ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আরও খবর
বাজারে ক্রেতাদের ক্ষোভ: “আলহামদুলিল্লাহ, পেঁপে-কুমড়া এখনও ৮০ টাকার নিচে, তারেক ভাইয়াকে ধন্যবাদ”
সরকারি জমি দখল করে জামায়াত আমির বললেন, “এখন আমাদের সময়”
‘জুলাইবিরোধী’ ভূমিকায় অভিযুক্ত, ১৪৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর
শ্রীলঙ্কার তৎপরতায় সৌদিতে নবী অবমাননায় লংকান যুবকের মৃত্যুদণ্ড রদ, অথচ বাংলাদেশি প্রেমিক যুগলের মৃত্যুদণ্ডে বেখবর মিশন ও দুই মন্ত্রণালয়
একটির খরচে ৫টি নির্মাণের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল: ৩য় এলএনজি টার্মিনালে ব্যয় বৃদ্ধি ৩৫-৩৭ শতাংশ
নেত্রকোনায় দোকানে বসে থাকা সাংবাদিককে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা
কাজ নাই, তাই বেতনও নাই: ৫ পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা
‘ব্লাডমানি’ দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশির জীবন রক্ষা করেছিল শেখ হাসিনার সরকার, অথচ অলক্ষ্যে সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
২০১০ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মুক্ত করতে ৯৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা “ব্লাডমানি” দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। আজ মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় এবার সামনে এসেছে প্রবাসী নাগরিকদের জীবন রক্ষায় সরকারের ভূমিকা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে হস্তক্ষেপের উদ্যোগ আত তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে বিদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের মুক্ত করতে অতীতে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার নজির থাকায় সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নতুন করে সেই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে তুলনার অবকাশ তৈরি করেছে।
২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ড থেকে
মুক্ত করতে ক্ষতিপূরণ বা ‘ব্লাডমানি’ পরিশোধের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার বিপরীতে সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কনস্যুলেট বা পররাষ্ট্রও মন্ত্রনালয় এই বিষয়ে কিছুই না জানা, এবং বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়াই এই সম্পর্কিত কোন তথ্য প্রকাশ্য না আসার বিষয়টি আলোচনা শরু হয়েছে। ২০০৭ সালের মৃত্যুদণ্ডের সাজাঃ ২০১০ সালে মুক্তি পান ছয় বাংলাদেশি ২০১০ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০০৭ সালে এক পাকিস্তানি নাগরিককে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার ৯৫ লাখ
৭০ হাজার টাকা ব্লাডমানি পরিশোধ করে। তৎকালীন সংসদ সদস্য মঈনউদ্দীন খান বাদলের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রম মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। Agence France Presse (AP) সুত্রে প্রকাশিত সংবাদের আর্কাইভ কপি ২০০৭ সালে আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানি শ্রমিক বাংলাদেশ সম্পর্কে বাংলাদেশি রুমমেটদের সামনে অত্যন্ত অপমানজনক ও বাজে মন্তব্য করলে ঝগড়ার সূত্রপাত হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে সেই পাকিস্তানিকে বটি দিয়ে আক্রমণ করে হত্যা করে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী শ্রমিকরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরে এই বাংলাদেশী শ্রমিকদের জীবন
বাঁচাতে এবং মুক্ত করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। ইসলামিক শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, নিহতের পরিবার যদি হত্যাকারীদের ক্ষমা করতে রাজি হয়, তবে রক্তপণ বা ‘দিয়াহ’ পরিশোধের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে সম্পূর্ণ ব্লাড মানি হিসেবে ৯.৫৭ মিলিয়ন টাকা (প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার) পরিশোধ করা হয়। আরব আমিরাতের সংব্দা সংস্থা ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ করে ১৬ই মে, ২০১০ তারিখের সংবাদ। সংবাদের লিংকঃ Six freed after Bangladesh pays blood money আইন অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে ব্লাডমানি পরিশোধের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। ছয় শ্রমিকের পরিবারের
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারই সেই অর্থ পরিশোধ করে। এর ফলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিক মুক্তি পান। এ ঘটনাটি বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া নাগরিকদের জন্য সরকারের আর্থিক সহায়তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের একটি উল্লেখযোগ্য নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অন্যদিকে, সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা অঞ্চলে একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ কার্যকর করা হয়। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, তদন্তের পর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং আদালত শরিয়াহ আইনের ‘তাআজির’ বিধানের
অধীনে মৃত্যুদণ্ড দেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে কথিত অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন কী ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল। জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের এ বিষয়ে অবহিত করেনি। পরে কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে বিষয়টির স্বীকৃতি চেয়েছে। এ তথ্য থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কনস্যুলেটের কাছে আগাম তথ্য ছিল না বলে মিশন জানিয়েছে। তবে বিচার চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আইনি সহায়তা,
যোগাযোগ বা কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারের দায়িত্ব ও কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন দুটি ঘটনার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেই বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের মাধমে সংশ্লিষ্ট সৌদি করতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে, এবং ছয় বাংলাদেশীর জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ তৎপরতা চালায়। ব্লাডমানি পরিশোধ করে ছয় শ্রমিকের মুক্তির ব্যবস্থা করতে পেরেছিল। আর মক্কার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বাংলাদেশের কনস্যুলেট জানিয়েছে, তারা আগাম কোনো বিজ্ঞপ্তি পায়নি। ২০০৯–২০১০ সালের উদ্যোগে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ বরাদ্দ ও মুক্তির ব্যবস্থা করার একটি সুস্পষ্ট ফলাফল ছিল। সৌদি আরবের ঘটনায় প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি মিশন ঘটনাটির বিস্তারিত জানার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দুটি ঘটনার আইনি ও বাস্তব পরিস্থিতি এক নয়। আমিরাতের ঘটনায় হত্যার মামলায় ব্লাডমানি পরিশোধের মাধ্যমে মুক্তির সুযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরবের ঘটনায় আদালতের রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাই একই ধরনের ফলাফল অর্জন করা সম্ভব ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য সৌদি আরবের বিচারপ্রক্রিয়া, দণ্ড মওকুফের সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। তবু এই তুলনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য সরকারের আগাম সতর্কতা, কনস্যুলার সহায়তা, আইনি প্রতিনিধিত্ব এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা কার্যকর? প্রবাসীদের জীবন রক্ষায় আগাম উদ্যোগ কতটা জরুরি? বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের কেউ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে বা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হলে, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান রেখেই বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব থাকে নাগরিকের অধিকার রক্ষায় যথাসম্ভব কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। ২০১০ সালের আমিরাতের ঘটনায় সরকারের অর্থনৈতিক সহায়তা ছয় বাংলাদেশির মুক্তির পথ তৈরি করেছিল। মক্কার সাম্প্রতিক ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত না করার তথ্য সামনে আসায় কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রবাসী নাগরিকদের মামলা পর্যবেক্ষণের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ: দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা চলাকালে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট কি কোনো তথ্য পেয়েছিল? তাঁদের আইনি প্রতিনিধিত্ব বা কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল কি? মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত হওয়ার আগে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বা দণ্ড মওকুফের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি? ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রবাসীদের গুরুতর ফৌজদারি মামলা দ্রুত শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সব মিলিয়ে, ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মুক্ত করতে ব্লাডমানি পরিশোধের ঘটনা এবং ২০২৬ সালে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রথম ঘটনায় সরকারের উদ্যোগে ছয়জনের মুক্তি নিশ্চিত হয়েছিল; দ্বিতীয় ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কূটনৈতিক মিশনের ব্যার্থতার তথ্য সামনে এসেছে। এ
মুক্ত করতে ক্ষতিপূরণ বা ‘ব্লাডমানি’ পরিশোধের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার বিপরীতে সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কনস্যুলেট বা পররাষ্ট্রও মন্ত্রনালয় এই বিষয়ে কিছুই না জানা, এবং বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়াই এই সম্পর্কিত কোন তথ্য প্রকাশ্য না আসার বিষয়টি আলোচনা শরু হয়েছে। ২০০৭ সালের মৃত্যুদণ্ডের সাজাঃ ২০১০ সালে মুক্তি পান ছয় বাংলাদেশি ২০১০ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০০৭ সালে এক পাকিস্তানি নাগরিককে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার ৯৫ লাখ
৭০ হাজার টাকা ব্লাডমানি পরিশোধ করে। তৎকালীন সংসদ সদস্য মঈনউদ্দীন খান বাদলের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রম মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। Agence France Presse (AP) সুত্রে প্রকাশিত সংবাদের আর্কাইভ কপি ২০০৭ সালে আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানি শ্রমিক বাংলাদেশ সম্পর্কে বাংলাদেশি রুমমেটদের সামনে অত্যন্ত অপমানজনক ও বাজে মন্তব্য করলে ঝগড়ার সূত্রপাত হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে সেই পাকিস্তানিকে বটি দিয়ে আক্রমণ করে হত্যা করে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী শ্রমিকরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরে এই বাংলাদেশী শ্রমিকদের জীবন
বাঁচাতে এবং মুক্ত করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। ইসলামিক শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, নিহতের পরিবার যদি হত্যাকারীদের ক্ষমা করতে রাজি হয়, তবে রক্তপণ বা ‘দিয়াহ’ পরিশোধের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে সম্পূর্ণ ব্লাড মানি হিসেবে ৯.৫৭ মিলিয়ন টাকা (প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার) পরিশোধ করা হয়। আরব আমিরাতের সংব্দা সংস্থা ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশ করে ১৬ই মে, ২০১০ তারিখের সংবাদ। সংবাদের লিংকঃ Six freed after Bangladesh pays blood money আইন অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে ব্লাডমানি পরিশোধের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। ছয় শ্রমিকের পরিবারের
আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারই সেই অর্থ পরিশোধ করে। এর ফলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিক মুক্তি পান। এ ঘটনাটি বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হওয়া নাগরিকদের জন্য সরকারের আর্থিক সহায়তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের একটি উল্লেখযোগ্য নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর অন্যদিকে, সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা অঞ্চলে একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ কার্যকর করা হয়। তাঁদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, তদন্তের পর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং আদালত শরিয়াহ আইনের ‘তাআজির’ বিধানের
অধীনে মৃত্যুদণ্ড দেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে কথিত অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন কী ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল। জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের এ বিষয়ে অবহিত করেনি। পরে কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে বিষয়টির স্বীকৃতি চেয়েছে। এ তথ্য থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কনস্যুলেটের কাছে আগাম তথ্য ছিল না বলে মিশন জানিয়েছে। তবে বিচার চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আইনি সহায়তা,
যোগাযোগ বা কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারের দায়িত্ব ও কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন দুটি ঘটনার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেই বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের মাধমে সংশ্লিষ্ট সৌদি করতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে, এবং ছয় বাংলাদেশীর জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ তৎপরতা চালায়। ব্লাডমানি পরিশোধ করে ছয় শ্রমিকের মুক্তির ব্যবস্থা করতে পেরেছিল। আর মক্কার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বাংলাদেশের কনস্যুলেট জানিয়েছে, তারা আগাম কোনো বিজ্ঞপ্তি পায়নি। ২০০৯–২০১০ সালের উদ্যোগে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ বরাদ্দ ও মুক্তির ব্যবস্থা করার একটি সুস্পষ্ট ফলাফল ছিল। সৌদি আরবের ঘটনায় প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি মিশন ঘটনাটির বিস্তারিত জানার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দুটি ঘটনার আইনি ও বাস্তব পরিস্থিতি এক নয়। আমিরাতের ঘটনায় হত্যার মামলায় ব্লাডমানি পরিশোধের মাধ্যমে মুক্তির সুযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরবের ঘটনায় আদালতের রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাই একই ধরনের ফলাফল অর্জন করা সম্ভব ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য সৌদি আরবের বিচারপ্রক্রিয়া, দণ্ড মওকুফের সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। তবু এই তুলনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য সরকারের আগাম সতর্কতা, কনস্যুলার সহায়তা, আইনি প্রতিনিধিত্ব এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা কার্যকর? প্রবাসীদের জীবন রক্ষায় আগাম উদ্যোগ কতটা জরুরি? বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের কেউ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে বা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হলে, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান রেখেই বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব থাকে নাগরিকের অধিকার রক্ষায় যথাসম্ভব কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। ২০১০ সালের আমিরাতের ঘটনায় সরকারের অর্থনৈতিক সহায়তা ছয় বাংলাদেশির মুক্তির পথ তৈরি করেছিল। মক্কার সাম্প্রতিক ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত না করার তথ্য সামনে আসায় কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রবাসী নাগরিকদের মামলা পর্যবেক্ষণের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ: দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা চলাকালে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট কি কোনো তথ্য পেয়েছিল? তাঁদের আইনি প্রতিনিধিত্ব বা কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল কি? মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত হওয়ার আগে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বা দণ্ড মওকুফের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি? ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রবাসীদের গুরুতর ফৌজদারি মামলা দ্রুত শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সব মিলিয়ে, ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ছয় বাংলাদেশি শ্রমিককে মুক্ত করতে ব্লাডমানি পরিশোধের ঘটনা এবং ২০২৬ সালে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রথম ঘটনায় সরকারের উদ্যোগে ছয়জনের মুক্তি নিশ্চিত হয়েছিল; দ্বিতীয় ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কূটনৈতিক মিশনের ব্যার্থতার তথ্য সামনে এসেছে। এ



