ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
বিশ্ববাজারে টানা কমছে জ্বালানি তেলের দাম, বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই দেশের বাজারে
অনুমোদন পেল ৪ ডিজিটাল ব্যাংক
বিশ্ববাজারে আরও বাড়ল তেলের দাম
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বহুমুখী চাপে রপ্তানিকারকেরা, বিপর্যস্ত অর্থনীতি
বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম, দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুরু: দক্ষিনাঞ্চলে যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা বাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত
দ্রব্যমূল্যে নাভিশ্বাস চরমে নিম্ন আয়ের মানুষেঃ তবুও কোথাও দেখা মিলছে না ‘টিসিবির ট্রাকসেল’
সারাবিশ্বে স্টার্টআপ বিনিয়োগে জোয়ার: বাংলাদেশে ৫ বছরের সর্বনিম্নে, ১ বছরেই ৯৫ শতাংশ ধস
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশ্বজুড়ে যখন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল খাতে বিনিয়োগের জোয়ার চলছে, তখন বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে রিস্ক ক্যাপিটাল বা ঝুঁকিপূর্ণ মূলধন আকর্ষণে দেশের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
লাইটক্যাসল পার্টনারসের ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট এইচ১ ২০২৬’ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের স্টার্টআপগুলো মাত্র ৬ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করতে পেরেছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১২০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অর্থায়ন কমেছে ৯৫ শতাংশ। চারটি কোম্পানির মোট ছয়টি চুক্তির মাধ্যমে এই অর্থ এসেছে। প্রতিটি চুক্তির গড় আকার ছিল প্রায়
১ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ যখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, ঠিক সেই সময়েই বাংলাদেশে এমন বড় ধস দেখা গেল। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপগুলো ৫১০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড অর্থায়ন পেয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক স্টার্টআপ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ২৬০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের পুরো বছরে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ অর্থ স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ হয়েছিল, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের অর্থায়ন তার চেয়েও বেশি। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশের স্টার্টআপে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলছেন। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জটিলতা, বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার
বা এক্সিটের সীমিত সুযোগ এবং দেশীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের দুর্বল অংশগ্রহণ। লাইটক্যাসলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখনো স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগে রূপ নিতে পারেনি। চালডালের সিইও ওয়াসিম আলিমের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং তহবিল স্থানান্তরের জটিলতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার ওপর চাপ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক অর্থায়নকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চঝুঁকির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরও সতর্ক হয়ে উঠছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে বলেও মনে করেন ওয়াসিম। তাঁর ভাষ্য, স্টার্টআপ নিবন্ধন, বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন, শেয়ার হস্তান্তর, কোম্পানির
মূল্যায়ন, কর পরিশোধ এবং মুনাফা দেশে ফিরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলোতে প্রায়ই সরকারের একাধিক সংস্থার মাধ্যমে পৃথক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে স্টার্টআপগুলোর প্রতিটি চুক্তির গড় আকার ছিল প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার। মোট অর্থায়নের প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে সবচেয়ে বড় তিনটি চুক্তি থেকে। এ সময়ে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর অর্থায়নে প্রধান উৎস হিসেবে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অবস্থান ধরে রেখেছে। মোট ৬ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার বা ৬৬ শতাংশ এসেছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে। তবে এক বছর আগে মোট অর্থায়নে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অংশ ছিল ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ এ খাতের অংশগ্রহণের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্টার্টআপগুলোর সব
অর্থায়নই এসেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। কোনো দেশীয় বিনিয়োগকারী এসব চুক্তিতে অংশ নেয়নি। অর্থায়নের প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার গেছে আর্লি-স্টেজের স্টার্টআপগুলোর কাছে। অনুদান, সিড এবং ‘প্রি-সিরিজ এ’ রাউন্ডের মাধ্যমে এসব অর্থায়ন হয়েছে। এর বিপরীতে একটি ‘সিরিজ এ’ চুক্তিতে অর্থায়ন হয়েছে মাত্র ৬ লাখ ২৫ হাজার ডলার। লেট-স্টেজ অর্থায়ন কার্যত ছিল না বললেই চলে। বিনিয়োগের খাতভিত্তিক চিত্রেও পরিবর্তন দেখা গেছে। সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি খাতে এসেছে ২ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার, যা মোট অর্থায়নের ৩৫ শতাংশ। আর্থিক সেবা খাতে বিনিয়োগ এসেছে ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার বা ২৯ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাত পেয়েছে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার, যা মোট
অর্থায়নের ২৬ শতাংশ। বাকি ৬ লাখ ডলার গেছে লজিস্টিকস ও মবিলিটি খাতে। খাতভিত্তিক এই পরিবর্তনটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কারণ ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের স্টার্টআপে মোট অর্থায়নের ৯২ শতাংশই গিয়েছিল আর্থিক সেবা খাতে। বাংলাদেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ কমে যাওয়ার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপ অর্থায়নে বড় ধরনের জোয়ার দেখা গেছে। এর মধ্যে মোট বৈশ্বিক অর্থায়নের ৭৪ শতাংশই পেয়েছে এআইভিত্তিক স্টার্টআপগুলো। এশিয়ায় এই বিনিয়োগের বড় অংশ পেয়েছে চীন, ভারত ও সিঙ্গাপুর। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট চুক্তির ওপর ভর করে এসব দেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ ২৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার ঘাটতি
নয়; বরং বিনিয়োগের পরিবেশের সীমাবদ্ধতা। তাঁদের মতে, বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিবেশ দেশের সম্ভাবনাকে বিনিয়োগযোগ্য ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপান্তরকে কঠিন করে তুলছে। বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাশরুর বলেন, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো ঝুঁকি নেওয়ার শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, দেশের বিনিয়োগকারীরা এখনো জমি, রিয়েল এস্টেট, শেয়ারবাজার, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা এবং প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন। ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘স্টার্টআপ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, ব্যবসা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা মেনে নিতে হয় এবং এক্সিটের সীমিত সুযোগ নিয়ে কাজ করতে হয়।’ বিশেষ করে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলের ক্ষেত্রে কার্যকর এক্সিট মার্কেটের অনুপস্থিতিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো স্টার্টআপ সফল হলেও শেয়ার বিক্রি, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ কিংবা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ দেশে সীমিত। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও বড় উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেন ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, ‘একটি দেশে বিনিয়োগের সময় আন্তর্জাতিক তহবিলগুলো কেবল ব্যবসার সম্ভাবনাই দেখে না। তারা আরও ভেবে দেখে, কত সহজে দেশে মূলধন প্রবেশ করতে পারে, কীভাবে মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নেওয়া যায়, শেয়ার বিক্রির অর্থ কীভাবে বিদেশে নেওয়া যায় এবং সর্বোপরি কীভাবে তারা শেষপর্যন্ত বিনিয়োগ তুলে নিতে পারে।’ লাইটক্যাসলের তথ্য বলছে, ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো ৪৮৫টি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ৯২ শতাংশেরও বেশি অর্থ এসেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। দীর্ঘ সময়ের এই মোট বিনিয়োগের প্রায় ৬২ শতাংশই গেছে আর্থিক সেবা খাতে। এরপর রয়েছে লজিস্টিকস ও মবিলিটি এবং ই-কমার্স খাত। দেশের স্টার্টআপ খাতে মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৬ শতাংশ এসেছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে। অন্যদিকে আর্লি-স্টেজ অর্থায়নের অংশ ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ। মাথাপিছু হিসাবে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ০ দশমিক ৩০ ডলার। এই পরিসংখ্যান দেশের ভেঞ্চার ইকোসিস্টেমের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থার চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও শওকত হোসেন বলেন, এক দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশ হতাশাজনক। ‘গত ১২ বছরে এই ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ খুব বেশি কিছু নয়,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকাশ ও শপআপে আসা বড় বিনিয়োগগুলো বাদ দিলে মোট অর্থের পরিমাণ আরও অনেক কমে যাবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো ধীরগতির ও জটিল বলে মন্তব্য করেন শওকত হোসেন। একই সঙ্গে স্টার্টআপ খাত সম্পর্কে ধারণা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতিও অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। নীতিগত জটিলতার কারণে অনেক বাংলাদেশি স্টার্টআপ বাধ্য হয়ে সিঙ্গাপুর অথবা দুবাইয়ে নিবন্ধিত হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, এর ফলে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের ‘স্টার্টআপ-ফার্স্ট’ নীতি বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ‘বাংলাদেশেরও এমন নীতি প্রয়োজন,’ উল্লেখ করে শওকত হোসেন ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন, বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগ এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অন্যান্য শহরে স্টার্টআপের বিকাশে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে এই ইকোসিস্টেমকে ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ যখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, ঠিক সেই সময়েই বাংলাদেশে এমন বড় ধস দেখা গেল। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপগুলো ৫১০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড অর্থায়ন পেয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক স্টার্টআপ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ২৬০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের পুরো বছরে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ অর্থ স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগ হয়েছিল, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের অর্থায়ন তার চেয়েও বেশি। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশের স্টার্টআপে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলছেন। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জটিলতা, বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার
বা এক্সিটের সীমিত সুযোগ এবং দেশীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের দুর্বল অংশগ্রহণ। লাইটক্যাসলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখনো স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগে রূপ নিতে পারেনি। চালডালের সিইও ওয়াসিম আলিমের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং তহবিল স্থানান্তরের জটিলতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার ওপর চাপ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক অর্থায়নকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চঝুঁকির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরও সতর্ক হয়ে উঠছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে বলেও মনে করেন ওয়াসিম। তাঁর ভাষ্য, স্টার্টআপ নিবন্ধন, বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন, শেয়ার হস্তান্তর, কোম্পানির
মূল্যায়ন, কর পরিশোধ এবং মুনাফা দেশে ফিরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলোতে প্রায়ই সরকারের একাধিক সংস্থার মাধ্যমে পৃথক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে স্টার্টআপগুলোর প্রতিটি চুক্তির গড় আকার ছিল প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার। মোট অর্থায়নের প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে সবচেয়ে বড় তিনটি চুক্তি থেকে। এ সময়ে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর অর্থায়নে প্রধান উৎস হিসেবে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অবস্থান ধরে রেখেছে। মোট ৬ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার বা ৬৬ শতাংশ এসেছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে। তবে এক বছর আগে মোট অর্থায়নে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অংশ ছিল ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ এ খাতের অংশগ্রহণের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্টার্টআপগুলোর সব
অর্থায়নই এসেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। কোনো দেশীয় বিনিয়োগকারী এসব চুক্তিতে অংশ নেয়নি। অর্থায়নের প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার গেছে আর্লি-স্টেজের স্টার্টআপগুলোর কাছে। অনুদান, সিড এবং ‘প্রি-সিরিজ এ’ রাউন্ডের মাধ্যমে এসব অর্থায়ন হয়েছে। এর বিপরীতে একটি ‘সিরিজ এ’ চুক্তিতে অর্থায়ন হয়েছে মাত্র ৬ লাখ ২৫ হাজার ডলার। লেট-স্টেজ অর্থায়ন কার্যত ছিল না বললেই চলে। বিনিয়োগের খাতভিত্তিক চিত্রেও পরিবর্তন দেখা গেছে। সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি খাতে এসেছে ২ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার, যা মোট অর্থায়নের ৩৫ শতাংশ। আর্থিক সেবা খাতে বিনিয়োগ এসেছে ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার বা ২৯ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাত পেয়েছে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার, যা মোট
অর্থায়নের ২৬ শতাংশ। বাকি ৬ লাখ ডলার গেছে লজিস্টিকস ও মবিলিটি খাতে। খাতভিত্তিক এই পরিবর্তনটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কারণ ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের স্টার্টআপে মোট অর্থায়নের ৯২ শতাংশই গিয়েছিল আর্থিক সেবা খাতে। বাংলাদেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ কমে যাওয়ার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপ অর্থায়নে বড় ধরনের জোয়ার দেখা গেছে। এর মধ্যে মোট বৈশ্বিক অর্থায়নের ৭৪ শতাংশই পেয়েছে এআইভিত্তিক স্টার্টআপগুলো। এশিয়ায় এই বিনিয়োগের বড় অংশ পেয়েছে চীন, ভারত ও সিঙ্গাপুর। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট চুক্তির ওপর ভর করে এসব দেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ ২৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার ঘাটতি
নয়; বরং বিনিয়োগের পরিবেশের সীমাবদ্ধতা। তাঁদের মতে, বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিবেশ দেশের সম্ভাবনাকে বিনিয়োগযোগ্য ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপান্তরকে কঠিন করে তুলছে। বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাশরুর বলেন, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো ঝুঁকি নেওয়ার শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, দেশের বিনিয়োগকারীরা এখনো জমি, রিয়েল এস্টেট, শেয়ারবাজার, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা এবং প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন। ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘স্টার্টআপ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, ব্যবসা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা মেনে নিতে হয় এবং এক্সিটের সীমিত সুযোগ নিয়ে কাজ করতে হয়।’ বিশেষ করে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলের ক্ষেত্রে কার্যকর এক্সিট মার্কেটের অনুপস্থিতিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো স্টার্টআপ সফল হলেও শেয়ার বিক্রি, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ কিংবা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ দেশে সীমিত। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও বড় উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেন ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, ‘একটি দেশে বিনিয়োগের সময় আন্তর্জাতিক তহবিলগুলো কেবল ব্যবসার সম্ভাবনাই দেখে না। তারা আরও ভেবে দেখে, কত সহজে দেশে মূলধন প্রবেশ করতে পারে, কীভাবে মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নেওয়া যায়, শেয়ার বিক্রির অর্থ কীভাবে বিদেশে নেওয়া যায় এবং সর্বোপরি কীভাবে তারা শেষপর্যন্ত বিনিয়োগ তুলে নিতে পারে।’ লাইটক্যাসলের তথ্য বলছে, ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো ৪৮৫টি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ৯২ শতাংশেরও বেশি অর্থ এসেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। দীর্ঘ সময়ের এই মোট বিনিয়োগের প্রায় ৬২ শতাংশই গেছে আর্থিক সেবা খাতে। এরপর রয়েছে লজিস্টিকস ও মবিলিটি এবং ই-কমার্স খাত। দেশের স্টার্টআপ খাতে মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৬ শতাংশ এসেছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে। অন্যদিকে আর্লি-স্টেজ অর্থায়নের অংশ ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ। মাথাপিছু হিসাবে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ০ দশমিক ৩০ ডলার। এই পরিসংখ্যান দেশের ভেঞ্চার ইকোসিস্টেমের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থার চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও শওকত হোসেন বলেন, এক দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশ হতাশাজনক। ‘গত ১২ বছরে এই ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ খুব বেশি কিছু নয়,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকাশ ও শপআপে আসা বড় বিনিয়োগগুলো বাদ দিলে মোট অর্থের পরিমাণ আরও অনেক কমে যাবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো ধীরগতির ও জটিল বলে মন্তব্য করেন শওকত হোসেন। একই সঙ্গে স্টার্টআপ খাত সম্পর্কে ধারণা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতিও অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। নীতিগত জটিলতার কারণে অনেক বাংলাদেশি স্টার্টআপ বাধ্য হয়ে সিঙ্গাপুর অথবা দুবাইয়ে নিবন্ধিত হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, এর ফলে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের ‘স্টার্টআপ-ফার্স্ট’ নীতি বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ‘বাংলাদেশেরও এমন নীতি প্রয়োজন,’ উল্লেখ করে শওকত হোসেন ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন, বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগ এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অন্যান্য শহরে স্টার্টআপের বিকাশে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে এই ইকোসিস্টেমকে ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।



