বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা, সেই পুরনো স্ক্রিপ্ট
সত্য আর মিথ্যার মোটা দাগের পার্থক্য- সত্য বলতে কোনও কসরৎ করতে হয় না। মিথ্যা বলতে গেলে ভেবে-চিন্তে নিখুঁতভাবে মাপজোখ করে বিশ্বাসযোগ্য বানিয়ে বলতে হয়। এই যে অগ্রণী ব্যাংকের লকারে (একটি প্রতিষ্ঠিত দৈনিকে আবার ভল্ট বলা হয়েছে)! শেখ হাসিনার ৮৩২ ভরি স্বর্ণালঙ্কার পাওয়ার খবর প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে এই মোটা দাগের পার্থক্যটি ধরা পড়েছে। সাধারণ বিবেচনায় কী বলে? সেনাবাহিনী, এসএসএফ, পুলিশ, বিজিবিসহ নানা স্তরের নিরাপত্তা বলয়ে সুরক্ষিত ছিলো শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় গণভবন। কমনসেন্স বলে দামী স্বর্ণালঙ্কার সেখানেই রাখার কথা। তা না করে তিনি দোনলা বন্দুকধারী ব্যাংকে রাখবেন কেন? দ্বিতীয়তঃ ৯ বাই ১৪ বাই ২৩ ইঞ্চি লকারে ৮৩২ ভরি বা প্রায় ১০ কেজি অলঙ্কার কি করে থাকে? তার উপর প্রদর্শীত স্বণালঙ্কারের বেশ কয়েকটিতে পুথি, পাথরও আছে। কেবলমাত্র বার বানিয়েই রাখা সম্ভব। তৃতীয়তঃ বলা হয়েছে, ‘আদালতের অনুমতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিনিধি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সিআইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তার উপস্থিতিতে লকার দুটি ভাঙা হয়।’ আইনমতে প্রতিটি লকারের জন্য দুটি করে চাবি থাকে, একটি যিনি লকার ভাড়া নেন তার কাছে অন্যটি ব্যাংকের কাছে থাকে। লকার খুলতে হলে দু’জনের চাবি লাগবে। শেখ হাসিনার যে চাবি আছে সেটা ছাড়া লকার খুলতে হলে ডুপ্লিকেট চাবি তৈরি করতে হবে। সেজন্য ডুপ্লিকেট চাবির জন্য থানায় ডায়েরি ও অফিস মেমোরেন্ডাম পাশ করাতে হবে। এসব পদ্ধতি যথাযথ অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। তারা ভেঙেছেন। একটি কাগজে আবার প্রশ্ন তোলা হয়েছে-‘লকার থেকে উদ্ধার করা সোনা শেখ হাসিনার হলফনামায় দেখানো হয়েছিল কি’? অর্থাৎ বিগত তিনটি নির্বাচন অবৈধ বলেই শেষ নয়, এবার তার নির্বাচনকালিন হলফনামা ধরে টান দিয়ে বাজিয়ে দেখতে হবে। আজকের মত একই ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেখানে যেসব সম্পদ পাওয়া গিয়েছিল তা নিয়ে সেসময়কার পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে খবর ছাপা হয়েছিল। ব্যাপারটা এমন যে পাজামা-পাঞ্জাবী পরা শেখ মুজিবের বাড়িতে তার পুত্রবধূর ৪ ভরি ওজনের টায়রা থাকবে কেন? ওসব তো থাকবে আমলা-পুলিশ-ব্যবসায়ী-কর্মকর্তাদের বাড়িতে! অথচ এই শহরের অন্তত ৫০ লক্ষ মানুষের বাড়িতে অমন ৫শ’ ১ হাজার ভরি সোনার অলঙ্কার আকসার মেলে। গত আমলের জামালপুরের ডিসি ফেয়ারওয়েল নেওয়ার সময় সোনার মুকুট উপহার পেয়ে সেটা মাথায় পরে ফটোসেশন করেছিলেন। সেটা কম করে হলেও ১শ’ ভরির ওপরে ছিল। ২০২৪-এর আগস্ট থেকে ২০২৫-এর আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে ইন্টেরিম সরকারের কাছে চ্যালেঞ্জিং মনে হয়নি। যখনই তিনি বিশ্বের ডজনখানেক প্রভাবশালী মিডিয়ায় স্বাক্ষাৎকার দিয়ে বিশ্বজোড়া প্রচারে চলে আসলেন, তখনই ইন্টেরিমের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রমাদ গোনা শুরু করল। আইসিটি আদালতে বিচার করে ফাঁসির আদেশ দিয়েও তার রাজনৈতিক প্রচার বন্ধ করতে না পেরে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে এবার তার চরিত্র হননের চেষ্টা চলছে। জনমানসে তিনি কত টাকার মালিক ছিলেন, বিলাসব্যসনে কত টাকায় ব্যয় করেছেন, কত বড় জমিদারি ছিল তার, এইসব তুলে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। এর আগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ‘৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে গেছে’ বলে অভিযোগ করা হলো। রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন ‘রোসাটম’-এর সহায়তায় পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলারের। এই অভিযোগের পরে রোসাটম সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বয়ং সংক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কারণ, রোসাটম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। ইন্টেরিম কর্তৃপক্ষ সেই চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্ট করেনি। জাস্ট চুপ মেরে গিয়েছিল। এর পরে আসল টিউলিপ সিদ্দিকীর দুর্নীতি নিয়ে প্রচার। টিউলিপ পদত্যাগ করে নিয়ম পালন করেছিলেন। সেই অভিযোগ এখনও প্রমাণ হয়নি। ২০২৪-এর আগষ্ট মাসে তারা গণভবন লুটপাট চালিয়ে ভেবেছিল; শত-সহস্র কোটি টাকা, সোনাদানা ও দামী অনেক কিছু পাবে। তারা হতাশ হলো সাধারণ বাঙালি পরিবারের ব্যবহার্য জিসিনপত্র ও আসবাদ দেখে। এর মধ্যে চরম ইতরামি হলো একজন প্রৌঢ় নারীর আন্ডারগার্মেন্ট নিয়ে। যে নোংরামি ও অসভ্যতা করা হলো তা বিশ্বজুড়ে প্রচার হয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির রুচির পরিচয় তুলে ধরল। উপমহাদেশের রাজনৈতিক কালচারে ব্যক্তিকেন্দ্রীক নোংরামি, অসভ্যতা নতুন নয়। নতুন এটাই যে অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশ বরাবরই এক কাঠি এগিয়ে! আমরা এরশাদ জমানায় একজন ‘অসভ্য অভব্য বিকৃতরুচির’ শাহ মোয়াজ্জেমকে দেখেছি। এখন এই ইন্টেরিম আমলে লুঙ্গি ঝাড়া দিলেই দশ-পাঁচটা ‘শাহ মোয়াজ্জেম’ বেরিয়ে আসে। এখন আর প্রকাশ্যে অশ্লীল-অশ্রাব্য কথা বলতে কেউ কুণ্ঠিত হয় না। ২৫ থেকে ৩০-এর তরুণরা অবলীলায় ‘চ’ বর্গ, ‘ল’ বর্গ, ‘ম’ বর্গ মিশিয়ে কুৎসিত, ইরোটিক কালচার ছড়িয়ে দিয়েছে। ধেড়েগুলো আবার সেসব শুনে বিমলানন্দ পাচ্ছে। মিডিয়ায় সগর্বে ওইসব যৌনবিকৃতি প্রচারও করছে। তা নিয়ে সুশীলদের কোনও উদ্বেগ নেই। স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার প্রকল্পের বয়স ২৪ ঘন্টা না পেরুতেই দুদক থেকে বলা হয়েছে, ‘দুটি লকার খুলে যে ৮৩২ ভরি (৯ হাজার ৭০৭ দশমিক ১৬ গ্রাম) সোনা পাওয়া গেছে, সেগুলো ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একার নয়। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর বোন শেখ রেহানা, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদসহ পরিবারের সদস্যদের নামে ওই সব সোনা জমা রাখা হয়েছিল নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে। এসব সোনার মধ্যে স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি সোনার নৌকা ও হরিণ রয়েছে।’ অর্থাৎ পরিবারের সবার হলেও “নৌকা ও হরিণ রয়েছে”! মানে তারা বিরাট ডিসকভারি করে ফেলেছেন! শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েই কি তার চরিত্র হননে মেতেছে এরা? এতে করে হয়ত একশ্রেণীর ভালনারেবল চিন্তার মানুষকে দিকভ্রান্ত করতে পারবে, সবাইকে কি পারবে? উত্তর হচ্ছে-না, পারবে না। বরং নিজেরাই খেলো হতে থাকবে। মনজুরুল হক ২৭শে নভেম্বর, ২০২৫
