ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
ক্ষমতা ছাড়ার আগে ব্যাপক লুটপাট, ৬ মাসে সরকারের ঋণ ৬০ হাজার কোটি
ইউনূস-আমেরিকার পরিকল্পনায় ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে জামায়াত
ইউনূসকে সমর্থন দেওয়া জাতিসংঘই বলছে, দেশে বাকস্বাধীনতা নেই
শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-বিদ্যুৎ খাত ও মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
ভোটার দর্শক, রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন নয়, ক্ষমতা ভাগাভাগির নগ্ন নাটক চলছে
শিক্ষার ছদ্মবেশে প্রভাব বিস্তারের নতুন অধ্যায়, ঢাকায় পাকিস্তানের আগ্রাসী একাডেমিক তৎপরতা
বাংলাদেশের ২০২৬ নির্বাচন: আন্তর্জাতিক উদ্বেগ, গণতন্ত্রের পরীক্ষা
যখন বাংলাদেশের আদালত নিজেই হয়ে ওঠে পুরুষতন্ত্রের নির্লজ্জ হাতিয়ার
হাইকোর্টের এই রায়টা আসলে কী বলছে? বলছে যে একজন নারী তার নিজের বিবাহিত জীবনে কী ঘটবে সেটা জানার অধিকারও রাখে না। তার স্বামী আরেকটা বিয়ে করবে কিনা, সেই সিদ্ধান্তে তার কোনো কথা বলার অধিকার নেই। এই সিদ্ধান্ত নেবে একটা আরবিট্রেশন কাউন্সিল, যেখানে বসে থাকবেন সম্ভবত পুরুষেরাই, আর তারা ঠিক করে দেবেন একজন পুরুষ আরেকটা বিয়ে করার যোগ্য কিনা। নারীর মতামত এখানে অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয়, অস্তিত্বহীন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন রাস্তায় রক্ত ঝরছিল, যখন একটা নির্বাচিত সরকারকে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে এবং বিদেশি অর্থায়নে উৎখাত করা হচ্ছিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটা হয়তো গণতন্ত্রের জন্য একটা আন্দোলন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এটা ছিল প্রতিক্রিয়াশীল
শক্তির ক্ষমতা দখল। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সঙ্গী জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য মৌলবাদী গোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল, তখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রকল্প। আর এই হাইকোর্টের রায় সেই প্রকল্পেরই একটা ধাপ। ইউনূসের মাইক্রোক্রেডিট মডেল নিয়ে অনেক কথা হয়। কীভাবে দরিদ্র নারীদের ঋণের জালে আটকে ফেলে তাদের শ্রম শোষণ করা হয়, কীভাবে সুদের বোঝা বয়ে বয়ে একজন নারী আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে যায়। এই একই ব্যক্তি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, আর তার অধীনে বিচার ব্যবস্থা এমন রায় দিচ্ছে যা নারীর আইনি অধিকারকে কেড়ে নিচ্ছে। এটা কি কাকতালীয়? নাকি এটাই তাদের আসল এজেন্ডা? বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ছিল
একটা প্রগতিশীল পদক্ষেপ। তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার, যত স্বৈরাচারীই হোক, অন্তত এই ক্ষেত্রে একটা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল। সেই আইনে বলা হয়েছিল পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে প্রথম স্ত্রীকে জানাতে হবে, এবং আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। এটা ছিল একধরনের নিয়ন্ত্রণ, একটা সামাজিক সুরক্ষা। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ কতটা হয়েছে? কতজন পুরুষ সত্যিই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের কাছে গেছেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আইন থেকে গেছে কাগজে কলমে, আর নারীরা ভুগেছেন নীরবে। এখন হাইকোর্ট বলছে যে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়, শুধু আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি লাগবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আরবিট্রেশন কাউন্সিল কারা? এরা কি নারীবান্ধব? এরা কি লিঙ্গ সমতায় বিশ্বাস করেন? বাংলাদেশের গ্রামীণ এবং
শহুরে সমাজের বাস্তবতায় এই কাউন্সিলগুলো প্রায়ই হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতের পুতুল। একজন ক্ষমতাবান পুরুষ যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তাহলে এই কাউন্সিল তাকে থামাবে এই ভাবনাটাই হাস্যকর। বরং এই কাউন্সিল হয়ে উঠবে আরেকটা পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নারীর কণ্ঠস্বর থাকবে না। জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডা সবসময়ই স্পষ্ট ছিল। এরা চায় বাংলাদেশে একটা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে দাঁড়িয়ে গণহত্যা, ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনে সহায়তা করেছিল। এদের কাছে নারী সবসময়ই ছিল ভোগ্যপণ্য, সম্পত্তি। এখন যখন এরা রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রভাব বিস্তার করছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই নারীবিরোধী আইনকানুন আসতে শুরু করবে। ইউনূসের ভূমিকাটা আরও বিপজ্জনক কারণ তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে
একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বন্ধু, এসব তকমা তার গায়ে লেপটে আছে। কিন্তু বাস্তবে তার মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক নারীদের শোষণের একটা বিশাল যন্ত্র। গবেষণায় দেখা গেছে যে মাইক্রোক্রেডিট প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী নারীদের অনেকেই ঋণ পরিশোধের চাপে আত্মহত্যা করেছেন। এই একই ব্যক্তি এখন রাষ্ট্রের হাল ধরে আছেন, আর তার আমলে বিচার ব্যবস্থা নারীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। বহুবিবাহের প্রশ্নটা শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, এটা একটা আর্থ-সামাজিক প্রশ্নও। যেসব পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তারা বেশিরভাগই আর্থিকভাবে সচ্ছল। দরিদ্র পুরুষ সাধারণত দ্বিতীয় বিয়ে করার সামর্থ্য রাখেন না। তাহলে এই আইন কাদের সুবিধা দিচ্ছে? ধনী আর ক্ষমতাবান পুরুষদের। যাদের টাকা আছে,
প্রভাব আছে, তারা যখন খুশি যত খুশি বিয়ে করতে পারবেন, আর প্রথম স্ত্রী বসে বসে সহ্য করবেন। এটা হলো শ্রেণি শোষণের আরেকটা রূপ, যেখানে পুঁজির মালিকরা নারীকেও তাদের সম্পত্তি হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে নারী আন্দোলন অনেক সংগ্রাম করে কিছু অধিকার আদায় করেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক আইনে সেই সমতা কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ছিল একটা আপসকামী আইন, যেখানে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা আর প্রগতিশীলতার মধ্যে একটা ভারসাম্য খোঁজা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই আপসকামিতাও শেষ হতে চলেছে। হাইকোর্টের এই রায় আসলে বলে দিচ্ছে যে নারীর কোনো অধিকার নেই, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই। আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ধারণাটা
এমনিতেই সমস্যাযুক্ত। কারণ এই কাউন্সিলগুলো গঠিত হয় স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে প্রায়ই থাকেন চেয়ারম্যান, মেম্বার, আর কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। এদের মধ্যে কতজন সত্যিকারের লিঙ্গ সমতায় বিশ্বাস করেন? কতজন নারীর অধিকার নিয়ে সচেতন? বাস্তবতা হলো, এই কাউন্সিলগুলো হয় পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারক আর বাহক। এখানে একজন প্রভাবশালী পুরুষ সহজেই দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি পেয়ে যাবেন, আর তার স্ত্রী জানতেও পারবেন না কী ঘটছে তার জীবনে। জুলাই ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশে যা ঘটছে তা একটা সুপরিকল্পিত প্রতিক্রিয়াশীল পুনর্গঠন প্রকল্প। ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তিগুলো একটার পর একটা ক্ষেত্রে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বাড়ছে, ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠনগুলোকে দমন করা হচ্ছে, আর এখন নারীর আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো একটা বড় পরিকল্পনার অংশ। বিদেশি অর্থায়নের প্রশ্নটাও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ওয়াহাবি মতাদর্শ ছড়ানোর জন্য অর্থ ঢালছে। মাদ্রাসা, মসজিদ, ইসলামি সংগঠন, সবখানেই এই টাকা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পেছনেও এই বিদেশি অর্থায়নের ভূমিকা ছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন। এখন এই শক্তিগুলো ক্ষমতায় এসে তাদের মতাদর্শ রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দিচ্ছে। নারীবাদী আন্দোলনের দিক থেকে এই রায়টা একটা বিরাট ধাক্কা। কয়েক দশক ধরে নারী সংগঠনগুলো লড়াই করে আসছে পারিবারিক সহিংসতা রোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার, এসব বিষয়ে। কিছু অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সব কিছু আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। হাইকোর্টের এই রায় শুধু দ্বিতীয় বিয়ের প্রশ্নে নয়, এটা আসলে নারীর সার্বিক অধিকারের ওপর একটা আক্রমণ। বামপন্থী বিশ্লেষণে দেখলে বোঝা যায় যে এটা আসলে পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্রের একটা প্রকাশ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নারী শ্রমিক হিসেবে শোষিত হয় কর্মক্ষেত্রে, আর পরিবারে ভোগ্যপণ্য হিসেবে। এই দুই ধরনের শোষণ একসঙ্গে চলে। এখন হাইকোর্টের এই রায় নারীকে আরও বেশি অসহায় করে দিচ্ছে। একজন নারী যখন জানবেন না তার স্বামী আরেকটা বিয়ে করছে কিনা, তখন সে কীভাবে নিজের অধিকার রক্ষা করবে? কীভাবে সে আর্থিক নিরাপত্তার পরিকল্পনা করবে? এটা তাকে পুরোপুরি নির্ভরশীল আর অসহায় করে দেয়। ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক মডেলের সঙ্গে এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটা সংযোগ দেখা যায়। গ্রামীণ ব্যাংক নারীকে টার্গেট করে কারণ নারীরা ঋণ পরিশোধে বেশি নিয়মানুবর্তী। কিন্তু এর মানে এই না যে এটা নারীবান্ধব। বরং এটা নারীর দায়িত্ববোধ আর সামাজিক চাপকে ব্যবহার করে তাদের শোষণ করে। একইভাবে, পারিবারিক আইনে নারীকে অধিকারহীন রাখাও একধরনের শোষণের ব্যবস্থা। একজন নারী যখন জানবে না তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করছে, তখন সে আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, আর সেই অনিরাপত্তা তাকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলে। জামায়াত আর অন্যান্য ইসলামি সংগঠনের কাছে নারী সবসময়ই একটা সমস্যা ছিল। এরা চায় নারী ঘরে থাকবে, পর্দা করবে, স্বামীর আনুগত্য করবে, আর বেশি কিছু চাইবে না। শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি, সবখানে নারীর অংশগ্রহণ এদের কাছে অপছন্দের। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময় দেখা গেছিল কীভাবে জামায়াত মেয়েদের চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটিয়ে আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল। এরা সবসময় নারীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। এখন ক্ষমতায় এসে এরা নারীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, যেটা তাদের আসল চেহারা। হাইকোর্টের এই রায়ের ব্যাপারে সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো যে এটা বিচার ব্যবস্থার একটা রায়। বিচার বিভাগ যেটা সংবিধানের রক্ষক হওয়ার কথা, যেটা নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার কথা, সেই বিচার বিভাগই নারীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এটা দেখায় যে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানই এখন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নিয়ন্ত্রণে। আইন প্রণয়ন, বিচার, প্রশাসন, সবখানেই এখন মৌলবাদী মতাদর্শের ছাপ পড়ছে। রিটকারীরা যখন বলছেন তারা আপিল করবেন, তখন একটা আশার আলো দেখা যায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এই মামলা যাবে, আর সেখানেও একই ধরনের প্রভাব থাকতে পারে। তাছাড়া আইনি লড়াই একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আর তার মধ্যে কত নারীর জীবন বরবাদ হয়ে যাবে? কতজন নারী হঠাৎ জানতে পারবে তার স্বামী আরেকটা বিয়ে করে ফেলেছে, আর সে কিছুই করতে পারবে না? বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় তালাক নেওয়াটাও একটা নারীর জন্য অত্যন্ত কঠিন। সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক অনিরাপত্তা, সন্তানদের হেফাজত, এসব কারণে অনেক নারী অসহনীয় বিবাহিত জীবন টেনে নিয়ে যান। এখন যদি স্বামী তার অজান্তেই দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলতে পারে, তাহলে সেই নারীর অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়? সে না পারবে সংসার চালাতে, না পারবে বেরিয়ে আসতে। এটা হলো একধরনের মানসিক নির্যাতন, যেটার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রই দায়ী হয়ে যাচ্ছে। এই পুরো পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ আসলে পিছিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালে যে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, আর সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে, সেই দেশটা এখন ধর্মীয় মৌলবাদ আর পুরুষতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। ইউনূস আর জামায়াতের জোট যেটা করছে, সেটা আসলে একটা প্রতিবিপ্লব। এরা চায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করে দিতে, আর একটা পশ্চাদপদ, ধর্মান্ধ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। নারীবাদী আন্দোলনকে এখন আরও শক্তিশালী হতে হবে। শুধু আইনি লড়াই নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সব ক্ষেত্রে লড়াই চালাতে হবে। কারণ এই হাইকোর্টের রায় শুধু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা বড় আক্রমণের অংশ। আগামীতে আরও অনেক নারীবিরোধী পদক্ষেপ আসতে পারে। হয়তো তালাকের অধিকার সীমিত করা হবে, হয়তো উত্তরাধিকারে নারীর অংশ কমানো হবে, হয়তো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে বিধিনিষেধ আসবে। এসব ঠেকাতে হলে এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে। বামপন্থী রাজনীতির দায়িত্বও এখানে রয়েছে। শ্রেণি সংগ্রামের সঙ্গে লিঙ্গ সংগ্রাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকে আছে নারীর শোষণের ওপর ভিত্তি করে। ঘরে অবৈতনিক শ্রম, কর্মক্ষেত্রে কম মজুরি, পারিবারিক আইনে বৈষম্য, সব মিলিয়ে নারী একটা শোষিত শ্রেণি। এই শোষণ বন্ধ না করলে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়। তাই বাম রাজনীতিকে নারীর অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার হতে হবে, সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে হবে। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে শুধু আইনি লড়াই নয়, জনমত তৈরি করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে এটা শুধু মুসলিম নারীদের সমস্যা নয়, এটা পুরো সমাজের সমস্যা। যখন অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অধিকারহীন করে রাখা হয়, তখন পুরো সমাজই পিছিয়ে পড়ে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউনূসের ভণ্ডামিটা এখানে স্পষ্ট হয়ে যায়। একদিকে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দরিদ্র নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলেন, অন্যদিকে তার অধীনে এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা চলছে যেটা নারীর মৌলিক অধিকারই কেড়ে নিচ্ছে। এই দ্বৈততা আসলে তার শ্রেণিচরিত্রের প্রকাশ। তিনি পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিনিধি, আর পুঁজিপতিদের কাছে নারী মানে সস্তা শ্রম আর নিয়ন্ত্রিত ভোক্তা। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা নারীরা যে সুদের বোঝা বইছেন, সেটা আসলে তাদের শ্রমের শোষণ। আর এখন পারিবারিক আইনে নারীকে অধিকারহীন করে রাখাটা সেই শোষণকে আরও সহজ করে দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায়নি। ১৯৭১ সালে তিরিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, দুই লক্ষের বেশি নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এই ধর্ষণগুলো ছিল পরিকল্পিত গণহত্যার অংশ, যেখানে জামায়াতের রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। নারীর শরীর তখন যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এখন সেই একই সংগঠন যখন রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রভাব বিস্তার করে নারীর অধিকার খর্ব করছে, তখন সেটা একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ। এরা কখনো নারীকে সম্মান করেনি, মানুষ ভাবেনি। নারী তাদের কাছে সবসময়ই ছিল নিয়ন্ত্রণ আর শোষণের বস্তু। সামরিক বাহিনীর ভূমিকাটাও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেখানে সামরিক বাহিনীর সমর্থন না থাকলে সেটা সফল হতো না। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতার রাজনীতিতে জড়িত। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে এরশাদ পর্যন্ত সামরিক শাসনের ইতিহাস রয়েছে। এই সামরিক শাসকরা সবসময়ই ধর্মীয় রক্ষণশীলদের সঙ্গে আপস করেছে, কারণ সেটা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এখনও সেই একই খেলা চলছে। সামরিক বাহিনী সমর্থন দিচ্ছে, আর মৌলবাদীরা সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমেরিকা, ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো যারা সবসময় গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের কথা বলে, তারা কিন্তু ইউনূসকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। কেন? কারণ ইউনূস তাদের আর্থিক স্বার্থের সেবক। তার মাইক্রোফাইন্যান্স মডেল আসলে নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদের একটা হাতিয়ার, যেটা দরিদ্র দেশগুলোতে পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটায়। তাই পশ্চিমা শক্তিগুলো ইউনূসকে রক্ষা করছে, তার সরকারকে বৈধতা দিচ্ছে, আর সেই সরকারের অধীনে যা ঘটছে তাতে চোখ বন্ধ করে আছে। হাইকোর্টের রায়ে আরেকটা যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে মুসলিম পারিবারিক আইনে সরাসরি স্ত্রীর অনুমতির কথা বলা নেই। এটা একটা আইনের ফস্কা গেঁড়ো। কারণ ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশে যেভাবে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির কথা বলা হয়েছিল, সেখানে ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে স্ত্রীকে জানানো হবে আর তার মতামত নেওয়া হবে। নইলে আরবিট্রেশন কাউন্সিল কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে? কিন্তু হাইকোর্ট এখন সেই ব্যাখ্যা বদলে দিয়ে বলছে যে স্ত্রীর মতামত জরুরি নয়। এটা আসলে আইনের চেতনাকে হত্যা করা। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার কথাও এসেছে রায়ে। এই ধারায় বলা ছিল যে স্বামী বা স্ত্রীর জীবদ্দশায় আরেকটা বিয়ে করলে সাত বছরের কারাদণ্ড হবে। এটা ছিল সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ১৯৬১ সালে মুসলিমদের জন্য আলাদা আইন করে সেই শাস্তি কমিয়ে এক বছর বা দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এটা নিজেই একটা বৈষম্য ছিল। এখন হাইকোর্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছে যে স্ত্রীর অনুমতিই লাগবে না। এভাবে ধাপে ধাপে নারীর অধিকার কেটে ছোট করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ আর ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের সমতার কথা বলা আছে। বলা আছে যে রাষ্ট্র নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য করবে না। কিন্তু পারিবারিক আইনে এই সমতা কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, বিয়ে-তালাক, সন্তানের হেফাজত, সবক্ষেত্রেই নারী পুরুষের চেয়ে কম অধিকার পায়। এই বৈষম্যকে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের নামে বৈধতা দেওয়া হয়। কিন্তু মৌলিক অধিকার তো ধর্মের ঊর্ধ্বে। সংবিধান যদি সমতার কথা বলে, তাহলে পারিবারিক আইনেও সেই সমতা থাকতে হবে। নইলে সংবিধান হয়ে দাঁড়ায় শুধু কাগজের লেখা। নারীবাদী আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা সমান পারিবারিক আইনের দাবি তুলছেন। যেখানে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হবে, নারী-পুরুষ সমান অধিকার পাবে। কিন্তু এই দাবি সবসময় ধর্মীয় রক্ষণশীলদের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। তারা বলে যে এটা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। কিন্তু আসলে ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে নারীর অধিকার হরণ করা হচ্ছে। কারণ ধর্মীয় আইনগুলো তৈরি হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, পুরুষদের দ্বারা, পুরুষের স্বার্থে। নারীর কণ্ঠস্বর সেখানে কখনো ছিল না। ইউনূস সরকারের অধীনে বাংলাদেশে আরও কী কী পরিবর্তন আসছে সেটা দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে শিক্ষাক্রমে পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাড়ানো হবে আর বিজ্ঞান শিক্ষা কমানো হবে। মিডিয়ায় সেন্সরশিপ বাড়ছে, প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর দমন করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বাড়ছে, তাদের সম্পত্তি দখল হচ্ছে। এসব একটা বড় পরিকল্পনার অংশ, যেটার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটা ধর্মভিত্তিক, পশ্চাদপদ রাষ্ট্রে পরিণত করা। আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনকেও সংযুক্ত হতে হবে। কারণ এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার আক্রান্ত হচ্ছে। আফগানিস্তানে তালেবান নারীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে, ইরানে হিজাব না পরায় নারীকে হত্যা করা হচ্ছে, আমেরিকায় গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এসব ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটলেও মূল লড়াইটা একই – নারীর শরীর আর জীবনের ওপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকেও এখন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে অনেক প্রগতিশীল দল নারীর অধিকারের প্রশ্নে আপসকামী থেকেছে। ধর্মীয় ভোট ব্যাংকের ভয়ে তারা এই বিষয়ে সোচ্চার হতে চায় না। কিন্তু এই আপসকামিতা আর চলতে পারে না। কারণ যে শক্তিগুলো এখন ক্ষমতায় আছে, তারা শুধু নারীর অধিকার নয়, সব ধরনের প্রগতিশীলতার বিরোধী। তাই এই লড়াইটা সবার লড়াই। শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও এই নারী আন্দোলনকে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে যে লক্ষ লক্ষ নারী কাজ করছেন, তারা দ্বিগুণ শোষণের শিকার। কারখানায় কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ পরিবেশ, আর ঘরে ফিরে গৃহস্থালি কাজের বোঝা। তারপর যদি স্বামী হঠাৎ দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলে, তাহলে তার জীবনে আর্থিক অনিরাপত্তা আরও বেড়ে যায়। তাই শ্রমিক অধিকার আর নারী অধিকার একসঙ্গে লড়তে হবে। যে রিট আবেদনটি হাইকোর্টে করা হয়েছিল, সেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার আর সুরক্ষার কথা বলা হয়েছিল। এটা ছিল একটা ন্যায্য দাবি। কিন্তু হাইকোর্ট সেই দাবি খারিজ করে উল্টো নারীর অধিকার কেড়ে নিলো। রিটকারীরা এখন আপিল করবেন বলেছেন। কিন্তু আপিল প্রক্রিয়া দীর্ঘ, আর তার ফলাফল অনিশ্চিত। এর মধ্যে এই রায়ের প্রভাবে কতজন পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলবে, কতজন নারীর জীবন বিপর্যস্ত হবে, সেটা ভাবলে শঙ্কিত হতে হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা ঠিকই বলেছেন যে এই রায় সামাজিক অসাম্য আর পারিবারিক অস্থিরতা বাড়াবে। বহুবিবাহের ফলে প্রথম স্ত্রী আর সন্তানরা অবহেলিত হয়। পরিবারের সম্পদ ভাগ হয়ে যায়। স্ত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। সন্তানরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয় নারীরা, যাদের কোনো কথা বলার ক্ষমতা নেই। ইউনূস আর জামায়াতের এই জোট আসলে শ্রেণি আর ধর্মীয় মৌলবাদের একটা মিশ্রণ। ইউনূস প্রতিনিধিত্ব করছে নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদের, যেখানে দরিদ্রের শোষণকে ক্ষুদ্রঋণের মোড়কে বৈধতা দেওয়া হয়। আর জামায়াত প্রতিনিধিত্ব করছে ধর্মীয় মৌলবাদের, যেখানে নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে রাখা হয়। এই দুই শক্তি একসঙ্গে মিলে বাংলাদেশকে একটা পশ্চাদপদ, শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচার। সেই চেতনার সঙ্গে এই হাইকোর্টের রায় সম্পূর্ণ বিপরীত। যে দেশে ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন একটা স্বাধীন, প্রগতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, সেই দেশ এখন পিছিয়ে যাচ্ছে মধ্যযুগের দিকে। এটা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি অপমান, বীরাঙ্গনাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের একটা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন থেকে শুরু করে ইলা মিত্র, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, জাহানারা ইমাম, এমন অসংখ্য নারী এই দেশে লড়াই করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে নারীরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, অকল্পনীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন। সেই ঐতিহ্য এখনও জীবিত আছে। বাংলাদেশের নারীরা আবারও লড়বে, আবারও জিতবে। কারণ ইতিহাস বলে যে প্রতিক্রিয়াশীলতা শেষ পর্যন্ত হারতে বাধ্য। প্রগতি হয়তো ধীর, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। আর সেই প্রগতির পথে নারীর অধিকার একটা মৌলিক শর্ত।
শক্তির ক্ষমতা দখল। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সঙ্গী জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য মৌলবাদী গোষ্ঠী যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল, তখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রকল্প। আর এই হাইকোর্টের রায় সেই প্রকল্পেরই একটা ধাপ। ইউনূসের মাইক্রোক্রেডিট মডেল নিয়ে অনেক কথা হয়। কীভাবে দরিদ্র নারীদের ঋণের জালে আটকে ফেলে তাদের শ্রম শোষণ করা হয়, কীভাবে সুদের বোঝা বয়ে বয়ে একজন নারী আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে যায়। এই একই ব্যক্তি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, আর তার অধীনে বিচার ব্যবস্থা এমন রায় দিচ্ছে যা নারীর আইনি অধিকারকে কেড়ে নিচ্ছে। এটা কি কাকতালীয়? নাকি এটাই তাদের আসল এজেন্ডা? বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ছিল
একটা প্রগতিশীল পদক্ষেপ। তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার, যত স্বৈরাচারীই হোক, অন্তত এই ক্ষেত্রে একটা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল। সেই আইনে বলা হয়েছিল পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে প্রথম স্ত্রীকে জানাতে হবে, এবং আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। এটা ছিল একধরনের নিয়ন্ত্রণ, একটা সামাজিক সুরক্ষা। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ কতটা হয়েছে? কতজন পুরুষ সত্যিই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের কাছে গেছেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আইন থেকে গেছে কাগজে কলমে, আর নারীরা ভুগেছেন নীরবে। এখন হাইকোর্ট বলছে যে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়, শুধু আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি লাগবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আরবিট্রেশন কাউন্সিল কারা? এরা কি নারীবান্ধব? এরা কি লিঙ্গ সমতায় বিশ্বাস করেন? বাংলাদেশের গ্রামীণ এবং
শহুরে সমাজের বাস্তবতায় এই কাউন্সিলগুলো প্রায়ই হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতের পুতুল। একজন ক্ষমতাবান পুরুষ যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তাহলে এই কাউন্সিল তাকে থামাবে এই ভাবনাটাই হাস্যকর। বরং এই কাউন্সিল হয়ে উঠবে আরেকটা পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নারীর কণ্ঠস্বর থাকবে না। জামায়াতে ইসলামীর এজেন্ডা সবসময়ই স্পষ্ট ছিল। এরা চায় বাংলাদেশে একটা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে দাঁড়িয়ে গণহত্যা, ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনে সহায়তা করেছিল। এদের কাছে নারী সবসময়ই ছিল ভোগ্যপণ্য, সম্পত্তি। এখন যখন এরা রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রভাব বিস্তার করছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই নারীবিরোধী আইনকানুন আসতে শুরু করবে। ইউনূসের ভূমিকাটা আরও বিপজ্জনক কারণ তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে
একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বন্ধু, এসব তকমা তার গায়ে লেপটে আছে। কিন্তু বাস্তবে তার মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক নারীদের শোষণের একটা বিশাল যন্ত্র। গবেষণায় দেখা গেছে যে মাইক্রোক্রেডিট প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী নারীদের অনেকেই ঋণ পরিশোধের চাপে আত্মহত্যা করেছেন। এই একই ব্যক্তি এখন রাষ্ট্রের হাল ধরে আছেন, আর তার আমলে বিচার ব্যবস্থা নারীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। বহুবিবাহের প্রশ্নটা শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, এটা একটা আর্থ-সামাজিক প্রশ্নও। যেসব পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তারা বেশিরভাগই আর্থিকভাবে সচ্ছল। দরিদ্র পুরুষ সাধারণত দ্বিতীয় বিয়ে করার সামর্থ্য রাখেন না। তাহলে এই আইন কাদের সুবিধা দিচ্ছে? ধনী আর ক্ষমতাবান পুরুষদের। যাদের টাকা আছে,
প্রভাব আছে, তারা যখন খুশি যত খুশি বিয়ে করতে পারবেন, আর প্রথম স্ত্রী বসে বসে সহ্য করবেন। এটা হলো শ্রেণি শোষণের আরেকটা রূপ, যেখানে পুঁজির মালিকরা নারীকেও তাদের সম্পত্তি হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে নারী আন্দোলন অনেক সংগ্রাম করে কিছু অধিকার আদায় করেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক আইনে সেই সমতা কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ছিল একটা আপসকামী আইন, যেখানে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা আর প্রগতিশীলতার মধ্যে একটা ভারসাম্য খোঁজা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই আপসকামিতাও শেষ হতে চলেছে। হাইকোর্টের এই রায় আসলে বলে দিচ্ছে যে নারীর কোনো অধিকার নেই, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই। আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ধারণাটা
এমনিতেই সমস্যাযুক্ত। কারণ এই কাউন্সিলগুলো গঠিত হয় স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে প্রায়ই থাকেন চেয়ারম্যান, মেম্বার, আর কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। এদের মধ্যে কতজন সত্যিকারের লিঙ্গ সমতায় বিশ্বাস করেন? কতজন নারীর অধিকার নিয়ে সচেতন? বাস্তবতা হলো, এই কাউন্সিলগুলো হয় পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারক আর বাহক। এখানে একজন প্রভাবশালী পুরুষ সহজেই দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি পেয়ে যাবেন, আর তার স্ত্রী জানতেও পারবেন না কী ঘটছে তার জীবনে। জুলাই ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশে যা ঘটছে তা একটা সুপরিকল্পিত প্রতিক্রিয়াশীল পুনর্গঠন প্রকল্প। ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তিগুলো একটার পর একটা ক্ষেত্রে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বাড়ছে, ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠনগুলোকে দমন করা হচ্ছে, আর এখন নারীর আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো একটা বড় পরিকল্পনার অংশ। বিদেশি অর্থায়নের প্রশ্নটাও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ওয়াহাবি মতাদর্শ ছড়ানোর জন্য অর্থ ঢালছে। মাদ্রাসা, মসজিদ, ইসলামি সংগঠন, সবখানেই এই টাকা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পেছনেও এই বিদেশি অর্থায়নের ভূমিকা ছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন। এখন এই শক্তিগুলো ক্ষমতায় এসে তাদের মতাদর্শ রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দিচ্ছে। নারীবাদী আন্দোলনের দিক থেকে এই রায়টা একটা বিরাট ধাক্কা। কয়েক দশক ধরে নারী সংগঠনগুলো লড়াই করে আসছে পারিবারিক সহিংসতা রোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার, এসব বিষয়ে। কিছু অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সব কিছু আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। হাইকোর্টের এই রায় শুধু দ্বিতীয় বিয়ের প্রশ্নে নয়, এটা আসলে নারীর সার্বিক অধিকারের ওপর একটা আক্রমণ। বামপন্থী বিশ্লেষণে দেখলে বোঝা যায় যে এটা আসলে পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্রের একটা প্রকাশ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নারী শ্রমিক হিসেবে শোষিত হয় কর্মক্ষেত্রে, আর পরিবারে ভোগ্যপণ্য হিসেবে। এই দুই ধরনের শোষণ একসঙ্গে চলে। এখন হাইকোর্টের এই রায় নারীকে আরও বেশি অসহায় করে দিচ্ছে। একজন নারী যখন জানবেন না তার স্বামী আরেকটা বিয়ে করছে কিনা, তখন সে কীভাবে নিজের অধিকার রক্ষা করবে? কীভাবে সে আর্থিক নিরাপত্তার পরিকল্পনা করবে? এটা তাকে পুরোপুরি নির্ভরশীল আর অসহায় করে দেয়। ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক মডেলের সঙ্গে এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটা সংযোগ দেখা যায়। গ্রামীণ ব্যাংক নারীকে টার্গেট করে কারণ নারীরা ঋণ পরিশোধে বেশি নিয়মানুবর্তী। কিন্তু এর মানে এই না যে এটা নারীবান্ধব। বরং এটা নারীর দায়িত্ববোধ আর সামাজিক চাপকে ব্যবহার করে তাদের শোষণ করে। একইভাবে, পারিবারিক আইনে নারীকে অধিকারহীন রাখাও একধরনের শোষণের ব্যবস্থা। একজন নারী যখন জানবে না তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করছে, তখন সে আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, আর সেই অনিরাপত্তা তাকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলে। জামায়াত আর অন্যান্য ইসলামি সংগঠনের কাছে নারী সবসময়ই একটা সমস্যা ছিল। এরা চায় নারী ঘরে থাকবে, পর্দা করবে, স্বামীর আনুগত্য করবে, আর বেশি কিছু চাইবে না। শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি, সবখানে নারীর অংশগ্রহণ এদের কাছে অপছন্দের। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময় দেখা গেছিল কীভাবে জামায়াত মেয়েদের চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটিয়ে আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল। এরা সবসময় নারীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। এখন ক্ষমতায় এসে এরা নারীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, যেটা তাদের আসল চেহারা। হাইকোর্টের এই রায়ের ব্যাপারে সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো যে এটা বিচার ব্যবস্থার একটা রায়। বিচার বিভাগ যেটা সংবিধানের রক্ষক হওয়ার কথা, যেটা নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার কথা, সেই বিচার বিভাগই নারীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এটা দেখায় যে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানই এখন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নিয়ন্ত্রণে। আইন প্রণয়ন, বিচার, প্রশাসন, সবখানেই এখন মৌলবাদী মতাদর্শের ছাপ পড়ছে। রিটকারীরা যখন বলছেন তারা আপিল করবেন, তখন একটা আশার আলো দেখা যায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এই মামলা যাবে, আর সেখানেও একই ধরনের প্রভাব থাকতে পারে। তাছাড়া আইনি লড়াই একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আর তার মধ্যে কত নারীর জীবন বরবাদ হয়ে যাবে? কতজন নারী হঠাৎ জানতে পারবে তার স্বামী আরেকটা বিয়ে করে ফেলেছে, আর সে কিছুই করতে পারবে না? বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় তালাক নেওয়াটাও একটা নারীর জন্য অত্যন্ত কঠিন। সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক অনিরাপত্তা, সন্তানদের হেফাজত, এসব কারণে অনেক নারী অসহনীয় বিবাহিত জীবন টেনে নিয়ে যান। এখন যদি স্বামী তার অজান্তেই দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলতে পারে, তাহলে সেই নারীর অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়? সে না পারবে সংসার চালাতে, না পারবে বেরিয়ে আসতে। এটা হলো একধরনের মানসিক নির্যাতন, যেটার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রই দায়ী হয়ে যাচ্ছে। এই পুরো পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ আসলে পিছিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালে যে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, আর সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে, সেই দেশটা এখন ধর্মীয় মৌলবাদ আর পুরুষতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। ইউনূস আর জামায়াতের জোট যেটা করছে, সেটা আসলে একটা প্রতিবিপ্লব। এরা চায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করে দিতে, আর একটা পশ্চাদপদ, ধর্মান্ধ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। নারীবাদী আন্দোলনকে এখন আরও শক্তিশালী হতে হবে। শুধু আইনি লড়াই নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সব ক্ষেত্রে লড়াই চালাতে হবে। কারণ এই হাইকোর্টের রায় শুধু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা বড় আক্রমণের অংশ। আগামীতে আরও অনেক নারীবিরোধী পদক্ষেপ আসতে পারে। হয়তো তালাকের অধিকার সীমিত করা হবে, হয়তো উত্তরাধিকারে নারীর অংশ কমানো হবে, হয়তো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে বিধিনিষেধ আসবে। এসব ঠেকাতে হলে এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে। বামপন্থী রাজনীতির দায়িত্বও এখানে রয়েছে। শ্রেণি সংগ্রামের সঙ্গে লিঙ্গ সংগ্রাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকে আছে নারীর শোষণের ওপর ভিত্তি করে। ঘরে অবৈতনিক শ্রম, কর্মক্ষেত্রে কম মজুরি, পারিবারিক আইনে বৈষম্য, সব মিলিয়ে নারী একটা শোষিত শ্রেণি। এই শোষণ বন্ধ না করলে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়। তাই বাম রাজনীতিকে নারীর অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার হতে হবে, সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে হবে। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে শুধু আইনি লড়াই নয়, জনমত তৈরি করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে এটা শুধু মুসলিম নারীদের সমস্যা নয়, এটা পুরো সমাজের সমস্যা। যখন অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অধিকারহীন করে রাখা হয়, তখন পুরো সমাজই পিছিয়ে পড়ে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউনূসের ভণ্ডামিটা এখানে স্পষ্ট হয়ে যায়। একদিকে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দরিদ্র নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলেন, অন্যদিকে তার অধীনে এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা চলছে যেটা নারীর মৌলিক অধিকারই কেড়ে নিচ্ছে। এই দ্বৈততা আসলে তার শ্রেণিচরিত্রের প্রকাশ। তিনি পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিনিধি, আর পুঁজিপতিদের কাছে নারী মানে সস্তা শ্রম আর নিয়ন্ত্রিত ভোক্তা। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা নারীরা যে সুদের বোঝা বইছেন, সেটা আসলে তাদের শ্রমের শোষণ। আর এখন পারিবারিক আইনে নারীকে অধিকারহীন করে রাখাটা সেই শোষণকে আরও সহজ করে দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায়নি। ১৯৭১ সালে তিরিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, দুই লক্ষের বেশি নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এই ধর্ষণগুলো ছিল পরিকল্পিত গণহত্যার অংশ, যেখানে জামায়াতের রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। নারীর শরীর তখন যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এখন সেই একই সংগঠন যখন রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রভাব বিস্তার করে নারীর অধিকার খর্ব করছে, তখন সেটা একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ। এরা কখনো নারীকে সম্মান করেনি, মানুষ ভাবেনি। নারী তাদের কাছে সবসময়ই ছিল নিয়ন্ত্রণ আর শোষণের বস্তু। সামরিক বাহিনীর ভূমিকাটাও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেখানে সামরিক বাহিনীর সমর্থন না থাকলে সেটা সফল হতো না। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতার রাজনীতিতে জড়িত। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে এরশাদ পর্যন্ত সামরিক শাসনের ইতিহাস রয়েছে। এই সামরিক শাসকরা সবসময়ই ধর্মীয় রক্ষণশীলদের সঙ্গে আপস করেছে, কারণ সেটা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এখনও সেই একই খেলা চলছে। সামরিক বাহিনী সমর্থন দিচ্ছে, আর মৌলবাদীরা সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমেরিকা, ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো যারা সবসময় গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের কথা বলে, তারা কিন্তু ইউনূসকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। কেন? কারণ ইউনূস তাদের আর্থিক স্বার্থের সেবক। তার মাইক্রোফাইন্যান্স মডেল আসলে নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদের একটা হাতিয়ার, যেটা দরিদ্র দেশগুলোতে পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটায়। তাই পশ্চিমা শক্তিগুলো ইউনূসকে রক্ষা করছে, তার সরকারকে বৈধতা দিচ্ছে, আর সেই সরকারের অধীনে যা ঘটছে তাতে চোখ বন্ধ করে আছে। হাইকোর্টের রায়ে আরেকটা যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে মুসলিম পারিবারিক আইনে সরাসরি স্ত্রীর অনুমতির কথা বলা নেই। এটা একটা আইনের ফস্কা গেঁড়ো। কারণ ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশে যেভাবে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির কথা বলা হয়েছিল, সেখানে ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে স্ত্রীকে জানানো হবে আর তার মতামত নেওয়া হবে। নইলে আরবিট্রেশন কাউন্সিল কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে? কিন্তু হাইকোর্ট এখন সেই ব্যাখ্যা বদলে দিয়ে বলছে যে স্ত্রীর মতামত জরুরি নয়। এটা আসলে আইনের চেতনাকে হত্যা করা। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার কথাও এসেছে রায়ে। এই ধারায় বলা ছিল যে স্বামী বা স্ত্রীর জীবদ্দশায় আরেকটা বিয়ে করলে সাত বছরের কারাদণ্ড হবে। এটা ছিল সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ১৯৬১ সালে মুসলিমদের জন্য আলাদা আইন করে সেই শাস্তি কমিয়ে এক বছর বা দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এটা নিজেই একটা বৈষম্য ছিল। এখন হাইকোর্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছে যে স্ত্রীর অনুমতিই লাগবে না। এভাবে ধাপে ধাপে নারীর অধিকার কেটে ছোট করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ আর ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের সমতার কথা বলা আছে। বলা আছে যে রাষ্ট্র নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য করবে না। কিন্তু পারিবারিক আইনে এই সমতা কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, বিয়ে-তালাক, সন্তানের হেফাজত, সবক্ষেত্রেই নারী পুরুষের চেয়ে কম অধিকার পায়। এই বৈষম্যকে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের নামে বৈধতা দেওয়া হয়। কিন্তু মৌলিক অধিকার তো ধর্মের ঊর্ধ্বে। সংবিধান যদি সমতার কথা বলে, তাহলে পারিবারিক আইনেও সেই সমতা থাকতে হবে। নইলে সংবিধান হয়ে দাঁড়ায় শুধু কাগজের লেখা। নারীবাদী আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা সমান পারিবারিক আইনের দাবি তুলছেন। যেখানে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হবে, নারী-পুরুষ সমান অধিকার পাবে। কিন্তু এই দাবি সবসময় ধর্মীয় রক্ষণশীলদের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। তারা বলে যে এটা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। কিন্তু আসলে ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে নারীর অধিকার হরণ করা হচ্ছে। কারণ ধর্মীয় আইনগুলো তৈরি হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, পুরুষদের দ্বারা, পুরুষের স্বার্থে। নারীর কণ্ঠস্বর সেখানে কখনো ছিল না। ইউনূস সরকারের অধীনে বাংলাদেশে আরও কী কী পরিবর্তন আসছে সেটা দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে শিক্ষাক্রমে পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাড়ানো হবে আর বিজ্ঞান শিক্ষা কমানো হবে। মিডিয়ায় সেন্সরশিপ বাড়ছে, প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর দমন করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বাড়ছে, তাদের সম্পত্তি দখল হচ্ছে। এসব একটা বড় পরিকল্পনার অংশ, যেটার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটা ধর্মভিত্তিক, পশ্চাদপদ রাষ্ট্রে পরিণত করা। আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনকেও সংযুক্ত হতে হবে। কারণ এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার আক্রান্ত হচ্ছে। আফগানিস্তানে তালেবান নারীকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে, ইরানে হিজাব না পরায় নারীকে হত্যা করা হচ্ছে, আমেরিকায় গর্ভপাতের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এসব ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঘটলেও মূল লড়াইটা একই – নারীর শরীর আর জীবনের ওপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকেও এখন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে অনেক প্রগতিশীল দল নারীর অধিকারের প্রশ্নে আপসকামী থেকেছে। ধর্মীয় ভোট ব্যাংকের ভয়ে তারা এই বিষয়ে সোচ্চার হতে চায় না। কিন্তু এই আপসকামিতা আর চলতে পারে না। কারণ যে শক্তিগুলো এখন ক্ষমতায় আছে, তারা শুধু নারীর অধিকার নয়, সব ধরনের প্রগতিশীলতার বিরোধী। তাই এই লড়াইটা সবার লড়াই। শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও এই নারী আন্দোলনকে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে যে লক্ষ লক্ষ নারী কাজ করছেন, তারা দ্বিগুণ শোষণের শিকার। কারখানায় কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ পরিবেশ, আর ঘরে ফিরে গৃহস্থালি কাজের বোঝা। তারপর যদি স্বামী হঠাৎ দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলে, তাহলে তার জীবনে আর্থিক অনিরাপত্তা আরও বেড়ে যায়। তাই শ্রমিক অধিকার আর নারী অধিকার একসঙ্গে লড়তে হবে। যে রিট আবেদনটি হাইকোর্টে করা হয়েছিল, সেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার আর সুরক্ষার কথা বলা হয়েছিল। এটা ছিল একটা ন্যায্য দাবি। কিন্তু হাইকোর্ট সেই দাবি খারিজ করে উল্টো নারীর অধিকার কেড়ে নিলো। রিটকারীরা এখন আপিল করবেন বলেছেন। কিন্তু আপিল প্রক্রিয়া দীর্ঘ, আর তার ফলাফল অনিশ্চিত। এর মধ্যে এই রায়ের প্রভাবে কতজন পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলবে, কতজন নারীর জীবন বিপর্যস্ত হবে, সেটা ভাবলে শঙ্কিত হতে হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা ঠিকই বলেছেন যে এই রায় সামাজিক অসাম্য আর পারিবারিক অস্থিরতা বাড়াবে। বহুবিবাহের ফলে প্রথম স্ত্রী আর সন্তানরা অবহেলিত হয়। পরিবারের সম্পদ ভাগ হয়ে যায়। স্ত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। সন্তানরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয় নারীরা, যাদের কোনো কথা বলার ক্ষমতা নেই। ইউনূস আর জামায়াতের এই জোট আসলে শ্রেণি আর ধর্মীয় মৌলবাদের একটা মিশ্রণ। ইউনূস প্রতিনিধিত্ব করছে নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদের, যেখানে দরিদ্রের শোষণকে ক্ষুদ্রঋণের মোড়কে বৈধতা দেওয়া হয়। আর জামায়াত প্রতিনিধিত্ব করছে ধর্মীয় মৌলবাদের, যেখানে নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে রাখা হয়। এই দুই শক্তি একসঙ্গে মিলে বাংলাদেশকে একটা পশ্চাদপদ, শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচার। সেই চেতনার সঙ্গে এই হাইকোর্টের রায় সম্পূর্ণ বিপরীত। যে দেশে ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন একটা স্বাধীন, প্রগতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, সেই দেশ এখন পিছিয়ে যাচ্ছে মধ্যযুগের দিকে। এটা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি অপমান, বীরাঙ্গনাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের একটা গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন থেকে শুরু করে ইলা মিত্র, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, জাহানারা ইমাম, এমন অসংখ্য নারী এই দেশে লড়াই করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে নারীরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, অকল্পনীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন। সেই ঐতিহ্য এখনও জীবিত আছে। বাংলাদেশের নারীরা আবারও লড়বে, আবারও জিতবে। কারণ ইতিহাস বলে যে প্রতিক্রিয়াশীলতা শেষ পর্যন্ত হারতে বাধ্য। প্রগতি হয়তো ধীর, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। আর সেই প্রগতির পথে নারীর অধিকার একটা মৌলিক শর্ত।



