারও মনোনয়ন টেকেনি। ঋণখেলাপির কারণে বিএনপির মনোনীত যশোর-৪ আসনের টি এস আইয়ুবের মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরবর্তী আপিলেও তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। তাঁর মালিকানাধীন সাইমেন্স লেদার প্রোডাক্টস ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি। এই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফরাজীর মনোনয়নপত্র টিকেছে। চট্টগ্রাম-১১ থেকে একেএম আবু তাহেরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এই আসনে দলটির মূল প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ থেকে আলহাজ জসীম উদ্দীন আহমেদের ঋণ নির্ধারিত তারিখের পর ৩০ ডিসেম্বর খেলাপিমুক্ত হয়েছে। তবে তিনি বেশ আগে টাকা জমা দেওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
বাদ পড়ে যান। কারণ, হাইকোর্টের আদেশে আপিলে আটকে যাওয়ার ফলে তিনি পুনরায় খেলাপির তালিকায় পড়ে যান। এদিকে, ইসির আপিল শুনানিতে ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নিজেই বলেছেন, মনে কষ্ট নিয়ে তারা ঋণখেলাপি প্রার্থীদের ছাড় দিয়েছেন। ‘আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।’ আবার ঋণখেলাপি হওয়ায় চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করেছে ইসি। কিন্তু চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিলের আবেদন করে ইসিতে আপিল করেছিল দুটি ব্যাংক।
এ বিষয়ে শুনানি শেষে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দিয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীকে অনুরোধ করে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’ শুধু বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা নন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি’তে এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে আসা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও রয়েছেন এ তালিকায়। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে ঋণখেলাপির কারণে বাতিল হওয়া ৮২ জনের মধ্যে ইসির আপিল শুনানিতে টিকছেন ১৫ জন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন, চরমোনাইর দল ইসলামী আন্দোলনের দুজন রয়েছেন। যদিও এবারের নির্বাচনে কোনো খেলাপি অংশ নিতে পারবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ
সরকারের পতনের দেড় বছর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বিদ্যমান আইনে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ অন্যের ঋণের গ্যারান্টর থাকলেও তিনি খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। বর্তমান সরকারের মেয়াদে সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী– সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরেও কোনো ব্যক্তির খেলাপির সত্যতা নিশ্চিত হলে তিনি পদ হারাতে পারেন। অবশ্য সরকারের দিক থেকে ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সে অবস্থান দেখা যায়নি। এর আগে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, কেউ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিলেও যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা জাতীয় নাগরিক পার্টি ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোনো খেলাপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘কোন ত্রুটি বের করে কিংবা দুর্নীতির আশ্রয়; কোন উপায়ে ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে আমি নিশ্চিত না। তবে এটা ভালো লক্ষণ না। এ রকম অব্যাহত থাকলে ঋণখেলাপির সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে না। এভাবে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দেওয়া ভালো কিছু না।’ বিগত
কয়েকটি এক তরফা নির্বাচনে আদালতের স্থগিতাদেশ কিংবা ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করে অনেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ঘটে। ওই নির্বাচনের ঠিক আগে ঋণের তথ্য হালনাগাদের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়ে ওই সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এবার কোনো ঋণখেলাপি যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া এবার আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েও কোনো ঋণখেলাপি যেন নির্বাচন করতে না পরেন সে ব্যবস্থা করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর সফল হয়নি। জানতে চাইলে সম্প্রতি ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে
কেউ যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে আমরা সেটা চেয়েছিলাম। তবে এ জন্য আইন পরিবর্তন করা দরকার। সেই ক্ষমতা তো আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট থেকে কেউ আইনি প্রতিকার নিয়ে এলে সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু করার নেই। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গত আগস্টে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাংকের ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের উচিত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঋণখেলাপির কারণে কারও প্রার্থিতা আটকানোর সুযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই। কেবল ঋণখেলাপিদের বিষয়ে তথ্য দিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবার প্রার্থীদের ঋণ থাকলে কার কী অবস্থা তা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়। ব্যাংক কোনো খেলাপির তথ্য গোপন করছে কিনা সেটিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিক থেকে যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে। এরপরও উচ্চ আদালত কিংবা নির্বাচন কমিশন কাউকে বৈধতা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করার কিছু থাকে না। ঋণখেলাপি হয়েও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে এবার ৩১ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ১৫ জনই বিএনপির। তাদের মধ্যে আপিল শুনানিতে কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তিনি ঋণখেলাপি হওয়ায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। তাঁর ঋণ খেলাপি না দেখাতে আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন আদালত। এই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তিনি নির্বাচনী হলফনামায় কোনো ঋণ নেই উল্লেখ করেন। এই আসনের এনসিপির আলোচিত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ এ বিষয়ে ইসিতে আপিল করেন। শুনানি শেষে গত ১৭ জানুয়ারি তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়। উচ্চ আদালতদের স্থগিতাদেশ নেওয়া অন্যদের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে। ঋণখেলাপির কারণে ৮২ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। তাদের মধ্য থেকে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ১৫ জন। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন হলেন– যশোর-২ আসনের মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। প্রাইম ব্যাংকে তাঁর ক্রেডিট কার্ডের ঋণখেলাপি। নির্ধারিত তারিখের পর গত ১ জানুয়ারি ব্যাংকের সব পাওনা পরিশোধ করে তিনি খেলাপিমুক্ত হন। নির্ধারিত তারিখের পর খেলাপিমুক্ত হওয়ায় তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন তিনি। দলটির আরেক প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল হক ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী। জনতা ব্যাংকের খেলাপি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তার প্রার্থিতা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। গত ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দুজন হলেন– যশোর-৩ থেকে মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন ও ময়মনসিংহ-৬ থেকে মো. নূরে আলম সিদ্দিকী। জাতীয় পার্টির নীলফামারী-৩ থেকে মো. রোহান চৌধুরী, গণঅধিকার পরিষদের খাগড়াছড়ির দীনময় রোয়াজা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চাঁদপুর-২ থেকে নাসিমা নাজনিন সরকার ও এনপিপির বরগুনা-২ থেকে মো. সোলায়মান। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাতজন হলেন– খুলনা-৩ আসনের এস এম আরিফুর রহমান মিঠু, ঝালকাঠি-১ আসনের মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ-১০ আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৩ একেএম আলমগীর, মানিকগঞ্জ-২ এস এম আব্দুল মান্নান, ঢাকা-১ থেকে সাবেক মন্ত্রী নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদা ও গোপালগঞ্জ-২ থেকে উৎপল বিশ্বাস। ঋণখেলাপি হিসেবে বাতিল হওয়া অন্য ৬৭ জনের বাতিলই রয়েছে। কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়ার ঋণখেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। এই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ারও মনোনয়ন টেকেনি। ঋণখেলাপির কারণে বিএনপির মনোনীত যশোর-৪ আসনের টি এস আইয়ুবের মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরবর্তী আপিলেও তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। তাঁর মালিকানাধীন সাইমেন্স লেদার প্রোডাক্টস ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি। এই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফরাজীর মনোনয়নপত্র টিকেছে। চট্টগ্রাম-১১ থেকে একেএম আবু তাহেরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এই আসনে দলটির মূল প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ থেকে আলহাজ জসীম উদ্দীন আহমেদের ঋণ নির্ধারিত তারিখের পর ৩০ ডিসেম্বর খেলাপিমুক্ত হয়েছে। তবে তিনি বেশ আগে টাকা জমা দেওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।



