বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছেলের শহীদি মর্যাদা চান বাবা – ইউ এস বাংলা নিউজ




ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ২৮ September, ২০২৪

আরও খবর

শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মীদের সমাবেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা আটক

২০২৩ সালে কৌশলগত অংশীদারত্ব ও অঙ্গীকার, ২০২৬ সালে বিনিয়োগে আগ্রহ ও সহযোগিতাঃ জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা

অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী: বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, আদর্শিক দৃঢ়তা আর কৃষিতে যাঁর অনন্য অবদান

ইরানে ফের মার্কিন হামলার শঙ্কায় বেড়েছে তেলের দাম

ট্রাম্প কোণঠাসা করলেও নতি স্বীকারের লক্ষণ নেই ইরানের

নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের সভাপতি কাজী আজিজুল হক খোকন ৩ দিন ধরে নিখোঁজ

সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াণে ছাত্রলীগের গভীর শোক ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছেলের শহীদি মর্যাদা চান বাবা

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ২৮ September, ২০২৪ |
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত রোকনের শহীদি মর্যাদা দাবি করেছেন তার বাবা মনির হোসেন (৫১)। তিনি বলেন, ‘কথায় নয়, কাজে সেটি প্রমাণ করতে হবে। যে সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে ছেলে মারা গেছে, ছেলের নামে সেই সড়কের নামকরণ করা হোক। যাতে করে সারাজীবন মানুষ আমার ছেলেকে স্মরণ রাখতে পারে। সরকারের কেউ খবর নেয়নি। সহযোগিতা হিসেবে একটি পয়সাও পাইনি। গুলিতে ছেলের মৃত্যুর পর থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। মামলা দায়ের করতে হয়েছে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে।’ অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষ পর্যন্ত রোকনের বাসার সন্ধান মিলে। রোকন পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানাধীন পশ্চিম কাঁটাসুরের নামা বাজার এলাকার বছিলা সড়কের ২৫৫ নম্বর হেদায়েত উল্লাহ ওরফে হেদু

চৌধুরীর বাড়িতে থাকতেন। দোতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলার একটি টিনশেড ছাউনি দেওয়া ১৩ ফুট দৈর্ঘ্য আর ৯ ফুট প্রস্থের এক রুমের বাসায় ভাড়ায় থাকতেন। বাড়িটির একাধিক লোকের সঙ্গে কথা বলার পর যোগাযোগ করা সম্ভব হয় রোকনের বাবা মনির হোসেনের সঙ্গে। তার বাসায় বসেই কথা হয় পারিবারিক ও রোকনের বিষয়ে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ি ভোলা সদরের নাসির মাঝি গ্রামে। নদীতে বাড়ি ঘর ভেঙে যায়। জীবিকার তাগিদে নানা আজিজ ড্রাইভার তার মেয়ে অর্থাৎ আমার মা মনোয়ারা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় আসেন। সেটি বহু বছর আগের কথা। আমার মায়ের বয়স তখন আড়াই বছর ছিল বলে মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি। আমার পিতা মোতাহার মিয়া। বাবা-মা

কেউ বেঁচে নেই। আমাদের জন্ম মোহাম্মদপুরের বছিলাতেই। বিয়ে করি রাবেয়া বেগমকে (৪৫)। আমাদের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। সবার বড় ছেলে শাহরিয়ার হোসেন রোকন। দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে নয়ন তারা মীম (২০)। বছরখানেক আগে তাকে বিয়ে দিয়েছি মোহাম্মদপুরেই। অভিষেক নামের এক ছেলের সঙ্গে। জামাই একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারিম্যানের চাকরি করে। তৃতীয় সন্তান তামজীদুল ইসলাম (১৮) মোটর গাড়ির গ্যারেজে মেকানিকের কাজ করে। সবার ছোট মেয়ে সানজিদা বেগম (১০)। মোহাম্মদপুরের বরাবর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আমি ডে লেবার বা দিনমজুরের কাজ করি। আমার স্ত্রী গৃহিণী।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একটি রুমেই আমরা সবাই মিলে থাকতাম। প্রায় ৫ বছর ধরে থাকছি। দুই

ছেলে ফ্লোরে ঘুমাত। আমি স্ত্রী আর ছোট মেয়েকে নিয়ে খাটটিতে ঘুমাতাম। রুমটির আয়তন দৈর্ঘ্যে ১৩ ফুট আর পাশে ৯ ফুট। আসবাবপত্রের মধ্যে একটি স্টিলের ভাঙাচোরা আলমারি, একটি প্লাইউডের পুরনো ওয়্যারড্রপ, রংচটা স্টিলের ড্রয়ার, দেয়ালে ঝুলানো একটি ছোট টেলিভিশন আর একটি বহু পুরাতন ফ্রিজ দেখা গেল। মাসিক সাড়ে ৯ হাজার টাকা ভাড়া। নিজের আর দুই ছেলের রোজগারে কোনোমতে সংসার চলছিল। বড় ছেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ হওয়ার পর সংসারে ব্যাপক টানাপোড়েন চলছে।’ স্বাভাবিক কথাবার্তার একপর্যায়ে আসে রোকনের প্রসঙ্গ। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘টাকার অভাবে রোকনকে লেখাপড়া করাতে পারিনি। তাই ছেলে সংসারের হাল ধরতে নিজেই কাজ শুরু করেন। ঢাকার চকবাজার থেকে

বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র কিনে আনত। তাই ফেরি করে বাসে বাসে বিক্রি করত।’ তিনি বলতে থাকেন, ‘ঘটনার দিনটি ছিল চলতি বছরের ১৯ জুলাই শুক্রবার। রোকন অন্যান্য দিনের মতোই ফেরি করে চকোলেট, চিপসসহ নানা ধরনের জিনিসপত্র বিক্রি করছিল। বেলা ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে আল্লাহ করিম মসজিদের আশপাশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। রোকনের পরিচিত কিছু বন্ধুবান্ধব ছিল। তারা শ্রমিক দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ওইদিন অনেক সাধারণ মানুষও অংশ নিয়েছিল। বন্ধু-বান্ধবের দেখাদেখি রোকনও মিছিলে যায়। রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে ছাত্র-জনতা।’ মনির হোসেন বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের হটাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে থাকে। রোকনের বুকে ও পিঠে শত ছোট ছোট

স্টিলের বুলেট বিদ্ধ হয়। পুরো শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ছেলে জীবন বাঁচাতে আল্লাহ করিম মসজিদ থেকে পশ্চিম দিকের ঢাকা রিয়েল এস্টেট গলিতে ঢুকে। একপর্যায়ে দৌড়াতে গিয়ে গলির মুখের ঢালের পশ্চিম দিকের ময়ূর ভিলা নামের বহুতল বাড়িটির সামনের রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। তখন শরীর থেকে স্রোতের মতো রক্ত বইছিল। রাস্তায় পড়ে ছটফট করতে থাকে। এ সময় অনেকেই তার মুখে পানি দেন। একপর্যায়ে বাবা আমার নিস্তেজ হয়ে যায়।’ মোবাইল ফোনে সেই ভিডিও দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতা দ্রুত তাকে শেরেবাংলানগর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে আমরা হাসপাতালে ছুটে যাই। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসকরা তার মুখে অক্সিজেনের মাস্ক পরায়। ২

থেকে ৩ মিনিট পরেই চিকিৎসকরা তার ছেলের মৃত্যুর সংবাদ জানান।’ তিনি বলেন, ‘‘হাসপাতালে থাকা অপরিচিত লোকজনসহ চিকিৎসক ও নার্সরা দ্রুত লাশ নিয়ে যেতে বলেন। অনেকেই তাড়াতাড়ি লাশ নিয়ে যেতে চাপ দিতে থাকেন। কোনো প্রকার পোস্টমর্টেম ছাড়াই লাশ দেয়। সঙ্গে একটি মৃত্যু সনদও দেয়। ছেলের লাশ কাপড় দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে বলেন সেখানে থাকা লোকজন। আমাদের কাছে কাপড় ছিল না। এ সময় একজন নার্স হাসপাতালের শয্যায় বিছানোর বাতিল হওয়া একটি পুরনো নোংরা চাদর দেন। সেই চাদর দিয়ে ছেলের লাশ ঢেকে একটি লাশবাহী ফ্রিজিং ভ্যানে তুলি। এ সময় সেখানকার লোকজন আমাদের বলেন, রাস্তায় কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবেন, ‘এমনিতেই মারা গেছে’। লাশ আনি মোহাম্মদপুরের বাসার পাশেই জান্নাতুল ফেরদাউস জামে মসজিদের সামনে। সেখানেই নামাজে জানাজা হয়। জানাজায় শত শত মানুষ হয়। এরপর লাশ দাফন করি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন রায়ের বাজার কবরস্থানে।’’ সরকারের কেউ খোঁজখবর নিয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, লাশ কবর দেওয়ার জন্য খরচ হওয়া ৫০০ টাকাও কেউ দেয়নি। সহযোগিতা হিসেবে একটি পয়সাও পাইনি। আমাদের খবর নিতে কেউ আসেনি। শুধু শ্রমিক দলের নেতা পরিচয়ে একজন ফোন করে ছেলে সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। শুধু তাই নয়, ছেলে গুলিতে মারা যাওয়ার পর মোহাম্মদপুর থানায় গিয়েছিলাম মামলা করতে। পুলিশ মামলা নেয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে উকিলের মাধ্যমে ঢাকার সিএমএম আদালতে গিয়ে ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করতে হয়েছে। এ সময় তিনি খাট থেকে নেমে স্টিলের আলমারির একটি ড্রয়ার খুলেন। সেখান থেকে রক্তমাখা একটি গেঞ্জি বের করেন। নিজের বুকের সামনে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘দেখুন আমার ছেলেকে। এই গেঞ্জি গায়ে ছিল গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময়। গেঞ্জিটি গুলিতে শত শত ছিদ্র হয়ে আছে। দেখুন কত গুলি লেগেছে। গুলিতে পুরো গেঞ্জি চালুনির মতো ছিদ্র হয়ে আছে। জার্সির সঙ্গে যে চাদর দিয়ে লাশ ঢেকে এনেছি সেই চাদরও ছেলের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছি।’ দেখা গেছে, চাদরের গায়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম লেখা। চাদরটিতে রক্তের দাগ লেগে তা শুকিয়ে আছে। জার্সি আর চাদর বুকে জড়িয়ে পিতা-মাতা আর রোকনের ছোট বোন অঝোরে কাঁদছিলেন। শহীদ রোকনের পিতা বলেন, ‘আমি ছেলেকে কথায় নয়, সত্যিকারের শহীদের মর্যাদা চাই। কথায় নয়, কাজে সেটি প্রমাণ করতে হবে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর যে সড়কে পড়ে ছেলে মারা গেছে, ছেলের নামে সেই সড়কের নামকরণ করা হোক। যাতে করে সারাজীবন মানুষ আমার ছেলেকে স্মরণ রাখতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
শ্রীলঙ্কার কোচের হুমকি, ফারহানের জার্সি নিলে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে ফের সড়ক অবরোধ শেকৃবি শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করবে সংসদীয় ককাস যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ইরান যুদ্ধ: জেডি ভ্যান্স কুমিল্লা ইলিশবাহী পিকআপে ডাকাতির পর ১৯ আসামি গ্রেপ্তার সাংবাদিক রাজীব ঘোষকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া নিয়ে ডিআরইউ ও ক্র্যাবের উদ্বেগ ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ থেকে ডিজিই-পে বিচ্ছিন্ন করল বাংলাদেশ ব্যাংক তরঙ্গ নবায়ন ব্যয় যৌক্তিক করার আহ্বান মোবাইল অপারেটরদের এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রকল্পে ৯০ হাজার উদ্যোক্তাকে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা তদন্তের দাবি, ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর Newsmax-এ বিশেষ কলাম বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হতে চায় বাংলাদেশ: তিতুমীর শ্রমিক আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানে সরকারঃ পুলিশ ও দলীয়কর্মী ছাড়াও ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনী মোতায়েন এবার কুয়েতে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড এইচআরডব্লিউ: শেখ হাসিনাকে সমর্থন করায় শিক্ষকদের টার্গেট করা হচ্ছে, বাকস্বাধীনতা নেই দেশে জাতীয়ভাবে উপেক্ষিত জেলহত্যা দিবস, সিলেটে নিষেধাজ্ঞা, মব-গ্রেফতার হুমকির মাথায় নিয়েই আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের স্মরণ জুলাইর ওয়াসিম হত্যা-মামলার আসামিকে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব দেওয়া কি পুরস্কার? প্রশ্ন- কারা মেরেছে তবে ওয়াসিমকে? সাফ সভাপতি আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ, তাই সাফ আয়োজনে প্রচারণা নেই বাফুফের বাপে মারছে সৈনিক, মায়ে মারছে কৃষক, পোলায় মারছে শ্রমিক’—এমন স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গতকাল মঙ্গলবারও এসব এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। আজ বুধবার সকালেও গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে নতুন করে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলগুলোয় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গাজীপুরে হামলায় গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেন। সোমবার গাজীপুরের জয়দেবপুরের বাহাদুরপুর এলাকায় নোমান টেরি টাওয়েল মিলসের সামনে সংঘর্ষের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার সময় হামলার শিকার হন তিনি। পরে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি গাজীপুরের লায়লা স্টাইল লিমিটেডের শ্রমিক ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় গতকাল ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে প্রচলিত ন্যূনতম মজুরিতে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংকটে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এ অবস্থায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, শ্রমিকদের ওপর হামলা এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় চাকরিচ্যুতির অভিযোগেরও প্রতিকার চাইছেন শ্রমিকরা। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার সাইনবোর্ড, বাংলাবাজার ও মির্জাপুর এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। পরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। জয়দেবপুর, সালনা, রাজেন্দ্রপুর ও শফিপুর এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাংলাবাজার ও কাশিমপুর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। গাজীপুরের বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকাতেও সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। তাঁদের সরিয়ে দিতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর পর বাংলাবাজার এলাকার কয়েকটি কারখানায় বুধবারও ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে কতটি কারখানা বন্ধ ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সাভারের হেমায়েতপুরেও আজ সকালে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার হেমায়েতপুর এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। দুপুর থেকে বিকাল ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত চলা অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরে শ্রমিকরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করলে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়ও আজ বুধবার নতুন করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পাশে কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হন কয়েকটি কারখানার শ্রমিক। তাঁরা মূল সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এ সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাঁদের ওপর হামলা চালান। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসে স্থানীয় একটি হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাজধানীর মিরপুরেও গতকাল মঙ্গলবার শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষে চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে কালশী সড়কে এক পুলিশ সদস্যকে মারধরের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে মেট্রোরেল চলাচলেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০ স্টেশনে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়। আজ বুধবার মিরপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের দাবি, বুধবার শ্রমিকদের সড়কে নামার সুযোগ হয়নি এবং অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দৈনিক বাংলার প্রকাশিত বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ৩০৬টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এতে ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৩ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়। এর আগে ১ নভেম্বর ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং কর্মস্থল ছেড়েছিলেন ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক। অর্থাৎ আন্দোলনের প্রভাবে একাধিক শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আজ বুধবার সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে মোট ২৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া ও বাইপাইল এলাকায় পাঁচ প্লাটুন, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছয় প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে। এর পাশাপাশি পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও শিল্পাঞ্চলে টহল দিচ্ছেন। এদিকে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ছয় সদস্যের এ বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ বুধবার। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ আজাদ সোবহানি। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন এ বি এম সামসুদ্দিন ও আসিব আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাবুল আক্তার ও আনোয়ার হোসেন। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি বোর্ড দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি; বরং রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের ক্ষোভ, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার চাপ—সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক খাতের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিএনপির সন্ত্রাসীদের নিপীড়নের ভিডিও করায় তৌফিককে হত্যা করা হয়, জানান সহকর্মীরা ডিবি হেফাজতে ইকবাল সোবহান চৌধুরীঃ ২৭ মাস সমঝোতা করেও শেষ রক্ষা হলোনা শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টার