ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
রংপুরে ৪ খুন: কারণ হিসেবে হিন্দু সমাজের জাতপ্রথার দ্বন্দ্বের নয়া দাবি পুলিশের
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা, নিহত অন্তত ৫০০, নিখোঁজ প্রায় ১৫০০
আমিনবাজার বর্জ্য-বিদ্যুৎ প্রকল্প: আওয়ামী লীগ আমলে গৃহীত চীনা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
১২৯ বার পেছালো সাগর-রুনি মামলার তারিখ: শেখ হাসিনার সময় সমালোচনা থাকলেও এখন নীরবতা
“এখন আমি জামিন চাই না”-দিপু মনি: জামিনের আবেদন প্রত্যাহার করে জানালেন, আর প্রয়োজনীয়তা নেই
মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হবে প্রশ্নে যা বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মধ্যরাতে বাইকে দুই তরুণের মাঝে এক তরুণী, ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা জানা গেল
রেকর্ড ছুঁতে চলেছে এলএনজি আমদানি ব্যয়: দেড় লাখ কোটি টাকার ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে দেশ
দেশে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত গ্যাসের মজুদ ক্রমাগত ফুরিয়ে আসার বিপরীতে শিল্পক্ষেত্র ও সাধারণ গ্রাহকপর্যায়ে এর চাহিদা দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকায় বাধ্য হয়েই সরকারকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয়ের পথ বেছে নিতে হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান অর্থবৎসরে রাষ্ট্রীয়ভাবে মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির আগাম কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীতে ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও সামরিক বাধা সৃষ্টির কারণে কাতার হতে বাংলাদেশে এলএনজির সরবরাহ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা সামাল দিতে বাধ্য হয়ে সরকার আন্তর্জাতিক খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে চড়া দামে এলএনজি ক্রয় করছে।
শুধুমাত্র চলতি অর্থবৎসরেই বিদেশ থেকে এলএনজি কিনতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার
আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার দরুন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যদি এলএনজির চড়া দাম অপরিবর্তিত থাকে, তবে এই আমদানিবাবদ ব্যয়ের অঙ্ক আরও আশঙ্কাজনকভাবে লাফিয়ে বাড়তে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সতর্ক করছেন। উদ্ভূত তীব্র গ্যাসসংকট প্রশমনকল্পে সরকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জলভাগে অতিরিক্ত কয়েকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যেই একটি নতুন রূপান্তর কেন্দ্র বা টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন লাভ করেছে। পরিকল্পনাধীন এসব অবকাঠামোর মাঝে অন্তত দুটি টার্মিনাল যদি বাস্তবে আলোর মুখ দেখে, তবেই কেবল দেশে এলএনজি গ্রহণ ও বিতরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। তবে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং পেট্রোবাংলার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমান বৈশ্বিক বাজারদর এবং সরবরাহ
ব্যবস্থার সক্ষমতার কথা বিবেচনা করলে নতুন দুটি টার্মিনাল চালু হলে বাৎসরিক এলএনজি আমদানি ব্যয় সহজে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করবে। অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের বর্তমান উচ্চমূল্য যদি অব্যাহত থাকে, তবে এই ক্রয়ে ব্যয়ের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে। বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে দুটি এফএসআরইউ কার্যকর রয়েছে, যা দিয়ে দিনে প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। সমপরিমাণ ক্ষমতাসম্পন্ন আরও দুটি টার্মিনাল যুক্ত করা গেলে দৈনিক মোট এলএনজি প্রক্রিয়া করার ক্ষমতা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে গিয়ে পৌঁছাবে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার এই প্রসারণ ঘটলে একই অনুপাতে বৈদেশিক মুদ্রার আমদানিব্যয় ও
বাজেটের ওপর ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মন্তব্য করেন, অবকাঠামোগত ঘাটতির দরুন রাষ্ট্র চাইলেও এখনই অধিক পরিমাণে এলএনজি জাহাজে করে এনে সরবরাহ করতে পারবে না। আমাদের বর্তমান দুটি এফএসআরইউ দিয়ে দিনে বড়জোর ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনা সম্ভব। পূর্বে অপর দুটি এফএসআরইউ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ছিল, তা বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলন কমে আসবে এবং বিদেশ থেকে এলএনজি এনেই ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে হবে—এই বাস্তবমুখী চিন্তা থেকেই দুটি এফএসআরইউ গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর বিকল্প সমাধান কী
হতে পারে, তা সরকারের মাথায় রাখা উচিত ছিল। তিনি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণের জন্য অনতিব্লিমে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন, যাতে দ্রুত নতুন গ্যাসের সন্ধান মেলে। পাশাপাশি তিনি সৌর ও বায়ুনির্ভর নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বৃদ্ধির পরামর্শ দেন। পেট্রোবাংলার অফিসিয়াল হিসাব অনুযায়ী, বিগত আটটি অর্থবছরে কেবল এলএনজি আমদানির মাধ্যমে দেশের সার্বিক গ্যাসের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রকে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকার বিশালাকৃতির তহবিল জোগাতে হয়েছে। আর এই বিরাট অঙ্কের অর্থসংস্থান করতে গিয়ে একদিকে সাধারণ জনগণের ওপর গ্যাসের দরবৃদ্ধির বোঝা চাপানো হয়েছে, অন্যদিকে মোটা অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি, বৈশ্বিক ঋণ সংস্থা থেকে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ এবং স্থানীয় ‘গ্যাস
উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ)’-এর গচ্ছিত অর্থ খালি করে পেট্রোবাংলাকে কাজ চালাতে হয়েছে। এত বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক ত্যাগের পরও সম্প্রতি মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে অপ্রত্যাশিত অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, কারিগরি বিকলতা এবং সাগর উত্তাল থাকার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে চরম গ্যাসের হাহাকার তৈরি হয়। এই আকস্মিক সংকটের সরাসরি নেতিবাচক মাশুল দিতে হয়েছে দেশের বিদ্যুত উৎপাদন খাত, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থা, সিএনজি স্টেশনসমূহ এবং সাধারণ গৃহস্থালি রান্নার গ্যাস ব্যবহারকারীদের। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এলএনজি খাতে সরকারি ভর্তুকি বাবদ মোট সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শুরু হওয়ার মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানেই পেট্রোবাংলা বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়িয়ে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে তুলে নিয়েছে। এই অপ্রতুল অর্থনৈতিক
পরিস্থিতিতে বিপুল এলএনজি ক্রয় এবং এর ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির ভার বহন করা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘এলএনজি জেকেএম’ (জাপান-কোরিয়া মার্কেট)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, বৈশ্বিক খোলা বাজারে বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি বিক্রি হচ্ছে ২২ ডলার ৯৪ সেন্টের কিছু বেশি মূল্যে। গত বছরের এই একই সময়ের আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তুলনা করলে এই দাম বৃদ্ধির হার প্রায় ৯৮.৬১ শতাংশ। অথচ চলতি বছরের শুরুতেও অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলার ৭১ সেন্ট, যা লাফিয়ে বেড়ে এখন ২২ ডলার ৯৪ সেন্টে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে ১১৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির কারণেই মূলত দেশের এলএনজি আমদানিব্যয় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পেট্রোবাংলার প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১১৩টি এলএনজি কার্গো জাহাজ খালাস করেছে, যা কিনতে মোট ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আর এই ক্রয়ের ওপর সরকারকে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে গুনতে হয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, গত অর্থবছরের আমদানিকৃত এলএনজির পরিমাণ ও তার মাশুলকে ভিত্তি হিসেবে হিসাব করলে, নতুন দুটি প্রক্রিয়াকরণ টার্মিনাল তৈরি হওয়ার পর জাতীয় এলএনজি আমদানিব্যয় অভূতপূর্ব মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। অবশ্য জাহাজ বা কার্গোর সার্বিক সংখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজারের তৎকালীন দাম এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীন সরবরাহের হারের ওপরই চূড়ান্ত ব্যয়ের অংকটি নির্ভর করবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব এই প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের দেশে বিদ্যমান গ্যাসের দৈনন্দিন চাহিদা এবং বাস্তব সরবরাহের ব্যবধান দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস কূপ অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিদেশ থেকে এলএনজি আনার পরিকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও চলমান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, যার মধ্যে ৩০টি কূপে খনন ও সংস্কার কাজ (ওয়ার্কওভার) সফলভাবে শেষ হয়েছে। আরও নতুন কূপ খনন করে দেশীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হলে এলএনজি আমদানির ওপর অত্যধিক চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। সারাদেশে তীব্র গ্যাসসংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় ভয়াবহ লোডশেডিং চেপে বসেছে। এর প্রত্যক্ষ ক্ষতিকর প্রভাব গিয়ে পড়ছে কলকারখানার সার্বিক উৎপাদনে, যার ফলে দেশের পুরো গ্যাসনির্ভর শিল্প খাত এখন চরম হুমকির মুখোমুখি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নিজ শিল্পের দুরাবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমাদের পার্টিকেল বোর্ড কারখানাটি চিরতরে বন্ধ করে দেব। কারণ আগামী দুই বছরের মধ্যেও দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না—এমন প্রশাসনিক সংকেত পাওয়ার পরেই আমরা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের মোট পাঁচটি সুতা তৈরির স্পিনিং মিল ছিল, যার প্রতিটাই এখন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। আমাদের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আমরা এখন গুটিয়ে আনব। এতে অন্তত যেসব শ্রমিক-কর্মচারী বর্তমানে বেকার বসে আছে, তাদের পেছনে অযথা বেতন দিতে হবে না এবং ব্যাংকের নিকট ঋণের দায়ও বৃদ্ধি পাবে না। এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, দেশের বর্তমান মোট অর্থনীতির আকার প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অর্থনৈতিক ভিত্তিকে কেবল টিকিয়ে রাখলেই চলবে না, এর ধারাবাহিক বৃদ্ধিও নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমশ নিম্নমুখী। সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, জনগণের চলমান জ্বালানিসংকটের প্রতি সরকার সমব্যথী। তবে জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। গ্যাসের কার্গো সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে তা দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। জ্বালানি খাতে ভালো অবস্থায় যেতে সরকারের প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার দরুন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যদি এলএনজির চড়া দাম অপরিবর্তিত থাকে, তবে এই আমদানিবাবদ ব্যয়ের অঙ্ক আরও আশঙ্কাজনকভাবে লাফিয়ে বাড়তে পারে বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সতর্ক করছেন। উদ্ভূত তীব্র গ্যাসসংকট প্রশমনকল্পে সরকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জলভাগে অতিরিক্ত কয়েকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যেই একটি নতুন রূপান্তর কেন্দ্র বা টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন লাভ করেছে। পরিকল্পনাধীন এসব অবকাঠামোর মাঝে অন্তত দুটি টার্মিনাল যদি বাস্তবে আলোর মুখ দেখে, তবেই কেবল দেশে এলএনজি গ্রহণ ও বিতরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। তবে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং পেট্রোবাংলার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমান বৈশ্বিক বাজারদর এবং সরবরাহ
ব্যবস্থার সক্ষমতার কথা বিবেচনা করলে নতুন দুটি টার্মিনাল চালু হলে বাৎসরিক এলএনজি আমদানি ব্যয় সহজে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করবে। অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের বর্তমান উচ্চমূল্য যদি অব্যাহত থাকে, তবে এই ক্রয়ে ব্যয়ের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে। বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে দুটি এফএসআরইউ কার্যকর রয়েছে, যা দিয়ে দিনে প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। সমপরিমাণ ক্ষমতাসম্পন্ন আরও দুটি টার্মিনাল যুক্ত করা গেলে দৈনিক মোট এলএনজি প্রক্রিয়া করার ক্ষমতা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে গিয়ে পৌঁছাবে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার এই প্রসারণ ঘটলে একই অনুপাতে বৈদেশিক মুদ্রার আমদানিব্যয় ও
বাজেটের ওপর ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মন্তব্য করেন, অবকাঠামোগত ঘাটতির দরুন রাষ্ট্র চাইলেও এখনই অধিক পরিমাণে এলএনজি জাহাজে করে এনে সরবরাহ করতে পারবে না। আমাদের বর্তমান দুটি এফএসআরইউ দিয়ে দিনে বড়জোর ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনা সম্ভব। পূর্বে অপর দুটি এফএসআরইউ নির্মাণের যে পরিকল্পনা ছিল, তা বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলন কমে আসবে এবং বিদেশ থেকে এলএনজি এনেই ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে হবে—এই বাস্তবমুখী চিন্তা থেকেই দুটি এফএসআরইউ গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর বিকল্প সমাধান কী
হতে পারে, তা সরকারের মাথায় রাখা উচিত ছিল। তিনি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে খরচ নিয়ন্ত্রণের জন্য অনতিব্লিমে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন, যাতে দ্রুত নতুন গ্যাসের সন্ধান মেলে। পাশাপাশি তিনি সৌর ও বায়ুনির্ভর নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বৃদ্ধির পরামর্শ দেন। পেট্রোবাংলার অফিসিয়াল হিসাব অনুযায়ী, বিগত আটটি অর্থবছরে কেবল এলএনজি আমদানির মাধ্যমে দেশের সার্বিক গ্যাসের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রকে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকার বিশালাকৃতির তহবিল জোগাতে হয়েছে। আর এই বিরাট অঙ্কের অর্থসংস্থান করতে গিয়ে একদিকে সাধারণ জনগণের ওপর গ্যাসের দরবৃদ্ধির বোঝা চাপানো হয়েছে, অন্যদিকে মোটা অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি, বৈশ্বিক ঋণ সংস্থা থেকে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ এবং স্থানীয় ‘গ্যাস
উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ)’-এর গচ্ছিত অর্থ খালি করে পেট্রোবাংলাকে কাজ চালাতে হয়েছে। এত বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক ত্যাগের পরও সম্প্রতি মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে অপ্রত্যাশিত অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, কারিগরি বিকলতা এবং সাগর উত্তাল থাকার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে চরম গ্যাসের হাহাকার তৈরি হয়। এই আকস্মিক সংকটের সরাসরি নেতিবাচক মাশুল দিতে হয়েছে দেশের বিদ্যুত উৎপাদন খাত, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থা, সিএনজি স্টেশনসমূহ এবং সাধারণ গৃহস্থালি রান্নার গ্যাস ব্যবহারকারীদের। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এলএনজি খাতে সরকারি ভর্তুকি বাবদ মোট সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শুরু হওয়ার মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানেই পেট্রোবাংলা বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়িয়ে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে তুলে নিয়েছে। এই অপ্রতুল অর্থনৈতিক
পরিস্থিতিতে বিপুল এলএনজি ক্রয় এবং এর ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির ভার বহন করা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘এলএনজি জেকেএম’ (জাপান-কোরিয়া মার্কেট)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, বৈশ্বিক খোলা বাজারে বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি বিক্রি হচ্ছে ২২ ডলার ৯৪ সেন্টের কিছু বেশি মূল্যে। গত বছরের এই একই সময়ের আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তুলনা করলে এই দাম বৃদ্ধির হার প্রায় ৯৮.৬১ শতাংশ। অথচ চলতি বছরের শুরুতেও অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলার ৭১ সেন্ট, যা লাফিয়ে বেড়ে এখন ২২ ডলার ৯৪ সেন্টে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে ১১৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির কারণেই মূলত দেশের এলএনজি আমদানিব্যয় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পেট্রোবাংলার প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১১৩টি এলএনজি কার্গো জাহাজ খালাস করেছে, যা কিনতে মোট ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আর এই ক্রয়ের ওপর সরকারকে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে গুনতে হয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, গত অর্থবছরের আমদানিকৃত এলএনজির পরিমাণ ও তার মাশুলকে ভিত্তি হিসেবে হিসাব করলে, নতুন দুটি প্রক্রিয়াকরণ টার্মিনাল তৈরি হওয়ার পর জাতীয় এলএনজি আমদানিব্যয় অভূতপূর্ব মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। অবশ্য জাহাজ বা কার্গোর সার্বিক সংখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজারের তৎকালীন দাম এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীন সরবরাহের হারের ওপরই চূড়ান্ত ব্যয়ের অংকটি নির্ভর করবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব এই প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের দেশে বিদ্যমান গ্যাসের দৈনন্দিন চাহিদা এবং বাস্তব সরবরাহের ব্যবধান দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস কূপ অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিদেশ থেকে এলএনজি আনার পরিকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও চলমান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, যার মধ্যে ৩০টি কূপে খনন ও সংস্কার কাজ (ওয়ার্কওভার) সফলভাবে শেষ হয়েছে। আরও নতুন কূপ খনন করে দেশীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হলে এলএনজি আমদানির ওপর অত্যধিক চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। সারাদেশে তীব্র গ্যাসসংকটের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় ভয়াবহ লোডশেডিং চেপে বসেছে। এর প্রত্যক্ষ ক্ষতিকর প্রভাব গিয়ে পড়ছে কলকারখানার সার্বিক উৎপাদনে, যার ফলে দেশের পুরো গ্যাসনির্ভর শিল্প খাত এখন চরম হুমকির মুখোমুখি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নিজ শিল্পের দুরাবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমাদের পার্টিকেল বোর্ড কারখানাটি চিরতরে বন্ধ করে দেব। কারণ আগামী দুই বছরের মধ্যেও দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না—এমন প্রশাসনিক সংকেত পাওয়ার পরেই আমরা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের মোট পাঁচটি সুতা তৈরির স্পিনিং মিল ছিল, যার প্রতিটাই এখন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। আমাদের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আমরা এখন গুটিয়ে আনব। এতে অন্তত যেসব শ্রমিক-কর্মচারী বর্তমানে বেকার বসে আছে, তাদের পেছনে অযথা বেতন দিতে হবে না এবং ব্যাংকের নিকট ঋণের দায়ও বৃদ্ধি পাবে না। এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, দেশের বর্তমান মোট অর্থনীতির আকার প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অর্থনৈতিক ভিত্তিকে কেবল টিকিয়ে রাখলেই চলবে না, এর ধারাবাহিক বৃদ্ধিও নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমশ নিম্নমুখী। সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, জনগণের চলমান জ্বালানিসংকটের প্রতি সরকার সমব্যথী। তবে জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। গ্যাসের কার্গো সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে, তবে তা দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। জ্বালানি খাতে ভালো অবস্থায় যেতে সরকারের প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।



