ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে, তারপরেই আমি অবসর নেব – দৃপ্ত শপথ শেখ হাসিনা’র
হারাম পণ্যে আরোপিত হালাল ট্যাক্স — উচ্চাভিলাষী বাজেটে রাজস্ব আদায়ে মরিয়া সরকার
ধর্ষণের শিকার নারীরা কেন নীরব থাকেন?
“বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও আশা- আকাঙ্ক্ষা যেভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে” – দ্যা ডিপ্লোম্যাট
বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ
দেশে নিবন্ধিত মোবাইল সিমের সংখ্যা ৩২ কোটি ৮২ লাখ
শর্ত মানলে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন আ.লীগের নেতাকর্মীরা
৬ দফা: বাঙালির মুক্তির সনদ
লাহোরে পাকিস্তানের সব বিরোধী দলের সম্মেলন। ভারত-পাকিস্তান অমীমাংসিত যুদ্ধ শেষে জানুয়ারি মাসে তাসখন্দে শান্তিচুক্তি করে পশ্চিম পাকিস্তানে জনরোষে সম্মুখীন হয় আইয়ুব খান। পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলো এই সুযোগে সম্মিলিত মোর্চা গঠন করে আইয়ু্বকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। এরই প্রস্তুতি হিসেবে করাচির সভা।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও এই সভায় আমন্ত্রিত। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর আগে ঢাকায় তিনি ঘোষণা করেন, এবার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করবেন।
“স্বায়ত্তশাসন” পাকিস্তান সৃষ্টির সময় থেকেই একটি আলোচিত দাবি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে পশ্চিম পাকিস্তানকে একেবারে ‘ওয়ালাইকুম-আস-সালাম’ জানিয়ে দিয়েছিলেন।
এর পরের
বছর আইয়ুব খানের সামরিক শাসন শুরু হলে সব শুনসান। ১৯৬৩ সালে চীন সফরের পর থেকে ভাসানীর নীতি হয়ে যায়– ‘নো ডিস্টার্ব আইয়ুব’। এই অবস্থায় সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু শেখ মুজিবকে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। আওয়ামী লীগের প্রাচীনপন্থী নেতাদের অজ্ঞাতে কয়েকজন বিশ্বস্ত বাঙালী অর্থনীতিবিদ, বাঙালী ব্যুরোক্রেট ও আইনজীবীকে সংযুক্ত করে কঠোর গোপনীয়তায় তিনি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের একটি রূপকল্প তৈরি করেন এবং এটি নিয়েই লাহোর যান। সঙ্গে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ, আব্দুল মালেক উকিল, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, এবিএম নুরুল ইসলাম, মো. ইউসুফ আলী প্রমুখ। সম্মেলনে উপস্থিত অন্য রাজনীতিবিদদের চিন্তা একটাই ছিল, আইয়ুবকে হটিয়ে নিজেদের ক্ষমতারোহণ। স্বায়ত্তশাসন বা জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম তাদের লক্ষ্য ছিল না। তাই
শেখ মুজিব তাঁর স্বায়ত্তশাসনের রূপকল্প ‘ছয় দফা’ উত্থাপনের সাথে সাথেই লোভী রাজনীতিবিদরা আঁতকে উঠেন। তাঁরা ছয় দফাকে বিবেচনায় নিতে বা আলোচনা করতেই অসম্মতি জানান। ফলে আওয়ামী লীগ এই সম্মেলনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে বেরিয়ে আসে। ১১ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের সামনে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঐদিনই শেখ মুজিব ঢাকা ফিরে আসেন। ছয় দফার প্রথমেই একটি ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর দাবি করা হলেও পরের দফাগুলো ফেডারেশনের বদলে শিথিল কনফেডারেশনের রূপরেখা নির্দেশ করে। দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি ছাড়া কেন্দ্রের হাতে আর কিছু থাকবে না। বাকি সব সিদ্ধান্ত প্রদেশগুলোর নিজস্ব। নিজস্ব মুদ্রা থাকবে, কর আদায়ের নিজস্ব ক্ষমতা, প্রদেশগুলো সরাসরি বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা
করবে, বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ প্রদেশগুলো নিজেরা গ্রহণ করবে এবং প্রদেশগুলোর নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের ক্ষমতা থাকবে। এ যেন কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ন্যূনতম সংযোগ রক্ষার চুক্তি। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে পারছিল– ছয় দফা মূলতঃ স্বাধীনতার দাবি। কিন্তু এর ভাষা ও বাক্যবিন্যাস এতো সুসংহত যে সরাসরি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ এর অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থাগ্রহণেরও সুযোগ নেই। ছয় দফা পেশের সময় শেখ মুজিব অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও রুহুল কুদ্দুসকে ডেকে বলেন– ‘আসলে এটা ছয় দফা নয়। এক দফাই। একটু ঘুরিয়ে বললাম।’ ১১ই ফেব্রুয়ারি ছয় দফা দাবি জনসম্মুখে আসার পর ১৩ই ফেব্রুয়ারি প্রথম এর সমর্থনে বিবৃতি দেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের এম এ
আজিজ, আব্দুল্লাহ আল হারুন, এম এ হান্নান। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি বিবৃতি দিয়ে সমর্থন জানায়। এরপরই ছয় দফা নিয়ে ঝড় শুরু হয়। প্রথম সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করে ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিবৃতি দেয় জামায়াতে ইসলামী ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ। ২৫শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জনসভা করে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনের কর্মসূচি শুরু করেন। ১৪ই মার্চ সিলেটে জনসভায় তিনি ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায় করেন। উল্লেখ্য, এটি তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নয়। ১৪ই মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চট্টগ্রামের স্টেডিয়ামের সভায় বিষোদ্গার করে বলেন– পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্টকারী এই কর্মসূচি বরদাশত করা যাবেনা। ১৮ই মার্চ কনভেনশন মুসলিম লীগের কাউন্সিলে তিনি গৃহযুদ্ধের হুমকি
দিয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের মোকাবেলার আহ্বান জানান। ১৮ই মার্চ অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সম্মেলন। প্রাচীনপন্থীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বেশীরভাগ জেলা নেতৃত্ব ও ছাত্রলীগের দৃঢ়তায় “ছয় দফা” আওয়ামী লীগের কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। এই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে ছয় দফাপন্থীদের অবস্থান সুসংহত হয়। এর আগে ১৫ই মার্চ করাচি আওয়ামী লীগও সমর্থন জানায়। ৭ই এপ্রিল মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন– তিনি ছয় দফা মানেন না, কারণ এতে শোষণ মুক্তির কোন দাবি নেই। ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের নেতারা ছয় দফাকে সিআইএ’র দলিল বলেও সমালোচনা করেন। কেউ কেউ এটিকে বিরোধীদলের ঐক্য বিনষ্টের জন্য আইয়ুব
খানের সচিব আলতাফ গওহরের পরিকল্পনা বলেও অভিযুক্ত করেন। ১৮ই জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ভাসানী আবারও ছয় দফার বিরোধীতা করে বলেন– ‘স্বায়ত্তশাসন মানে বিচ্ছিন্নতা নয়। প্রয়োজনে আমি শেষ রক্তবিন্ধু দিয়ে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করব। ছয় দফা আগেও সমর্থন করিনি, এখনো করিনা।’ পাকিস্তান সরকার, ডানপন্থী ও বামপন্থী সকল রাজনৈতিক দলের বিরোধীতা অগ্রাহ্য করে শেখ মুজিব সিদ্ধান্ত নেন– সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে ছয় দফার ব্যাখ্যা প্রদান করবেন, পাকিস্তানী শোষণের চিত্র তুলে ধরবেন। এই লক্ষ্যে শুরু হয় তাঁর জেলা শহরগুলোতে গণসংযোগ। ৮ই এপ্রিল পাবনা, ৯ই এপ্রিল বগুড়া, ১০ই এপ্রিল রংপুর, ১৫ই এপ্রিল যশোর। ১৩ই এপ্রিল ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে তাঁর বাসভবনে শেখ মুজিব এক বৈঠক করেন। প্রাচীনপন্থী আওয়ামী লীগ নেতাদের অধিকাংশই পাকিস্তানপন্থী। তাই ছাত্রলীগ নেতাদেরকে তিনি প্রতিটি জেলায় আওয়ামী লীগের কমিটি দখল করে ছয় দফা জোরদার করার নির্দেশ দেন। এদিকে পাকিস্তান সরকারও শুরু করে ‘মুজিব গ্রেপ্তার’ অভিযান। ১৮ই এপ্রিল যশোরে গ্রেপ্তার, জামিন নিয়ে মুক্ত হলে ২১শে এপ্রিল ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিলেট, সিলেট থেকে জামিনে মুক্ত হলে কারাফটক থেকে আবার গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আটবার গ্রেপ্তার ও মুক্ত হন শেখ মুজিব। প্রতিবারই মুক্ত হবার সাথে সাথে ছয় দফার সমর্থনে জনসংযোগ করেন। ৮ই মে রাতে নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষ করার কয়েকঘন্টার মধ্যে দেশরক্ষা আইনে শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক, এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরীসহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সরকার। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করে ৭ই জুন বন্দীমুক্তি ও ছয় দফার পক্ষে হরতাল আহ্বান করে। নেতাদের সকলে কারাবন্দী থাকলেও সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাকের মত তরুণ ছাত্রনেতাদের তৎপরতায় অভূতপুর্ব সাড়া মিলে এই হরতালে। পুলিশের নৃশংসতায় সরকারী হিসেবেই নিহত হন ১০ জন। এই হরতালের প্রেক্ষিতেই তেজগাঁ, টঙ্গী ও আদমজির শ্রমিকরা আওয়ামী লীগের সাথে সংযুক্ত হন। এর আগে শ্রমিক রাজনীতির একক নিয়ন্ত্রণ ছিল বামদের হাতে। পরবর্তীতে অন্যরা মুক্তি পেলেও এবার শেখ মুজিবের দীর্ঘ কারাবাস হয়। অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি। প্রায় ৩ বছরের কারাবাসের মধ্যে আগরতলা মামলাসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষিতে ছয় দফার আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। নগর থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম, চাকরীজীবি থেকে কৃষক-শ্রমিক পর্যন্ত সহজ ভাষায় সহজ সত্য উপলব্ধি করে– বাংলা হচ্ছে পাকিস্তানের উপনিবেশ। এই উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনই একমাত্র লক্ষ্য। তথ্যসূত্রঃ ১। কারাগারের রোজনামচা। শেখ মুজিবুর রহমান। ২০১৭ ২। বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম। ডাঃ মাহফুজুর রহমান। ১৯৯৩ ৩। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ১৮৩০ থেকে ১৯৭১। ডঃ মোহাম্মদ হান্নান। ২০০৬ ৪। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। মযহারুল ইসলাম। ১৯৭৪ ৫। আমি সিরাজুল আলম খানঃ একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য। শামসুদ্দিন পেয়ারা। ২০২০
বছর আইয়ুব খানের সামরিক শাসন শুরু হলে সব শুনসান। ১৯৬৩ সালে চীন সফরের পর থেকে ভাসানীর নীতি হয়ে যায়– ‘নো ডিস্টার্ব আইয়ুব’। এই অবস্থায় সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু শেখ মুজিবকে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেয়। আওয়ামী লীগের প্রাচীনপন্থী নেতাদের অজ্ঞাতে কয়েকজন বিশ্বস্ত বাঙালী অর্থনীতিবিদ, বাঙালী ব্যুরোক্রেট ও আইনজীবীকে সংযুক্ত করে কঠোর গোপনীয়তায় তিনি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের একটি রূপকল্প তৈরি করেন এবং এটি নিয়েই লাহোর যান। সঙ্গে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ, আব্দুল মালেক উকিল, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, এবিএম নুরুল ইসলাম, মো. ইউসুফ আলী প্রমুখ। সম্মেলনে উপস্থিত অন্য রাজনীতিবিদদের চিন্তা একটাই ছিল, আইয়ুবকে হটিয়ে নিজেদের ক্ষমতারোহণ। স্বায়ত্তশাসন বা জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম তাদের লক্ষ্য ছিল না। তাই
শেখ মুজিব তাঁর স্বায়ত্তশাসনের রূপকল্প ‘ছয় দফা’ উত্থাপনের সাথে সাথেই লোভী রাজনীতিবিদরা আঁতকে উঠেন। তাঁরা ছয় দফাকে বিবেচনায় নিতে বা আলোচনা করতেই অসম্মতি জানান। ফলে আওয়ামী লীগ এই সম্মেলনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে বেরিয়ে আসে। ১১ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের সামনে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঐদিনই শেখ মুজিব ঢাকা ফিরে আসেন। ছয় দফার প্রথমেই একটি ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর দাবি করা হলেও পরের দফাগুলো ফেডারেশনের বদলে শিথিল কনফেডারেশনের রূপরেখা নির্দেশ করে। দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি ছাড়া কেন্দ্রের হাতে আর কিছু থাকবে না। বাকি সব সিদ্ধান্ত প্রদেশগুলোর নিজস্ব। নিজস্ব মুদ্রা থাকবে, কর আদায়ের নিজস্ব ক্ষমতা, প্রদেশগুলো সরাসরি বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা
করবে, বৈদেশিক সাহায্যের অর্থ প্রদেশগুলো নিজেরা গ্রহণ করবে এবং প্রদেশগুলোর নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের ক্ষমতা থাকবে। এ যেন কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ন্যূনতম সংযোগ রক্ষার চুক্তি। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে পারছিল– ছয় দফা মূলতঃ স্বাধীনতার দাবি। কিন্তু এর ভাষা ও বাক্যবিন্যাস এতো সুসংহত যে সরাসরি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ এর অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থাগ্রহণেরও সুযোগ নেই। ছয় দফা পেশের সময় শেখ মুজিব অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও রুহুল কুদ্দুসকে ডেকে বলেন– ‘আসলে এটা ছয় দফা নয়। এক দফাই। একটু ঘুরিয়ে বললাম।’ ১১ই ফেব্রুয়ারি ছয় দফা দাবি জনসম্মুখে আসার পর ১৩ই ফেব্রুয়ারি প্রথম এর সমর্থনে বিবৃতি দেন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের এম এ
আজিজ, আব্দুল্লাহ আল হারুন, এম এ হান্নান। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি বিবৃতি দিয়ে সমর্থন জানায়। এরপরই ছয় দফা নিয়ে ঝড় শুরু হয়। প্রথম সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করে ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিবৃতি দেয় জামায়াতে ইসলামী ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ। ২৫শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জনসভা করে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনের কর্মসূচি শুরু করেন। ১৪ই মার্চ সিলেটে জনসভায় তিনি ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায় করেন। উল্লেখ্য, এটি তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নয়। ১৪ই মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চট্টগ্রামের স্টেডিয়ামের সভায় বিষোদ্গার করে বলেন– পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্টকারী এই কর্মসূচি বরদাশত করা যাবেনা। ১৮ই মার্চ কনভেনশন মুসলিম লীগের কাউন্সিলে তিনি গৃহযুদ্ধের হুমকি
দিয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের মোকাবেলার আহ্বান জানান। ১৮ই মার্চ অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সম্মেলন। প্রাচীনপন্থীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বেশীরভাগ জেলা নেতৃত্ব ও ছাত্রলীগের দৃঢ়তায় “ছয় দফা” আওয়ামী লীগের কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। এই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ফলে আওয়ামী লীগের ভেতরে ছয় দফাপন্থীদের অবস্থান সুসংহত হয়। এর আগে ১৫ই মার্চ করাচি আওয়ামী লীগও সমর্থন জানায়। ৭ই এপ্রিল মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন– তিনি ছয় দফা মানেন না, কারণ এতে শোষণ মুক্তির কোন দাবি নেই। ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের নেতারা ছয় দফাকে সিআইএ’র দলিল বলেও সমালোচনা করেন। কেউ কেউ এটিকে বিরোধীদলের ঐক্য বিনষ্টের জন্য আইয়ুব
খানের সচিব আলতাফ গওহরের পরিকল্পনা বলেও অভিযুক্ত করেন। ১৮ই জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ভাসানী আবারও ছয় দফার বিরোধীতা করে বলেন– ‘স্বায়ত্তশাসন মানে বিচ্ছিন্নতা নয়। প্রয়োজনে আমি শেষ রক্তবিন্ধু দিয়ে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করব। ছয় দফা আগেও সমর্থন করিনি, এখনো করিনা।’ পাকিস্তান সরকার, ডানপন্থী ও বামপন্থী সকল রাজনৈতিক দলের বিরোধীতা অগ্রাহ্য করে শেখ মুজিব সিদ্ধান্ত নেন– সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে ছয় দফার ব্যাখ্যা প্রদান করবেন, পাকিস্তানী শোষণের চিত্র তুলে ধরবেন। এই লক্ষ্যে শুরু হয় তাঁর জেলা শহরগুলোতে গণসংযোগ। ৮ই এপ্রিল পাবনা, ৯ই এপ্রিল বগুড়া, ১০ই এপ্রিল রংপুর, ১৫ই এপ্রিল যশোর। ১৩ই এপ্রিল ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে তাঁর বাসভবনে শেখ মুজিব এক বৈঠক করেন। প্রাচীনপন্থী আওয়ামী লীগ নেতাদের অধিকাংশই পাকিস্তানপন্থী। তাই ছাত্রলীগ নেতাদেরকে তিনি প্রতিটি জেলায় আওয়ামী লীগের কমিটি দখল করে ছয় দফা জোরদার করার নির্দেশ দেন। এদিকে পাকিস্তান সরকারও শুরু করে ‘মুজিব গ্রেপ্তার’ অভিযান। ১৮ই এপ্রিল যশোরে গ্রেপ্তার, জামিন নিয়ে মুক্ত হলে ২১শে এপ্রিল ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিলেট, সিলেট থেকে জামিনে মুক্ত হলে কারাফটক থেকে আবার গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আটবার গ্রেপ্তার ও মুক্ত হন শেখ মুজিব। প্রতিবারই মুক্ত হবার সাথে সাথে ছয় দফার সমর্থনে জনসংযোগ করেন। ৮ই মে রাতে নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষ করার কয়েকঘন্টার মধ্যে দেশরক্ষা আইনে শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক, এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরীসহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সরকার। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করে ৭ই জুন বন্দীমুক্তি ও ছয় দফার পক্ষে হরতাল আহ্বান করে। নেতাদের সকলে কারাবন্দী থাকলেও সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাকের মত তরুণ ছাত্রনেতাদের তৎপরতায় অভূতপুর্ব সাড়া মিলে এই হরতালে। পুলিশের নৃশংসতায় সরকারী হিসেবেই নিহত হন ১০ জন। এই হরতালের প্রেক্ষিতেই তেজগাঁ, টঙ্গী ও আদমজির শ্রমিকরা আওয়ামী লীগের সাথে সংযুক্ত হন। এর আগে শ্রমিক রাজনীতির একক নিয়ন্ত্রণ ছিল বামদের হাতে। পরবর্তীতে অন্যরা মুক্তি পেলেও এবার শেখ মুজিবের দীর্ঘ কারাবাস হয়। অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি। প্রায় ৩ বছরের কারাবাসের মধ্যে আগরতলা মামলাসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষিতে ছয় দফার আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। নগর থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম, চাকরীজীবি থেকে কৃষক-শ্রমিক পর্যন্ত সহজ ভাষায় সহজ সত্য উপলব্ধি করে– বাংলা হচ্ছে পাকিস্তানের উপনিবেশ। এই উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনই একমাত্র লক্ষ্য। তথ্যসূত্রঃ ১। কারাগারের রোজনামচা। শেখ মুজিবুর রহমান। ২০১৭ ২। বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম। ডাঃ মাহফুজুর রহমান। ১৯৯৩ ৩। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ১৮৩০ থেকে ১৯৭১। ডঃ মোহাম্মদ হান্নান। ২০০৬ ৪। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। মযহারুল ইসলাম। ১৯৭৪ ৫। আমি সিরাজুল আলম খানঃ একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য। শামসুদ্দিন পেয়ারা। ২০২০



