ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
ফয়েজ আহমেদ তৈয়বের সবার আগে দেশত্যাগ ও আইসিটি খাতে বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ
আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিরোধ বাড়লে ‘নারীবিরোধী’ জামায়াত বড় সাফল্য পেতো: ব্রিটিশ এমপি রুপা হক
স্ক্রিনশট ফাঁস করে ‘প্রিয় তারেক রহমান’ সম্বোধনে ঢাবি শিক্ষক মোনামির আকুতিভরা পোস্ট ভাইরাল
ধানমন্ডি ৩২ শে যাওয়া কি অপরাধ?
“আমার মা কখনও কাউকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেননি, শুধুমাত্র যারা পুলিশ বা অন্যদের ওপর হামলা করছিল, তাদের ক্ষেত্রে ছাড়া।” – সজীব ওয়াজেদ
নিরঙ্কুশ জয়, এখনো সরকার গঠন হয়নি: এর আগেই ধানমন্ডিতে ঢাবি শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান লাঞ্ছিত, প্রশ্নবিদ্ধ ‘ভবিষৎ গণতন্ত্র’
ছয়বার জামিন পেয়েও মেলেনি মুক্তি, কারাগারে আ.লীগ নেতার মৃত্যু
গণতন্ত্রের নতুন সমীকরণ: আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক চাপ ও বিএনপির ‘কৌশলী’ দাবার চাল
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল কখনোই মসৃণ হয়নি। তবে এবারের প্রেক্ষাপটটি অভুতপূর্ব। একটি ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের পর নবনির্বাচিত সংসদ যখন শপথের অপেক্ষায়, তখন জাতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আর 'কে সরকার গঠন করবে' তা নয়, বরং প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে—'বিরোধী দলে কে থাকবে?'। আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। এটি কেবল একটি আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পশ্চিমা বিশ্বের গণতান্ত্রিক মানদণ্ড, ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং বিএনপির দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার কৌশল।
আন্তর্জাতিক চাপ: গণতন্ত্রের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে
‘আইনি প্রক্রিয়ার’ কথা বলেন, তখন তিনি মূলত পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগের জায়গাটিকেই অ্যাড্রেস করতে চান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং কমনওয়েলথ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক আদেশে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। এর পেছনে কেবল আদর্শিক কারণ নেই, আছে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ১. জিএসপি প্লাস (GSP+) সুবিধা: ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে হলে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার শর্ত পূরণ করতে হবে। বিরোধী দলহীন বা নিষিদ্ধের রাজনীতি চালু থাকলে এই সুবিধা হারানো প্রায় নিশ্চিত, যা নতুন সরকারের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ২. মার্কিন ভিসা নীতি ও নিষেধাজ্ঞা: গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের
গণতন্ত্র নিয়ে যে সক্রিয় অবস্থান দেখিয়েছে, তাতে বিরোধী দমনের অভিযোগ উঠলে নতুন সরকারের ওপরও খড়গ নেমে আসতে পারে। ফলে বিএনপি অনুধাবন করছে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখলে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের সরকারকে ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা ‘একদলীয় শাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি হবে। আইনি গোলকধাঁধাঁ ও বিএনপির ‘সেফ এক্সিট’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯-এর ১৮(১) ধারার ক্ষমতাবলে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই আইনটি মূলত জঙ্গি সংগঠনের জন্য তৈরি। একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে এই ধারায় দীর্ঘমেয়াদে নিষিদ্ধ রাখা আদালতে টিকবে কি না, তা নিয়ে খোদ আইনজ্ঞদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। বিএনপি এখানে একটি অত্যন্ত চতুর ‘ডুয়েল পলিসি’ বা দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে: প্রথমত: তারা নিজেরা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবে
না। এতে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক এবং গত দেড় দশকের নির্যাতিত কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। দ্বিতীয়ত: তারা আদালতকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেবে। যদি উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত বা বাতিল করে, তবে বিএনপি আন্তর্জাতিক মহলকে বলতে পারবে, “আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাসী, এটি আদালতের রায়।” এই কৌশলে বিএনপি ‘সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না’ নীতিতে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ ফিরলে আন্তর্জাতিক চাপ কমবে, আবার মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ‘দুর্বল ও কোণঠাসা’ প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়া যাবে। মাঠের রাজনীতি ও তৃতীয় শক্তির উত্থান আপনার উল্লেখিত এনসিপি (জাতীয় নাগরিক কমিটি বা সমমনা শক্তি) এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উদ্বেগটি অমূলক নয়। তারা মনে করছেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের
মধ্যে একটি অলিখিত ‘বোঝাপড়া’ হতে পারে। এই সন্দেহের কারণ হলো, বিএনপি জানে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে থাকলে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে একটি পরিচিত ও দুর্বল প্রতিপক্ষ। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হলে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করতে পারে ইসলামি দলগুলো অথবা নতুন কোনো র্যাডিকেল শক্তি—যা বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় হুমকি হতে পারে। গুলিস্তানে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে পতাকা উত্তোলনের ঘটনাটি ছিল একটি ‘টেস্ট কেস’। এটি প্রমাণ করেছে যে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পলাতক থাকলেও তৃণমূলের একটি অংশ এখনো সক্রিয় হওয়ার অপেক্ষায়। ১৮ মাস ধরে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা একটি দলের জন্য এটি অস্তিত্বের জানান দেওয়া। ইতিহাস বলে, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবং ’৭৫-পরবর্তী
সময়েও আওয়ামী লীগ বারবার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দলটিকে নিষিদ্ধ করলে এটি আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কে পরিণত হতে পারে, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য চরমপন্থি দলগুলোর চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে। ভারত ফ্যাক্টর ও শেখ হাসিনার বিচার এই সমীকরণের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশটি হলো ভারত এবং শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় বিষয়টি আর দ্বিপাক্ষিক নেই, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। নতুন সরকার যদি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং কঠোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হতে পারে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগকে ‘সেক্যুলার’ ও ‘নিরাপদ বাজি’ মনে করে। বিএনপি যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের (যেমন: উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন) বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারে
এবং একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সীমিত সুযোগ দেয়, তবে ভারত হয়তো নমনীয় হতে পারে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া যদি ‘প্রতিহিংসায়’ রূপ নেয়, তবে ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে লবিং জোরদার করতে পারে। তাই বিএনপিকে এখানে ‘ন্যায়বিচার’ এবং ‘প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক’—এই দুইয়ের মধ্যে সরু সুতোয় হাঁটতে হচ্ছে। রিকনসিলিয়েশন নাকি রিট্রিবিউশন? কমনওয়েলথ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ‘জাতীয় পুনর্মিলন’ বা রিকনসিলিয়েশনের প্রস্তাবটি তাত্ত্বিকভাবে সুন্দর শোনালেও বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। গত ১৫ বছরে গুম, খুন এবং মামলার যে পাহাড় জমেছে, তার সুরাহা না করে বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহাবস্থানে যেতে চাইবে না। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা ‘ম্যানেজড পলিটিক্স’-এর দিকেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ। যেখানে: ১. আওয়ামী লীগ বা তার কোনো নতুন সংস্করণকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে, তবে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের থাকবে না। ২. বিচার প্রক্রিয়া চলবে, কিন্তু তা এতটাই দীর্ঘায়িত হবে যে এটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করবে না। উপসংহার: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন অধ্যায়? ১৯৭৫-এর পর আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে দিয়েছিল জিয়াউর রহমানের সরকার—বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে। আজ ইতিহাসের অদ্ভুত সমীকরণে সেই একই সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি। বর্তমান বাস্তবতা বলছে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আইনি পথে শিথিল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে দলটির নৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বাসন হতে সময় লাগবে এক যুগেরও বেশি। বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিজয়ীর বেশে ‘প্রতিশোধ’ না নিয়ে ‘রাষ্ট্রনায়কোচিত’ আচরণ করা। যদি বিএনপি আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং একচেটিয়া ক্ষমতার পথে হাঁটে, তবে বাংলাদেশে ‘তৃতীয় কোনো শক্তির’ উত্থান সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর যদি তারা প্রতিহিংসার বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির (Inclusive Politics) পথে হাঁটে, তবে হয়তো বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’র বৃত্ত থেকে বের হতে পারবে। নতুন সরকারের সামনে তাই এখন দুটি পথ: হয় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে তাদের ‘শহীদ’ হওয়ার সুযোগ দেওয়া, অথবা তাদের রাজনৈতিক মাঠে রেখে জনগণের রায়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা। দ্বিতীয় পথটিই সম্ভবত গণতন্ত্রের জন্য অধিক নিরাপদ।
‘আইনি প্রক্রিয়ার’ কথা বলেন, তখন তিনি মূলত পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগের জায়গাটিকেই অ্যাড্রেস করতে চান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং কমনওয়েলথ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক আদেশে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। এর পেছনে কেবল আদর্শিক কারণ নেই, আছে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ১. জিএসপি প্লাস (GSP+) সুবিধা: ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে হলে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার শর্ত পূরণ করতে হবে। বিরোধী দলহীন বা নিষিদ্ধের রাজনীতি চালু থাকলে এই সুবিধা হারানো প্রায় নিশ্চিত, যা নতুন সরকারের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ২. মার্কিন ভিসা নীতি ও নিষেধাজ্ঞা: গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের
গণতন্ত্র নিয়ে যে সক্রিয় অবস্থান দেখিয়েছে, তাতে বিরোধী দমনের অভিযোগ উঠলে নতুন সরকারের ওপরও খড়গ নেমে আসতে পারে। ফলে বিএনপি অনুধাবন করছে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখলে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের সরকারকে ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা ‘একদলীয় শাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি হবে। আইনি গোলকধাঁধাঁ ও বিএনপির ‘সেফ এক্সিট’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯-এর ১৮(১) ধারার ক্ষমতাবলে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই আইনটি মূলত জঙ্গি সংগঠনের জন্য তৈরি। একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে এই ধারায় দীর্ঘমেয়াদে নিষিদ্ধ রাখা আদালতে টিকবে কি না, তা নিয়ে খোদ আইনজ্ঞদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। বিএনপি এখানে একটি অত্যন্ত চতুর ‘ডুয়েল পলিসি’ বা দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে: প্রথমত: তারা নিজেরা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবে
না। এতে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক এবং গত দেড় দশকের নির্যাতিত কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। দ্বিতীয়ত: তারা আদালতকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেবে। যদি উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞার আদেশ স্থগিত বা বাতিল করে, তবে বিএনপি আন্তর্জাতিক মহলকে বলতে পারবে, “আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাসী, এটি আদালতের রায়।” এই কৌশলে বিএনপি ‘সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না’ নীতিতে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ ফিরলে আন্তর্জাতিক চাপ কমবে, আবার মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ‘দুর্বল ও কোণঠাসা’ প্রতিপক্ষ হিসেবে পাওয়া যাবে। মাঠের রাজনীতি ও তৃতীয় শক্তির উত্থান আপনার উল্লেখিত এনসিপি (জাতীয় নাগরিক কমিটি বা সমমনা শক্তি) এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উদ্বেগটি অমূলক নয়। তারা মনে করছেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের
মধ্যে একটি অলিখিত ‘বোঝাপড়া’ হতে পারে। এই সন্দেহের কারণ হলো, বিএনপি জানে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে থাকলে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে একটি পরিচিত ও দুর্বল প্রতিপক্ষ। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হলে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করতে পারে ইসলামি দলগুলো অথবা নতুন কোনো র্যাডিকেল শক্তি—যা বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় হুমকি হতে পারে। গুলিস্তানে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে পতাকা উত্তোলনের ঘটনাটি ছিল একটি ‘টেস্ট কেস’। এটি প্রমাণ করেছে যে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পলাতক থাকলেও তৃণমূলের একটি অংশ এখনো সক্রিয় হওয়ার অপেক্ষায়। ১৮ মাস ধরে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা একটি দলের জন্য এটি অস্তিত্বের জানান দেওয়া। ইতিহাস বলে, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবং ’৭৫-পরবর্তী
সময়েও আওয়ামী লীগ বারবার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দলটিকে নিষিদ্ধ করলে এটি আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কে পরিণত হতে পারে, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য চরমপন্থি দলগুলোর চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে। ভারত ফ্যাক্টর ও শেখ হাসিনার বিচার এই সমীকরণের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশটি হলো ভারত এবং শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় বিষয়টি আর দ্বিপাক্ষিক নেই, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। নতুন সরকার যদি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং কঠোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হতে পারে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগকে ‘সেক্যুলার’ ও ‘নিরাপদ বাজি’ মনে করে। বিএনপি যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের (যেমন: উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন) বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পারে
এবং একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সীমিত সুযোগ দেয়, তবে ভারত হয়তো নমনীয় হতে পারে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া যদি ‘প্রতিহিংসায়’ রূপ নেয়, তবে ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে লবিং জোরদার করতে পারে। তাই বিএনপিকে এখানে ‘ন্যায়বিচার’ এবং ‘প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক’—এই দুইয়ের মধ্যে সরু সুতোয় হাঁটতে হচ্ছে। রিকনসিলিয়েশন নাকি রিট্রিবিউশন? কমনওয়েলথ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ‘জাতীয় পুনর্মিলন’ বা রিকনসিলিয়েশনের প্রস্তাবটি তাত্ত্বিকভাবে সুন্দর শোনালেও বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। গত ১৫ বছরে গুম, খুন এবং মামলার যে পাহাড় জমেছে, তার সুরাহা না করে বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহাবস্থানে যেতে চাইবে না। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ বা ‘ম্যানেজড পলিটিক্স’-এর দিকেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ। যেখানে: ১. আওয়ামী লীগ বা তার কোনো নতুন সংস্করণকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হবে, তবে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের থাকবে না। ২. বিচার প্রক্রিয়া চলবে, কিন্তু তা এতটাই দীর্ঘায়িত হবে যে এটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করবে না। উপসংহার: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন অধ্যায়? ১৯৭৫-এর পর আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে দিয়েছিল জিয়াউর রহমানের সরকার—বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে। আজ ইতিহাসের অদ্ভুত সমীকরণে সেই একই সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি। বর্তমান বাস্তবতা বলছে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আইনি পথে শিথিল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে দলটির নৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বাসন হতে সময় লাগবে এক যুগেরও বেশি। বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিজয়ীর বেশে ‘প্রতিশোধ’ না নিয়ে ‘রাষ্ট্রনায়কোচিত’ আচরণ করা। যদি বিএনপি আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং একচেটিয়া ক্ষমতার পথে হাঁটে, তবে বাংলাদেশে ‘তৃতীয় কোনো শক্তির’ উত্থান সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর যদি তারা প্রতিহিংসার বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির (Inclusive Politics) পথে হাঁটে, তবে হয়তো বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’র বৃত্ত থেকে বের হতে পারবে। নতুন সরকারের সামনে তাই এখন দুটি পথ: হয় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে তাদের ‘শহীদ’ হওয়ার সুযোগ দেওয়া, অথবা তাদের রাজনৈতিক মাঠে রেখে জনগণের রায়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা। দ্বিতীয় পথটিই সম্ভবত গণতন্ত্রের জন্য অধিক নিরাপদ।



