ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
জ্বালানি নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অংশ, ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিহিংসামূলক নীতি তা নষ্ট করছে: আজিজ খান
রোহিঙ্গা প্রকল্পের অর্থে প্রতিমন্ত্রীর পিএস-এপিএসদের ফ্রান্স-ইতালি-তুরস্ক সফর
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ থেকে এখন বিশ্বের তীব্র খাদ্য সংকটের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ
টিটিপির নিশানায় বাংলাদেশ: সারাদেশে ‘রেড অ্যালার্ট
বহুমুখী সংকটে শিল্পখাত, টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে সিমেন্টসহ উৎপাদন খাত
মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকার ছবি তুলে বিশ্ব বিবেক নাড়িয়ে দেওয়া আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই
রোহিঙ্গা প্রকল্পের অর্থে প্রতিমন্ত্রীর পিএস-এপিএসদের ফ্রান্স-ইতালি-তুরস্ক সফর
দুর্নীতির আখড়া ডিএনসিসি: বাজারদরের ৬ গুণ বেশি দামে পণ্য ক্রয়, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দিতে বারবার দরপত্র বাতিল, শর্ত বদল
একই দিনে দুই দরপত্র, এক প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান—ডিএনসিসির প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ে ভয়াবহ অনিয়ম: পুলিশের চেয়ে ৬ গুণ বেশি দামে কিনল ডিএনসিসি
একই ভাষায় তিন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন দরপত্র! তিনবার দরপত্র বাতিল, শর্ত বদল, অতিমূল্যায়ন, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান
বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে ক্রয়কৃত পণ্যের আন্তর্জাতিক মান বাদ?
দরপত্রের শর্ত ভেঙে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)-এর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সংস্থাটির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে সড়কবাতির খুঁটি স্থাপন থেকে শুরু করে ওয়াকিটকি ক্রয়সহ একাধিক প্রকল্পে বিশেষ
সুবিধাপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে, যার মোট আর্থিক পরিমাণ ৪৩ কোটি টাকার বেশি। প্রথম দরপত্র: শর্ত ভেঙেও যোগ্য ঘোষণা, বিপিপিএর নির্দেশনা উপেক্ষা গত ২৫শে আগস্ট মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়কবাতির খুঁটি সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। শর্ত অনুযায়ী অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের থাকতে হতো— কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা, গত ১০ বছরে অন্তত ১০ কোটি ৮ লাখ টাকার একটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক ডেকোরেটিভ পোল ও স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট সরবরাহের সক্ষমতা। এই দরপত্রে প্রোটোস্টার লিমিটেড রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের একটি অভিজ্ঞতা সনদ জমা দেয়। সেখানে ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কাজের উল্লেখ থাকলেও কাজটির নির্ধারিত সমাপ্তির
সময় ছিল ৩০ জুন ২০২৬—অর্থাৎ কাজটি তখনও চলমান ছিল। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী “সফলভাবে সম্পন্ন” কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি অংশ নেয়। এই অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ১১৮(৪) অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। দরপত্রের নির্দেশনার ১৫.১(বি) ধারা অনুযায়ী সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু প্রোটোস্টার লিমিটেড তা পূরণ করতে না পেরে ডিএনসিসির একটি সাধারণ সড়কবাতি প্রকল্পের ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার অভিজ্ঞতা সনদ দাখিল করে, যা সমজাতীয় কাজ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা নয়। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের যোগসাজশে মূল্যায়ন কমিটি এই সনদ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করে—যা সরাসরি ক্রয়বিধির লঙ্ঘন। এই দরপত্রে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ
নেয়: প্রোটোস্টার লিমিটেড, এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও সালেক পাওয়ার লিমিটেড। মূল্যায়ন শেষে প্রোটোস্টার লিমিটেড ও এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনালকে কারিগরিভাবে যোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে গত ১৯শে নভেম্বর প্রোটোস্টার লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ৪ঠা ডিসেম্বর ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন আকরাম খান, যিনি জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক। একই দিনে দ্বিতীয় দরপত্র: একক অংশগ্রহণকারী, একই অনিয়ম একই দিনে ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের অঞ্চল-৫-এর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া আরেকটি দরপত্র আহ্বান করেন। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল: ডেকোরেটিভ স্ট্রিট লাইট পোল, স্মার্ট এলইডি লাইট ও সিএলএমএস, ক্যাবল ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ। এই দরপত্রে কেবল প্রোটোস্টার লিমিটেড
অংশগ্রহণ করে। এই দরপত্রে শর্ত ছিল— কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা, গত ১০ বছরে ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকার একটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট উৎপাদন সক্ষমতা। প্রোটোস্টার লিমিটেড এখানে আবারও অসম্পূর্ণ কাজের অভিজ্ঞতা সনদ এবং পরবর্তীতে ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার একটি সাধারণ কাজের সনদ দাখিল করে, যা নির্ধারিত শর্তের চেয়ে ৭০ লাখ টাকা কম। তবুও দরপত্র যাচাই কমিটি প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করে এবং গত ১৯শে নভেম্বর কার্যাদেশ দেয়। পরে ৪ ডিসেম্বর ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুটি দরপত্র মিলিয়ে প্রোটোস্টার লিমিটেডকে দেওয়া কাজের পরিমাণ দাঁড়ায়— প্রথম প্রকল্পে ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় প্রকল্পে ২১ কোটি ১৯
লাখ টাকা। মোট ৩৫ কোটির বেশি (এবং অন্যান্য প্রকল্পসহ অভিযোগ অনুযায়ী ৪৩ কোটিরও বেশি)। বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে ক্রয় : দরপত্রে যোগসাজশ সড়কবাতির কাজের দরপত্রে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যেই এবার অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে ওয়াকিটকি ক্রয়ের মাধ্যমে নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)-এর বিরুদ্ধে। নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে এবং যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি মোট ৩৮০টি ওয়াকিটকি ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কিনেছে প্রায় ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। এর মধ্যে— Hytera PDC680 মডেলের ১০০টি ওয়াকিটকি: প্রতিটির দাম ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা Hytera HP788 UV মডেলের ২৮০টি ওয়াকিটকি: প্রতিটির দাম
১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা অথচ তুলনামূলকভাবে— ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পুলিশ একই ধরনের ২,৪০০টি ওয়াকিটকি কিনেছে প্রতিটি ৪৭,৫২০ টাকায় এবং ২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৪০০টি ওয়াকিটকি কিনেছিল প্রতিটি ৫১,৯৩৫ টাকায়। অর্থাৎ ডিএনসিসি একই ধরনের যন্ত্রপাতি বাজার দরের চেয়ে মডেল ভেদে অন্তত ৩ থেকে ৬ গুণ বেশি দামে কিনেছে। বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য গঠিত কমিটি তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দর সংগ্রহ করে: রুশদিয়া এন্টারপ্রাইজ, এসএম কর্পোরেশন ও মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড তবে অভিযোগ রয়েছে, রুশদিয়া ও এসএম কর্পোরেশনের টেলিকম সরঞ্জাম সরবরাহে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাদের ট্রেড লাইসেন্সেও সংশ্লিষ্ট খাতের উল্লেখ নেই। অথচ অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান সিস্টেম কমিউনিকেশন লিমিটেডকে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া দরপত্রের ভাষা, শর্ত ও বিন্যাস প্রায় অভিন্ন ছিল, যা সম্ভাব্য যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। এই তিনটির মধ্যে— স্টেট আইটি সর্বনিম্ন দর দেয়। রুশদিয়া দ্বিতীয় এবং এসএম কর্পোরেশন সর্বোচ্চ দর দেয়। তবে বিস্ময়করভাবে, স্টেট আইটির প্রস্তাবিত দরই পরবর্তীতে দাপ্তরিক মূল্য হিসেবে নির্ধারিত হয়—অর্থাৎ লাভ, ভ্যাট ও ট্যাক্স যোগ করার আগেই ঠিক সেই পরিমাণ দরপত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল। যা ইঙ্গিত করে যে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া আগেই ঠিক করা হয়েছিল। ডিএনসিসির একাধিক প্রকৌশলী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, “ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারদর বেশি দেখিয়ে দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ঠিকাদারকে বেশি দামে কাজ দেওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্টরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।” দরদাতাদের যোগ্যতার শর্ত লঙ্ঘন ২০২৪ সালের অক্টোবরে আহ্বান করা দরপত্রে শর্ত ছিল— গত ৩ বছরে অন্তত ৪ কোটি টাকার সমজাতীয় কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতা। অথচ কাজ পায় মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড, যারা এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটি দুটি অভিজ্ঞতা সনদ জমা দেয়— যার মধ্যে ছিল ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের একটি যৌথ প্রকল্প—যেখানে স্টেট আইটি প্রধান অংশীদার ছিল না (এটি বাতিল হয়) এবং পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশন-এর একটি সনদ, যার চুক্তিমূল্য প্রায় ১০.৫৬ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৩ কোটি টাকা)। কিন্তু এই সনদটি মূলত হাইতেরা কমিউনিকেশনস কর্পোরেশন লিমিটেডের নামে ইস্যু করা হয়েছিল। পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশনের তৎকালীন কর্মকর্তা এম আনোয়ার জাহিদ বলেন, “সনদটি হাইতেরার জন্য দেওয়া হয়েছিল, স্টেট আইটির জন্য নয়। স্টেট আইটি সেখানে স্থানীয় এজেন্ট মাত্র।” তারপরও এই সনদ ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করা হয়, যা সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়। এতে ক্রয়কারী কর্মকর্তা ছিলেন সাইফুল ইসলাম। ক্রয়প্রক্রিয়া কমিটিতে আরও ছিলেন— মো. মঈন উদ্দিন (সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, ডিএনসিসি) এবং আমিনুর রহমান (সহকারী প্রকৌশলী)। রামপুরা–কুড়িল সড়ক প্রকল্পে শর্ত পরিবর্তনের কারসাজি: নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধাপ্রদান? গত বছরের ১লা জুন রামপুরা সেতু থেকে কুড়িল মোড় পর্যন্ত সড়কে খুঁটি, স্মার্ট এলইডি বাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঢাকা ওয়াসা-এর অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৯ কোটি টাকার বেশি। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ২৯শে জুন। কিন্তু শেষ সময়ের মাত্র তিন দিন আগে—২৬শে জুন—হঠাৎ করে দরপত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পরিবর্তন করা হয় এবং সময় বাড়িয়ে ১০ই জুলাই নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই পরিবর্তন করা হয় কারিগরি কমিটির অনুমোদন ছাড়াই, যা সরকারি ক্রয়বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দরপত্রের মূল ও সংশোধিত শর্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়— আন্তর্জাতিক মানের সনদ বাধ্যতামূলক থাকার শর্ত বাতিল করা হয়েছে। সব যন্ত্রপাতি একই ব্র্যান্ডের হওয়ার শর্তও শিথিল করা হয়। এছাড়া নতুন করে সিএমএস সফটওয়্যারের সোর্স কোড সরবরাহের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শর্ত আন্তর্জাতিকভাবে অস্বাভাবিক, কারণ কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি তাদের সফটওয়্যারের সোর্স কোড সরবরাহ করে না। ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, এই শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারীকে সুবিধা দিতে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এনার্জি প্লাস আগেই ঠিকাদার জেএপি ট্রেডিংকে সোর্স কোড সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। দরপত্রে আরও যেসব পরিবর্তন আনা হয়— নির্দিষ্টভাবে উল্লেখিত ফিলিপস জাইটানিয়াম ড্রাইভার পরিবর্তন করে “সমমান” যুক্ত করা হয়। একইসাথে ইউরোপের নির্দিষ্ট বন্দর থেকে আমদানির শর্ত শিথিল করা হয়। এগুলো দরপত্রকে উন্মুক্ত করার পরিবর্তে বরং নির্দিষ্ট দরদাতার জন্য সুবিধাজনক করে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এই দরপত্রে অংশ নেয় দুই প্রতিষ্ঠান: মেসার্স জেএপি ট্রেডিং এবং এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনাল। জেএপি ট্রেডিংয়ের প্রস্তাবিত দর ছিল ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা (সর্বনিম্ন) এবং এসএস রহমানের দর ছিল ৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, সাইফুল ইসলাম-এর সঙ্গে জেএপি ট্রেডিংয়ের ঘনিষ্ঠতার কারণে শর্ত পরিবর্তন করা হয়। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবে অসঙ্গতি, বাজার দরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জেএপি ট্রেডিংয়ের প্রস্তাবে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। যেমন- এলইডি বাতির জন্য প্রয়োজনীয় এলভিডি ও আরওএইচএস সনদ নেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে। এছাড়া, ডিসিইউ ও সিএমএসের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের স্বীকৃতি না দিয়ে স্থানীয় ঘোষণাপত্র দেওয়া, শর্ত অনুযায়ী ক্লাস-২ (ডাবল আইসোলেশন) পণ্যের বদলে ক্লাস-১ সরবরাহের প্রস্তাব এবং ভোল্টেজ, পাওয়ার ফ্যাক্টর ও লুমেন টলারেন্সের মান পূরণ হয়নি। প্রস্তাবিত এলইডি বাতির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ৬০–৭০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ১৮–২০ হাজার টাকা)। কিন্তু প্রকল্পে প্রতিটি বাতির মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা—যা বাজারদরের কয়েকগুণ বেশি। দরপত্র বাতিল ও পুনঃপ্রক্রিয়া সব অনিয়মের পরও জেএপি ট্রেডিংকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর নির্দেশে দরপত্রটি বাতিল করা হয়। তবে এখানেই শেষ নয়— গত ১৯শে এপ্রিল আবারও তৃতীয়বারের মতো দরপত্র বাতিল করে পুনর্দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করা হয়েছে, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা কি অব্যাহত? অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, “সড়কবাতি ও খুঁটির দরপত্রে কোনো শর্ত লঙ্ঘন হয়নি। ওয়াকিটকি ক্রয়েও নিয়ম ভাঙা হয়নি। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাইলে তিনবার দরপত্র আহ্বান করতে হতো না।” অন্যদিকে অঞ্চল-৫-এর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া-এর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, “সব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ডিএনসিসির একাধিক প্রকল্পে যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দরপত্রের শর্ত ইচ্ছেমতো পরিবর্তন, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করা, বাজারদরের চেয়ে বহু গুণ বেশি মূল্য নির্ধারণ এবং যোগসাজশ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে ইতিমধ্যে। এসব ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এখন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তদন্ত কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে—এই অভিযোগগুলো কতটা গভীরে পৌঁছাবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আদৌ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
সুবিধাপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে, যার মোট আর্থিক পরিমাণ ৪৩ কোটি টাকার বেশি। প্রথম দরপত্র: শর্ত ভেঙেও যোগ্য ঘোষণা, বিপিপিএর নির্দেশনা উপেক্ষা গত ২৫শে আগস্ট মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত সড়কবাতির খুঁটি সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। শর্ত অনুযায়ী অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের থাকতে হতো— কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা, গত ১০ বছরে অন্তত ১০ কোটি ৮ লাখ টাকার একটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক ডেকোরেটিভ পোল ও স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট সরবরাহের সক্ষমতা। এই দরপত্রে প্রোটোস্টার লিমিটেড রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের একটি অভিজ্ঞতা সনদ জমা দেয়। সেখানে ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কাজের উল্লেখ থাকলেও কাজটির নির্ধারিত সমাপ্তির
সময় ছিল ৩০ জুন ২০২৬—অর্থাৎ কাজটি তখনও চলমান ছিল। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী “সফলভাবে সম্পন্ন” কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি অংশ নেয়। এই অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) পিপিআর ২০২৫-এর বিধি ১১৮(৪) অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। দরপত্রের নির্দেশনার ১৫.১(বি) ধারা অনুযায়ী সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু প্রোটোস্টার লিমিটেড তা পূরণ করতে না পেরে ডিএনসিসির একটি সাধারণ সড়কবাতি প্রকল্পের ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার অভিজ্ঞতা সনদ দাখিল করে, যা সমজাতীয় কাজ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা নয়। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের যোগসাজশে মূল্যায়ন কমিটি এই সনদ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করে—যা সরাসরি ক্রয়বিধির লঙ্ঘন। এই দরপত্রে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ
নেয়: প্রোটোস্টার লিমিটেড, এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও সালেক পাওয়ার লিমিটেড। মূল্যায়ন শেষে প্রোটোস্টার লিমিটেড ও এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনালকে কারিগরিভাবে যোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে গত ১৯শে নভেম্বর প্রোটোস্টার লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ৪ঠা ডিসেম্বর ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন আকরাম খান, যিনি জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক। একই দিনে দ্বিতীয় দরপত্র: একক অংশগ্রহণকারী, একই অনিয়ম একই দিনে ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের অঞ্চল-৫-এর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া আরেকটি দরপত্র আহ্বান করেন। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল: ডেকোরেটিভ স্ট্রিট লাইট পোল, স্মার্ট এলইডি লাইট ও সিএলএমএস, ক্যাবল ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ। এই দরপত্রে কেবল প্রোটোস্টার লিমিটেড
অংশগ্রহণ করে। এই দরপত্রে শর্ত ছিল— কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা, গত ১০ বছরে ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকার একটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট উৎপাদন সক্ষমতা। প্রোটোস্টার লিমিটেড এখানে আবারও অসম্পূর্ণ কাজের অভিজ্ঞতা সনদ এবং পরবর্তীতে ১৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার একটি সাধারণ কাজের সনদ দাখিল করে, যা নির্ধারিত শর্তের চেয়ে ৭০ লাখ টাকা কম। তবুও দরপত্র যাচাই কমিটি প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করে এবং গত ১৯শে নভেম্বর কার্যাদেশ দেয়। পরে ৪ ডিসেম্বর ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুটি দরপত্র মিলিয়ে প্রোটোস্টার লিমিটেডকে দেওয়া কাজের পরিমাণ দাঁড়ায়— প্রথম প্রকল্পে ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় প্রকল্পে ২১ কোটি ১৯
লাখ টাকা। মোট ৩৫ কোটির বেশি (এবং অন্যান্য প্রকল্পসহ অভিযোগ অনুযায়ী ৪৩ কোটিরও বেশি)। বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে ক্রয় : দরপত্রে যোগসাজশ সড়কবাতির কাজের দরপত্রে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যেই এবার অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে ওয়াকিটকি ক্রয়ের মাধ্যমে নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)-এর বিরুদ্ধে। নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে এবং যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি মোট ৩৮০টি ওয়াকিটকি ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কিনেছে প্রায় ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। এর মধ্যে— Hytera PDC680 মডেলের ১০০টি ওয়াকিটকি: প্রতিটির দাম ২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা Hytera HP788 UV মডেলের ২৮০টি ওয়াকিটকি: প্রতিটির দাম
১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা অথচ তুলনামূলকভাবে— ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পুলিশ একই ধরনের ২,৪০০টি ওয়াকিটকি কিনেছে প্রতিটি ৪৭,৫২০ টাকায় এবং ২০১৯ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ৪০০টি ওয়াকিটকি কিনেছিল প্রতিটি ৫১,৯৩৫ টাকায়। অর্থাৎ ডিএনসিসি একই ধরনের যন্ত্রপাতি বাজার দরের চেয়ে মডেল ভেদে অন্তত ৩ থেকে ৬ গুণ বেশি দামে কিনেছে। বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য গঠিত কমিটি তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দর সংগ্রহ করে: রুশদিয়া এন্টারপ্রাইজ, এসএম কর্পোরেশন ও মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড তবে অভিযোগ রয়েছে, রুশদিয়া ও এসএম কর্পোরেশনের টেলিকম সরঞ্জাম সরবরাহে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তাদের ট্রেড লাইসেন্সেও সংশ্লিষ্ট খাতের উল্লেখ নেই। অথচ অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান সিস্টেম কমিউনিকেশন লিমিটেডকে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া দরপত্রের ভাষা, শর্ত ও বিন্যাস প্রায় অভিন্ন ছিল, যা সম্ভাব্য যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। এই তিনটির মধ্যে— স্টেট আইটি সর্বনিম্ন দর দেয়। রুশদিয়া দ্বিতীয় এবং এসএম কর্পোরেশন সর্বোচ্চ দর দেয়। তবে বিস্ময়করভাবে, স্টেট আইটির প্রস্তাবিত দরই পরবর্তীতে দাপ্তরিক মূল্য হিসেবে নির্ধারিত হয়—অর্থাৎ লাভ, ভ্যাট ও ট্যাক্স যোগ করার আগেই ঠিক সেই পরিমাণ দরপত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল। যা ইঙ্গিত করে যে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া আগেই ঠিক করা হয়েছিল। ডিএনসিসির একাধিক প্রকৌশলী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, “ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারদর বেশি দেখিয়ে দাপ্তরিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ঠিকাদারকে বেশি দামে কাজ দেওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্টরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।” দরদাতাদের যোগ্যতার শর্ত লঙ্ঘন ২০২৪ সালের অক্টোবরে আহ্বান করা দরপত্রে শর্ত ছিল— গত ৩ বছরে অন্তত ৪ কোটি টাকার সমজাতীয় কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতা। অথচ কাজ পায় মেসার্স দ্য স্টেট আইটি লিমিটেড, যারা এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটি দুটি অভিজ্ঞতা সনদ জমা দেয়— যার মধ্যে ছিল ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের একটি যৌথ প্রকল্প—যেখানে স্টেট আইটি প্রধান অংশীদার ছিল না (এটি বাতিল হয়) এবং পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশন-এর একটি সনদ, যার চুক্তিমূল্য প্রায় ১০.৫৬ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৩ কোটি টাকা)। কিন্তু এই সনদটি মূলত হাইতেরা কমিউনিকেশনস কর্পোরেশন লিমিটেডের নামে ইস্যু করা হয়েছিল। পুলিশ টেলিকম অর্গানাইজেশনের তৎকালীন কর্মকর্তা এম আনোয়ার জাহিদ বলেন, “সনদটি হাইতেরার জন্য দেওয়া হয়েছিল, স্টেট আইটির জন্য নয়। স্টেট আইটি সেখানে স্থানীয় এজেন্ট মাত্র।” তারপরও এই সনদ ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করা হয়, যা সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়। এতে ক্রয়কারী কর্মকর্তা ছিলেন সাইফুল ইসলাম। ক্রয়প্রক্রিয়া কমিটিতে আরও ছিলেন— মো. মঈন উদ্দিন (সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, ডিএনসিসি) এবং আমিনুর রহমান (সহকারী প্রকৌশলী)। রামপুরা–কুড়িল সড়ক প্রকল্পে শর্ত পরিবর্তনের কারসাজি: নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধাপ্রদান? গত বছরের ১লা জুন রামপুরা সেতু থেকে কুড়িল মোড় পর্যন্ত সড়কে খুঁটি, স্মার্ট এলইডি বাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঢাকা ওয়াসা-এর অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৯ কোটি টাকার বেশি। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ২৯শে জুন। কিন্তু শেষ সময়ের মাত্র তিন দিন আগে—২৬শে জুন—হঠাৎ করে দরপত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পরিবর্তন করা হয় এবং সময় বাড়িয়ে ১০ই জুলাই নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই পরিবর্তন করা হয় কারিগরি কমিটির অনুমোদন ছাড়াই, যা সরকারি ক্রয়বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দরপত্রের মূল ও সংশোধিত শর্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়— আন্তর্জাতিক মানের সনদ বাধ্যতামূলক থাকার শর্ত বাতিল করা হয়েছে। সব যন্ত্রপাতি একই ব্র্যান্ডের হওয়ার শর্তও শিথিল করা হয়। এছাড়া নতুন করে সিএমএস সফটওয়্যারের সোর্স কোড সরবরাহের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শর্ত আন্তর্জাতিকভাবে অস্বাভাবিক, কারণ কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি তাদের সফটওয়্যারের সোর্স কোড সরবরাহ করে না। ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, এই শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারীকে সুবিধা দিতে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এনার্জি প্লাস আগেই ঠিকাদার জেএপি ট্রেডিংকে সোর্স কোড সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। দরপত্রে আরও যেসব পরিবর্তন আনা হয়— নির্দিষ্টভাবে উল্লেখিত ফিলিপস জাইটানিয়াম ড্রাইভার পরিবর্তন করে “সমমান” যুক্ত করা হয়। একইসাথে ইউরোপের নির্দিষ্ট বন্দর থেকে আমদানির শর্ত শিথিল করা হয়। এগুলো দরপত্রকে উন্মুক্ত করার পরিবর্তে বরং নির্দিষ্ট দরদাতার জন্য সুবিধাজনক করে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এই দরপত্রে অংশ নেয় দুই প্রতিষ্ঠান: মেসার্স জেএপি ট্রেডিং এবং এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনাল। জেএপি ট্রেডিংয়ের প্রস্তাবিত দর ছিল ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা (সর্বনিম্ন) এবং এসএস রহমানের দর ছিল ৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, সাইফুল ইসলাম-এর সঙ্গে জেএপি ট্রেডিংয়ের ঘনিষ্ঠতার কারণে শর্ত পরিবর্তন করা হয়। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবে অসঙ্গতি, বাজার দরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জেএপি ট্রেডিংয়ের প্রস্তাবে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। যেমন- এলইডি বাতির জন্য প্রয়োজনীয় এলভিডি ও আরওএইচএস সনদ নেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে। এছাড়া, ডিসিইউ ও সিএমএসের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের স্বীকৃতি না দিয়ে স্থানীয় ঘোষণাপত্র দেওয়া, শর্ত অনুযায়ী ক্লাস-২ (ডাবল আইসোলেশন) পণ্যের বদলে ক্লাস-১ সরবরাহের প্রস্তাব এবং ভোল্টেজ, পাওয়ার ফ্যাক্টর ও লুমেন টলারেন্সের মান পূরণ হয়নি। প্রস্তাবিত এলইডি বাতির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ৬০–৭০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ১৮–২০ হাজার টাকা)। কিন্তু প্রকল্পে প্রতিটি বাতির মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা—যা বাজারদরের কয়েকগুণ বেশি। দরপত্র বাতিল ও পুনঃপ্রক্রিয়া সব অনিয়মের পরও জেএপি ট্রেডিংকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর নির্দেশে দরপত্রটি বাতিল করা হয়। তবে এখানেই শেষ নয়— গত ১৯শে এপ্রিল আবারও তৃতীয়বারের মতো দরপত্র বাতিল করে পুনর্দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করা হয়েছে, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা কি অব্যাহত? অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, “সড়কবাতি ও খুঁটির দরপত্রে কোনো শর্ত লঙ্ঘন হয়নি। ওয়াকিটকি ক্রয়েও নিয়ম ভাঙা হয়নি। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাইলে তিনবার দরপত্র আহ্বান করতে হতো না।” অন্যদিকে অঞ্চল-৫-এর দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া-এর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, “সব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ডিএনসিসির একাধিক প্রকল্পে যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দরপত্রের শর্ত ইচ্ছেমতো পরিবর্তন, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করা, বাজারদরের চেয়ে বহু গুণ বেশি মূল্য নির্ধারণ এবং যোগসাজশ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে ইতিমধ্যে। এসব ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এখন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তদন্ত কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে—এই অভিযোগগুলো কতটা গভীরে পৌঁছাবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আদৌ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।



